অধিকারপত্র বিশেস সম্পাদকীয় ফিচার । দেশচিন্তা
বাংলাদেশের বাইরে ঋণ, মেগা প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং দুর্নীতির ধারাবাহিকতায় ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’র প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড—এই দুটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির মনস্তত্ত্ব কি আজও একই রকম? বিশ্লেষণে উঠে আসছে বিদেশি ঋণ, কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং জাতীয় স্বার্থ বিসর্জনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চালিকাশক্তি। পাঠক জানতে পারবেন, কেন ‘বাঙালির শত্রু বাঙালি’—এই আত্মঘাতী মনস্তত্ত্ব আজও বদলায়নি, এবং কীভাবে নাগরিক সচেতনতাই হতে পারে সার্বভৌমত্বের শেষ রক্ষাকবচ।
শুরুটা খুব সাধারণ—কিন্তু প্রশ্নটা বড়
রাজধানীর একটি মফস্বলি চায়ের দোকানে বসে দুই বন্ধু। একজন বলেন, “শুনলি, আমাদের নতুন বন্দরটা নাকি চীনা কোম্পানি বানাচ্ছে।” আরেকজন বলেন, “আর ভারত নাকি ভয় পাচ্ছে।” প্রথমজন হাসে, “ভয় পাবে না তো কী? আমাদের তো নিজেদেরই ভয় পাওয়ার কথা।” দ্বিতীয়জন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে, “আমরা তো ভয় পাই না, আমরা শুধু টিভিতে দেখি আর ফেসবুকে লিখি।”
এই সামান্য কথোপকথনটি যদি আপনি একটু খেয়াল করে ভাবেন, তবে দেখবেন—এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি জাতির গোটা ইতিহাস, তার সমস্ত ট্র্যাজেডি, আর তার সবচেয়ে বড় আত্মঘাতী অভ্যাস। এই দোকানের দুই বন্ধু জানেন না, তারা হয়তো সেই একই মনস্তত্ত্বের উত্তরাধিকারী—যে মনস্তত্ত্ব ১৭৫৭ সালে মীর জাফরকে নবাবের আসনে বসিয়েছিল, আর ১৯৭৫ সালে খন্দকার মোশতাককে রাষ্ট্রপতির চেয়ারে। প্রশ্নটা তাহলে কী? প্রশ্নটা হলো—বাইরের শক্তি আসলে কতটা শক্তিশালী, নাকি ঘরের মানুষগুলোই তাদের সবচেয়ে বড় সহায়ক?
মজার গান শুনুন: মীরজাফর রিমিক্স (কোট-টাই ভার্সন) | Mirzafar Remix | Bengali Protest Folk-Hop Song
ঘটনার পেছনের গল্প: বাইরের তলোয়ার, ঘরের দরজা
বাংলার ইতিহাসে বাইরের শক্তির আগমন কোনো নতুন ঘটনা নয়। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে মধ্যযুগ, ঔপনিবেশিক আমল—সব সময় বাংলার উর্বর ভূমি, নদীপথ এবং ধন-সম্পদ বিদেশিদের লোভাতুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো: বাইরের শক্তি কেবল তখনই জয়ী হয়েছে, যখন ঘরের মানুষ দরজা খুলে দিয়েছে।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও তিনি পরাজিত হলেন। কারণ কী? কারণ তার প্রধান সেনাপতি মীর জাফর যুদ্ধের মাঠে পুঁটুলির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন জগৎশেঠ, উমিচাঁদ এবং রায়দুর্লভের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তাদের গোপন চুক্তি ছিল—নবাবকে সরিয়ে মীর জাফরকে ক্ষমতায় বসানো হবে, আর বিনিময়ে কোম্পানি পাবে বিপুল অর্থ ও বাণিজ্যিক সুবিধা। একইভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেই চক্রান্তের মূল হোতা ছিলেন তারই মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ। ইতিহাসবিদরা তাকে আখ্যায়িত করেন ‘আধুনিক বাংলাদেশের সীরজাফর’ হিসেবে।
এই দুই ঘটনার মধ্যে ব্যবধান প্রায় দুইশো বছর, কিন্তু মনস্তত্ত্ব একই—নিজের ক্ষমতার লোভে বা প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করতে বাইরের শক্তিকে ঘরে ডেকে আনা। আর সেই বাইরের শক্তি? সে কখনোই স্থায়ী বন্ধু হয় না। মীর জাফর নবাব হওয়ার পর ব্রিটিশরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে অন্ধ করে দেয়। জগৎশেঠেরা ব্যাংকিং ব্যবসা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান, পরে নিহত হন। খন্দকার মোশতাক মাত্র ৮৩ দিন রাষ্ট্রপতি থাকতে পেরেছিলেন, শেষে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। বাইরের শক্তি তাদের কাজ শেষ করে ফেলে, তারপর ফেলে দেয়।
সংখ্যাগুলো কী বলছে?
