08/16/2026 আগস্টের রক্তাক্ত আয়না: মুসলিম ইতিহাসের ক্ষত, আত্মবিভাজন ও মানবতার ডাক (শেষ পর্ব)
Dr Mahbub
১৬ August ২০২৬ ০৫:৩৭
“শোক, কান্না ও বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট” ধারাবাহিকের পঞ্চম পর্বে প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর বিদায় থেকে ইয়ারমুক, কনস্টান্টিনোপল, উমাইয়া পতন, আল-মিহনা, বসরা, মানজিকার্ট, বায়তুল মুকাদ্দাস, মালাগা, অটোমান যুদ্ধ, আল-আকসা, মাজার-ই-শরিফ, ইরাক, মার্কালে, রাবা, গৌতা, সিনজার, রোহিঙ্গা ও কাবুল পর্যন্ত আগস্টের ক্ষতগুলো ইতিহাস, আত্মসমালোচনা ও মানবমর্যাদার আলোকে তুলে ধরা হয়েছে। এটি প্রতিশোধের ভাষ্য নয়; নির্ভুল স্মৃতি, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার এবং সব নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান।
আগস্টের আকাশে কখনো নক্ষত্র ঝরে, কখনো নতুন ফসলের সুবাস ওঠে। কিন্তু ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতা উল্টালে দেখা যায়—এই একই মাস মুসলিম বিশ্বের জন্য বহুবার ফিরে এসেছে বিদায়, পরাজয়, বিভাজন, আগুন, বিষাক্ত বাতাস ও উদ্বাস্তু মানুষের কান্না নিয়ে। কোথাও বিদায় নিয়েছেন ইসলামের প্রথম খলিফা; কোথাও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মুসলমানের হাতেই ঝরেছে মুসলমানের রক্ত। কোনো শহরের পতনের পর হাজারো মানুষকে দাস বানানো হয়েছে, কোনো মসজিদে ইবাদতরত মানুষের শরীর ছিন্নভিন্ন করেছে আত্মঘাতী বোমা, আবার কোনো জনপদে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর আক্রমণে একটি জনগোষ্ঠী হারিয়েছে তার জন্মভূমি।
প্রথমেই একটি জরুরি ঐতিহাসিক সতর্কতা প্রয়োজন। ইসলামি ইতিহাসের ধর্মীয় সময়গণনা হিজরি চান্দ্রবর্ষে, আর আগস্ট গ্রেগরীয় সৌরবর্ষের একটি মাস। হিজরি বছর সৌরবর্ষের চেয়ে প্রায় দশ-এগারো দিন ছোট বলে মহররম, রমজান, আশুরা ও অন্যান্য হিজরি তারিখ প্রতি বছর গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারে এগিয়ে আসে। অতএব কারবালার ট্র্যাজেডি, বাগদাদের মঙ্গোল ধ্বংস কিংবা গ্রানাডার পতনের মতো গভীর মুসলিম স্মৃতিকে কেবল আবেগের টানে স্থায়ীভাবে ‘আগস্টের ঘটনা’ বলা যায় না। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ঘটনার ক্ষেত্রে দিন বা সৈন্যসংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলে তা স্পষ্ট করা হয়েছে। কারণ ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসার প্রথম শর্ত তারিখকে সত্য রাখা; শোককে গভীর করতে অতিরঞ্জন লাগে না।
আগস্ট নিজে কোনো হত্যাকারী নয়। কোনো মাসের ভেতরে অমঙ্গল বাস করে না। মানুষের সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার লোভ, ঘৃণার প্রচার, প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা এবং অপরাধের দায়মুক্তিই ক্যালেন্ডারের নির্দোষ পাতাকে রক্তাক্ত করে। ফলে এই ইতিহাস পাঠের উদ্দেশ্য আগস্টকে ভয় পাওয়া নয়; বরং সেই রাজনৈতিক ও নৈতিক ব্যর্থতাগুলো চিনে নেওয়া, যেগুলো যে কোনো মাসকে কান্নার মাসে পরিণত করতে পারে।
