অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিত│ দেশচিন্তা │নি:শব্দ পৃথিবী ও একীভূত সমাজ
এই নিবন্ধের উপজীব্য চ্ছে: শিশুর শিক্ষা ও পাঠ্যবইয়ের অর্ধসত্য পাঠ্যবইয়ের অর্ধসত্য, বাংলা ইশারা ভাষার স্বীকৃতি, বধির শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার এবং রাষ্ট্রের আইনগত প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান। বাংলাদেশের সংবিধান বলছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা কি প্রতিটি নাগরিকের মাতৃভাষাও? বিশেষ করে এমন একটি শিশুর ক্ষেত্রে, যে জন্ম থেকেই শুনতে পায় না বা যার কাছে কথ্য বাংলা স্বাভাবিকভাবে প্রবেশযোগ্য নয়—তার প্রথম ভাষা কী হবে? বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকার করেছে। জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদও ইশারা ভাষাকে পূর্ণাঙ্গ ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বধির শিশুর ভাষাগত পরিচয়, উপযুক্ত ভাষায় শিক্ষা এবং ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করার কথা বলেছে। অথচ আমাদের পাঠ্যবই, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নব্যবস্থায় এখনো প্রায়ই ‘রাষ্ট্রভাষা’, ‘মাতৃভাষা’, ‘প্রথম ভাষা’ ও ‘শিক্ষার মাধ্যম’কে একই বাক্সে ঢুকিয়ে দেখা হয়। এই নিবন্ধে বাংলাদেশের আইন, শিক্ষা-বাস্তবতা, প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য, আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং ফিলিপাইন ও নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞতার আলোকে দেখানো হয়েছে—বিতর্কটি ‘বাংলা না ইশারা ভাষা’ নয়; বরং বাংলা ইশারা ভাষা ও লিখিত বাংলাকে কেন্দ্র করে একটি অধিকারভিত্তিক দ্বিভাষিক ও দ্বিমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা নির্মাণের প্রশ্ন।
নীরবতা ভাষাহীনতা নয়
একটি শ্রেণিকক্ষ কল্পনা করুন। শিক্ষক বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন—“বাংলা আমাদের মাতৃভাষা।” অধিকাংশ শিশু বাক্যটি শুনে, উচ্চারণ করে, খাতায় লেখে। কিন্তু সামনের সারিতে বসা একটি বধির শিশু শিক্ষকের ঠোঁটের নড়াচড়া দেখছে। তার কাছে শব্দ পৌঁছাচ্ছে না, অথচ পাঠ্যবই ধরে নিচ্ছে ভাষা যেন কেবল কানের দরজা দিয়েই মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। শিশুটি কি বাংলা জানে না? নাকি শিক্ষাব্যবস্থা তার ভাষা চিনতে শেখেনি?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা নির্ধারিত। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা একটি রাষ্ট্রীয়-সাংবিধানিক ধারণা; মাতৃভাষা বা প্রথম ভাষা ব্যক্তির ভাষা অর্জনের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—বাংলাদেশের নিজস্ব আইনই শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকার করে। এখানেই আমাদের পাঠ্যবই ও শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়: আইন যে ভাষাগত বৈচিত্র্য স্বীকার করেছে, শ্রেণিকক্ষ কি তা স্বীকার করেছে?
এই নাতিদীর্ঘ নিবন্ধটি সাতটি পরস্পর সংযুক্ত ও বিষয়গতভাবে ধারাবাহিক অংশে বিন্যস্ত। বাংলা ইশারা ভাষার ভাষাবৈজ্ঞানিক স্বাতন্ত্র্য, বধির জনগোষ্ঠীর ভাষাগত পরিচয়, জনমিতিক বাস্তবতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনগত স্বীকৃতি এবং শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তির যৌক্তিকতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিবন্ধটি একটি সমন্বিত অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে।
নিবন্ধটির সাতটি অংশ :
- অংশ–০১: প্রারম্ভিকতা: বাংলা ইশারা ভাষা একটি স্বতন্ত্র ভাষা, বহু শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাতৃভাষা
রাষ্ট্রভাষা, মাতৃভাষা ও প্রথম ভাষার ধারণাগত পার্থক্য এবং বাংলা ইশারা ভাষাভাষী বধির জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত অধিকারের প্রশ্ন। - অংশ–০২: বাংলা ইশারা ভাষা—একটি স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক ভাষা ও বহু বধির মানুষের প্রথম ভাষা থথা মাতৃভাষা
বাংলা ইশারা ভাষার ভাষাবৈজ্ঞানিক স্বাতন্ত্র্য, নিজস্ব ব্যাকরণ, ভাষাগত কাঠামো, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং মাতৃভাষা হিসেবে এর গুরুত্ব। - অংশ–০৩: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোয় ভাষাগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে বধির জনগোষ্ঠীর অধিকার
বাংলাদেশের সংবিধান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ এবং ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক ঘোষণার আলোকে অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের বিশ্লেষণ। - অংশ–০৪: বধির জনগোষ্ঠীর জনমিতিক বাস্তবতা ও ভাষাগত সংখ্যালঘু (Language Minority Group)পরিচয়—পরিসংখ্যানের আলোকে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বধির মানুষের সংখ্যা, বাংলা ইশারা ভাষা ব্যবহারকারীদের জনসংখ্যাসংক্রান্ত তথ্যের সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা। - অংশ–০৫: স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক ও প্রথম ভাষা হিসেবে বাংলা ইশারা ভাষার আইনগত মর্যাদা—বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনগত স্বীকৃতি এবং নিউজিল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও ফিলিপাইনের ইশারা ভাষাবিষয়ক আইনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ; পূর্ণাঙ্গ আইনগত স্বীকৃতি ও বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা। - অংশ–০৬: জাতীয় শিক্ষাক্রমে তৃতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ইশারা ভাষা—যৌক্তিকতা, প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবায়নের পথ
শ্রবণশীল শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় বা অতিরিক্ত ভাষা হিসেবে বাংলা ইশারা ভাষা শেখার সুযোগ এবং বধির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে এর ব্যবহার নিশ্চিত করার নীতিগত ও শিক্ষাগত যুক্তি। - অংশ–০৭: সমাপনী আলোচনা, নীতিগত সুপারিশ ও উত্তরণের পথ
ভাষাগত অধিকার প্রতিষ্ঠা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাক্রম, দ্বিভাষিক শিক্ষা, শিক্ষক উন্নয়ন, ইশারা ভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক, আইনগত সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির জন্য সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা।
নিচে নিবন্ধটির সাতটি অংশ ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হলো:
অংশ-০১
প্রারম্ভিকতা: বাংলা ইশারা ভাষা একটি স্বতন্ত্র ভাষা, বহু শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাতৃভাষা
রাষ্ট্রভাষা বাংলা, কিন্তু সবার মাতৃভাষা কি বাংলা?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা—কিন্তু দেশের সব নাগরিকের মাতৃভাষা কি বাংলা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, জাতীয় পাঠ্যপুস্তক, ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং বধির শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে এক গভীর বৈপরীত্য সামনে আসে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। অথচ বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে ব্যবহারকারী বধির শিক্ষার্থীদের জন্য সমতুল্য জাতীয় পাঠ্যক্রম, ভাষাভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কতটা গড়ে উঠেছে, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবন্ধিতা জরিপ, সংবিধানের ভাষাসংক্রান্ত বিধান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, জাতিসংঘের ভাষাগত সংখ্যালঘুবিষয়ক ঘোষণা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদের আলোকে এই চার পর্বের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন অনুসন্ধান করেছে রাষ্ট্রভাষা, মাতৃভাষা ও শিক্ষার ভাষার মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য। পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা হয়েছে ইশারা ভাষা সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা, পাঠ্যপুস্তকের উপস্থাপনা, শ্রেণিকক্ষের ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়নব্যবস্থা, পরিবার ও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের সংকট। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার তুলনামূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রতিবেদনটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে: যে রাষ্ট্র মাতৃভাষায় শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করে, সেই রাষ্ট্র কি বধির শিশুর নিজস্ব ভাষায় শেখার সুযোগ নিশ্চিত না করেও শিক্ষাকে সর্বজনীন বলতে পারে?
যে শিশুর ভাষা পাঠ্যবইয়ে নেই: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এক অদৃশ্য দেয়াল
একটি শিশু বিদ্যালয়ে আসে পৃথিবীকে জানার কৌতূহল নিয়ে। তার কাছে বিদ্যালয় হওয়ার কথা নতুন শব্দ, নতুন ধারণা, নতুন সম্পর্ক ও নতুন সম্ভাবনার দরজা। কিন্তু সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যদি শিশুটি আবিষ্কার করে, শিক্ষক যে ভাষায় বোঝান, পাঠ্যবই যে ভাষাকে স্বাভাবিক ধরে নেয় এবং পরীক্ষা যে ভাষায় তার জ্ঞান যাচাই করে, সেই ভাষায় তার অবাধ প্রবেশাধিকার নেই—তাহলে শিক্ষার শুরুতেই তৈরি হয় এক অদৃশ্য দেয়াল। শিশুটি শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকে, অথচ শিক্ষার সঙ্গে তার যোগাযোগ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। উপস্থিতির খাতায় তার নাম আছে, কিন্তু শেখার প্রক্রিয়ায় তার অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত, সেই প্রশ্নটি প্রায়ই অনুচ্চারিত থেকে যায়।
বাংলাদেশের বধির শিশুদের শিক্ষার প্রশ্নে এই বৈপরীত্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে সমস্যাটি কেবল শ্রবণক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, শ্রেণিকক্ষে শব্দ শোনার অসুবিধা কিংবা বিশেষ শিক্ষাসামগ্রীর অভাব নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে ভাষা—শিশুর প্রথম ভাষা, শিক্ষকের শিক্ষাদানের ভাষা, পাঠ্যপুস্তকের ভাষা এবং রাষ্ট্রের ভাষানীতির মধ্যকার সম্পর্ক।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত। এই স্বীকৃতি বাঙালির ঐতিহাসিক ভাষাসংগ্রাম, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা ও মাতৃভাষা একই ধারণা নয়। একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক ভাষা সেই রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের প্রথম ভাষা হবে, এমন কোনো ভাষাবৈজ্ঞানিক অনিবার্যতা নেই। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলো যেমন এই বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়, তেমনি বধির জনগোষ্ঠীর ইশারা ভাষাও ভাষাগত বৈচিত্র্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা উন্মোচন করে।
ইশারা ভাষা কেবল মুখের ভাষাকে হাতের সাহায্যে প্রকাশ করার কৌশল নয়। এর নিজস্ব শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণ, বাক্যগঠন এবং অর্থ প্রকাশের পদ্ধতি রয়েছে। মুখের অভিব্যক্তি, হাতের গতি, দেহভঙ্গি এবং স্থানিক বিন্যাস মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দৃশ্যনির্ভর ভাষাব্যবস্থা। বাংলাদেশের বধির জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবহৃত বাংলা ইশারা ভাষার সঙ্গে লিখিত বাংলার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও দুটিকে অভিন্ন ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথার্থ নয়। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন, সব শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের প্রথম ভাষা ইশারা ভাষা নয়; তাঁদের ভাষাগত অভিজ্ঞতা, শিক্ষার ইতিহাস ও যোগাযোগের পছন্দে বৈচিত্র্য রয়েছে।
এই বাস্তবতায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যবই প্রকাশের উদ্যোগ নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। চাকমা, মারমা, গারো, সাদরি ও ত্রিপুরা ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাসামগ্রী তৈরির উদ্যোগ মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেয়। এটি নিঃসন্দেহে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু এই স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রশ্ন ওঠে, ইশারা ভাষাভাষী বধির শিশুদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে সমতুল্য ভাষাগত শিক্ষাব্যবস্থা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
এখানে দুই জনগোষ্ঠীর অধিকারকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো সমীচীন নয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা যেমন ন্যায্য দাবি, তেমনি বধির শিশুদের প্রবেশগম্য ভাষায় শিক্ষা লাভও মৌলিক অধিকার। এক জনগোষ্ঠীর অর্জন অন্য জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার কারণ নয়; বরং সেই অর্জন রাষ্ট্রের সামনে সমতার মানদণ্ড স্থাপন করে। প্রশ্নটি তাই কার অধিকার বেশি, তা নয়। প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষানীতি সব ভাষাগত বাস্তবতাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে কি না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় প্রতিবন্ধিতা জরিপের তথ্য এই আলোচনাকে জননীতি ও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যায়। ২০২১ সালের জরিপে শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, বাক্প্রতিবন্ধিতা এবং যুগপৎ দৃষ্টি ও শ্রবণপ্রতিবন্ধিতার পৃথক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। এসব হারকে ২০২২ সালের জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর একটি আনুমানিক চিত্র পাওয়া সম্ভব। তবে শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের মোট সংখ্যা থেকে সরাসরি ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। ফলে বধির জনগোষ্ঠীর ভাষাগত অধিকার নিয়ে নির্ভুল পরিকল্পনার জন্য প্রতিবন্ধিতার পাশাপাশি ভাষা ব্যবহার, ভাষা অর্জন এবং শিক্ষার মাধ্যম সম্পর্কেও পৃথক তথ্য প্রয়োজন।
এই প্রশ্নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে। জাতিসংঘের ১৯৯২ সালের জাতীয় বা জাতিগত, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকারবিষয়ক ঘোষণা ভাষাগত পরিচয় সংরক্ষণ ও ভাষা ব্যবহারের স্বাধীনতার নীতিগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ সনদের ২৪ অনুচ্ছেদ ইশারা ভাষা শেখা, বধির জনগোষ্ঠীর ভাষাগত পরিচয়ের প্রসার এবং উপযুক্ত ভাষা ও যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব আইনেও ইশারা ভাষা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত। তবে ১৯৯২ সালের ঘোষণাকে সরাসরি বাধ্যতামূলক চুক্তি কিংবা সব বধির মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই আইনগত সংজ্ঞার ভাষাগত সংখ্যালঘু হিসেবে গণ্য করা যথাযথ হবে না। অধিকারটির শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে ওঠে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইনগত বিধানকে সম্মিলিতভাবে বিবেচনা করলে।

এই প্রতিবেদন সেই বৃহত্তর প্রশ্নেরই অনুসন্ধান। প্রথমত, রাষ্ট্রভাষা, মাতৃভাষা ও ইশারা ভাষার সম্পর্কের ভাষাবৈজ্ঞানিক এবং পাঠ্যপুস্তকসংক্রান্ত অসংগতি; দ্বিতীয়ত, জনসংখ্যা, মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যবই ও ভাষাগত সমতার প্রশ্ন; তৃতীয়ত, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে বধির জনগোষ্ঠীর ভাষাগত অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা; চতুর্থত, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ভাষাগত প্রবেশগম্যতা, শিক্ষক প্রস্তুতি, মূল্যায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা—এই চারটি পরস্পরসম্পর্কিত মাত্রায় আলোচনাটি বিস্তৃত।
এই অনুসন্ধানের মূল বিবেচনা একটিই:
