আন্তর্জাতিক ডেস্ক | অধিকারপত্র ডটকম
ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার মধ্যে হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইরানের সহায়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় তেহরানের ভূমিকা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বক্তব্য এবং সামরিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন সামনে এসেছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদস্যরা হুতিদের প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, কৌশলগত নির্দেশনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইরান ও হুতিরা সামরিক সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সৌদি আরবে হামলা, বাড়ছে উদ্বেগ
ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে বহু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১৩ জন নিহত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা, তেলবাহী জাহাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব হামলার পেছনে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আঞ্চলিক সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, হুতিরা আঞ্চলিক সহায়তায় উন্নত সামরিক প্রযুক্তি অর্জন করেছে। তবে এ বক্তব্যে তিনি নির্দিষ্ট করে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি।
ইরানের সহায়তার অভিযোগ
আলজাজিরার প্রতিবেদনে *দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল*-এর একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের মাহান এয়ারের ফ্লাইটে আইআরজিসির সদস্য, ড্রোনের যন্ত্রাংশ, ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা-ব্যবস্থা এবং বিস্ফোরক সক্রিয় করার উপকরণ ইয়েমেনে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইআরজিসির সদস্যরা হুতিদের সামরিক অভিযান পরিচালনায় সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের হাতে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির উপস্থিতি এবং সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানগুলোতে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি ইরানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন জোরালো করেছে। তবে অভিযোগ ও বিশ্লেষণকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
ইরান ও হুতিরা নিজেদের মধ্যে সামরিক সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণ এবং অভিযান পরিচালনায় ইরানের প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
ইয়েমেনে নতুন করে ভয়াবহ সংঘর্ষ
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং হুতিদের মধ্যে সংঘর্ষ নতুন করে তীব্র হয়েছে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর থেকে দেশটিতে সংঘাত চলমান। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
সোমবার ইয়েমেনের শাবওয়া প্রদেশে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৫৩ জন নিহত এবং প্রায় ২০০ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে। হামলার সময় সেখানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে হুতিরা সেপ্টেম্বর মাসে নতুন সামরিক অভিযান চালিয়ে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে বলে আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। লোহিত সাগর উপকূল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের পরিস্থিতিও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সামরিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘর্ষ তীব্র হলে ইয়েমেনের যুদ্ধ আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইয়েমেনের যুদ্ধ এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের স্থিতিশীলতা। ফলে সংঘাতের পরবর্তী গতিপথের দিকে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।