এখন আসুন বর্তমানে ফিরে আসি। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ ভয়াবহভাবে বাড়ছে। অর্থ বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪.৫৩ বিলিয়ন ডলার ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে সুদ বাবদই গেছে ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। সরকারি পূর্বাভাস বলছে, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াবে ৭.৫৬৫ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রেকর্ড ৪.০৯ বিলিয়ন ডলারের প্রায় দ্বিগুণ।
এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর মানে হলো—আমরা এখন বিদেশ থেকে যে নতুন ঋণ বা সহায়তা পাচ্ছি, তার চেয়ে বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে পুরনো ঋণ শোধ করতে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল, পদ্মা রেল লিঙ্ক—এই মেগা প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসছে, ফলে আসল পরিশোধের চাপ শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় সহজ শর্তের ঋণ পাওয়া কমে গেছে; এখন বাজারভিত্তিক, ভাসমান সুদের হারে ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক সুদের হার বাড়লে আমাদের সুদের বোঝাও বাড়ছে।
কিন্তু সংখ্যার বাইরে গিয়ে দেখুন—এই ঋণের টাকায় যেসব মেগা প্রকল্প হয়েছে, সেগুলোর ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। একটি সাদা পত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাতটি মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ১,১৪,৫৪৭ কোটি টাকা, যা শেষে দাঁড়িয়েছে ১,৯৫,১১৬ কোটি টাকায়—অর্থাৎ ৮০,৫৬৯ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পেছনে ছিল দুর্বল পরিকল্পনা, দুর্নীতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অব্যবস্থাপনা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক প্রকল্পে সঠিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম হয়েছে এবং ‘পেট প্রজেক্ট’ হিসেবে কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
ভাবুন তো—এই অতিরিক্ত ৮০ হাজার কোটি টাকা যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হতো, তাহলে কত স্কুল, কত হাসপাতাল, কত শিক্ষক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেত? কিন্তু আমরা সেই পথে যাইনি। আমরা ব্যয় বাড়িয়েছি, ঋণ বাড়িয়েছি, আর এখন সেই ঋণের সুদ গুনছি।
সংখ্যার বাইরে মানুষের জীবন
ঢাকার বাইরে একটি জেলা শহরে থাকেন রহিম মিয়া। তার ছেলে সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিতে চায়। রহিম মিয়া জানেন, পরীক্ষায় ভালো করা এক thing, কিন্তু সুপারিশ না থাকলে চাকরি পাওয়া কঠিন। তিনি একটি ঋণ নেন—ছেলেকে একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি করাতে। সেই কোচিং সেন্টারের মালিক আবার স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয়। রহিম মিয়ার ছেলে পরীক্ষায় ভালো করে, কিন্তু চাকরি পায় না। কারণ, সুপারিশপ্রাপ্তরা আগেই জায়গা নিয়ে ফেলেছে।
এখানে প্রশ্ন হলো—রহিম মিয়ার ছেলের ব্যর্থতার দায় কি শুধু তার নিজের? নাকি এই ব্যবস্থার, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বড় হয়, যেখানে মেধার চেয়ে সুপারিশ বেশি কাজ করে? এই প্রশ্নটি যদি আমরা জাতীয় পর্যায়ে তুলি, তাহলে দেখব—আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক সময় একইভাবে কাজ করে। যোগ্য মানুষ নয়, দলীয় পরিচয় বা ব্যক্তিগত আনুগত্য বড় হয়ে ওঠে। আর যখনই এমন হয়, তখনই বাইরের শক্তির জন্য পথ তৈরি হয়।
একটু হাসি হোক—যদিও হাসির কারণটা খুব সুখের নয়
আমাদের মেগা প্রকল্পগুলোর জীবনচক্রটি বেশ মজার—যদিও মজার বিষয়টি আসলে দুঃখজনক। প্রথমে একটিgrand উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, রঙিন ব্যানার, ফেসবুকে লাইভ। তারপর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের লেকচার, মিডিয়ায় ছবি। এরপর প্রতিবেদন প্রকাশ—‘সফলভাবে সমাপ্ত।’ তারপর? তারপর নীরবতা। কয়েক বছর পর দেখা যায়, প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের বাজেট নেই, যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, বা বিদেশি ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি শেষ হয়ে গেছে—কিন্তু স্থানীয় কোনো দক্ষ জনবল গড়ে ওঠেনি।
আরেকটি মজার বিষয় হলো আমাদের ‘কূটনৈতিক ব্যালান্সিং’। আমরা বলি—‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়।’ কথাটি খুব সুন্দর। কিন্তু বাস্তবে দেখুন—একটি দেশ আমাদের বন্দর বানাতে চায়, আরেকটি দেশ চায় না। একটি দেশ ঋণ দিতে চায়, আরেকটি দেশ সেই ঋণের শর্ত নিয়ে আপত্তি তুলছে। আমরা তখন দুই দিকেই হাসি, দুই দিকেই হাত নাড়ি। কিন্তু যখন সুদের হার বাড়ে, যখন ঋণ পরিশোধের সময় আসে—তখন কেউ আমাদের পাশে দাঁড়ায় না। তখন আমাদেরই গুনতে হয়।
একটি কথা মনে রাখবেন—আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘বন্ধু’ বলে কিছু নেই, থাকে ‘স্বার্থ’। যে দেশ আমাদের ঋণ দেয়, সে তার নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থে দেয়। যে দেশ বিনিয়োগ করে, সে তার বাজার ও কৌশলগত অবস্থানের স্বার্থে করে। এই সত্যটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। আর ভুলে যাওয়ার কারণেই বারবার প্রতারিত হই।
তত্ত্বের আয়নায়: আমরা কীভাবে বিষয়টিকে বুঝব?