শিক্ষা কেবল বিদ্যালয়ের দরজা খুলে দেওয়ার নাম নয়; শিক্ষা হলো শিশুর বোঝার, প্রশ্ন করার, নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার এবং জ্ঞান নির্মাণে অংশ নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা। যে ভাষায় শিশু পৃথিবীকে বুঝতে পারে, সেই ভাষার সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হলে বিদ্যালয় জ্ঞানের সেতু না হয়ে কখনো কখনো বিচ্ছিন্নতার প্রাচীরে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের আলোচনায় এই প্রাচীর কতটা দৃশ্যমান, এবং তা অপসারণের দায়িত্ব কার—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এই প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য।
অংশ–০২
বাংলা ইশারা ভাষা—একটি স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক ভাষা ও বহু বধির মানুষের প্রথম ভাষা তথা মাতৃভাষা
রাষ্ট্রভাষা, মাতৃভাষা, প্রথম ভাষা—এক শব্দের তিন আলাদা দরজা
বাংলাদেশের ভাষা-ইতিহাস আবেগ, রক্ত ও আত্মপরিচয়ের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহনকারী রাষ্ট্রে বাংলার সাংবিধানিক মর্যাদা প্রশ্নাতীত। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদ অত্যন্ত স্পষ্ট—“প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।” কিন্তু এখানেই একটি ধারণাগত বিভ্রান্তি তৈরি হয়, যখন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ থেকে সরলরেখায় সিদ্ধান্ত টানা হয়—‘অতএব বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মাতৃভাষাও বাংলা’। প্রথম বাক্যটি সাংবিধানিক সত্য; দ্বিতীয়টি সমাজভাষাবৈজ্ঞানিকভাবে সর্বজনীন সত্য নয়।
রাষ্ট্রভাষা হলো রাষ্ট্রের প্রশাসন, আইন, জাতীয় যোগাযোগ ও প্রতীকী পরিচয়ের ভাষা। মাতৃভাষা বা প্রথম ভাষা হলো ব্যক্তি শৈশবে যে ভাষা স্বাভাবিকভাবে অর্জন করে, যার মাধ্যমে পৃথিবীকে প্রথম সংগঠিত করতে শেখে, কিংবা যে ভাষায় সে সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চিন্তা ও যোগাযোগ করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিশুদের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য সুপরিচিত। এনসিটিবি নিজেই চাকমা, মারমা, গারো, সাদরি ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ভাষায় মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা উপকরণ প্রকাশ করেছে। অতএব বাংলা রাষ্ট্রভাষা হওয়া এবং অন্য কোনো ভাষা কারও প্রথম ভাষা হওয়া পরস্পরবিরোধী নয়।
বধির শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম। তার মা হয়তো কথ্য বাংলাভাষী, পরিবারও বাংলাভাষী; কিন্তু শিশু যদি সেই কথ্য ভাষা শ্রবণপথে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে না পারে, তবে ‘মায়ের ভাষাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিশুর প্রথম ভাষা’—এমন ধারণা কার্যকর হয় না। ভাষা রক্তের উত্তরাধিকার নয়; ভাষা অর্জনের জন্য প্রবেশযোগ্য যোগাযোগ প্রয়োজন। এই জায়গায় বাংলা ইশারা ভাষা অনেক শিশুর জন্য শুধু যোগাযোগের সহায়ক ব্যবস্থা নয়, জ্ঞান ও চিন্তার প্রথম প্রবেশদ্বার হতে পারে।
ইশারা ভাষা ‘হাত নাড়ানো’ নয়: একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক ভাষা
আমাদের প্রচলিত পাঠ্যবই ও সাধারণ কথাবার্তায় ইশারা ভাষাকে প্রায়ই ‘অঙ্গভঙ্গির ভাষা’, ‘সংকেত’ বা কথ্য ভাষার বিকল্প কৌশল হিসেবে বোঝানো হয়। এখানেই বড় ভুলটি ঘটে। স্বাভাবিক ইশারা ভাষার নিজস্ব শব্দভান্ডার, ব্যাকরণ, বাক্যগঠন, স্থানিক বিন্যাস, মুখভঙ্গি ও অর্থ সৃষ্টির নিয়ম রয়েছে। জাতিসংঘও স্পষ্টভাবে বলছে, ইশারা ভাষা পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক ভাষা এবং এগুলো কথ্য ভাষা থেকে কাঠামোগতভাবে স্বতন্ত্র। বিশ্বজুড়ে ৩০০-এর বেশি ইশারা ভাষা ব্যবহৃত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষ শিক্ষা বিভাগের কোর্সে এবং কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগের পাঠ্যক্রমেও বাংলা ইশারা ভাষার ব্যাকরণ, শব্দভান্ডার ও বাক্যগঠনকে স্বতন্ত্র ভাষাতাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়। ফলে ‘বাংলা ইশারা ভাষা’ নামটি শুনে এটিকে কেবল বাংলা বাক্যের প্রতিটি শব্দ হাতে অনুবাদ করার পদ্ধতি মনে করা ঠিক নয়। কথ্য বাংলা ও বাংলা ইশারা ভাষা সম্পর্কযুক্ত সামাজিক পরিসরে ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্তু তাদের মাধ্যম ও কাঠামো এক নয়।
এই পার্থক্য শিক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুকে যদি আমরা এমন একটি ভাষায় গণিত, বিজ্ঞান বা সমাজ শেখাতে চাই, যে ভাষাটি সে পূর্ণভাবে গ্রহণই করতে পারছে না, তাহলে সমস্যাটি শিশুর বুদ্ধিতে নয়—শিক্ষার দরজায়। কাচের ওপারে বই সাজিয়ে রেখে শিশুকে বলা যায় না, “জ্ঞান তো তোমার সামনেই আছে।” দরজাটিও খুলতে হয়। অনেক বধির শিশুর জন্য সেই দরজার নাম ইশারা ভাষা।
বাংলাদেশের আইন যে কথা ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছে
বাংলাদেশে বাংলা ইশারা ভাষার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিটি বিদেশি কোনো তত্ত্ব থেকে ধার নিতে হয় না; দেশের আইনেই তার ভিত্তি রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-তে ‘বাংলা ইশারা ভাষা’কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত, অন্যান্য ভাষার মতোই গতিশীল ও পরিবর্তনশীল ভাষা হিসেবে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো আইনের ১৬(১)(থ) ধারা—শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী, যথাসম্ভব বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার সেখানে স্বীকৃত। একই আইনে প্রতিবন্ধিতার ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু প্রতিবন্ধিতার কারণে ভর্তি প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধেও সুরক্ষা রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতাও সমান স্পষ্ট। বাংলাদেশ ২০০৭ সালের ৩০ নভেম্বর জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ—সিআরপিডি—অনুসমর্থন করে। সনদের ২৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে ইশারা ভাষা শেখার সুযোগ সৃষ্টি, বধির সম্প্রদায়ের ভাষাগত পরিচয় উন্নীতকরণ এবং বধির শিশুকে তার জন্য সবচেয়ে উপযোগী ভাষা ও যোগাযোগপদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। একই অনুচ্ছেদ ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণের কথাও বলে। ২১ অনুচ্ছেদ ইশারা ভাষার ব্যবহার স্বীকৃতি ও উৎসাহিত করার কথা বলে, আর ৩০ অনুচ্ছেদ বধির সংস্কৃতি ও ভাষাগত পরিচয়ের স্বীকৃতি দাবি করে। অর্থাৎ আইনের ভাষায় বিতর্কের বড় অংশ ইতিমধ্যেই নিষ্পত্তি: ইশারা ভাষা কোনো দয়া নয়; এটি অধিকার।
পাঠ্যবইয়ের ‘অর্ধসত্য’: প্রতারণা কোথায়?
‘পাঠ্যবইয়ের প্রতারণা’ শব্দবন্ধটি তীব্র। তাই এটিকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। এখানে কোনো গোপন ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নয়; বরং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক অর্ধসত্যের কথা বলা হচ্ছে, যা বারবার শেখানো হলে শিশুর বাস্তব পরিচয় মুছে দিতে পারে। যখন পাঠ্যবই বলে, “বাংলা আমাদের মাতৃভাষা”, বাক্যটি সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী শিশুর ক্ষেত্রে সত্য। কিন্তু যখন একই বাক্যকে বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর জন্য ব্যতিক্রমহীন সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন রাষ্ট্রভাষা ও ব্যক্তির প্রথম ভাষার পার্থক্য অদৃশ্য হয়ে যায়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অতীতের বাংলা ব্যাকরণভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রীতে ‘সংকেত ভাষা’কে অনেক সময় অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে ভাব প্রকাশের কৌশল হিসেবে শেখানো হয়েছে, অথচ আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান ইশারা ভাষাকে নিজস্ব ব্যাকরণসম্পন্ন প্রাকৃতিক ভাষা হিসেবে দেখে। এমন শিক্ষণ শুধু শব্দগত ভুল নয়; এর সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক আছে। যে ভাষাকে ‘আসল ভাষা’ এবং অন্যটিকে ‘অঙ্গভঙ্গি’ বলা হয়, শ্রেণিকক্ষের মর্যাদার সিঁড়িতে প্রথমটি উপরে উঠে যায়, দ্বিতীয়টি নিচে নেমে আসে।
এনসিটিবির দায়িত্বের মধ্যেই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর উপযোগী পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষা উপকরণ প্রস্তুতের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল বই ও মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক তৈরির সরকারি উদ্যোগের সুস্পষ্ট নজিরও আছে। বিপরীতে বাংলা ইশারা ভাষায় পূর্ণাঙ্গ, ধারাবাহিক, শ্রেণিভিত্তিক পাঠ্যসামগ্রীর দৃশ্যমানতা এখনো অনেক দুর্বল; সাম্প্রতিক সংবাদ বিশ্লেষণেও এই ঘাটতি তুলে ধরা হয়েছে। এখানেই প্রশ্ন: চোখের জন্য বই বদলাতে পারলে, ভাষার জন্য বই কেন বদলাবে না?
ভাষা না পেলে শিক্ষা নয়, ‘ভাষাহীন অপেক্ষা’ তৈরি হয়
শিশুর মস্তিষ্ক জন্মের পর ভাষা অর্জনের জন্য অপেক্ষা করে না। সে চারপাশের অর্থ, সম্পর্ক, কারণ-ফল, সময়, সংখ্যা, অনুভূতি—সবকিছুকে ভাষার মাধ্যমে সংগঠিত করতে থাকে। শ্রবণক্ষম শিশু কথোপকথনের অসংখ্য টুকরো অনায়াসে শুনে ‘incidentally’ শেখে; বধির শিশুর ক্ষেত্রে সেই স্বতঃস্ফূর্ত প্রবেশাধিকার নাও থাকতে পারে। পরিবার, স্বাস্থ্যসেবা ও বিদ্যালয় যদি একই সঙ্গে প্রবেশযোগ্য ইশারা ভাষাও না দেয়, তবে শিশুটি শুধু শব্দ থেকে নয়—অনেক সামাজিক জ্ঞান থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
আধুনিক গবেষণায় এই ঝুঁকিকে ‘language deprivation’ বা ভাষাবঞ্চনা বলা হয়—অর্থাৎ ভাষা শেখার গুরুত্বপূর্ণ বিকাশপর্বে কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক ভাষায় পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার না পাওয়া। বিশ্ব বধির ফেডারেশন সতর্ক করেছে, কেবল কথ্য ভাষার ফলাফলের অপেক্ষায় থেকে ইশারা ভাষা বিলম্বিত করা কিছু শিশুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভাষাগত ও শিক্ষাগত ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় ইশারা ভাষা ও জাতীয় লিখিত ভাষার সমন্বয়ে বহুভাষিক শিক্ষাকে বধির শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে।
এখানে একটি প্রচলিত ভয়ও সংশোধন করা দরকার—ইশারা ভাষা শেখালে শিশু কথ্য ভাষা শিখবে না। সাম্প্রতিক গবেষণাও এমন সরল বিরোধকে সমর্থন করে না। ২০২৪ সালে Developmental Science-এ প্রকাশিত গবেষণায় ককলিয়ার ইমপ্লান্ট ব্যবহারকারী শিশুদের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক ইশারা ভাষার সংস্পর্শ ভাষা ও জ্ঞানীয় দক্ষতার ইতিবাচক ফলের সঙ্গে যুক্ত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ভাষাকে প্রতিযোগী নয়, সেতু হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: আইন এগিয়েছে, শিশুর পথ এখনো কাঁটায় ভরা
পরিসংখ্যান আমাদের এই ভাষা-প্রশ্নকে আরও বড় শিক্ষা-সংকটের মধ্যে দেখতে বাধ্য করে। বিবিএস ও ইউনিসেফের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রায় ৬০ শতাংশ কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ছিল না; যারা বিদ্যালয়ে যায়, তারাও গড়ে বয়সোপযোগী শ্রেণির তুলনায় দুই বছরের বেশি পিছিয়ে থাকে। একই জরিপে ১.৭ শতাংশ শিশুর অন্তত একটি আইনগতভাবে সংজ্ঞায়িত প্রতিবন্ধিতা এবং আরও বড় অংশের কোনো না কোনো কার্যগত অসুবিধা শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালের এমআইসিএসের প্রাথমিক ফলাফলেও ২–১৭ বছর বয়সী ৫.২ শতাংশ শিশুর অন্তত একটি ক্ষেত্রে কার্যগত অসুবিধার কথা উঠে এসেছে।
জনশুমারি ২০২২-এ শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট শতাংশ হিসেবে নথিভুক্ত হলেও, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি পৃথক একটি স্বীকৃত শ্রেণি। সংখ্যাটি ছোট দেখালেই নীতিগত দায়িত্ব ছোট হয় না। অধিকার গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পুরস্কার নয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সরকার কয়েকটি বাক্-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় পরিচালনা করে, যেখানে ইশারা ভাষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা দেওয়া হয়। একটি সাম্প্রতিক সরকারি পৃষ্ঠায় আটটি বিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু দেশের বিপুল ভৌগোলিক বিস্তার, উপজেলা ও গ্রামীণ বাস্তবতা বিবেচনা করলে কয়েকটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান সমাধান হতে পারে না। ২০২৫ সালের ইউনিসেফ সেবা-মানচিত্রায়ণও প্রতিবন্ধী শিশুদের সেবায় ভৌগোলিক বৈষম্য, খণ্ডিত ব্যবস্থা ও দক্ষ জনবলের সংকটের কথা বলেছে।
‘কথা শেখানো’ বনাম ‘ভাষা দেওয়া’: পুরোনো দ্বন্দ্বের নতুন পাঠ
বধির শিক্ষার ইতিহাসে দীর্ঘদিন একটি দ্বন্দ্ব রয়েছে—মৌখিক পদ্ধতি বা oralism বনাম sign-based education। একপক্ষ মনে করে শ্রবণযন্ত্র, ককলিয়ার ইমপ্লান্ট, শ্রবণ-প্রশিক্ষণ ও কথ্য ভাষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব শিশুকে মূলধারায় যুক্ত করবে। অন্যপক্ষ জোর দেয় প্রাকৃতিক ইশারা ভাষা ও Deaf cultural identity-র ওপর। আধুনিক অধিকারভিত্তিক অবস্থান এই দ্বন্দ্বকে অনেকটাই নতুনভাবে দেখে: শিশুকে একটি পদ্ধতির পরীক্ষাগারে পরিণত না করে তাকে ভাষার নিরাপত্তা দিতে হবে।
শ্রবণযন্ত্র বা ককলিয়ার ইমপ্লান্ট অবশ্যই অনেক শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। কথ্য বাংলা শেখাও মূল্যবান, কারণ পরিবার, বৃহত্তর সমাজ, উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে এর ব্যবহার অপরিসীম। কিন্তু প্রযুক্তিকে ভাষার বিকল্প ধরে নেওয়া সমস্যাজনক। ইমপ্লান্ট একটি চিকিৎসা-প্রযুক্তি; ভাষা একটি সামাজিক ও জ্ঞানীয় ব্যবস্থা। যন্ত্র সবার ক্ষেত্রে একই ফল দেয় না, আবার শিশুর শেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো ‘ফল দেখা যাক’ বলে স্থগিতও রাখা যায় না।
অতএব বাস্তবসম্মত নীতি হবে শিশুকেন্দ্রিক ও বহুমাধ্যমিক: বাংলা ইশারা ভাষায় পূর্ণ প্রবেশাধিকার, লিখিত বাংলা শেখা, প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী কথ্য বাংলা, এবং পরিবারকে পছন্দ করার জন্য বৈজ্ঞানিক তথ্য দেওয়া। বাংলাদেশের আইনও ‘নিজ ইচ্ছা’ ও ন্যায্য সুযোগের ধারণা স্বীকার করেছে। একটিকে বেছে নিতে গিয়ে অন্যটির দরজা বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।
আসল সমাধান: বাংলা ইশারা ভাষা + লিখিত বাংলা—দ্বিভাষিক, দ্বিমাধ্যমিক শিক্ষা
এই বিতর্ককে ‘ইশারা ভাষা বনাম বাংলা’ হিসেবে সাজানোই সম্ভবত সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ভুল। বাংলা ইশারা ভাষার স্বীকৃতি মানে বাংলা ভাষাকে অস্বীকার করা নয়। বরং অনেক বধির শিশুর ক্ষেত্রে ইশারা ভাষাই লিখিত বাংলায় পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর সেতু হতে পারে। একদিকে থাকবে দৃশ্যমান ও স্বাভাবিকভাবে প্রবেশযোগ্য বাংলা ইশারা ভাষা; অন্যদিকে থাকবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার লিখিত রূপ, এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী কথ্য রূপ। এটাই bilingual-bimodal বা দ্বিভাষিক-দ্বিমাধ্যমিক শিক্ষার যুক্তি।
বিশ্ব বধির ফেডারেশন জাতীয় ইশারা ভাষা ও জাতীয় লিখিত ভাষাকে একসঙ্গে কেন্দ্র করে শিক্ষা দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, শুধু সাধারণ বিদ্যালয়ে একজন দোভাষী বসিয়ে দিলেই অর্থবহ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না; শিক্ষক, সহপাঠী, পাঠ্যক্রম ও বিদ্যালয় সংস্কৃতির মধ্যেও সরাসরি ভাষাগত প্রবেশাধিকার প্রয়োজন।
ইউনেস্কোর মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার নীতিও একটি মৌলিক সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে: শিশু যে ভাষা বোঝে, সেই ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা তার শেখা, বোঝাপড়া ও অংশগ্রহণ শক্তিশালী করে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বাড়িতে ব্যবহৃত ভাষার সঙ্গে বিদ্যালয়ের শিক্ষার ভাষা মিললে প্রাথমিকের শেষে অর্থ বুঝে পড়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। বধির শিশুর ক্ষেত্রে এই নীতি প্রয়োগ করতে হলে ‘ভাষা’ শব্দটির মধ্যে signed language-ও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
শিক্ষক যদি শিশুর ভাষা না জানেন, অন্তর্ভুক্তি শুধু বেঞ্চ ভাগাভাগি
