*নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকারপত্র ডটকম*
জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে পা দিয়ে লিখেই পড়াশোনা শেষ করেছেন মো. আলতাফ হোসেন। নিজের সঞ্চয় ও পৈতৃক জমি বিক্রির অর্থ দিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি বিদ্যালয়। তাঁর এই ব্যতিক্রমী জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষার প্রসারে অবদানের কথা শুনে বিদ্যালয়টির জন্য নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আলতাফ হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বুয়েট থেকে প্রকৌশলে পড়াশোনা শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ এবং ভোলার বৃক্ষপ্রেমী রেজাউল কিবরিয়া বাবুলও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
তিনজনের জীবনসংগ্রাম, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সমাজের কল্যাণে তাঁদের অবদানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের কাজের প্রশংসা করে নিজ নিজ উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে উৎসাহ দেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।’
পা দিয়ে লিখে গড়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
মো. আলতাফ হোসেনের জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর শিক্ষাজীবন কিংবা স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। পা দিয়ে লেখার অভ্যাস গড়ে তুলে পড়াশোনা শেষ করেন তিনি।
২০০৭ সালে নরসিংদীর পাঁচদোনায় প্রতিষ্ঠা করেন প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন স্কুল। নিজের সঞ্চয় ও পৈতৃক জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে গড়ে তোলেন প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১৪৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। পাঠদানের দায়িত্বে রয়েছেন ১০ জন শিক্ষক। নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে পা দিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমও পরিচালনা করেন আলতাফ।
তাঁর এই উদ্যোগ শুধু নিজের জীবনসংগ্রামের অনন্য দৃষ্টান্ত নয়, বরং শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগেরও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিদ্যালয়টির জন্য নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বুয়েট থেকে পড়েও শিশুদের শিক্ষক নায়লা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন নায়লা শারাফ। পরে জনতা ব্যাংকেও কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন তিনি।
৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও সরকারি চাকরিতে যোগ না দিয়ে শিশুদের শিক্ষাদানের পথ বেছে নেন নায়লা। গত সাত বছর ধরে নেত্রকোনার পাঁচআননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন তিনি।
বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে পাঠদানকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলতে নিজ উদ্যোগে শিক্ষা উপকরণ এবং ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করেন নায়লা। শিশুদের শেখার আগ্রহ বাড়াতে তাঁর এই উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে।
তিন দশক ধরে গাছ লাগাচ্ছেন ভোলার বাবুল
ভোলার চরফ্যাশনের রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের আরেক পরিচয়—তিনি একজন বৃক্ষপ্রেমী মানুষ। মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় তিন দশক ধরে নিজের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছ লাগিয়েছেন তিনি।
পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি গড়ে তোলেন বাবুল। সেখানে উৎপাদিত চারা বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর লাগানো অনেক গাছ বড় হয়েছে। সড়কের পাশে বেড়ে ওঠা এসব গাছ এখন পথচারীদের ছায়া দিচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছে।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশ গড়ার বার্তা
আলতাফ হোসেনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নায়লা শারাফের শিশুদের শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ এবং রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের দীর্ঘদিনের বৃক্ষরোপণ—তিনটি উদ্যোগের ধরন আলাদা হলেও লক্ষ্য এক: সমাজের কল্যাণে কাজ করা।
প্রধানমন্ত্রী তাঁদের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করা মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কাজ অন্যদেরও ভালো উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করবে।
সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তিনজনকেই তাঁদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে উৎসাহ দেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
**আলতাফের গল্প তাই শুধু প্রতিবন্ধকতা জয় করার গল্প নয়; এটি শিক্ষা, আত্মনির্ভরতা ও মানুষের জন্য কাজ করার এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।**