এই পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে ‘প্রিন্সিপাল-এজেন্ট তত্ত্ব’ (Principal-Agent Theory)। তত্ত্বটি বলে—একজন প্রিন্সিপাল (যেমন: জনগণ বা রাষ্ট্র) যখন কোনো এজেন্টকে (যেমন: নীতিনির্ধারক, আমলা বা ঠিকাদার) দায়িত্ব দেন, তখন এজেন্টের নিজের স্বার্থ প্রিন্সিপালের স্বার্থের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। এজেন্ট যদি তদারকির বাইরে থাকেন, তবে তিনি নিজের সুবিধার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—যেমন বিদেশি ঋণ নেওয়া, যেখানে তার ব্যক্তিগত কমিশন থাকে, কিন্তু জাতির ওপর বোঝা চাপে।
আরেকটি তত্ত্ব হলো ‘ইনস্টিটিউশনাল থিওরি’। এটি বলে—প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক নিয়মে চলে না, বরং অনানুষ্ঠানিক প্রভাব, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক অভ্যাসও প্রতিষ্ঠানের আচরণ নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখুন—আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন আছে, আছে নিয়ম-কানুন, আছে জবাবদিহির বিধান। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (TIB) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দুর্নীতি পারসেপশন ইনডেক্সে (CPI) বাংলাদেশের স্কোর ১৮২টি দেশের মধ্যে ২৪, এবং অবস্থান নিচ থেকে ১৩তম। এই স্কোর গত ১৪ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। TIB বলছে, জুলাই অভ্য uprising-এর পর যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
কাগজের নীতি বনাম মাঠের বাস্তবতা
আমাদের নীতিতে লেখা আছে—‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।’ মেগা প্রকল্পের নীতিতেও লেখা আছে—‘প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সঠিকভাবে করতে হবে।’ কিন্তু বাস্তবে? সাদা পত্রের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে—অনেক প্রকল্পে সঠিকভাবে খরচ-সুবিধা বিশ্লেষণ করা হয়নি, ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম হয়েছে, এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ঘন ঘন পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বাস্তবতা হলো—আমরা ‘কী করেছি’ সেই হিসাব রাখতে ভালোবাসি। কত টাকা খরচ হয়েছে, কত কিলোমিটার রেলপথ বসেছে, কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে—এই সংখ্যাগুলো আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘মানুষের জীবনে কী বদলেছে’—এই প্রশ্নটি আমরা কম করি। একটি রেলপথ যদি নির্মাণ করা হয় কিন্তু সাধারণ মানুষের যাতায়াতের খরচ যদি না কমে, তাহলে সেই রেলপথের সার্থকতা কোথায়? একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র যদি নির্মাণ করা হয় কিন্তু গ্রামের মানুষের ঘরে যদি এখনও মোমবাতি জ্বালাতে হয়, তাহলে সেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র কাদের জন্য?
কার লাভ, কার ক্ষতি?
এই প্রশ্নটি করা জরুরি। মেগা প্রকল্পের ঋণ নেওয়া হয় জাতির নামে। কিন্তু সেই ঋণের সুবিধা কে পায়? ঠিকাদারি পায় কে? যারা প্রকল্পের কাজ পান, যারা সরবরাহকারী হন, যারা কমিশন পান—তারা একটি ছোট গোষ্ঠী। আর যারা ক্ষতি পান—তারা হলেন সাধারণ করদাতা, যারা এই ঋণ শোধ করতে হবে। যখন সুদের হার বাড়ে, যখন টাকার মান কমে, তখন সেই বোঝা সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে।
রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় বললে—এই ব্যবস্থায় ‘who decides, who pays, who benefits’ এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর আলাদা। সিদ্ধান্ত নেন একটি ছোট অভিজাত গোষ্ঠী, মূল্য দেন সাধারণ মানুষ, আর সুবিধা পান সেই গোষ্ঠীই। এই বৈষম্যই হলো সেই কাঠামো, যা বারবার আমাদের দুর্বল করে।
অন্যরা কীভাবে সামলেছে?
আন্তর্জাতিক উদাহরণ আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। শ্রীলঙ্কা চীনের ঋণে পড়ে হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিতে বাধ্য হয়েছিল। পাকিস্তানও চীনের ঋণের চাপে আইএমএফের কাছে যেতে বাধ্য হয়েছে। তবে সব দেশ একই পরিণতিতে পৌঁছায়নি। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ ও ঋণ নিয়েছে, কিন্তু তারা শর্তগুলো কঠোরভাবে যাচাই করেছে এবং একাধিক উৎস থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করেছে। তাদের সাফল্যের মূল কারণ—তারা ‘এক ঝুড়িতে সব ডিম’ রাখেনি।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হলো—চীনের BRI প্রকল্পে যোগ দেওয়া মানেই ঋণের ফাঁদে পড়া নয়। কিন্তু শর্তহীন ঋণ, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং একক উৎসের ওপর নির্ভরতা—এগুলোই বিপদের কারণ। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ BRI-তে যোগ দেয়। এরপর পদ্মা রেল লিঙ্ক, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চীনের বিনিয়োগ এসেছে। এই প্রকল্পগুলো অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু একই সঙ্গে ঋণের বোঝাও বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন—চীনের ঋণ বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের একটি সহনীয় অংশ, তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রত্যাশিত আয় না হলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে।
আমরা কোথায় ভুল করছি?
আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল—আমরা সমস্যার লক্ষণ নিয়ে কাজ করি, মূল কারণ নিয়ে নয়। আমরা বলি—‘দুর্নীতি বেড়েছে।’ কিন্তু কেন বেড়েছে? আমরা বলি—‘ঋণ বাড়ছে।’ কিন্তু কেন বাড়ছে? আমরা বলি—‘বাইরের শক্তি প্রভাব বিস্তার করছে।’ কিন্তু কেন পারছে?