বাংলাদেশে একীভূত বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু একই শ্রেণিকক্ষে বসা আর একই শিক্ষায় অংশ নেওয়া এক জিনিস নয়। একজন বধির শিশুকে সাধারণ বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসিয়ে দিলেই inclusion ঘটে না, যদি শিক্ষক তার ভাষা না জানেন, সহপাঠীরা যোগাযোগ করতে না পারে, ভিডিওতে ক্যাপশন না থাকে, মূল্যায়ন মৌখিক নির্দেশনানির্ভর হয় এবং শ্রেণিকক্ষের আলোচনা তার চোখের সামনে অদৃশ্য শব্দের মতো ভেসে যায়।
সিআরপিডির ২৪ অনুচ্ছেদ তাই শুধু বিদ্যালয়ে প্রবেশের কথা বলেনি; ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণের কথাও বলেছে। এই নির্দেশনার বাস্তব অর্থ হলো—বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষা, বিএড, বিশেষ শিক্ষা, শিক্ষা প্রশাসন ও ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণে বাংলা ইশারা ভাষার স্তরভিত্তিক দক্ষতা কাঠামো প্রয়োজন। শুধু কয়েক দিনের orientation দিয়ে fluent classroom communication তৈরি হয় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বধির শিক্ষক ও ভাষা-আদর্শ। বিশ্ব বধির ফেডারেশন ইশারা ভাষার বিকাশ ও শিক্ষাদানে বধির ব্যক্তিদের নেতৃত্বের ওপর জোর দেয়, কারণ ভাষা শুধু শব্দকোষ নয়; এর সঙ্গে সংস্কৃতি, প্রেক্ষিত, ব্যবহার ও পরিচয় জড়িত। তাই নীতি প্রণয়নের টেবিলে বধির মানুষের চেয়ার খালি রেখে তাদের ভাষা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক যেন নদীর মানচিত্র আঁকা, কিন্তু নদীর কাছেই না যাওয়া।
পরিবার: শিশুর প্রথম শ্রেণিকক্ষ, অথচ এখানেই সবচেয়ে বড় ভাষা-শূন্যতা
বিশ্বের অধিকাংশ বধির শিশু এমন পরিবারে জন্মায় যেখানে বাবা-মা শুনতে পান এবং আগে থেকে ইশারা ভাষা জানেন না। বিশ্ব বধির ফেডারেশন এই হার প্রায় ৯৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করে। ফলে বধির শিশুর প্রথম ভাষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিদ্যালয়ে ভর্তির বয়সে শুরু করলে অনেক দেরি হয়ে যায়। জন্মের পর শ্রবণ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা পরামর্শ ও প্রাথমিক হস্তক্ষেপের সময় থেকেই পরিবারকে ভাষা বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে।
বাংলাদেশে অনেক অভিভাবকের প্রথম প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই হয়—“আমার সন্তান কি কথা বলতে পারবে?” স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি শুধু হিয়ারিং এইড, থেরাপি বা ইমপ্লান্টের উত্তর দেয়, কিন্তু সমান্তরালে না বলে “আপনার সন্তান এখনই কীভাবে পূর্ণাঙ্গ ভাষা পাবে?”, তাহলে সিদ্ধান্ত অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড়ায়। পরিবারকে চিকিৎসা ও ভাষার মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য করারও কোনো কারণ নেই।
সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে অভিভাবকদের বিনা মূল্যে বা স্বল্প খরচে বাংলা ইশারা ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা, ভিডিও অভিধান, ঘরভিত্তিক Deaf mentor service, অনলাইন শেখার প্ল্যাটফর্ম এবং জেলা পর্যায়ে ভাষা সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়। শিশুকে দিনে দুই ঘণ্টা বিদ্যালয়ে ইশারা ভাষা শেখানো অথচ বাকি সময় পরিবারে ভাষাহীন রাখা মানে গাছকে অল্প সময় পানি দিয়ে সারাদিন শিকড় শুকিয়ে রাখা।
মূল্যায়ন ব্যবস্থাও বদলাতে হবে: ভাষার বাধাকে যেন মেধার ঘাটতি না বলা হয়
শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই নয়; পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দেয় আমরা কোন জ্ঞানকে মূল্যবান বলে গণ্য করি। শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যদি প্রশ্নের নির্দেশনা বুঝতেই না পারে, oral presentation দিতে বাধ্য হয়, অডিওভিত্তিক কার্যক্রমের বিকল্প না পায় অথবা দোভাষীর মান দুর্বল হয়, তবে তার পরীক্ষার ফল আসলে বিষয়জ্ঞান নয়—যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতাকে মাপতে পারে।
এনসিটিবির সাম্প্রতিক জাতীয় শিক্ষাক্রমের নথিতে ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতার ক্ষেত্রে শোনা-বলার পাশাপাশি ইশারা, স্পর্শ ও বিকল্প গ্রহণ-প্রকাশের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রগতি। কিন্তু লিখিত নীতির প্রাণ আসে বাস্তবায়নে। প্রতিটি বিষয়ের শিক্ষণফল, শিক্ষক নির্দেশিকা, ডিজিটাল কনটেন্ট, পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণে এই বহুমাধ্যমিক ধারণা ঢুকতে হবে।
একটি বিজ্ঞান প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার্থী ইশারা ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারলে, সেটিকে বাংলায় লিখিত উত্তর থেকে কম জ্ঞান বলে ধরা যাবে না—যদি মূল্যায়নের উদ্দেশ্য বিজ্ঞান বোঝা হয়। আবার লিখিত বাংলা দক্ষতা যদি আলাদাভাবে মূল্যায়নের লক্ষ্য হয়, তখন সেটি অবশ্যই মূল্যায়িত হবে। বিষয়জ্ঞান, ভাষাজ্ঞান ও যোগাযোগের মাধ্যমকে আলাদা না করলে আমরা মেধা আর মাধ্যমকে গুলিয়ে ফেলি। তখন পরীক্ষাই হয়ে ওঠে অদৃশ্য বৈষম্যের যন্ত্র।
অন্য দেশ কী করেছে: ফিলিপাইন ও নিউজিল্যান্ডের শিক্ষা
বাংলাদেশকে কোনো দেশের নীতি অন্ধভাবে নকল করতে হবে না। তবে তুলনা আমাদের সম্ভাবনার জানালা খুলে দেয়। ফিলিপাইন ২০১৮ সালের Filipino Sign Language Act-এর মাধ্যমে Filipino Sign Language বা FSL-কে দেশটির বধির জনগোষ্ঠীর জাতীয় ইশারা ভাষা এবং বধির ব্যক্তিদের সঙ্গে সরকারি যোগাযোগের স্বীকৃত ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, আইনটি বধির শিক্ষায় FSL-কে শিক্ষার মাধ্যম করার পাশাপাশি লিখিত Filipino, অন্যান্য স্থানীয় ভাষা ও ইংরেজি শেখানোর কথা স্পষ্ট করেছে। অর্থাৎ ইশারা ভাষার স্বীকৃতি সেখানে জাতীয় লিখিত ভাষাকে সরিয়ে দেয়নি; বরং ভাষাগত ভূমিকা পরিষ্কার করেছে।
নিউজিল্যান্ড আরও আগে, ২০০৬ সালে New Zealand Sign Language Act-এর মাধ্যমে NZSL-কে দেশের একটি সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আইনে Deaf community-কে এমন একটি স্বতন্ত্র ভাষিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যারা NZSL-কে প্রথম বা পছন্দের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে।
এই উদাহরণগুলোর শিক্ষা বাংলাদেশের জন্য সহজ: রাষ্ট্রের একটি প্রধান ভাষা থাকতে পারে, একই সঙ্গে ইশারা ভাষারও শক্তিশালী আইনগত ও শিক্ষাগত মর্যাদা থাকতে পারে। ভাষার অধিকার শূন্য-সমষ্টির খেলা নয়—একটি ভাষাকে অধিকার দিলে অন্য ভাষার মর্যাদা কমে না।
বাংলাদেশের জন্য কী করা প্রয়োজন: ‘বিশেষ সুবিধা’ নয়, শিক্ষা-পরিকাঠামোর পুনর্গঠন
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ নতুন করে অধিকার আবিষ্কার করা নয়; বিদ্যমান আইনের প্রতিশ্রুতিকে শিক্ষাব্যবস্থায় রূপ দেওয়া।
- প্রথমত, জাতীয় শিক্ষাক্রমে স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রভাষা, মাতৃভাষা, প্রথম ভাষা, যোগাযোগের ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যমের পার্থক্য শেখাতে হবে। প্রাথমিক বাংলা বা সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে বাংলাদেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যের আলোচনায় বাংলা ইশারা ভাষাকে স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। “বাংলা আমাদের মাতৃভাষা” বাক্যের পরিবর্তে প্রেক্ষিতনির্ভর ভাষা ব্যবহার করা যায়—“বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এবং দেশের অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা।” একটি ছোট সংশোধন, কিন্তু এর নৈতিক পরিসর বিশাল।
- দ্বিতীয়ত, বধির শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ইশারা ভাষাভিত্তিক জাতীয় পাঠ্যক্রম, ভিডিও পাঠ্যপুস্তক, বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা, শিক্ষক নির্দেশিকা ও মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করতে হবে। এই কাজ বধির সংগঠন, বাংলা ইশারা ভাষার দক্ষ ব্যবহারকারী, ভাষাবিজ্ঞানী, বিশেষ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, অভিভাবক ও এনসিটিবিকে একসঙ্গে নিয়ে করতে হবে।
- তৃতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগে বাংলা ইশারা ভাষার দক্ষতার স্বীকৃত মান নির্ধারণ, বধির শিক্ষক তৈরির জন্য বৃত্তি ও পেশাগত পথ, এবং সাধারণ বিদ্যালয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী qualified interpreter ও resource support নিশ্চিত করা দরকার।
- চতুর্থত, নবজাতকের শ্রবণ শনাক্তকরণের সঙ্গে family sign-language support যুক্ত করা প্রয়োজন।
- পঞ্চমত, শিক্ষাবিষয়ক জাতীয় তথ্যব্যবস্থায় শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর ভর্তি, উপস্থিতি, ঝরে পড়া, শেখার ফল ও প্রয়োজনীয় সহায়তার তথ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। তথ্য ছাড়া অন্তর্ভুক্তি অনেক সময় কেবল বক্তৃতায় টিকে থাকে।
‘মাতৃভাষা’ শব্দটির মর্যাদা রক্ষা করতে হলে তার বৈচিত্র্যও মানতে হবে
বাংলাদেশ পৃথিবীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস দিয়েছে—এটি আমাদের গভীর গৌরব। কিন্তু সেই গৌরবের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ২১ ফেব্রুয়ারির ফুলে নয়; এমন মানুষের ভাষাকে আমরা কতটা মর্যাদা দিই, যার ভাষা আমাদের নিজের ভাষার মতো শোনায় না—কখনো একেবারেই শোনা যায় না।
বধির শিশুর ভাষা চোখে আসে। হাতের অবস্থান, মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের গতি, স্থান ও দৃষ্টির মধ্যে বাক্য তৈরি হয়। শব্দহীন বলে সেই ভাষা নীরব নয়। বরং শ্রবণকেন্দ্রিক সমাজই অনেক সময় তাকে শুনতে ব্যর্থ হয়।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ভালোবাসার সঙ্গে বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো সংঘাত নেই। বরং ভাষা আন্দোলনের মূল দর্শন—নিজের ভাষায় কথা বলা, শেখা ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকার—এই দাবির সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি। একটি রাষ্ট্র তার সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে সম্মানিত করেই মহৎ হয় না; সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক নাগরিকের ভাষাকে জায়গা দিতে পারলে তার গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা প্রমাণিত হয়।
অংশ–০৩
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোয় ভাষাগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে বধির জনগোষ্ঠীর অধিকার
ভাষাগত সংখ্যালঘু হিসেবে বধির জনগোষ্ঠীর অধিকার: জাতিসংঘের ১৯৯২ সালের ঘোষণা, আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা ও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দায়
বাংলাদেশে শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বধির মানুষের শিক্ষার ভাষা নিয়ে আলোচনাটি সাধারণত প্রতিবন্ধিতা, বিশেষ শিক্ষা কিংবা যোগাযোগের সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা রয়েছে—ভাষাগত সংখ্যালঘুর অধিকার (Linguistic Minority Rights)। একজন বধির শিশু যখন বাংলা ইশারা ভাষার মাধ্যমে চিন্তা করে, অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং জ্ঞান অর্জন করে, তখন সেই ভাষার ব্যবহারকে শুধু প্রতিবন্ধিতাজনিত সহায়তা হিসেবে দেখলে তার পূর্ণাঙ্গ ভাষাগত পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী বধির সম্প্রদায়কে তাই একটি স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারী জনগোষ্ঠী হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ভিত্তি ১৯৯২ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত জাতীয়, জাতিগত, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকারবিষয়ক ঘোষণা—Declaration on the Rights of Persons Belonging to National or Ethnic, Religious and Linguistic Minorities। সাধারণ পরিষদের ৪৭/১৩৫ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে গৃহীত ঘোষণাটি ভাষাগত সংখ্যালঘুদের পরিচয় সংরক্ষণ, নিজস্ব ভাষা ব্যবহার, বৈষম্যহীন অংশগ্রহণ এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতিগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে।
ঘোষণাটির ১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিজ ভূখণ্ডে বসবাসকারী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও ভাষাগত পরিচয় রক্ষা করা এবং সেই পরিচয় বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। ২(১) অনুচ্ছেদে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ও জনপরিসরে নির্বিঘ্নে এবং বৈষম্য ছাড়া নিজস্ব ভাষা ব্যবহারের অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো ৪(৩) অনুচ্ছেদ। সেখানে রাষ্ট্রকে যথাসম্ভব উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজেদের মাতৃভাষা শেখার অথবা সেই ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের পর্যাপ্ত সুযোগ পান।
এই বিধানগুলো বাংলা ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী বধির জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত অধিকার বিশ্লেষণে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কোনো ভাষাগত সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা যদি রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ হয়, তাহলে বধির শিশুর শিক্ষা শুধু কথ্য বা লিখিত বাংলায় সীমাবদ্ধ রেখে তার স্বাভাবিক ও প্রবেশযোগ্য ভাষাকে উপেক্ষা করা সেই নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—প্রশ্নটি ওঠা স্বাভাবিক।
ইশারা ভাষাভাষী বধির জনগোষ্ঠী কি আইনগতভাবে ভাষাগত সংখ্যালঘু?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সব শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ইশারা ভাষা ব্যবহার করেন না এবং প্রত্যেক বধির মানুষের প্রথম ভাষাও অভিন্ন নয়। কেউ বাংলা ইশারা ভাষা ব্যবহার করেন, কেউ কথ্য বা লিখিত বাংলায় যোগাযোগ করেন, আবার কেউ একাধিক ভাষা ও যোগাযোগপদ্ধতি ব্যবহার করেন। ফলে শুধু শ্রবণপ্রতিবন্ধিতার পরিচয় দিয়ে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একক ভাষাগত সংখ্যালঘু হিসেবে গণ্য করা যথার্থ নয়।
তবে যেসব বধির ব্যক্তি বাংলা ইশারা ভাষাকে নিজেদের প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন এবং সেই ভাষার মাধ্যমে স্বতন্ত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখেন, তাঁদের ভাষাগত সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচনা করার শক্তিশালী মানবাধিকারভিত্তিক যুক্তি রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য নম্বর ২৩ অনুযায়ী, কোনো ভাষাগত সংখ্যালঘুর অস্তিত্ব শুধু রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে না; বাস্তব ও বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডের ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করতে হয়।
এই ব্যাখ্যা অনুসারে বাংলা ইশারা ভাষাভাষী বধির সম্প্রদায়ের ভাষাগত পরিচয়, নিজস্ব ভাষার ব্যবহার, সামাজিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক অনুশীলন সংখ্যালঘু অধিকার আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। তবে এটিও স্বীকার করতে হবে যে ১৯৯২ সালের ঘোষণায় বধির সম্প্রদায়কে পৃথকভাবে নাম উল্লেখ করে ভাষাগত সংখ্যালঘু ঘোষণা করা হয়নি। বাংলাদেশের আইনে তাঁদের একটি স্বতন্ত্র জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করাও এই বিশ্লেষণের পূর্বশর্ত নয়। বিষয়টি মূলত স্বতন্ত্র ভাষাগত পরিচয়ের অধিকারভিত্তিক স্বীকৃতি এবং সেই পরিচয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
মাতৃভাষায় শিক্ষা: ১৯৯২ সালের ঘোষণার আইনি মর্যাদা ও সীমাবদ্ধতা