মুসলিম ইতিহাসের আগস্ট-স্মৃতির সূচনায় হারানোর বেদনা প্রথমবারের মতো বড় হয়ে আসে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ইন্তেকাল। প্রাচীন ক্যালেন্ডার রূপান্তরের ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ আগস্ট মদিনায় ইন্তেকাল করেন ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। কোনো কোনো কালপঞ্জিতে ২২ আগস্ট উল্লেখ করা হলেও বহুল স্বীকৃত ঐতিহাসিক হিসাবে ২৩ আগস্টই তাঁর মৃত্যুর তারিখ। প্রচলিত হিসাবে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৩ বছর। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠতম সাহাবি, হিজরতের সঙ্গী, ইসলামের প্রথম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অনুসারীদের অন্যতম এবং জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির একজন হিসেবে মুসলিম সমাজে তাঁর মর্যাদা ছিল অনন্য।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম সমাজ যখন শোক, অনিশ্চয়তা ও বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কায় দিশাহারা, যখন ভুয়া নবুয়তের দাবি ও রাজনৈতিক বিদ্রোহ একসঙ্গে মাথা তুলেছিল, ঠিক তখন সেই অস্থির মুহূর্তে আবু বকর (রা.) দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দায়িত্ব নিয়েই সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন—মানুষ মুহাম্মদ (সা.) মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু আল্লাহ চিরঞ্জীব। তাঁর এই দৃঢ়তা ভেঙে পড়া সমাজকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। পরবর্তী সময়ে গোত্রীয় বিদ্রোহ, ধর্মত্যাগ এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব অস্বীকারের সংকট মোকাবিলা করে তিনি নবগঠিত মুসলিম রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন। তিনি ছিলেন মহানবী (সা.)-এর হিজরতের সঙ্গী, নির্যাতিত মানুষের মুক্তিদাতা, নিজের সম্পদ ইসলামের প্রয়োজনে বিলিয়ে দেওয়া একজন বিশ্বাসী এবং ক্ষমতায় থেকেও সাধারণ জীবনযাপনকারী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর প্রধান শক্তি ছিল নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা।
তাঁর মৃত্যু মুসলিম সমাজকে একটি নির্মম সত্যের সামনে দাঁড় করায়—মহান নেতাও স্থায়ী নন; স্থায়ী হওয়া উচিত ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, পরামর্শ, জবাবদিহি ও শান্তিপূর্ণ উত্তরাধিকারের সংস্কৃতি। তাঁর পরবর্তী তিন খলিফা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ফলে আবু বকর (রা.)-এর বিদায়কে শুধু আবেগে স্মরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রশ্ন করতে হয়: আমরা কি ব্যক্তিকে এত বড় করি যে প্রতিষ্ঠান ছোট হয়ে যায়? মতভেদকে কি শত্রুতায় পরিণত করি? ধর্মীয় মর্যাদাকে কি রাজনৈতিক প্রশ্নহীনতার ঢাল বানাই? প্রথম খলিফার সরল কবর যেন আজও বলে—ক্ষমতার আসন যত উঁচুই হোক, শেষ ঠিকানা মাটিই; তাই শাসনের আসল উত্তরাধিকার প্রাসাদ নয়, ন্যায়।
ইয়ারমুকের যুদ্ধ ৬৩৬ সালের আগস্টে কয়েক দিন ধরে রাশেদুন খিলাফত ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যে সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয় সিরিয়া ও লেভান্টের রাজনৈতিক ইতিহাস বদলে দেয়; সামরিক কৌশল ও নেতৃত্বের আলোচনায় খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নাম বিশেষভাবে আসে। মুসলিম ঐতিহাসিক স্মৃতিতে ইয়ারমুক তাই গৌরবের অধ্যায়। কিন্তু সংবাদপত্রের মানবিক ইতিহাস কেবল বিজয়ীর পতাকা গোনে না; পতাকার ছায়ায় পড়ে থাকা মৃতদেহ, আহত সৈনিক, অপেক্ষমাণ স্ত্রী, পিতৃহীন শিশু এবং জনপদের আতঙ্কও দেখে।