মূল কারণটি হলো—আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যখন রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে ধ্বংস করার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে, যখন যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য বড় হয়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল রাখা হয় যাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে—তখনই বাইরের শক্তির জন্য পথ তৈরি হয়। মীর জাফর বা খন্দকার মোশতাক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নন। তারা একটি ব্যবস্থার ফসল—এমন ব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন থেকে উপলব্ধি: পাঁচ প্রশ্নের ধারাবাহিক যাত্রা ও তাত্ত্বিক কাঠামোর সমন্বয়
এই অংশটি একটি সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণী স্থাপত্যের প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রতিটি প্রশ্নই একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় প্রশ্নকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এবং সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে আলাদা তাত্ত্বিক লেন্স।
- প্রথম কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—বিশ্বাসঘাতকতা কেন বারবার ফিরে আসে; এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যবহার করা হয়েছে Principal-Agent Theory এবং Institutional Theory, যা ব্যাখ্যা করে যে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান কীভাবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী আচরণকে সম্ভব করে তোলে, আর এর মানবিক অনুরণন হলো সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতা।
- দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো—দরজা খোলা রাখলে কী হয়; এখানে Debt Trap ও Dependency Theory-র মাধ্যমে দেখানো হয়েছে কীভাবে বহিঃঋণ ও একক নির্ভরতা জাতীয় সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকিতে ফেলে, আর এর মানবিক প্রতিচ্ছবি হলো একজন কৃষকের ঋণচক্রের সঙ্গে জাতীয় ঋণের তুলনা।
- তৃতীয় প্রশ্ন হলো—সাফল্য কীভাবে মাপি; Implementation Theory ও Governance Framework-এর সাহায্যে দেখানো হয়েছে যে আউটপুট আর আউটকামের পার্থক্য না বোঝার কারণে প্রকল্প সফল দেখালেও মানুষের জীবন বদলায় না, আর এর মানবিক অনুরণন হলো প্রকল্পের সুবিধাভোগী ও ক্ষতিগ্রস্তের মধ্যকার বিভাজন।
- চতুর্থ প্রশ্ন হলো—ভুল স্বীকার করা কি দুর্বলতা; Conflict Theory ও Social Justice Theory-র মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে ক্ষমতাকাঠামো ও বৈষম্য সংস্কারকে কঠিন করে তোলে, অথচ ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে আত্মসমালোচনার বিকল্প নেই, আর এর মানবিক আহ্বান হলো নাগরিকের আত্মশুদ্ধি।
- পঞ্চম প্রশ্ন হলো—স্বাধীনতা রক্ষা কে করে; Capability Approach ও Active Citizenship-এর আলোকে দেখানো হয়েছে যে স্বাধীনতা কেবল সনদ নয়, বরং নাগরিকের সক্ষমতা ও প্রতিদিনের অংশগ্রহণের ফসল, আর এর মানবিক অনুরণন হলো পাঠকের প্রতি সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান।
এভাবে এখানে একটি ধারাবাহিক যাত্রা তৈরি করে—ঐতিহাসিক মনস্তত্ত্ব থেকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি, বাস্তবায়ন-ব্যর্থতা থেকে আত্মসমালোচনা, এবং শেষে নাগরিক দায়বদ্ধতার সামষ্টিক আহ্বানে পৌঁছে; প্রতিটিপ্রশ্নই এক পরের জন্য যুক্তি তৈরি করে, ফলে সূচিটি কেবল একটি তালিকা নয়, বরং একটি সুসংহত বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে কাজ করে।
মীর জাফরের মৃতদেহ কবরে, মনস্তত্ত্ব আমাদের রক্তে
পলাশীর প্রান্তর আজ কৃষিজমি। সেখানে চাষিরা ধান চাষ করেন, কেউ কেউ হয়তো জানেন না এই মাটিতে একদিন বাংলার স্বাধীনতার ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সিরাজ-উদ-দৌলার বিশাল বাহিনী দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু তার প্রধান সেনাপতি মীর জাফর যুদ্ধের মাঠে পুঁটুলির মতো নীরব। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তার গোপন চুক্তি ছিল—নবাবকে সরিয়ে তাকে ক্ষমতায় বসানো হবে। যুদ্ধ শেষে মীর জাফর নবাব হলেন, কিন্তু কতদিন? ব্রিটিশরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে অন্ধ করে দিল, তার পুত্র ও নাতির মৃতদেহ কাটা হলো। জগৎশেঠের ব্যাংকিং সাম্রাজ্য ধ্বংস হলো, উমিচাঁদ ও রায়দুর্লভও রেহাই পেলেন না। ইতিহাসের নির্মম সমীকরণ: বিশ্বাসঘাতকরা কখনো টেকে না, কারণ বাইরের শক্তি তাদের ব্যবহার করে, তারপর ফেলে দেয়।
কিন্তু মীর জাফর মরে গেছে—তার মনস্তত্ত্ব কি মরেছে? আজকের বাংলাদেশে সেই মনস্তত্ত্বের নতুন পোশাক পরিধান করতে দেখি। সেদিনের বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি আজ কোট-টাই পরা এক কূটনীতিক, যিনি বিদেশি দূতাবাসের গোপন কক্ষে বসে দেশের স্বার্থ বিক্রি করেন। অথবা তিনি একজন নীতিনির্ধারক, যিনি একটি মেগা প্রকল্পের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন—যেখানে ব্যক্তিগত কমিশন আছে, কিন্তু জাতির ওপর ঋণের বোঝা চাপে। অথবা তিনি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি, যিনি প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করতে বিদেশি শক্তির সহায়তা চান। মীর জাফর মরে গেছে, কিন্তু তার মনস্তত্ত্ব আজও জীবিত—শুধু পোশাক বদলেছে।