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ১৯৯২ সালের দলিলটি একটি ঘোষণা, বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি বা কনভেনশন নয়। ফলে শুধু এই ঘোষণার ৪(৩) অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে বলা যায় না যে বাংলাদেশ অবিলম্বে প্রতিটি বধির শিক্ষার্থীর জন্য বাংলা ইশারা ভাষায় পৃথক পাঠ্যপুস্তক প্রকাশে সরাসরি চুক্তিগতভাবে বাধ্য। ঘোষণাটি আন্তর্জাতিক সফট ল হিসেবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, আইন প্রণয়ন এবং মানবাধিকার বাস্তবায়নের মানদণ্ড নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাতিসংঘের নিজস্ব আইনি ব্যাখ্যাতেও এই অ-বাধ্যতামূলক মর্যাদা স্পষ্ট করা হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইশারা ভাষাভাষী বধির শিশুদের মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কেবল সরকারের সদিচ্ছার বিষয়। বাংলাদেশের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি এই অধিকারকে অনেক বেশি নির্দিষ্ট করেছে। বিশেষ করে International Covenant on Civil and Political Rights বা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ২৭ অনুচ্ছেদ ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিজ ভাষা ব্যবহারের অধিকার রক্ষা করে। মানবাধিকার কমিটি ব্যাখ্যা করেছে, এই অধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে প্রয়োজন অনুযায়ী ইতিবাচক সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হয়।
আরও সরাসরি শিক্ষাসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা রয়েছে জাতিসংঘের Convention on the Rights of Persons with Disabilities বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদে। বাংলাদেশ ২০০৭ সালে এই সনদ অনুসমর্থন করেছে। সনদের ২৪(৩)(খ) অনুচ্ছেদ ইশারা ভাষা শেখার সুযোগ এবং বধির সম্প্রদায়ের ভাষাগত পরিচয় উন্নীত করার কথা বলেছে। ২৪(৩)(গ) অনুচ্ছেদে বধির ও বধিরান্ধ শিশুর শিক্ষায় ব্যক্তির উপযোগী ভাষা ও যোগাযোগপদ্ধতি নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। ২৪(৪) অনুচ্ছেদে ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।
অতএব ১৯৯২ সালের ঘোষণা ভাষাগত সংখ্যালঘুর অধিকারের নৈতিক ও ব্যাখ্যামূলক ভিত্তি প্রদান করে; অন্যদিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ বাংলাদেশকে ইশারা ভাষায় প্রবেশযোগ্য শিক্ষা বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনি দায়িত্বের মধ্যে নিয়ে আসে।
জাতিসংঘের ২০২০ সালের প্রতিবেদন: বধির সম্প্রদায়ের ইশারা ভাষায় শিক্ষার সুস্পষ্ট নির্দেশনা
এই বিতর্কে আরও প্রত্যক্ষ আন্তর্জাতিক দলিল পাওয়া যায় জাতিসংঘের সংখ্যালঘুবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকের ২০২০ সালের Education, Language and the Human Rights of Minorities শীর্ষক প্রতিবেদনে (A/HRC/43/47)। প্রতিবেদনে সংখ্যালঘু ভাষায় শিক্ষার সুযোগ, সমমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা, বৈষম্য প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রীয় ভাষা শেখার পাশাপাশি নিজস্ব ভাষায় শিক্ষাগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিবেদনের সুপারিশের (i) দফায় বধির জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তবসম্মত ক্ষেত্রে ইশারা ভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে জাতিসংঘের সংখ্যালঘু অধিকার কাঠামোতে বধির জনগোষ্ঠীর শিক্ষায় ইশারা ভাষার প্রশ্নটি স্পষ্টভাবে স্থান পেয়েছে। এটি ১৯৯২ সালের ঘোষণার কোনো নতুন বাধ্যতামূলক অনুচ্ছেদ নয়; বরং বিদ্যমান সংখ্যালঘু অধিকার নীতির আলোকে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের সুপারিশ। তবুও বাংলাদেশের শিক্ষানীতির জন্য এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
এই সুপারিশের আলোকে এনসিটিবির মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক উদ্যোগকে আরও বিস্তৃতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। চাকমা, মারমা, গারো, সাদরি ও ত্রিপুরা ভাষায় পাঠ্যবই প্রকাশের মাধ্যমে সরকার ভাষাগত বৈচিত্র্যের শিক্ষাগত গুরুত্ব স্বীকার করেছে। সেই নীতিকে বাংলা ইশারা ভাষাভাষী বধির শিশুদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। তবে এর বাস্তব রূপ কেবল মুদ্রিত বই নয়; ইশারা ভাষার ভিডিও পাঠ্যপুস্তক, বিষয়ভিত্তিক পাঠদান, দক্ষ শিক্ষক, দ্বিভাষিক শিক্ষাসামগ্রী এবং উপযুক্ত মূল্যায়নব্যবস্থার সমন্বয় হতে হবে।
বাংলাদেশের আইন এবং রাষ্ট্রের বাস্তবায়নগত দায়
বাংলাদেশের নিজস্ব আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিকে আরও সুস্পষ্ট ভিত্তি দিয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ১৬(১)(থ) ধারায় শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিজ ইচ্ছানুযায়ী, যথাসম্ভব, বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকৃত। একই ধারার দ্বিতীয় উপধারায় এসব অধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে বৈষম্যমূলক আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই আইনি স্বীকৃতি এবং সিআরপিডির ২৪ অনুচ্ছেদ একসঙ্গে বিবেচনা করলে রাষ্ট্রের সামনে কয়েকটি বাস্তব দায়িত্ব দাঁড়ায়। প্রথমত, বধির শিশুর ভাষাগত প্রয়োজন শনাক্ত করা এবং সেই অনুযায়ী প্রবেশযোগ্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, বাংলা ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষাসহায়ক তৈরি করা। তৃতীয়ত, জাতীয় পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তু ইশারা ভাষায় বোধগম্য করে উপস্থাপন করা। চতুর্থত, লিখিত বাংলা অর্জনের সুযোগ বজায় রেখে শিশুর প্রথম বা পছন্দের ভাষার প্রতি সম্মান দেখানো। পঞ্চমত, শিক্ষার নীতিনির্ধারণ ও উপকরণ তৈরিতে বাংলা ইশারা ভাষাভাষী বধির ব্যক্তিদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
এখানে একটি আইনি সতর্কতাও প্রয়োজন। বিদ্যমান আইন থেকে প্রতিটি শ্রেণির জন্য অবিলম্বে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভিডিও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের কোনো স্বতন্ত্র, স্পষ্ট বিধান পাওয়া যায় না। কিন্তু ইশারা ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের কার্যকর সুযোগ সৃষ্টি না করলে তা সিআরপিডির শিক্ষাসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা, যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা গ্রহণের নীতি এবং বৈষম্যহীন শিক্ষার অধিকারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো লঙ্ঘন ঘটেছে কি না, তা নির্ধারণে শিক্ষার্থীর প্রয়োজন, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা, প্রযোজ্য বিধি এবং বাস্তব পরিস্থিতি পরীক্ষা করতে হবে।
ভাষার অধিকারকে অনুগ্রহ নয়, শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে
বাংলাদেশের ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে আলোচনা যদি শুধু জাতিগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে বাংলা ইশারা ভাষাভাষী বধির জনগোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত বাস্তবতা উপেক্ষিত থেকে যায়। তাঁদের অনেকের কাছে বাংলা ইশারা ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; আত্মপরিচয়, সামাজিক সম্পর্ক, জ্ঞান অর্জন এবং সংস্কৃতির বাহন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা তাঁদেরও রাষ্ট্রভাষা; কিন্তু সেই সত্য তাঁদের প্রথম ভাষা বা উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ইশারা ভাষার অধিকারকে অস্বীকার করে না।
১৯৯২ সালের জাতিসংঘের ঘোষণা, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির সংখ্যালঘু সুরক্ষা, সিআরপিডির ২৪ অনুচ্ছেদ এবং বাংলাদেশের ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী অধিকার আইন—সবগুলোকে সমন্বিতভাবে পড়লে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত সামনে আসে: বধির শিশুর ভাষাগত প্রবেশাধিকারকে শিক্ষার অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে নয়, কার্যকর শিক্ষার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ যখন বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করে ভাষাগত ন্যায়বিচারের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তখন বাংলা ইশারা ভাষাভাষী বধির শিশুদের জন্য সমমানের শিক্ষা-সুযোগ গড়ে তোলা সেই উদ্যোগেরই যৌক্তিক সম্প্রসারণ। কারণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিদ্যালয়ের দরজা খুলে দেওয়া নয়; বিদ্যালয়ের ভেতরে শিশুটি যে ভাষায় পৃথিবীকে বুঝতে পারে, সেই ভাষায় জ্ঞানের দরজাও উন্মুক্ত করা।
অংশ–০৪
বধির জনগোষ্ঠীর জনমিতিক বাস্তবতা ও ভাষাগত সংখ্যালঘু (Language Minority Group)পরিচয়—পরিসংখ্যানের আলোকে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
সংখ্যার আয়নায় ভাষাগত বৈষম্য: পাঁচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য মাতৃভাষার পাঠ্যবই, অথচ বাংলা ইশারা ভাষাভাষী বধির শিশুর জন্য কোথায় পাঠ্যপুস্তক?
বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ রয়েছে, যা একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ভাষাগত ন্যায়বিচারের এক গভীর অসংগতিও সামনে নিয়ে আসে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের ব্যবস্থা করেছে। ভাষাগুলো হলো চাকমা, মারমা, গারো, সাদরি ও ত্রিপুরা। এনসিটিবির সরকারি ওয়েবসাইটে এসব ভাষায় প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক ও ডাউনলোডের ব্যবস্থা রয়েছে। —এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কারণ রাষ্ট্র এখানে স্বীকার করেছে, একটি শিশুর মাতৃভাষা বাংলা না হলেও তার শিক্ষার অধিকার সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং সে যে ভাষা বোঝে, সেই ভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কিন্তু এখানেই অনিবার্য একটি প্রশ্ন ওঠে। রাষ্ট্র যখন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুর জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যবইয়ের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছে, তখন একই রাষ্ট্রের বাংলা ইশারা ভাষাভাষী বধির শিশুদের জন্য সমমানের জাতীয় পাঠ্যক্রম ও ইশারা ভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক কোথায়? এনসিটিবির প্রকাশিত ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাঠ্যপুস্তক তালিকায় পাঁচটি ভাষা পাওয়া যায়, কিন্তু বাংলা ইশারা ভাষাকে কেন্দ্র করে তুলনীয় কোনো শ্রেণিভিত্তিক পাঠ্যপুস্তকধারা সেখানে দেখা যায় না। অবশ্য এই তালিকায় অনুপস্থিতি দিয়ে দেশের কোথাও কোনো ইশারা ভাষার শিক্ষা উপকরণ নেই—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। প্রশ্নটি মূলত জাতীয় পাঠ্যক্রমে ভাষাটির প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান নিয়ে।
জনশুমারি কী বলছে: আবেগ নয়, সংখ্যার ভিত্তিতে বৈষম্যের বিচার
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন। একই প্রতিবেদনের সারণি অনুযায়ী চাকমা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪ লাখ ৮৩ হাজার ২৯৯, মারমা ২ লাখ ২৪ হাজার ২৬১, ত্রিপুরা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭৮ এবং গারো ৭৬ হাজার ৮৪৬ জন। এই চার জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত জনসংখ্যা ৯ লাখ ৪০ হাজার ৯৮৪। সাদরিকে একই ধরনের পৃথক জনগোষ্ঠী হিসেবে এই সারণিতে শনাক্ত করা যায় না; এটি ভাষাগত পরিচয়, যা একাধিক সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ফলে পাঁচ ভাষার ব্যবহারকারীর মোট সংখ্যা শুধু সংশ্লিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা যোগ করে নির্ধারণ করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথার্থ নয়।
এবার বিবেচনা করা যাক শ্রবণপ্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যান। বিবিএসের National Survey on Persons with Disabilities 2021-এর বিস্তারিত সারণি ৪.১.২-এ উল্লেখিত হার অনুযায়ী শ্রবণপ্রতিবন্ধিতার জাতীয় প্রাদুর্ভাব প্রায় ০.৩৫ শতাংশ। ২০২২ সালের ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯২১ জনসংখ্যার ভিত্তিতে এই হার প্রয়োগ করলে দেশে আনুমানিক ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৪০১ জন শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনের মূল ফলাফল অংশে ০.৩৬ শতাংশ হার ব্যবহৃত হওয়ায় বিকল্প প্রাক্কলন দাঁড়ায় প্রায় ৬ লাখ ১১ হাজার ৩৮৪। অর্থাৎ পরিসংখ্যানগত পার্থক্য স্বীকার করেও বলা যায়, ২০২১ সালের জরিপের হারকে ২০২২ সালের জনসংখ্যায় প্রয়োগ করলে শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ।
এই প্রাক্কলন থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা পাওয়া যায়। বিস্তারিত সারণিভিত্তিক প্রায় ৫ লাখ ৯৪ হাজার শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা দেশের বৃহত্তম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী চাকমাদের ৪ লাখ ৮৩ হাজার জনসংখ্যার প্রায় ১.২৩ গুণ। মারমাদের তুলনায় প্রায় ২.৬৫ গুণ এবং ত্রিপুরাদের তুলনায় প্রায় ৩.৮০ গুণ। তবে এটি পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সম্মিলিত জনসংখ্যার দ্বিগুণ নয়। বরং উল্লিখিত চারটি নৃগোষ্ঠীর সম্মিলিত জনসংখ্যার চেয়েও কম। সংখ্যার এই নির্ভুলতা জরুরি, কারণ ভাষাগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে অতিরঞ্জন করলে সেই যুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষুণ্ণ হয়।
আরও একটি পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা আর বাংলা ইশারা ভাষার প্রথম ভাষাভাষীর সংখ্যা এক নয়। সব শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ইশারা ভাষা ব্যবহার করেন না; কেউ কথ্য বাংলা, কেউ লিখিত বাংলা, কেউ শ্রবণসহায়ক প্রযুক্তি এবং কেউ একাধিক যোগাযোগপদ্ধতি ব্যবহার করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বধির ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর যোগাযোগের এই বৈচিত্র্য স্বীকার করে। ফলে প্রায় ছয় লাখ মানুষকে এককভাবে বাংলা ইশারা ভাষার মাতৃভাষী ঘোষণা করা যেমন ভুল, তেমনি তাদের ভাষাগত চাহিদাকে পরিসংখ্যান থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
ইশারা ভাষা বাংলা ভাষার অঙ্গভঙ্গি নয়: এটি স্বতন্ত্র ভাষাগত পরিচয়
বাংলাদেশের শিক্ষা ও সামাজিক আলোচনায় একটি মৌলিক ভুল ধারণা রয়েছে—বাংলা ইশারা ভাষা যেন কথ্য বাংলারই হাত দিয়ে প্রকাশিত সংস্করণ। প্রকৃতপক্ষে প্রাকৃতিক ইশারা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ, শব্দভান্ডার, বাক্যগঠন ও অর্থ প্রকাশের নিয়ম থাকে। জাতিসংঘ ইশারা ভাষাগুলোকে কথ্য ভাষার সমমর্যাদাসম্পন্ন পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক ভাষা হিসেবে স্বীকার করেছে।
বাংলা ইশারা ভাষার নামের মধ্যে ‘বাংলা’ থাকলেও সেটিকে কথ্য বাংলার হুবহু দৃশ্যমান অনুবাদ ভাবা যায় না।—এখানে রাষ্ট্রভাষা ও প্রথম ভাষার পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বধির নাগরিকের রাষ্ট্রভাষা বাংলা; কিন্তু বাংলা ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী একজন বধির শিশুর প্রথম ও সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে প্রবেশযোগ্য ভাষা হতে পারে বাংলা ইশারা ভাষা। এটি কেবল ভাষাবিজ্ঞানের বক্তব্য নয়। বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ১৬(১)(থ) ধারায় শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী, যথাসম্ভব, বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকৃত।
সুতরাং যে রাষ্ট্র একটি শিশুর বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকার করেছে, তার শিক্ষাব্যবস্থারও উচিত সেই ভাষায় প্রবেশযোগ্য শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এখানে শুধু বাংলা ইশারা ভাষার একটি অভিধান কিংবা দু-একটি ভিডিও তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন গণিত, বিজ্ঞান, পরিবেশ, সমাজ, ইতিহাস ও ভাষাশিক্ষার বিষয়বস্তুকে বাংলা ইশারা ভাষায় বোধগম্য করে তোলা এবং পাশাপাশি লিখিত বাংলা শেখানোর সুসংহত ব্যবস্থা।
পাঁচ ভাষার জন্য বই সম্ভব হলে ষষ্ঠ ভাষাগত উদ্যোগটি অসম্ভব কেন?
এই তুলনা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যবই প্রকাশের বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি নয়। বরং সেই ইতিবাচক উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করার দাবি। চাকমা, মারমা, গারো, সাদরি ও ত্রিপুরা ভাষায় পাঠ্যবই প্রকাশ প্রমাণ করে, বাংলাদেশের জাতীয় পাঠ্যক্রমে ভাষাগত বৈচিত্র্য অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। তা হলে বাংলা ইশারা ভাষাভিত্তিক শিক্ষার জন্য একই রকম রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ কেন গড়ে উঠবে না?