এই মনস্তত্ত্বের মূল চালিকাশক্তি কী? প্রিন্সিপাল-এজেন্ট তত্ত্ব (Principal-Agent Theory) বলে—একজন প্রিন্সিপাল (জনগণ বা রাষ্ট্র) যখন এজেন্টকে (নীতিনির্ধারক বা আমলা) দায়িত্ব দেন, তখন এজেন্টের নিজের স্বার্থ প্রিন্সিপালের স্বার্থের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। এজেন্ট যদি তদারকির বাইরে থাকেন, তিনি নিজের সুবিধার জন্য সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব প্রায়ই সত্য হয়ে ওঠে—নীতিনির্ধারক বিদেশি ঋণ নেন, যেখানে তার ব্যক্তিগত কমিশন থাকে; কিন্তু সেই ঋণের সুদ গুনতে হয় সাধারণ করদাতাকে। ২০২৫ সালের দুর্নীতি পারসেপশন ইনডেক্সে (CPI) বাংলাদেশের স্কোর ১৮২টি দেশের মধ্যে ২৪, অবস্থান নিচ থেকে ১৩তম—এই সংখ্যাটি প্রমাণ করে, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে আছে, কিন্তু কার্যত দুর্বল।
এখানে মানবিক প্রশ্নটি হলো—কেন আমরা বারবার একই ফাঁদে পড়ি? কারণ আমরা সমস্যার লক্ষণ নিয়ে কাজ করি, মূল কারণ নিয়ে নয়। আমরা বলি—‘দুর্নীতি বেড়েছে।’ কিন্তু কেন বেড়েছে? আমরা বলি—‘বাইরের শক্তি প্রভাব বিস্তার করছে।’ কিন্তু কেন পারছে? উত্তরটি হলো—আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যখন রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে ধ্বংস করার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে, যখন যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য বড় হয়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল রাখা হয় যাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে—তখনই বাইরের শক্তির জন্য পথ তৈরি হয়। মীর জাফর বা খন্দকার মোশতাক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নন; তারা একটি ব্যবস্থার ফসল।
প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক: আমরা কি সেই ভিড়ের একজন, যে কেবল তামাশা দেখে? নাকি আমরা সেই সচেতন নাগরিক, যে প্রশ্ন করে—‘আমাদের সেনাপতি কোথায়?’ ‘আমাদের স্বার্থ কোথায়?’ মীর জাফরের রক্ত এখনো আমাদের শিরায় বইছে, কিন্তু সেই রক্তকে বদলে দেওয়া সম্ভব—শুধু যদি আমরা তার মনস্তত্ত্বকে চিনতে পারি। আর মনস্তত্ত্ব চেনার প্রথম শর্ত হলো—নিজেদের ভুল স্বীকার করা।
ঋণের কাঁদে পা দিলে বুঝবেন—বাইরের ডাকাতের দরকারই পড়ে না
একটি পরিবারের গল্প দিয়ে শুরু করি। গ্রামের এক কৃষক ঋণ নেন ট্রাক্টর কেনার জন্য। প্রথম বছর ফসল ভালো হয়, তিনি খুশি। দ্বিতীয় বছর বন্যা, ফসল নষ্ট, কিন্তু ঋণের কিস্তি দিতে হয়। তিনি আবার ঋণ নেন—এবার সুদ মেটাতে। তৃতীয় বছর শস্যের দাম কমে যায়, তিনি জমি বন্ধক রাখতে বাধ্য হন। এই চক্রের নাম ‘ঋণের ফাঁদ।’ বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিও কি এখন এই চক্রে পড়েছে? আসুন সংখ্যাগুলো দেখি।
অর্থ বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪.৫৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করেছে—এর মধ্যে সুদ বাবদই গেছে ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। সরকারি পূর্বাভাস বলছে, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াবে ৭.৫৬৫ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৪.০৯ বিলিয়ন ডলারের প্রায় দ্বিগুণ। এই সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়; এর মানে হলো—আমরা এখন বিদেশ থেকে যে নতুন ঋণ বা সহায়তা পাচ্ছি, তার চেয়ে বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে পুরনো ঋণ শোধ করতে। মেগা প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসছে, ফলে আসল পরিশোধের চাপ শুরু হয়েছে।
কিন্তু সমস্যাটি আরও গভীর। সাদা পত্রের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাতটি মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ১,১৪,৫৪৭ কোটি টাকা, যা শেষে দাঁড়িয়েছে ১,৯৫,১১৬ কোটি টাকায়—অর্থাৎ ৮০,৫৬৯ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পেছনে ছিল দুর্বল পরিকল্পনা, দুর্নীতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অব্যবস্থাপনা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক প্রকল্পে সঠিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়ম হয়েছে এবং ‘পেট প্রজেক্ট’ হিসেবে কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এই ৮০ হাজার কোটি টাকা যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হতো, তাহলে কত স্কুল, কত হাসপাতাল, কত শিক্ষক প্রশিক্ষণ দেওয়া যেত?
আন্তর্জাতিক উদাহরণ আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। শ্রীলঙ্কা চীনের ঋণে পড়ে হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিতে বাধ্য হয়েছিল। পাকিস্তানও চীনের ঋণের চাপে আইএমএফের কাছে যেতে বাধ্য হয়েছে। তবে সব দেশ একই পরিণতিতে পৌঁছায়নি। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়েছে, কিন্তু শর্তগুলো কঠোরভাবে যাচাই করেছে এবং একাধিক উৎস থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করেছে। তাদের সাফল্যের মূল কারণ—তারা ‘এক ঝুড়িতে সব ডিম’ রাখেনি। বাংলাদেশ ২০১৬ সালে BRI-তে যোগ দেয়; এরপর পদ্মা রেল লিঙ্ক, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র等项目ে চীনের বিনিয়োগ এসেছে। এই প্রকল্পগুলো অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু একই সঙ্গে ঋণের বোঝাও বাড়িয়েছে।
তত্ত্বের আয়নায় দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ‘Debt Trap’ তত্ত্ব বলে—যখন কোনো দেশ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তখন সে তার জাতীয় সম্পদ (বন্দর, ভূমি, খনিজ) ঋণদাতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে দিতে বাধ্য হয়। এটি একটি কাঠামোগত নির্ভরতার জন্ম দেয়। বাংলাদেশ কি এই ফাঁদে পড়ছে? বিশ্লেষকরা বলছেন—চীনের ঋণ বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের একটি সহনীয় অংশ, তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রত্যাশিত আয় না হলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো—আমাদের দরজা কি খোলা? আমরা কি একাধিক উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছি, নাকি একক দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি?