এক্ষেত্রে প্রচলিত কাগজের পাঠ্যপুস্তকের ধারণাটিও প্রসারিত করতে হবে। বাংলা ইশারা ভাষা দৃশ্যমান ও গতিশীল ভাষা। স্থিরচিত্রের বই গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপাদান হলেও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার জন্য প্রয়োজন ইশারা ভাষার ভিডিও পাঠ্যপুস্তক, দ্বিভাষিক ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ, ইশারা ভাষাদক্ষ শিক্ষক এবং এমন মূল্যায়নব্যবস্থা, যেখানে ভাষাগত প্রবেশাধিকারের অভাবকে শিশুর মেধার ঘাটতি হিসেবে গণ্য করা হবে না।
একই সঙ্গে জরুরি একটি জাতীয় সমীক্ষা—দেশে কত শিশু বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম বা প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে, কতজন বিদ্যালয়ে পড়ছে, কতজন বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে এবং কতজন নিজ ভাষায় শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে? এই তথ্য ছাড়া প্রয়োজনীয় শিক্ষক, পাঠ্যপুস্তক ও অর্থ বরাদ্দের যথাযথ পরিকল্পনা সম্ভব নয়।
এখানেই রাষ্ট্রের কাছে নৈতিক প্রশ্নটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রায় ছয় লাখ শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের আনুমানিক উপস্থিতি নিজেই গুরুত্বপূর্ণ একটি জননীতি-সংক্রান্ত তথ্য। কিন্তু তাদের সবার ভাষা এক নয় বলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং ব্যক্তিভেদে উপযুক্ত ভাষা ও যোগাযোগমাধ্যম নিশ্চিত করার দায়িত্ব আরও সুনির্দিষ্ট হয়। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা যদি সত্যিই একটি ন্যায়সংগত শিক্ষানীতি হয়, তাহলে বধির শিশুর ভাষাগত পরিচয়কে তার বাইরে রাখার যুক্তিসংগত কারণ কী?
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে—ভাষার অধিকার সংখ্যার দয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। যে শিশুর কণ্ঠ শোনা যায় না, তার ভাষাও যে আছে, রাষ্ট্রকে প্রথমে সেই সত্য স্বীকার করতে হবে। তারপর সেই ভাষায় জ্ঞানের দরজা খুলতে হবে।
অংশ–০৫
স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক ও প্রথম ভাষা হিসেবে বাংলা ইশারা ভাষার আইনগত মর্যাদা—বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
বাংলা ইশারা ভাষা কোনো অনুবাদ নয়, একটি স্বতন্ত্র মাতৃভাষা: বিশ্বস্বীকৃতির আলোকে বাংলাদেশ কোথায়?
উপশিরোনাম: বিশ্বজুড়ে তিন শতাধিক ইশারা ভাষা, সাত কোটির বেশি বধির জনগোষ্ঠী এবং নিউজিল্যান্ড ও হাঙ্গেরির স্বতন্ত্র ভাষা আইনের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—ইশারা ভাষার স্বীকৃতি কেবল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তার বিষয় নয়; এটি ভাষাগত পরিচয়, মাতৃভাষায় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ও নাগরিক সমমর্যাদার প্রশ্ন। বাংলাদেশের বাংলা ইশারা ভাষার জন্যও প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ আইনগত স্বীকৃতি ও কার্যকর শিক্ষাগত অধিকার।
ইশারা ভাষা কি মৌখিক ভাষার হাতের অনুবাদ, নাকি নিজস্ব ব্যাকরণসমৃদ্ধ একটি পূর্ণাঙ্গ ভাষা?
বাংলাদেশে বাংলা ইশারা ভাষার (Bangla Sign Language—BdSL) স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনার শুরুতেই একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণার অবসান জরুরি। অনেকেই মনে করেন, ইশারা ভাষা হলো বাংলা শব্দগুলো হাতের সংকেতে প্রকাশ করার বিশেষ কৌশল। কেউ কেউ একে নিছক অঙ্গভঙ্গি, সাংকেতিক যোগাযোগ কিংবা বাক্প্রতিবন্ধী মানুষের বিকল্প যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। ভাষাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত গবেষণা অনুযায়ী, এসব ধারণা প্রাকৃতিক ইশারা ভাষার প্রকৃত স্বরূপকে যথাযথভাবে প্রকাশ করে না।
ইশারা ভাষা কোনো মৌখিক ভাষার হুবহু অনুবাদ নয়; এটি নিজস্ব ব্যাকরণ, বাক্যগঠন, শব্দভাণ্ডার, অর্থবিন্যাস এবং ভাষাগত নিয়মসমৃদ্ধ একটি স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক ভাষা (Natural Language)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ডেফনেস অ্যান্ড আদার কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার্স (NIDCD) আমেরিকান ইশারা ভাষাকে (American Sign Language—ASL) পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক ভাষা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার ভাষাগত বৈশিষ্ট্য কথ্য ভাষার সমতুল্য হলেও ব্যাকরণ ইংরেজির থেকে পৃথক। ভাষাবিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায়ও প্রাকৃতিক ইশারা ভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক কাঠামোর সমতুল্য সংকেত-একক, শব্দগঠন, বাক্যবিন্যাস এবং অর্থতাত্ত্বিক নিয়মের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কথ্য ভাষা প্রধানত শ্রবণ ও কণ্ঠনির্ভর যোগাযোগপদ্ধতি ব্যবহার করে; ইশারা ভাষা ব্যবহার করে দৃশ্যমান-স্থানিক মাধ্যম (Visual-Spatial Modality)। এতে হাতের আকৃতি, অবস্থান, গতিবিধি, তালুর দিক, মুখভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি এবং শরীরের অবস্থান সম্মিলিতভাবে ভাষাগত অর্থ প্রকাশ করে। এসব উপাদানের অনেকগুলো শুধু আবেগ প্রকাশের জন্য নয়; নির্দিষ্ট ব্যাকরণগত কাজেও ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকান ইশারা ভাষায় ভ্রুর অবস্থান, মুখের অভিব্যক্তি কিংবা দেহভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রশ্নের ধরন ও বাক্যের ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা যায়। অর্থাৎ কথ্য ভাষায় কণ্ঠস্বরের ওঠানামা বা শব্দক্রম যে ভূমিকা পালন করতে পারে, ইশারা ভাষায় মুখভঙ্গি ও স্থানিক বিন্যাস তার সঙ্গে তুলনীয় ভাষাগত কাজ সম্পাদন করতে পারে।
ভাষাবিজ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—পৃথিবীর সব ইশারা ভাষা এক নয়। আমেরিকান ইশারা ভাষা (ASL), ব্রিটিশ ইশারা ভাষা (BSL), নিউজিল্যান্ড ইশারা ভাষা (NZSL) এবং হাঙ্গেরীয় ইশারা ভাষা (Hungarian Sign Language) পৃথক ভাষাগত ঐতিহ্য বহন করে। একই কথ্য ভাষাভাষী দুটি দেশেও সম্পূর্ণ পৃথক ইশারা ভাষা বিকশিত হতে পারে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রধান কথ্য ভাষা ইংরেজি হলেও ASL এবং BSL এক ভাষা নয়।
এই ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যের আলোকে বাংলা ইশারা ভাষাকেও কেবল বাংলা কথ্য ভাষার সংকেতভিত্তিক রূপ হিসেবে বিবেচনা করা যথার্থ নয়। বাংলাদেশে বধির জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত প্রাকৃতিক ইশারা ভাষার নিজস্ব ভাষাগত বৈশিষ্ট্য, সামাজিক ব্যবহার, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক বিকাশকে স্বতন্ত্র গবেষণা ও নীতিগত স্বীকৃতির বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।
এখানে আরও একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা বাক্যের শব্দক্রম অনুসরণ করে হাতের চিহ্ন ব্যবহার করা কোনো সংকেতায়িত যোগাযোগপদ্ধতি (Manually Coded Bengali) এবং বধির জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক সামাজিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে বিকশিত বাংলা ইশারা ভাষা একই ধারণা নয়। প্রথমটি কথ্য বা লিখিত বাংলার কাঠামো অনুসরণ করতে পারে; দ্বিতীয়টি একটি প্রাকৃতিক ভাষা হিসেবে নিজস্ব ভাষাগত নিয়মে পরিচালিত হয়।
অতএব, বাংলা ইশারা ভাষার স্বীকৃতি মানে বাংলাকে হাতের সংকেতে অনুবাদের স্বীকৃতি নয়। এর অর্থ একটি জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র ভাষাগত অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া।
বিশ্বে সাত কোটির বেশি বধির মানুষ, তিন শতাধিক ইশারা ভাষা: সংখ্যাই বলে দেয় ভাষাগত অধিকারের গুরুত্ব
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব বধির ফেডারেশনের (World Federation of the Deaf—WFD) হিসাবে বিশ্বে সাত কোটির বেশি বধির মানুষ রয়েছেন; তাঁদের ৮০ শতাংশের বেশি উন্নয়নশীল দেশে বসবাস করেন। বিশ্বব্যাপী বধির জনগোষ্ঠীর মধ্যে তিন শতাধিক স্বতন্ত্র ইশারা ভাষা প্রচলিত।
তবে পরিসংখ্যানের যথাযথ ব্যাখ্যা জরুরি। সাত কোটির বেশি মানুষের হিসাবটি মূলত বিশ্বব্যাপী বধির জনগোষ্ঠীর একটি আনুমানিক পরিসংখ্যান; এটি পৃথিবীর প্রত্যেক ইশারা ভাষা ব্যবহারকারীর নির্ভুল জনগণনা নয়। সব বধির ব্যক্তি একই মাত্রায় ইশারা ভাষা ব্যবহার করেন না। আবার বধির মানুষের পরিবারের শ্রবণশীল সদস্য, শিক্ষক ও দোভাষীরাও ইশারা ভাষা ব্যবহার করেন।
বিশ্বব্যাপী ইশারা ভাষার এই বৈচিত্র্য সম্পর্কে জাতিসংঘ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, প্রাকৃতিক ইশারা ভাষাগুলো কথ্য ভাষা থেকে কাঠামোগতভাবে পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ ভাষা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১৭ সালে ২৩ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যার অন্যতম উদ্দেশ্য ইশারা ভাষার গুরুত্ব এবং বধির মানুষের মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।
এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। বাংলাদেশে শ্রবণপ্রতিবন্ধী, বধির এবং বাংলা ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন ভিন্ন অনুমান পাওয়া যায়। বধির জনগোষ্ঠী ও ইশারা ভাষার অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু প্রতিবেদনে প্রায় ২০ লাখ থেকে ২৪ লাখ ইশারা ভাষা ব্যবহারকারীর হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যার পেছনে জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ, সুস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং যাচাইযোগ্য গণনাপদ্ধতির তথ্য নিশ্চিত না করে একে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সরকারি পরিসংখ্যান বলা যায় না।
বিশেষত শ্রবণক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সম্পূর্ণ বধিরতা এবং ইশারা ভাষা ব্যবহার—এই তিনটি ভিন্ন পরিসংখ্যানগত শ্রেণিকে এক করে ফেলা উচিত নয়। এ কারণে দেশের প্রকৃত বাংলা ইশারা ভাষাভাষী জনসংখ্যা নির্ধারণে জাতীয় পর্যায়ে ভাষাভিত্তিক জরিপ প্রয়োজন। কিন্তু সঠিক সংখ্যা নির্ধারণের এই প্রয়োজনীয়তা ভাষাগত অধিকারের দাবিকে দুর্বল করে না। বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: যে জনগোষ্ঠীর ভাষাকে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাক্রম ও জনসেবায় স্থান দেওয়ার প্রশ্ন উঠেছে, সেই জনগোষ্ঠীর ভাষাভিত্তিক নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তৈরির দায়িত্বও কি রাষ্ট্রের নয়?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভাষার অধিকার জনসংখ্যার সংখ্যাধিক্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। কোনো জনগোষ্ঠী সংখ্যায় অপেক্ষাকৃত ছোট হলেও তার ভাষাগত পরিচয়, শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন অংশগ্রহণের অধিকার সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজিল্যান্ডের দৃষ্টান্ত: বধির জনগোষ্ঠী একটি স্বতন্ত্র ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়
ইশারা ভাষার স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত। দেশটির পার্লামেন্ট ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল New Zealand Sign Language Act 2006 অনুমোদন করে। এই আইনের মাধ্যমে নিউজিল্যান্ড ইশারা ভাষাকে (NZSL) দেশের অন্যতম সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রদান করে।
আইনটির বিশেষত্ব শুধু সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বধির জনগোষ্ঠীকে কীভাবে রাষ্ট্র আইনগতভাবে সংজ্ঞায়িত করবে, সে বিষয়ে আইনটি একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেছে। আইনের ৪ ধারায় বধির জনগোষ্ঠীকে একটি স্বতন্ত্র ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী (Distinct Linguistic and Cultural Group) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার সদস্যরা নিউজিল্যান্ড ইশারা ভাষাকে প্রথম অথবা পছন্দের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন কিংবা ওই সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় যুক্ত করেন।
এই বিধানের গুরুত্ব অসামান্য। কারণ এখানে বধির জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে শুধু শারীরিক শ্রবণক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দিয়ে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিচয়কে আইনগত স্বীকৃতির ভিত্তি করা হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের আইনের ৬ ধারা সরাসরি NZSL-কে সরকারি ভাষা ঘোষণা করেছে। ৭ ধারা নির্দিষ্ট বিচারিক কার্যক্রমে এই ভাষা ব্যবহারের অধিকার দিয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য দোভাষীর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিধান করেছে। ৯ ধারায় সরকারি বিভাগগুলোকে বধির জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শ এবং সরকারি তথ্য ও সেবা তাদের কাছে প্রবেশগম্য করার নীতিগত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে আইনগত স্বীকৃতির পরিধি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উল্লেখযোগ্য। আইনের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, বিচারিক কার্যক্রমে ভাষা ব্যবহারের বিশেষ অধিকার ছাড়া কেবল সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য সব ক্ষেত্রে আদালতে বলবৎযোগ্য অধিকার সৃষ্টি হয় না। অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞতাও দেখায়, ভাষার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগের মধ্যে অতিরিক্ত আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নিউজিল্যান্ডের আইন প্রমাণ করে, কোনো রাষ্ট্র তার বধির জনগোষ্ঠীকে একই সঙ্গে প্রতিবন্ধিতা-সম্পর্কিত অধিকারধারী ব্যক্তি এবং স্বতন্ত্র ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে।
হাঙ্গেরির ২০০৯ সালের ইশারা ভাষা আইন: ভাষাগত সংখ্যালঘু অধিকার প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট মডেল
নিউজিল্যান্ডের পাশাপাশি হাঙ্গেরির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য আরও প্রত্যক্ষভাবে প্রাসঙ্গিক। দেশটির পার্লামেন্ট ২০০৯ সালে Act CXXV of 2009 on Hungarian Sign Language and the Use of Hungarian Sign Language প্রণয়ন করে।
এই আইনের ২(গ) ধারায় হাঙ্গেরীয় ইশারা ভাষাকে নিজস্ব ব্যাকরণ ও নিয়মসমৃদ্ধ, হাঙ্গেরিতে বিকশিত একটি স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক ভাষা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের ৩(১) ও ৩(২) ধারা। প্রথমটিতে হাঙ্গেরীয় ইশারা ভাষাকে স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে সেই ভাষার ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীকে ভাষাগত সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকার করে তাদের ভাষা ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বিকাশ এবং বধির সংস্কৃতি লালন ও পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
অর্থাৎ হাঙ্গেরি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত অবস্থান গ্রহণ করেছে: বধির জনগোষ্ঠীর অধিকার শুধু প্রতিবন্ধিতার কারণে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার অধিকার নয়; তাদের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের অধিকারও রয়েছে।
হাঙ্গেরির আইনে এই স্বীকৃতিকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ১১ ও ১২ ধারায় প্রাসঙ্গিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইশারা ভাষা ও বিশেষ যোগাযোগপদ্ধতি শেখার সুযোগ এবং নির্ধারিত ক্ষেত্রে এসবের শিক্ষাদান নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। ১৩ ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে বধির ও বধির-অন্ধ শিশুদের অভিভাবকদের ইশারা ভাষা বা উপযুক্ত যোগাযোগপদ্ধতি শেখার ব্যবস্থা এবং ১৪ ধারায় দ্বিভাষিক শিক্ষাপদ্ধতির বিধান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বধির শিশু যদি ইশারা ভাষার মাধ্যমে কার্যকরভাবে যোগাযোগ ও শিক্ষা অর্জন করে, তাহলে শুধু শিশুকে ভাষাটি শেখালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তার পরিবার, শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও প্রয়োজনীয় ভাষাগত সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ দিতে হয়। হাঙ্গেরির আইন তাই স্বীকৃতি থেকে ব্যবহার, ব্যবহার থেকে শিক্ষা এবং শিক্ষা থেকে সামাজিক অংশগ্রহণের একটি অধিকতর সমন্বিত কাঠামো তৈরি করেছে।
নিউজিল্যান্ড ও হাঙ্গেরির আইনগত স্বীকৃতির ধরন এক নয়। নিউজিল্যান্ড ইশারা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিয়েছে; হাঙ্গেরি নিজস্ব প্রাকৃতিক ভাষা এবং তার ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর ভাষাগত সংখ্যালঘু অধিকারকে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু উভয় দেশের অভিজ্ঞতার অভিন্ন শিক্ষা হলো—বধির জনগোষ্ঠীর ভাষাকে কেবল প্রতিবন্ধিতা-সহায়ক যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করলে তার পূর্ণ ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
বাংলাদেশের অবস্থান: প্রথম ভাষার অধিকার স্বীকৃত, কিন্তু স্বতন্ত্র ভাষার পূর্ণাঙ্গ আইন কোথায়?
বাংলাদেশে বাংলা ইশারা ভাষার আইনগত অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। বাংলা ইশারা ভাষা সম্পূর্ণ আইনগত স্বীকৃতিহীন—এমন দাবি সঠিক নয়।
বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ১৬(১)(থ) ধারায় শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী, যথাসম্ভব, বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো আইনের ২ ধারায় বাংলা ইশারা ভাষার সংজ্ঞা। সেখানে ভাষাটিকে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত এবং অন্যান্য ভাষার মতো গতিশীল ও পরিবর্তনশীল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দুটি বিধান বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনেই বাংলা ইশারা ভাষার সাংস্কৃতিক ভিত্তি এবং প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকারকে স্বীকার করে।
তবে বাংলাদেশের আইন ও নিউজিল্যান্ড-হাঙ্গেরির স্বতন্ত্র ভাষা আইনগুলোর মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশের ২০১৩ সালের আইনটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষাবিষয়ক একটি বিস্তৃত আইন। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড ও হাঙ্গেরি বিশেষভাবে ইশারা ভাষার মর্যাদা, ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট অধিকার নির্ধারণের জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন করেছে। বাং
লাদেশের বর্তমান আইনে বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার থাকা সত্ত্বেও নিউজিল্যান্ডের মতো সরকারি ভাষার মর্যাদা কিংবা হাঙ্গেরির মতো পৃথক আইনে বধির জনগোষ্ঠীর ভাষাগত সংখ্যালঘু পরিচয় ও বিস্তৃত ভাষাগত অধিকার প্রতিষ্ঠার সমতুল্য পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এতে নেই।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনসংস্কারের প্রশ্ন সামনে আসে। বাংলাদেশ কি বাংলা ইশারা ভাষাকে স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক ভাষা হিসেবে সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিয়ে, বধির ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ভাষাগত পরিচয়, মাতৃভাষায় শিক্ষা, বিচারিক কার্যক্রমে ভাষা ব্যবহার, সরকারি তথ্যপ্রাপ্তি এবং পেশাদার দোভাষীসেবা নিশ্চিত করার জন্য একটি পৃথক বাংলাদেশ বাংলা ইশারা ভাষা স্বীকৃতি ও অধিকার আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারে না?
এমন একটি আইনে বাংলা ইশারা ভাষার আইনগত মর্যাদা, বধির সম্প্রদায়ের ভাষাগত অধিকার, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইশারা ভাষার ব্যবহার, ইশারা ভাষা শিক্ষক ও দোভাষীর পেশাগত মানদণ্ড, রাষ্ট্রীয় সেবার প্রবেশগম্যতা এবং আইন বাস্তবায়নের জবাবদিহি নির্ধারণ করা সম্ভব।—এক্ষেত্রে ২০১৩ সালের বিদ্যমান আইনকে অস্বীকার বা প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন নেই। বরং তার স্বীকৃত অধিকারগুলোকে আরও বিস্তারিত, বাস্তবায়নযোগ্য এবং প্রতিষ্ঠানগতভাবে কার্যকর করার জন্য পরিপূরক আইনগত কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থেকে জাতীয় আইন: কেন স্বীকৃতির প্রশ্নটি এখন শিক্ষাক্রম সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত
ইশারা ভাষাকে একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষে শুধু ভাষাবিজ্ঞান কিংবা আন্তর্জাতিক তুলনামূলক আইনই নয়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকারও প্রাসঙ্গিক। জাতিসংঘের Convention on the Rights of Persons with Disabilities (CRPD)-এর ২ অনুচ্ছেদ ভাষার সংজ্ঞায় ইশারা ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ২১ অনুচ্ছেদ ইশারা ভাষার ব্যবহার, স্বীকৃতি ও প্রসারকে গুরুত্ব দিয়েছে। ২৪ অনুচ্ছেদ ইশারা ভাষা শেখার সুযোগ, বধির শিক্ষার্থীদের ভাষাগত পরিচয়ের বিকাশ এবং উপযুক্ত ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলেছে। ৩০(৪) অনুচ্ছেদ ইশারা ভাষা ও বধির সংস্কৃতিসহ স্বতন্ত্র ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্বীকৃতিকে গুরুত্ব দেয়।
এছাড়া জাতিসংঘের International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর ২৭ অনুচ্ছেদ ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিজেদের ভাষা ব্যবহারের অধিকার সুরক্ষার বিধান প্রদান করে। বধির ইশারা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই বিধানের প্রাসঙ্গিকতা বিচার করতে হলে তাদের স্বতন্ত্র ভাষাগত ও সম্প্রদায়গত পরিচয়কে বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এ দুটি মানবাধিকার কাঠামোর গুরুত্ব রয়েছে। তবে এখানে আইনগতভাবে সুস্পষ্ট থাকা প্রয়োজন যে, CRPD কিংবা ICCPR সরাসরি বাংলাদেশকে নিউজিল্যান্ডের অনুরূপ একটি নির্দিষ্ট নামে ইশারা ভাষা আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেয় না। সংশ্লিষ্ট অধিকারগুলো কার্যকর করতে পৃথক আইন, বিদ্যমান আইনের সংশোধন, বিধিমালা, শিক্ষানীতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা—একাধিক পন্থা গ্রহণ করা সম্ভব। তবু আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের কার্যকর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতি গ্রহণের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম সংস্কার একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলা ইশারা ভাষাকে শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি শুধু তৃতীয় ভাষাশিক্ষার একটি নতুন বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। বধির শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ইশারা ভাষার প্রথম ভাষাগত মর্যাদা, উপযুক্ত ক্ষেত্রে শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার এবং শ্রবণশীল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ভাষা হিসেবে শেখার সুযোগ—এই তিনটি বিষয়কে পৃথক অথচ পরস্পরসম্পর্কিত নীতিগত লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ইশারা ভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক তৈরির ক্ষেত্রেও প্রচলিত মুদ্রিত পাঠ্যবইয়ের ধারণা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন ভিডিওসমৃদ্ধ শিখনসামগ্রী, ইশারা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণভিত্তিক শিক্ষাক্রম, বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা উন্নয়ন, আঞ্চলিক ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান এবং বধির জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে পাঠ্যসামগ্রীর মান যাচাই।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে এই শিক্ষা নেওয়া যায় যে, ভাষাগত স্বীকৃতি তখনই অধিক অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা শ্রেণিকক্ষ, সরকারি দপ্তর, আদালত এবং সামাজিক জীবনে ব্যবহারিক প্রবেশাধিকার সৃষ্টি করে।
ভাষার স্বীকৃতি কেবল রাষ্ট্রীয় ঘোষণা নয়, একটি জনগোষ্ঠীর মর্যাদার স্বীকৃতি
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ভাষাগত মর্যাদা ও মানবিক পরিচয়ের সম্পর্ক সম্পর্কে আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দিয়েছে। ভাষার অধিকার কেবল নির্দিষ্ট শব্দ বা বাক্য ব্যবহারের স্বাধীনতা নয়; এর সঙ্গে মানুষের আত্মপরিচয়, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং পূর্ণ নাগরিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন জড়িত।
বাংলাদেশে বাংলা ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী বধির জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও সেই মানবিক দর্শন প্রাসঙ্গিক। যে শিশু ইশারায় প্রথমবার নিজের ভাবনা প্রকাশ করে, যে শিক্ষার্থী ইশারা ভাষায় গণিত বা বিজ্ঞানের ধারণা বুঝতে চায়, যে তরুণ নিজের ভাষায় উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে অংশ নিতে চায়—তাদের ভাষাগত প্রয়োজনকে কেবল সহানুভূতি বা প্রতিবন্ধিতা-সহায়তার পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট নয়।
নিউজিল্যান্ড দেখিয়েছে, ইশারা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া সম্ভব। হাঙ্গেরি দেখিয়েছে, বধির জনগোষ্ঠীকে ভাষাগত সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের ভাষা সংরক্ষণ, শিক্ষালাভ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অধিকার আইনে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বাংলাদেশও ইতোমধ্যে বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকৃতি দিয়েছে।
এখন আলোচনার বিষয় হলো সেই বিদ্যমান স্বীকৃতিকে কীভাবে পূর্ণাঙ্গ ভাষাগত অধিকার, কার্যকর মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সেবায় সমান অংশগ্রহণের নিশ্চয়তায় রূপান্তর করা যায়। বাংলা ইশারা ভাষা বাংলা ভাষার প্রতিবন্ধী সংস্করণ নয়; এটি বাংলাদেশের বধির জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র ভাষাগত ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। আর সেই ঐতিহ্যের আইনগত স্বীকৃতি এবং শিক্ষাগত বিকাশ নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহের প্রশ্ন নয়—এটি মানবিক মর্যাদা, ভাষাগত ন্যায়বিচার এবং
অংশ–০৬
জাতীয় শিক্ষাক্রমে তৃতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ইশারা ভাষা—যৌক্তিকতা, প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবায়নের পথ
তৃতীয় ভাষার পাঠ্যক্রমে বাংলা ইশারা ভাষা কেন নয়? ভাষাগত ন্যায়বিচার, সাংবিধানিক দায় ও বধির জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার
উপশিরোনাম: বিদেশি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু যে দেশের বধির নাগরিকেরা নিজেদের ভাষায় শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে, সেই দেশের শিক্ষাক্রমে বাংলা ইশারা ভাষার স্থান কোথায়? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার নৈতিক দর্শন এই প্রশ্নকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা যখন নতুন শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক সংস্কার এবং বহুভাষিক দক্ষতার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের জাতীয় বিবেকের সামনে উপস্থিত হয়েছে—যে রাষ্ট্র তার শিক্ষার্থীদের জাপানি, কোরীয়, ম্যান্ডারিন, ফরাসি, জার্মান কিংবা আরবি ভাষা শেখানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, সেই রাষ্ট্র কি নিজের ভূখণ্ডে বসবাসকারী বধির জনগোষ্ঠীর বাংলা ইশারা ভাষাকে (Bangla Sign Language—BdSL) সমান গুরুত্ব দিতে পারে না?
প্রশ্নটি বিদেশি ভাষাশিক্ষার বিরোধিতা নয়। বরং ভাষাশিক্ষার অগ্রাধিকার, শিক্ষাগত সমতা, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ এবং রাষ্ট্রের আইনগত দায়িত্বকে একই আলোচনায় নিয়ে আসার প্রয়াস। কারণ বিদেশি ভাষা শেখা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে পারে; অন্যদিকে বাংলা ইশারা ভাষার স্বীকৃতি ও কার্যকর ব্যবহার বধির শিক্ষার্থীদের একটি অংশের জন্য শিক্ষায় প্রবেশ, জ্ঞান অর্জন, আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং মর্যাদাপূর্ণ সামাজিক অংশগ্রহণের অপরিহার্য শর্ত।
২০২৬ সালের ৮ জুন শিক্ষাক্রম সংস্কার বিষয়ে সরকারের ঘোষণায় বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষাশিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ১১ জুন জাতীয় বাজেট বক্তৃতায়ও বিভিন্ন বিদেশি ভাষা অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। পরবর্তী পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ শীর্ষক পাঠ সংযোজন এবং ২০২৮ সালে বৃহত্তর শিক্ষাক্রম সংস্কারের কথা প্রকাশিত হয়েছে। তবে তৃতীয় ভাষা বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা আর সব শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক তৃতীয় ভাষার পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যপুস্তক ও পাঠদান চালু করা এক বিষয় নয়; সংস্কারের ঘোষিত পর্যায়গুলোকে সেই পার্থক্য মাথায় রেখেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। —এই নীতিগত পরিবর্তনের মুহূর্তে বাংলা ইশারা ভাষাকে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার একটি স্বীকৃত বিকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগত পার্থক্য পরিষ্কার করা প্রয়োজন: শ্রবণশীল শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ইশারা ভাষা তৃতীয় বা অতিরিক্ত ভাষা হতে পারে, কিন্তু অনেক বধির শিক্ষার্থীর জন্য সেটিই প্রথম ভাষা, মাতৃভাষা কিংবা প্রধান ও সর্বাধিক সহজলভ্য ভাষা। কাজেই বধির শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ভাষাকে কেবল ‘তৃতীয় ভাষা’ হিসেবে চিহ্নিত করা তাদের ভাষাগত পরিচয়ের যথাযথ স্বীকৃতি নয়। বরং জাতীয় শিক্ষাক্রমে বাংলা ইশারা ভাষার দ্বৈত ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন—বধির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম ভাষা ও উপযুক্ত ক্ষেত্রে শিক্ষাদানের মাধ্যম এবং অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ভাষা হিসেবে শেখার সুযোগ।
ভাষাগত সংখ্যালঘু হিসেবে বধির জনগোষ্ঠী: প্রতিবন্ধিতার পরিচয়ের বাইরেও ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার
বাংলাদেশে বধির জনগোষ্ঠীকে সাধারণত প্রতিবন্ধিতার কাঠামোয় চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু এই পরিচয় তাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। বধির জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ভাষাভিত্তিক সম্প্রদায়ও রয়েছে, যাদের যোগাযোগ, সামাজিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি এবং জ্ঞান বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ইশারা ভাষা।
ইশারা ভাষা কোনো বিচ্ছিন্ন অঙ্গভঙ্গির সমষ্টি কিংবা কথ্য বাংলা ভাষার শব্দে শব্দে দৃশ্যমান অনুবাদ নয়। প্রাকৃতিক ইশারা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ, বাক্যগঠন, অর্থপ্রকাশের পদ্ধতি এবং স্থানিক-দৃশ্যমান ভাষাগত কাঠামো রয়েছে। ফলে বাংলা ইশারা ভাষার শিক্ষা বলতে শুধু কয়েকটি সংকেত শেখানো বোঝায় না; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ভাষা এবং সেই ভাষার সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন বোঝায়।
এখানে বধির জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে বড় ভাষাগত সংখ্যালঘু’ হিসেবে উপস্থাপনের আগে একটি পরিসংখ্যানগত সতর্কতা প্রয়োজন। শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা, সম্পূর্ণ বধির মানুষের সংখ্যা এবং বাংলা ইশারা ভাষা ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা এক নয়। সব শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ইশারা ভাষা ব্যবহার করেন না; আবার শ্রবণশীল পরিবারের সদস্য, শিক্ষক ও দোভাষীরাও এই ভাষা ব্যবহার করতে পারেন। তাই নির্ভরযোগ্য ও তুলনাযোগ্য ভাষাভিত্তিক জনগণনার তথ্য ছাড়া বধির জনগোষ্ঠীকে দেশের বৃহত্তম ভাষাগত সংখ্যালঘু ঘোষণা করা সমীচীন নয়। তবে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ, বিস্তৃত এবং ঐতিহাসিকভাবে অবহেলিত ভাষাগত জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিকতা অত্যন্ত শক্তিশালী।
এই জনগোষ্ঠীর ভাষাগত পরিচয়কে শিক্ষাক্রমে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ রাষ্ট্রের ভাষানীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। বাংলাদেশের বহুভাষিক বাস্তবতার আলোচনায় শুধু ভৌগোলিক অঞ্চল, জাতিগত পরিচয় কিংবা কথ্য ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠী নয়, দৃশ্যমান-স্থানিক ভাষা ব্যবহারকারী বধির জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশের আইনেই বাংলা ইশারা ভাষার অধিকার: নতুন দাবি নয়, বিদ্যমান অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন
বাংলা ইশারা ভাষাকে শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তির যুক্তি শুধু মানবিক আবেদন বা কল্যাণমূলক বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল নয়। এর সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি রয়েছে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-তে।—এই আইনের ১৬(১)(থ) ধারায় শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী, যথাসম্ভব, বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। একই ধারার উপধারা (২) প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নির্ধারিত অধিকারগুলোর ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ নিষিদ্ধ করেছে।
এই বিধানের তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। আইন যখন একজন বধির ব্যক্তির বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকার করে, তখন শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব শুধু ওই অধিকারকে কাগজে স্বীকৃতি দেওয়া নয়; বরং তা কার্যকরভাবে প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা।
ধরা যাক, একজন বধির শিশু বাংলা ইশারা ভাষার মাধ্যমে সবচেয়ে কার্যকরভাবে শেখে। কিন্তু তার বিদ্যালয়ে ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক নেই, পাঠ্যবিষয়ের ধারণাগুলো ইশারা ভাষায় ব্যাখ্যা করার ব্যবস্থা নেই, উপযুক্ত ডিজিটাল শিখনসামগ্রী নেই এবং পরীক্ষার সময় প্রয়োজনীয় যোগাযোগ-সহায়তাও পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে শিশুটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও শিক্ষার বিষয়বস্তুতে তার কার্যকর প্রবেশাধিকার সীমিত হতে পারে।
এখানেই আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার (Formal Access) এবং প্রকৃত শিক্ষাগত অংশগ্রহণের (Substantive Educational Participation) মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিদ্যালয়ের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেই অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। শিক্ষার্থী যে ভাষা ও যোগাযোগপদ্ধতির মাধ্যমে কার্যকরভাবে শিখতে পারে, সেই ভাষায় শিক্ষা অর্জনের বাস্তব সুযোগও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নীতিগত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ২৭ অনুচ্ছেদের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২৮ অনুচ্ছেদের বৈষম্যবিরোধী কাঠামো শিক্ষাগত সমতার বৃহত্তর সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করে। তবে সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ; এটি সরাসরি বলবৎযোগ্য মৌলিক অধিকারের সমার্থক নয়। একইভাবে সংবিধানের সমতাসংক্রান্ত বিধান এবং প্রতিবন্ধিতা-নির্দিষ্ট আইনগত সুরক্ষার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখতে হবে।
এসব বিধান একত্রে বিবেচনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত সামনে আসে: প্রতিবন্ধিতার ধরন ও ভাষাগত প্রয়োজন উপেক্ষা করে সবার জন্য একই পাঠদান-পদ্ধতি নির্ধারণ করাকে প্রকৃত সমতা বলে ধরে নেওয়া যায় না। সমতার লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন সহায়তা ও ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি। অতএব, বাংলা ইশারা ভাষাকে শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব কোনো নতুন বিশেষ সুবিধা তৈরির দাবি নয়; এটি বিদ্যমান অধিকারকে শিক্ষার বাস্তব কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত করার যৌক্তিক প্রচেষ্টা।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে ইশারা ভাষা: রাষ্ট্রের আইনগত ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা
বাংলাদেশের শিক্ষাক্রমে বাংলা ইশারা ভাষা অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আইনগত ভিত্তি জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদ (Convention on the Rights of Persons with Disabilities—CRPD)। বাংলাদেশ ২০০৭ সালের ৩০ নভেম্বর সনদটি অনুসমর্থন করে এবং ২০০৮ সালের ১২ মে এর ঐচ্ছিক প্রটোকলে যোগ দেয়। ফলে সনদের বিধান বাস্তবায়নে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আইনগত অঙ্গীকার রয়েছে। —এই সনদের ২ অনুচ্ছেদে ভাষার সংজ্ঞায় কথ্য ভাষার পাশাপাশি ইশারা ভাষা এবং অন্যান্য অকথ্য ভাষাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে ইশারা ভাষা কোনো নিম্নতর যোগাযোগব্যবস্থা নয়; এটি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত।
২১ অনুচ্ছেদের (খ) ও (ঙ) দফা রাষ্ট্রকে যথাক্রমে সরকারি যোগাযোগে ইশারা ভাষার ব্যবহার গ্রহণ ও সহজতর করতে এবং ইশারা ভাষার ব্যবহার স্বীকৃতি ও প্রসারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলে। অন্যদিকে ৩০(৪) অনুচ্ছেদ ইশারা ভাষা ও বধির সংস্কৃতিসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং সহায়তার অধিকার নিশ্চিত করে। —তবে শিক্ষাক্রম সংস্কারের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হলো সনদের ২৪ অনুচ্ছেদ—শিক্ষার অধিকার।
এই অনুচ্ছেদের ৩(খ) দফায় ইশারা ভাষা শেখার সুযোগ সহজতর করা এবং বধির জনগোষ্ঠীর ভাষাগত পরিচয়ের বিকাশকে উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। ৩(গ) দফায় বধির, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও বধির-অন্ধ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বাধিক উপযুক্ত ভাষা ও যোগাযোগপদ্ধতিতে শিক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। ৪ নম্বর অনুচ্ছেদাংশে ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, প্রতিবন্ধী শিক্ষকসহ উপযুক্ত জনবল তৈরি এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই বিধানগুলো থেকে অন্তত তিনটি মৌলিক আইনগত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়।
- প্রথমত, বধির শিক্ষার্থীদের ইশারা ভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের সাধারণ কল্যাণমূলক বিবেচনার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সনদ বাস্তবায়নের অংশ।
- দ্বিতীয়ত, শুধু ইশারা ভাষার একটি ঐচ্ছিক পাঠ চালু করলেই বধির শিক্ষার্থীদের জন্য সনদের শিক্ষাসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূর্ণ হয় না। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ইশারা ভাষায় পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী, যোগ্য শিক্ষক, মূল্যায়নের উপযোগী ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত ভাষাগত সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে।
- তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সনদটি বাংলা ইশারা ভাষাকে নির্দিষ্টভাবে ‘তৃতীয় ভাষা’ নামে জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেয় না। কোন শ্রেণিতে কীভাবে ভাষাটি শেখানো হবে, তা রাষ্ট্রের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সিদ্ধান্ত। কিন্তু সনদের ভাষাগত অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার বিধান বাস্তবায়নের একটি যৌক্তিক নীতিগত ব্যবস্থা হতে পারে বাংলা ইশারা ভাষার জন্য শিক্ষাক্রমে আনুষ্ঠানিক স্থান সৃষ্টি করা।
অতএব, প্রশ্ন শুধু একটি নতুন বিষয় চালু করার নয়; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকারকে শিক্ষাক্রম, শিক্ষকশিক্ষা এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তব ব্যবস্থায় রূপান্তর করার।
১৯৯২ সালের জাতিসংঘের সংখ্যালঘু অধিকার ঘোষণা: ভাষাগত পরিচয়ের সুরক্ষায় নতুন যুক্তি
বাংলা ইশারা ভাষার অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিসরে বিচার করা যায় জাতিসংঘের ১৯৯২ সালের Declaration on the Rights of Persons Belonging to National or Ethnic, Religious and Linguistic Minorities-এর আলোকে।
এই ঘোষণার ১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে বসবাসকারী ভাষাগতসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও পরিচয় সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। ২ অনুচ্ছেদে সংখ্যালঘু ব্যক্তিদের নিজেদের ভাষা ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য জীবনে ব্যবহার করার স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে। বিশেষভাবে ৪(৩) অনুচ্ছেদে যথাসম্ভব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা শেখা অথবা সেই ভাষায় শিক্ষাগ্রহণের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে রাষ্ট্রের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
—এই ঘোষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ভিত্তি প্রদান করে। কারণ ভাষাগত সংখ্যালঘুর অধিকার শুধু নিজস্ব ভাষায় কথা বলা কিংবা যোগাযোগের স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ নয়; ভাষা সংরক্ষণ, ভাষার বিকাশ এবং ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের সুযোগও তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে আইনগতভাবে দুটি বিষয় পৃথক রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, ১৯৯২ সালের ঘোষণাটি একটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ঘোষণা; এটি CRPD-এর মতো অনুসমর্থনযোগ্য ও সরাসরি চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টিকারী আন্তর্জাতিক কনভেনশন নয়। দ্বিতীয়ত, সব বধির ব্যক্তি একই ভাষাগত পরিচয়ে নিজেদের চিহ্নিত করেন না। ফলে বধির জনগোষ্ঠীর ভাষাগত সংখ্যালঘু পরিচয়ের বিশ্লেষণে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের স্বপরিচয়, ভাষাচর্চা ও বাস্তব অবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তা সত্ত্বেও ঘোষণাটির নীতিসমূহ বধির জনগোষ্ঠীর ভাষাগত অধিকার বিশ্লেষণে প্রাসঙ্গিক। এই যুক্তির আরও প্রত্যক্ষ সমর্থন পাওয়া যায় জাতিসংঘের সংখ্যালঘুবিষয়ক ফোরামের ভাষা ও শিক্ষাসংক্রান্ত সুপারিশে, যেখানে বাস্তবসম্মত ক্ষেত্রে বধির জনগোষ্ঠীর জন্য ইশারা ভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এখানে একটি গভীর নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। যে রাষ্ট্র তার বহুভাষিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করতে চায়, সে রাষ্ট্র কি এমন একটি জনগোষ্ঠীর ভাষাকে জাতীয় শিক্ষাক্রমের বাইরে রাখতে পারে, যে জনগোষ্ঠীর ভাষাগত পরিচয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোয় বিশেষ সুরক্ষার বিষয়?
বিদেশি ভাষা অর্থনৈতিক সম্ভাবনার জন্য, ইশারা ভাষা সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য
বিদেশি ভাষা শিক্ষার অন্যতম যুক্তি অর্থনৈতিক। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক যোগাযোগে বিদেশি ভাষার দক্ষতা মূল্যবান সম্পদ হতে পারে। বাংলাদেশ তার শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে চাইলে বহুভাষিক শিক্ষার প্রসার একটি বিবেচনাযোগ্য উদ্যোগ। কিন্তু ভাষাশিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবল অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি?
শিক্ষার মানবিক, গণতান্ত্রিক এবং সামাজিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। শিক্ষা মানুষকে শুধু কর্মসংস্থানের উপযোগী করে না; তাকে অন্য মানুষের অভিজ্ঞতা বুঝতে, বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে এবং সমাজে সমঅধিকারের চর্চা করতে সক্ষম করে।—এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ইশারা ভাষার শিক্ষাগত মূল্য দ্বিমাত্রিক।
একদিকে বধির শিক্ষার্থীদের জন্য এর ব্যবহার শিক্ষা গ্রহণ ও জ্ঞান বিনিময়ের বাধা কমাতে পারে। অন্যদিকে শ্রবণশীল শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ইশারা ভাষা শেখা একটি নতুন যোগাযোগদক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের একটি অংশ ইশারা ভাষায় প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করলে বধির মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরিসর প্রসারিত হতে পারে।
এখানে ভাষাটির অর্থনৈতিক মূল্যও অস্বীকার করা যায় না। যোগ্য ইশারা ভাষা শিক্ষক, পেশাদার দোভাষী, শিখনসামগ্রী নির্মাতা, ভিডিওভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুতকারক এবং প্রবেশগম্য যোগাযোগব্যবস্থার বিশেষজ্ঞ তৈরির মাধ্যমে নতুন পেশাগত ক্ষেত্রের বিকাশ ঘটতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের মান, স্বীকৃত যোগ্যতা এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠানগত বিনিয়োগের ওপর। অর্থাৎ বাংলা ইশারা ভাষার অন্তর্ভুক্তি নিছক সমাজকল্যাণমূলক ব্যয় হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, যোগাযোগের প্রবেশগম্যতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ।
সমতা মানে সবাইকে একই ভাষায় শেখানো নয়: শিক্ষাগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার একটি মৌলিক নীতি হলো—শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ভিন্ন হলে শিক্ষাগত সমতা অর্জনের ব্যবস্থাও ভিন্ন হতে পারে।—এটি আনুষ্ঠানিক সমতা (Formal Equality) ও কার্যকর সমতার (Substantive Equality) পার্থক্য।
ধরা যাক, একটি বিদ্যালয়ে শ্রবণশীল ও বধির শিক্ষার্থীর জন্য একই বই, একই শিক্ষক এবং একই মৌখিক পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণ করা হলো। বাহ্যিকভাবে সবার জন্য একই সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যদি শ্রবণনির্ভর পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষকের ব্যাখ্যা বুঝতে না পারে এবং তার জন্য উপযুক্ত ভাষাগত সহায়তাও না থাকে, তাহলে সেই অভিন্ন ব্যবস্থা তার জন্য সমান শিক্ষাগত সুযোগ তৈরি করে না।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার দাবি তাই সবাইকে একই পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়ার দাবি নয়; বরং সবাইকে যথাযথভাবে শেখার সুযোগ দেওয়ার দাবি।—এই বাস্তবতায় বাংলা ইশারা ভাষাকে শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তির যৌক্তিকতা কেবল ভাষাগত বহুত্ববাদে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিক্ষার্থীর জন্য উপযুক্ত ভাষায় শিক্ষা, যোগাযোগের প্রবেশগম্যতা, শিক্ষকের পেশাগত সক্ষমতা এবং বৈষম্যহীন মূল্যায়নব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বধির শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে এসে তার বোধগম্য ভাষায় শেখার সুযোগ না দেওয়া হলে অন্তর্ভুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি তৈরি হতে পারে, কিন্তু অন্তর্ভুক্তির শিক্ষাগত উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কীভাবে বাংলা ইশারা ভাষাকে জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা যায়
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত তৃতীয় ভাষা নীতিকে সামনে রেখে বাংলা ইশারা ভাষা অন্তর্ভুক্তির একটি পর্যায়ক্রমিক, বাস্তবায়নযোগ্য এবং অধিকারভিত্তিক কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে।
- প্রথমত, শ্রবণশীল শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ইশারা ভাষাকে স্বীকৃত অতিরিক্ত ভাষার বিকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে পরিচিতিমূলক যোগাযোগদক্ষতা, বধির সংস্কৃতির পরিচয় এবং দৈনন্দিন কথোপকথনের উপযোগী পাঠ তৈরি করা সম্ভব। পরবর্তী পর্যায়ে বিদ্যালয়ের সক্ষমতা ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ অনুসারে আরও উন্নত ভাষাগত দক্ষতার পাঠ চালু করা যেতে পারে।
- দ্বিতীয়ত, বধির শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ইশারা ভাষাকে যথাযথ ক্ষেত্রে প্রথম ভাষা ও শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার পৃথক ব্যবস্থা থাকতে হবে। শ্রবণশীল শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় ভাষা হিসেবে ইশারা ভাষা শেখানোর উদ্যোগ কখনোই বধির শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় ভাষাগত সহায়তার বিকল্প হতে পারে না।
- তৃতীয়ত, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কাঠামো গঠন করা প্রয়োজন। সেখানে বধির জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, বধির শিক্ষক, ইশারা ভাষাবিজ্ঞানী, বিশেষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাবিশেষজ্ঞ, শিক্ষক-প্রশিক্ষক এবং পাঠ্যক্রম বিশেষজ্ঞদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত।
- চতুর্থত, বাংলা ইশারা ভাষার পাঠ্যপুস্তককে কেবল মুদ্রিত বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা বাস্তবসম্মত হবে না। ইশারা ভাষা একটি দৃশ্যমান-স্থানিক ভাষা। ফলে ভিডিওভিত্তিক পাঠ, ডিজিটাল অভিধান, শিক্ষণ-ভিডিও, দ্বিভাষিক শিখনসামগ্রী এবং মূল্যায়ন উপকরণকে পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
- পঞ্চমত, ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক তৈরি এবং শিক্ষকশিক্ষা কার্যক্রমে বধির শিক্ষার্থীদের ভাষাগত ও যোগাযোগগত চাহিদা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। শিক্ষাক্রমে ভাষা সংযোজন করলেও যদি তা শেখানোর যোগ্য শিক্ষক না থাকে, তবে উদ্যোগটি কাগুজে সংস্কারে সীমিত হয়ে পড়বে।
- ষষ্ঠত, শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও মাননিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। সীমিতসংখ্যক নির্বাচিত বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং বধির শিক্ষার্থী ও পরিবারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ‘Nothing About Us Without Us’—আমাদের বিষয়ে আমাদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। বধির জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও শিক্ষাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তাদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ভাষা ব্যবহারের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, বিদ্যমান চর্চা এবং ব্যবহারকারীদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো মান্যরূপ দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্য ভাষানীতি তৈরি করতে পারবে না।
একুশের চেতনা ও বাংলা ইশারা ভাষা: ভাষার অধিকারের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ভাষার অধিকারের সম্পর্ক গভীর। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—ভাষা কেবল যোগাযোগের উপকরণ নয়; এটি আত্মপরিচয়, মর্যাদা, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব এবং রাজনৈতিক-সামাজিক অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহনকারী একটি রাষ্ট্রের ভাষানীতিতে ভাষাগত বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি থাকা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং বাংলা ইশারা ভাষার অধিকারের প্রশ্ন অভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। কিন্তু উভয়ের মধ্যে একটি সাধারণ মানবিক নীতি রয়েছে—মানুষের ভাষাগত পরিচয়কে অবজ্ঞা করে তার সমমর্যাদা ও পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় না।
যে বধির শিশু নিজের ভাবনা ইশারায় প্রকাশ করে, যে তরুণী ইশারা ভাষায় নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে, কিংবা যে শিক্ষার্থী উপযুক্ত যোগাযোগব্যবস্থা না পাওয়ায় শ্রেণিকক্ষের আলোচনা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে—তাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আমাদের ভাষা ও শিক্ষাবিষয়ক নীতিকে আরও গভীরভাবে বিবেচনা করার আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলা ইশারা ভাষাকে শিক্ষাক্রমে যথাযথ মর্যাদা দেয়, তবে তা ভাষাগত বহুত্ববাদকে আরও বাস্তব ভিত্তি দিতে পারে।
সর্বোপরি, শিক্ষাক্রম সংস্কারের এই সন্ধিক্ষণে নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। বিদেশি ভাষাশিক্ষার সম্প্রসারণ এবং বধির জনগোষ্ঠীর ভাষাগত অধিকার প্রতিষ্ঠাকে পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য হিসেবে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। উভয়ই একই বহুভাষিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হতে পারে। কেননা বিদেশি ভাষা আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করতে পারে; বাংলা ইশারা ভাষার শিক্ষাগত স্বীকৃতি আমাদের নিজেদের সমাজের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবধান কমাতে পারে।
বাংলাদেশের নতুন শিক্ষাক্রমে সেই দুই উদ্দেশ্যের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হবে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন। কারণ একটি শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র শুধু কতটি নতুন ভাষা শেখানো হচ্ছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না; বিচার করতে হয়, দেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যের মধ্যে কারা নিজেদের ভাষায় শেখার সুযোগ পাচ্ছে এবং কারা এখনও সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকছে।
অংশ–০৭
সমাপনী আলোচনা, নীতিগত সুপারিশ ও উত্তরণের পথ
শিশুকে ভাষার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া নয়, শিক্ষাকে শিশুর ভাষায় পৌঁছাতে হবে
বাংলাদেশে শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষার ভাষা নিয়ে প্রশ্নটির উত্তর “বাংলা না বাংলা ইশারা ভাষা”—এই দুই মেরুর কোনো একটিতে নেই। রাষ্ট্রভাষা বাংলা থাকবে; লিখিত বাংলা বধির শিশুর শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, নাগরিক জীবন ও কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। একই সঙ্গে যেসব শিশুর জন্য বাংলা ইশারা ভাষা সবচেয়ে স্বাভাবিক ও প্রবেশযোগ্য ভাষা, তাদের সেই ভাষায় চিন্তা, শেখা, প্রশ্ন করা এবং জ্ঞান অর্জনের অধিকারও থাকতে হবে।
বাংলাদেশের আইন ইতিমধ্যে বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকার করেছে। আন্তর্জাতিক সনদ আমাদের আরও নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমও বিকল্প যোগাযোগপদ্ধতির দিকে কিছু দরজা খুলেছে। অতএব সমস্যা এখন আর নীতিগত অজ্ঞতার নয়; সমস্যা প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার দূরত্বে।
পাঠ্যবই যদি রাষ্ট্রভাষাকে সবার মাতৃভাষা বলে সরলীকরণ করে, শ্রেণিকক্ষ যদি ইশারা ভাষাকে শুধু অঙ্গভঙ্গি মনে করে, শিক্ষক যদি শিশুর ভাষায় কথা বলতে না পারেন, আর পরীক্ষা যদি ভাষার প্রতিবন্ধকতাকে মেধার ব্যর্থতা হিসেবে গণনা করে—তাহলে শিশুটি ব্যর্থ নয়; ব্যবস্থাই তাকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ভাষা একটি শিশুর কাছে শুধু কথা বলার উপায় নয়; পৃথিবীতে প্রবেশের চাবি। বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের প্রশ্ন তাই শেষ পর্যন্ত খুব সরল একটি নৈতিক পরীক্ষায় এসে দাঁড়ায়: আমরা কি শিশুকে আমাদের ভাষাব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করব, নাকি শিক্ষাব্যবস্থাকেই এমনভাবে বদলাব—যাতে প্রতিটি শিশুর কাছে জ্ঞানের দরজাটি সত্যিই খুলে যায়?