এখানে শেষ কথা হলো—ঋণ নেওয়া মানেই খারাপ নয়, কিন্তু শর্তহীন ঋণ, অস্বচ্ছ চুক্তি আর একক দেশের ওপর নির্ভরতা—এই তিনটি মিলে তৈরি হয় ‘Debt Trap।’ যখন আমাদের দরজা খোলা, তখন বাইরের ডাকাতের প্রবেশ ঘটে নিজে থেকেই। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আমাদের দরজার চাবি নিজের হাতে রাখতে চাই, নাকি অন্যদের হাতে তুলে দিতে চাই?
আমরা ব্যানার দেখি, উদ্বোধন দেখি—কিন্তু জবাবদিহি দেখি না
রাজধানীর একটি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। রঙিন ব্যানার, ফেসবুকে লাইভ, মন্ত্রীর বক্তৃতা—‘এই প্রকল্প বদলে দেবে জাতির ভাগ্য।’ তিন বছর পর সেই প্রকল্পের একটি অংশ পরিদর্শনে গেলেন একজন সাংবাদিক। দেখা গেল, যন্ত্রপাতি মরিচা পড়ে আছে, রক্ষণাবেক্ষণের বাজেট নেই, বিদেশি ঠিকাদারের চুক্তি শেষ—কিন্তু স্থানীয় কোনো দক্ষ জনবল গড়ে ওঠেনি। সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন—‘এই প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদন কোথায়?’ উত্তর এলো—‘প্রকল্প সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে।’ কিন্তু ‘কীভাবে সফল?’—এই প্রশ্নের উত্তর নেই।
আমাদের মেগা প্রকল্পগুলোর জীবনচক্রটি বেশ পরিচিত—যদিও হাসির নয়, কাঁদার। প্রথমে grand উদ্বোধন, রঙিন ব্যানার। তারপর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের লেকচার, মিডিয়ায় ছবি। এরপর প্রতিবেদন প্রকাশ—‘সফলভাবে সমাপ্ত।’ তারপর? তারপর নীরবতা। কয়েক বছর পর দেখা যায়, প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের বাজেট নেই, যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। আরেকটি মজার বিষয় হলো আমাদের ‘কূটনৈতিক ব্যালান্সিং’—আমরা বলি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়।’ কথাটি সুন্দর, কিন্তু বাস্তবে দেখুন—একটি দেশ আমাদের বন্দর বানাতে চায়, আরেকটি চায় না। আমরা দুই দিকেই হাসি, দুই দিকেই হাত নাড়ি। কিন্তু যখন সুদের হার বাড়ে, কেউ আমাদের পাশে দাঁড়ায় না।
সমস্যাটি কোথায়? আমরা ‘কী করেছি’ সেই হিসাব রাখতে ভালোবাসি। কত কিলোমিটার রেলপথ, কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ—এই সংখ্যাগুলো আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘মানুষের জীবনে কী বদলেছে’—এই প্রশ্নটি আমরা কম করি। এটি ‘আউটপুট বনাম আউটকাম’-এর পার্থক্য। আউটপুট হলো—কত স্কুল নির্মাণ করা হলো; আউটকাম হলো—শিক্ষার মান বেড়েছে কি? আউটপুট হলো—কত কিলোমিটার রেলপথ; আউটকাম হলো—সাধারণ মানুষের যাতায়াতের খরচ কমেছে কি? আমাদের নীতি ও প্রতিবেদনে আউটপুটের সংখ্যা বেশি, আউটকামের বিশ্লেষণ কম।
‘Implementation Theory’ বলে—নীতির সাফল্য নির্ভর করে বাস্তবায়নের কাঠামোর ওপর। কাগজে নীতি যতই সুন্দর হোক, যদি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পর্যবেক্ষণ না থাকে, তবে ফল আসবে না। ‘Governance and Accountability Framework’ বলে—প্রতিটি প্রকল্পের জন্য স্পষ্ট জবাবদিহির শৃঙ্খল থাকতে হবে: কে সিদ্ধান্ত নেবে, কে বাস্তবায়ন করবে, কে মূল্যায়ন করবে, এবং কে জবাবদিহি করবে। বাংলাদেশে এই শৃঙ্খল প্রায়ই ভেঙে যায়—কারণ সিদ্ধান্ত নেন এক গোষ্ঠী, বাস্তবায়ন করেন ঠিকাদার, মূল্যায়ন করেন সেই গোষ্ঠীরই লোকেরা। ফলে ‘প্রকল্প সফল’ ঘোষণা আসে, কিন্তু মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসে না।
এখানে মানবিক প্রশ্নটি হলো—এই প্রকল্পের সুবিধা কে পায়? ঠিকাদারি পায় কে? যারা প্রকল্পের কাজ পান, যারা সরবরাহকারী হন, যারা কমিশন পান—তারা একটি ছোট গোষ্ঠী। আর যারা ক্ষতি পান—তারা হলেন সাধারণ করদাতা, যারা এই ঋণ শোধ করতে হবে। রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায়—‘who decides, who pays, who benefits’ এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর আলাদা। সিদ্ধান্ত নেন একটি ছোট অভিজাত গোষ্ঠী, মূল্য দেন সাধারণ মানুষ, আর সুবিধা পান সেই গোষ্ঠীই।
শেষ প্রশ্নটি রেখে দিই—একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার অর্থ কি সমস্যাও শেষ? কত টাকা খরচ হয়েছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু কত জীবন বদলেছে—এটি কি আরও গুরুত্বপূর্ণ নয়? আমরা যদি এই প্রশ্নটি করতে শিখি, তবেই প্রকৃত জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে।
যে জাতি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে না, সে জাতি ভবিষ্যৎ গড়তে পারে না
আমরা প্রায়ই বলি—‘দুর্নীতি বেড়েছে।’ কিন্তু কেন বেড়েছে? আমরা বলি—‘ঋণ বাড়ছে।’ কিন্তু কেন বাড়ছে? আমরা বলি—‘বাইরের শক্তি প্রভাব বিস্তার করছে।’ কিন্তু কেন পারছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমে নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। কারণ, আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো জাতি কখনো শেখে না।
পলাশীর যুদ্ধে আমরা মীর জাফরকে দোষ দিই। কিন্তু সিরাজ-উদ-দৌলার দরবারে কি সব ঠিক ছিল? তার প্রধান সেনাপতির বিশ্বাসঘাতকতা তিনি আগে থেকে বুঝতে পারেননি কেন? ১৯৭৫ সালে খন্দকার মোশতাককে দোষ দিই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সুরক্ষা ব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল না? প্রশ্নটা নিজেদের কাছে করা জরুরি। এর মানে এই নয় যে আমরা শিকারকে দোষ দিচ্ছি; এর মানে হলো—আমরা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করছি। যে ব্যবস্থায় বিশ্বাসঘাতকতা সম্ভব হয়, সেই ব্যবস্থার সংস্কার দরকার। যে প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বড়, সেই প্রতিষ্ঠানের সংস্কার দরকার।
আত্মসমালোচনার একটি বাস্তব উদাহরণ দেখা যাক। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্য uprising-এর পর বাংলাদেশের নানা মহলে সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) বলছে—সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয়নি। আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। দুর্নীতি পারসেপশন ইনডেক্সে আমাদের স্কোর ২৪, যা গত ১৪ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এই সংখ্যাটি কি আমাদের আত্মসমালোচনার আহ্বান জানায় না?
‘Conflict Theory’ বলে—সমাজে সম্পদের বণ্টন ও ক্ষমতার সম্পর্কে বৈষম্য থাকে। যে গোষ্ঠী ক্ষমতায় থাকে, সে তার সুবিধা ধরে রাখতে চায়; ফলে সংস্কার কঠিন হয়। বাংলাদেশে এই তত্ত্ব প্রযোজ্য—কারণ ক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ সংস্কারে আগ্রহী নয়, কারণ সংস্কার তাদের সুবিধা কমিয়ে দেবে। কিন্তু ‘Social Justice Theory’ বলে—ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে সম্পদের পুনর্বণ্টন এবং দুর্বলদের ক্ষমতায়ন দরকার। এই দুটি তত্ত্বের টানাপোড়েনেই আমাদের রাজনীতি।
এখানে মানবিক প্রশ্নটি হলো—একজন সাধারণ নাগরিকের কী লাভ এই আত্মসমালোচনা থেকে? লাভ হলো—যখন আমরা ভুল স্বীকার করি, তখনই আমরা শুধরানোর পথ খুঁজি। যখন আমরা শুধরানোর পথ খুঁজি, তখনই আমরা ভবিষ্যৎ গড়ি। যে জাতি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে না, সে জাতি কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে। আর যে জাতি পারে, সে ইতিহাসকে নতুন করে লেখে।
প্রশ্নটি আপনার কাছে—আপনি কি নিজের ভুল স্বীকার করতে প্রস্তুত? যদি প্রস্তুত হন, তবেই পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হয়।
স্বাধীনতা সনদ নয়—প্রতিদিনের সচেতনতা, প্রতিদিনের জবাবদিহি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা একটি ভূখণ্ড পেয়েছিলাম, একটি পতাকা পেয়েছিলাম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে স্বাধীনতা চিরস্থায়ী। স্বাধীনতা একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া—প্রতিদিন তা রক্ষা করতে হয়। একটি সনদ কেবল ইতিহাসের দলিল; স্বাধীনতা হলো প্রতিদিনের সংগ্রাম—প্রতিদিনের সচেতনতা, প্রতিদিনের জবাবদিহি।
সচেতনতা মানে শুধু ভোট দেওয়া নয়। সচেতনতা মানে হলো—নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির আওতায় আনা। ঋণচুক্তির শর্ত জানা, মেগা প্রকল্পের খরচ যাচাই করা, এবং ভুল হলে প্রশ্ন তোলা। আজকের যুগে নাগরিকের হাতিয়ার হলো তথ্য। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া—সবই আছে। কিন্তু তথ্য থাকলেই হবে না, সেই তথ্য যাচাই করতে হবে। গুজব আর সত্যের পার্থক্য বুঝতে হবে। ‘Digital Literacy & Information Sovereignty’ হলো এই সচেতনতার অংশ—কোনো সংবেদনশীল খবর শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা।
তত্ত্বের আয়নায় দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ‘Capability Approach’ (অমর্ত্য সেন) বলে—মানুষের স্বাধীনতা কেবল অধিকার পাওয়া নয়, বরং সেই অধিকার ব্যবহার করার সক্ষমতা অর্জন করা। বাংলাদেশের নাগরিকদের যদি তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা না থাকে, তবে তাদের স্বাধীনতা কাগজে থাকলেও বাস্তবে অসম্পূর্ণ। ‘Active Citizenship’ তত্ত্ব বলে—গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নাগরিকের প্রতিদিনের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল।
এখানে একটি বাস্তব উদাহরণ দেখা যাক। একটি মেগা প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি নিয়ে যখন সংবাদপত্রে রিপোর্ট এলো, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন করলেন—‘এই অতিরিক্ত টাকা কোথায় গেল?’ কিন্তু সেই প্রশ্নগুলো কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল? যদি নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক এবং গবেষকরা একসঙ্গে এই প্রশ্নগুলো তুলতেন, তাহলে হয়তো তদন্ত কমিটি গঠিত হতো। এটাই হলো সচেতন নাগরিকত্বের শক্তি—প্রশ্ন করা এবং প্রশ্নের উত্তর দাবি করা।
এখন কী করা যায়?