উত্তরণের পথ: আইনগত প্রতিশ্রুতি থেকে ভাষাগত ন্যায়বিচার
১) জাতীয় ভাষানীতি ও শিক্ষাক্রমে ইশারা ভাষার যথাযথ অবস্থান
বাংলাদেশের সামনে প্রথম কাজ হলো ভাষাগত অধিকারকে শিক্ষানীতির একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর অংশে পরিণত করা। রাষ্ট্রভাষা বাংলা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা এবং বধির জনগোষ্ঠীর ইশারা ভাষা—এই তিনটি বিষয়কে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং রাষ্ট্রীয় ভাষানীতির ভেতরেই তাদের পৃথক অবস্থান ও পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ করা সম্ভব।
জাতীয় শিক্ষাক্রমে রাষ্ট্রভাষা, মাতৃভাষা, প্রথম ভাষা, দ্বিতীয় ভাষা এবং শিক্ষার মাধ্যমের ধারণাগত পার্থক্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের ভাষাগত পরিচয় ও বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে, সেখানে ইশারা ভাষাকে একটি স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর মাধ্যমে শ্রবণক্ষম শিক্ষার্থীরাও বুঝতে পারবে, ভাষা কেবল কণ্ঠস্বর ও শ্রবণের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়।
তবে পাঠ্যবইয়ে ইশারা ভাষার নাম যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাংলা ইশারা ভাষার প্রকৃত ব্যবহার, আঞ্চলিক ও সম্প্রদায়গত বৈচিত্র্য, ভাষাগত কাঠামো এবং শিক্ষাগত প্রয়োগ নিয়ে পদ্ধতিগত গবেষণা। ভাষার মান নির্ধারণের নামে বধির জনগোষ্ঠীর জীবন্ত ভাষাকে প্রশাসনিকভাবে সংকুচিত করা যাবে না। ভাষাটির বিকাশে বধির ভাষাব্যবহারকারী, ভাষাবিজ্ঞানী, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
২) জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের জন্য নতুন কর্মপরিকল্পনা
পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যবই প্রকাশের অভিজ্ঞতা বাংলা ইশারা ভাষাভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী তৈরির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হতে পারে। তবে ইশারা ভাষার জন্য প্রচলিত মুদ্রিত পাঠ্যবইয়ের অনুরূপ ব্যবস্থা তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ ইশারা ভাষা মূলত দৃশ্যনির্ভর ও গতিশীল। এর ব্যাকরণগত অর্থ প্রকাশে হাতের গতি, মুখের অভিব্যক্তি, দেহভঙ্গি এবং স্থানিক বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই বাস্তবতায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের উদ্যোগে বাংলা ইশারা ভাষাভিত্তিক ভিডিও পাঠ্যপুস্তক, দ্বিভাষিক শিক্ষাসামগ্রী, বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা, শিক্ষক নির্দেশিকা এবং প্রবেশগম্য ডিজিটাল পাঠক্রম তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। লিখিত বাংলা ও বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, পরস্পরসম্পূরক শিক্ষাগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রথম পর্যায়ে নির্বাচিত বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই শিক্ষাসামগ্রী প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীর ভাষাগত বোঝাপড়া, বিষয়ভিত্তিক শিখনফল, শিক্ষকের প্রস্তুতি এবং অভিভাবকের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করা যেতে পারে। প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করলে নীতিগত সিদ্ধান্ত আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত হবে।
৩) শিক্ষক প্রস্তুতি, বধির শিক্ষকের অংশগ্রহণ এবং শ্রেণিকক্ষের সংস্কার
বধির শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি হলো ভাষাগতভাবে সক্ষম শিক্ষক। শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর ভাষা বুঝতে না পারেন, তাহলে উন্নত পাঠ্যবই, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ কিংবা প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাদান কার্যকর নাও হতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষকশিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থায় বাংলা ইশারা ভাষার দক্ষতাকে প্রাসঙ্গিক পেশাগত যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বধির ব্যক্তিদের শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি, বৃত্তি, পেশাগত উন্নয়ন এবং নিয়োগের উপযুক্ত কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
সাধারণ বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ ইশারা ভাষার দোভাষী, শ্রেণিকক্ষ সহায়তা এবং প্রবেশগম্য শিক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে। তবে দোভাষীকে শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। দোভাষীর কাজ যোগাযোগে সহায়তা করা; শিক্ষার পরিকল্পনা, বিষয়বস্তু উপস্থাপন ও শিখনফল নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব শিক্ষকের এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের।
৪) জাতীয় পরিসংখ্যান ও গবেষণায় ভাষাগত পরিচয়কে দৃশ্যমান করা
বাংলাদেশে শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা সম্পর্কে সরকারি জরিপ থেকে ধারণা পাওয়া গেলেও তাঁদের মধ্যে কতজন বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন, কতজন অন্য যোগাযোগপদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন এবং কতজন নিজস্ব উপযুক্ত ভাষায় শিক্ষার সুযোগ পান—এসব বিষয়ে সমন্বিত জাতীয় তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
এই তথ্যের অনুপস্থিতি নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। শুধু প্রতিবন্ধিতার ধরন দিয়ে শিক্ষার্থীর ভাষাগত প্রয়োজন নির্ধারণ করা যায় না। দুইজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর ভাষা অর্জনের ইতিহাস, পারিবারিক পরিবেশ, শ্রবণসহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার মাধ্যমের প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।
ভবিষ্যৎ জাতীয় জরিপ ও শিক্ষা-পরিসংখ্যানব্যবস্থায় প্রতিবন্ধিতার ধরন, প্রথম বা প্রধান ভাষা, যোগাযোগের পছন্দ, শিক্ষার মাধ্যম, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং শিক্ষাগত অগ্রগতির তথ্য পৃথকভাবে সংগ্রহের ব্যবস্থা করা উচিত। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, অবহিত সম্মতি এবং বৈষম্যমূলক ব্যবহার প্রতিরোধের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাসামগ্রী উৎপাদন, অর্থ বরাদ্দ এবং আঞ্চলিক সেবাব্যবস্থা পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে। তথ্যের উদ্দেশ্য কেবল মানুষ গণনা করা নয়; যাদের প্রয়োজন এত দিন প্রশাসনিক হিসাবে অদৃশ্য থেকেছে, তাদের শিক্ষাগত অধিকার বাস্তবায়নের উপযুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৫) শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহি ও বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ
অধিকার বাস্তবায়নের জন্য নীতিগত ঘোষণা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নির্দিষ্ট দায়িত্ব, অর্থায়ন, সময়সীমা এবং অগ্রগতি পরিমাপের ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রশাসন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন এবং বধির জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি ফল সীমিত হতে পারে।
এ জন্য একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা যেতে পারে, যেখানে বাংলা ইশারা ভাষাভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীর ভাষাগত চাহিদা মূল্যায়ন, বিদ্যালয় পর্যায়ের সহায়তা এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশগম্যতার জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারিত থাকবে।
বাস্তবায়নের অগ্রগতি শুধু কতটি বই প্রকাশিত হলো বা কতজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেলেন, সেই হিসাব দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং শিক্ষার্থীরা কতটা বুঝতে পারছে, তাদের শিক্ষাগত অর্জন কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, বিদ্যালয়ে টিকে থাকার হার কেমন এবং শিক্ষার পরবর্তী স্তরে প্রবেশের সুযোগ কতটা বাড়ছে—এসব ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নীতি প্রণয়ন ও মূল্যায়নের প্রতিটি পর্যায়ে বধির জনগোষ্ঠীর অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। যাদের ভাষাগত অধিকার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেই মানুষদের বাদ দিয়ে তৈরি নীতি অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার দাবি করতে পারে না।
চূড়ান্ত প্রতিফলন
একুশের উত্তরাধিকার ও নীরব ভাষার অধিকার: আমরা কোন বাংলাদেশ গড়তে চাই?
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা আত্মপরিচয়, মর্যাদা, প্রতিবাদ এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শিখিয়েছে, মানুষের ভাষাকে অস্বীকার করা মানে তার অস্তিত্বের একটি মৌলিক মাত্রাকে অস্বীকার করা। সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রের কাছে ভাষাগত ন্যায়বিচারের দাবি তাই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা কেবল অতীতের অর্জন উদ্যাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ইতিহাসের প্রকৃত উত্তরাধিকার বহন করতে হলে তার নৈতিক শিক্ষাকে বর্তমানের বাস্তবতায় প্রয়োগ করতে হয়। যে জাতি নিজের ভাষার মর্যাদার জন্য সংগ্রাম করেছে, সেই জাতির শিক্ষাব্যবস্থায় অন্য ভাষার মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত—এ প্রশ্ন তাই বাইরের কোনো দাবি নয়; আমাদের নিজেদের ইতিহাসেরই এক অনিবার্য সম্প্রসারণ।
বধির শিশুর ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গভীর। তার ভাষা উচ্চারিত শব্দে ধরা না পড়লেও তার চিন্তা আছে, অনুভূতি আছে, প্রশ্ন আছে, কল্পনা আছে। হাতের গতিতে, চোখের দৃষ্টিতে, মুখের অভিব্যক্তিতে এবং শরীরের স্থানিক বিন্যাসে সে অর্থ নির্মাণ করে। শ্রবণক্ষম সমাজের কাছে সেই ভাষা অপরিচিত হতে পারে; কিন্তু অপরিচিত ভাষা কোনোভাবেই অসম্পূর্ণ ভাষা নয়।
একটি শিশুকে যদি তার প্রবেশগম্য ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে শিক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে তার সামনে শুধু একটি পাঠ্যবইয়ের ভাষাগত বাধা তৈরি হয় না; জ্ঞান অর্জন, সামাজিক সম্পর্ক, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের সামর্থ্য প্রকাশের পথও সংকুচিত হতে পারে। বিপরীতে, উপযুক্ত ভাষাগত পরিবেশ শিশুকে কেবল শিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয় না; তাকে নিজের চিন্তার স্বাধীনতা অর্জনেরও ভিত্তি দেয়।
এখানে বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং বাংলা ইশারা ভাষার অধিকারকে পরস্পরবিরোধী করে দেখার কোনো যুক্তি নেই। বধির শিক্ষার্থীর জন্য লিখিত বাংলা শেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু লিখিত বাংলা শেখানোর কার্যকর পথ অনেক ক্ষেত্রেই তার প্রথম বা সবচেয়ে প্রবেশগম্য ভাষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা তখনই অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন শিক্ষার্থীকে তার ভাষাগত বাস্তবতার জন্য শাস্তি না দিয়ে সেই বাস্তবতাকে শিক্ষার শক্তিতে পরিণত করা হয়।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে তাই এখন দুটি পথ:
- একটি পথ হলো বিদ্যমান কাঠামোকে অপরিবর্তিত রেখে বধির শিক্ষার্থীদের সেই কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া। অন্য পথটি হলো শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সংস্কার করা, যাতে ভাষাগত পার্থক্য শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ না হয়।
- দ্বিতীয় পথটি নিঃসন্দেহে কঠিন। এর জন্য গবেষণা, অর্থায়ন, শিক্ষক প্রস্তুতি, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা প্রয়োজন। কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কখনো সহজতম প্রশাসনিক পথ বেছে নেওয়ার নাম নয়; এটি প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ন্যায়সংগত শিক্ষার পরিবেশ নির্মাণের অঙ্গীকার।
পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যবই প্রকাশের উদ্যোগ আমাদের দেখিয়েছে, ভাষাগত বৈচিত্র্যকে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে স্থান দেওয়া সম্ভব। এখন সেই অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত করার সময়। বাংলা ইশারা ভাষাভাষী বধির শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষাসামগ্রী, দক্ষ শিক্ষক এবং প্রবেশগম্য মূল্যায়নব্যবস্থা গড়ে তোলা কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নের একটি অপরিহার্য অংশ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু একটি ভাষার স্বীকৃতি কিংবা একটি নতুন পাঠ্যবই প্রকাশের নয়। প্রশ্নটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে কীভাবে দেখে, বৈচিত্র্যকে কতটা সম্মান করে এবং সমতার প্রতিশ্রুতিকে কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তার।
আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষার মর্যাদার কথা বলি। বিদ্যালয়ে শিশুদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পড়াই। পাঠ্যবইয়ে মাতৃভাষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করি। কিন্তু যে শিশুর ভাষা আমাদের কানে পৌঁছায় না, তার ভাষার অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে সেই শিক্ষার একটি মৌলিক অংশ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে পূর্ণতা দিতে হলে শুধু উচ্চারিত ভাষার স্বাধীনতা নয়, ইশারায় প্রকাশিত ভাষার মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে। একুশের চেতনার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—মানুষের ভাষাকে সম্মান করতে হলে আগে তার ভাষায় প্রকাশিত মানুষটিকে স্বীকার করতে হয়। আর বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি তাই রয়ে যায়:
যে শিশুর হাতে ভাষা আছে, চোখে স্বপ্ন আছে, মনে জানার আকাঙ্ক্ষা আছে—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি তার জন্য জ্ঞানের দরজা খুলবে, নাকি তাকে এমন এক দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে রাখবে, যার চাবি তার নিজের ভাষায় তৈরি হয়নি?
এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে, আমাদের শিক্ষা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, আমাদের রাষ্ট্র কতটা অধিকারভিত্তিক এবং আমাদের ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার কতটা সর্বজনীন।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com
#বাংলাইশারাভাষা #মাতৃভাষারঅধিকার #শ্রবণপ্রতিবন্ধীশিক্ষা #একীভূতশিক্ষা #শিক্ষাঅধিকার #BanglaSignLanguage #DeafEducation #LanguageRights #InclusiveEducation #MotherTongueEducation