সমাধান কেবল ‘সচেতনতা বাড়ানো’ নয়। সচেতনতা প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে প্রয়োজন institutional reform এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন।
- স্বল্পমেয়াদে, ঋণ চুক্তির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি বিদেশি ঋণের শর্ত, সুদের হার এবং পরিশোধের সময়সূচি প্রকাশ্যে আনতে হবে। একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ঋণের উৎস বহুমুখীকরণ করতে হবে। মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে খরচ-সুবিধা বিশ্লেষণ করতে হবে, এবং প্রকল্প শুরুর আগেই ‘exit plan’ তৈরি করতে হবে।
- মধ্যমেয়াদে, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকারভাবে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে। মেগা প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বিডিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর মূল্যায়ন করতে হবে—শুধু ‘খরচ হয়েছে কি না’ নয়, বরং ‘মানুষের জীবন বদলেছে কি না’।
- দীর্ঘমেয়াদে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোকে শিখতে হবে—প্রতিপক্ষ মানে শত্রু নয়। জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে সব দল একমত হতে হবে। এবং নাগরিকদের সচেতন থাকতে হবে—শুধু ভোট দেওয়া নয়, ভোটের পরেও নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
করণীয়: কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা
- তাৎক্ষণিক (০–৬ মাস):—— প্রতিটি বৈদেশিক ঋণচুক্তির পূর্ণ বিবরণ (সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড, শর্ত) সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপন এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা। ঋণ ব্যবস্থাপনায় ‘Debt Sustainability Analysis’ স্বাধীনভাবে পরিচালনা করা।
- স্বল্পমেয়াদে (১–২ বছর):—— মেগা প্রকল্পের জন্য ‘National Interest Cost-Benefit Analysis’ বাধ্যতামূলক করা। ঠিকাদারি প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বিডিং ছাড়া কোনো চুক্তি অনুমোদন না করা। দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইনগত সংস্কার আনা।
- মধ্যমেয়াদে (৩–৫ বছর):—— ঋণের উৎস বহুমুখীকরণ—চীন, ভারত, জাপান, বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং বেসরকারি খাত থেকে সুষমভাবে অর্থায়ন নিশ্চিত করা। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে ‘Knowledge Transfer’ নিশ্চিত করা।
- দীর্ঘমেয়াদে (৫–১০ বছর):—— রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় স্বার্থে ন্যূনতম ঐকমত্য (Consensus) গড়ে তোলা। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘Constitutional Literacy’ ও ‘Economic Citizenship’ অন্তর্ভুক্ত করা।
- সফলতার মাপকাঠি:—— শুধু কত টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে বা কত প্রকল্প শেষ হয়েছে তা নয়—বরং ঋণ পরিশোধের পরও কতটা Fiscal Space থাকে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কতটা বাড়ে, এবং জাতীয় সিদ্ধান্তে বিদেশি প্রভাব কতটা কমে—এগুলোই হবে প্রকৃত সাফল্যের সূচক।
শেষ কথা
ইতিহাস আমাদের শেখায়—বাইরের শক্তি তখনই জেতে, যখন ঘরের খেলা ঘরের মানুষই ভেঙে দেয়। পলাশীর মাঠে সেদিন লাখো মানুষ তামাশা দেখছিল, কিন্তু কেউ প্রশ্ন করেনি—
‘আমাদের সেনাপতি কোথায়?’ আজও আমরা অনেক সময় তামাশা দেখি। টিভিতে দেখি, ফেসবুকে লিখি, কিন্তু প্রশ্ন করি না—‘আমাদের সিদ্ধান্ত কোথায়?’ ‘আমাদের স্বার্থ কোথায়?’
প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক। আমরা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছি, নাকি একই ডুলকে নতুন পোশাক পরিয়ে ফিরিয়ে আনছি?
বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—স্বাধীনতা কখনো স্থায়ীভাবে অর্জিত হয় না। এটি প্রতিদিনের সচেতনতা, প্রতিদিনের জবাবদিহি এবং প্রতিদিনের নৈতিক সাহসের ফসল। আমরা যদি শুধু অতীতের গৌরবগাথা গাই, আর বর্তমানের ভুলগুলোকে এড়িয়ে যাই, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
আজকের বাংলাদেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে—ঋণের বোঝা, ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন, দুর্নীতি—এগুলো কোনো একক সরকারের সমস্যা নয়। এগুলো আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব পালনের প্রথম শর্ত হলো—আমরা নিজেদের ভুলগুলো স্বীকার করতে শিখি। যে জাতি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে না, সে জাতি কখনো নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে না।
শেষ প্রতিফলন
একটি জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু কখনো বাইরে থাকে না। সে থাকে ভেতরে—আমাদের লোভে, আমাদের অহংকারে, আমাদের বিভাজনে। মীর জাফরের রক্ত আজও আমাদের শিরায় বইছে, শুধু সে এখন কোট-টাই পরে ঘোরে।
কিন্তু আমরা যদি সচেতন হই, যদি প্রশ্ন করতে শিখি, যদি জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ওপরে রাখতে পারি—তাহলে হয়তো সেই রক্তকে আমরা বদলে দিতে পারব।
প্রশ্নটা আপনার কাছে: আপনি কি সেই পরিবর্তনের অংশ হতে চান, নাকি তামাশা দেখতে থাকা ভিড়ের একজন হয়ে থাকতে চান?
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#অধিকারপত্র #Odhikarpatra #বাংলাদেশ #Bangladesh #মীরজাফর #পলাশীরযুদ্ধ #ঋণেরফাঁদ #DebtTrap #সার্বভৌমত্ব #Sovereignty #রাজনৈতিকঅর্থনীতি #PoliticalEconomy #দুর্নীতি #Corruption #জাতীয়স্বার্থ #NationalInterest #নাগরিকসচেতনতা #CivicAwareness #ভূরাজনীতি #Geopolitics