মধ্যযুগীয় বর্ণনায় উভয় পক্ষের সৈন্য ও হতাহতের সংখ্যা বিপুল এবং পরস্পরবিরোধী; আধুনিক ইতিহাসবিদেরা তাই নির্দিষ্ট বিশাল সংখ্যা ব্যবহারে সতর্ক। সংখ্যা যতই হোক, প্রতিটি মৃত্যু ছিল একটি পূর্ণ জীবন। যে বাইজেন্টাইন সৈনিক নিহত হয়েছিল, তার ঘরেও হয়তো মা অপেক্ষা করছিলেন; যে মুসলিম যোদ্ধা আর ফিরল না, তার শিশুও হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল। এই স্বীকৃতি বিজয়ের তাৎপর্য অস্বীকার করে না; বরং ইসলামের ন্যায়, সংযম ও মানবমর্যাদার দাবিকে গভীর করে। যুদ্ধ যদি কখনো অনিবার্য হয়ও, তাকে উৎসবে পরিণত করা বিপজ্জনক। বিজয় স্মরণ করতে হবে কৃতজ্ঞতায়, নিহতকে স্মরণ করতে হবে মানবতায়, আর শান্তিকে দেখতে হবে সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে।
৭১৭ সালের ১৫ আগস্ট উমাইয়া খিলাফতের বাহিনী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলকে ঘিরে দ্বিতীয় বৃহৎ অবরোধ শুরু করে। সেনাপতি মাসলামা ইবনে আবদুল মালিকের নেতৃত্বে পরিচালিত এই বিরাট স্থল ও নৌ-অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল দুর্ভেদ্য রাজধানীটি দখল করে উমাইয়া সাম্রাজ্যের সীমানা ইউরোপের আরও গভীরে সম্প্রসারিত করা। বিপুল সৈন্য, নৌবহর ও রসদ নিয়ে অভিযান শুরু হলেও কনস্টান্টিনোপলের শক্তিশালী প্রতিরক্ষাপ্রাচীর, বাইজেন্টাইন নৌশক্তি এবং ‘গ্রিক ফায়ার’ নামে পরিচিত ভয়ংকর অগ্নাস্ত্র উমাইয়া অগ্রযাত্রা রুদ্ধ করে দেয়।
অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে যুদ্ধক্ষেত্রের তলোয়ারের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে শীত, ক্ষুধা ও রোগ। অস্বাভাবিক প্রতিকূল আবহাওয়া, খাদ্যসংকট, দীর্ঘ ও বিচ্ছিন্ন সরবরাহপথ এবং বুলগার বাহিনীর আক্রমণে অবরোধকারী সৈন্যদের অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বহু জাহাজ গ্রিক ফায়ারে পুড়ে যায়; অসংখ্য সৈনিক যুদ্ধের পরিবর্তে অনাহার, অসুখ ও শীতের কাছে প্রাণ হারান। পরের বছর, ৭১৮ সালের ১৫ আগস্ট, অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। ফেরার পথেও ঝড়, সামুদ্রিক বিপর্যয় এবং বাইজেন্টাইন আক্রমণে উমাইয়া নৌবহর আরও ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
আব্বাসীয় বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্যায়ে ৭৫০ সালের জানুয়ারিতে জাবের যুদ্ধে উমাইয়া বাহিনী পরাজিত হলে শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান দ্বিতীয় সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অতিক্রম করে মিসরে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আব্বাসীয় বাহিনী তাঁকে অনুসরণ করে এবং ৭৫০ সালের ৬ আগস্ট মিসরের বুসির এলাকায় তাঁকে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে উমাইয়া খিলাফতের রাজনৈতিক শাসনের অবসান ঘটে; কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের এই অধ্যায় শুধু একজন পরাজিত খলিফার মৃত্যুতে শেষ হয়নি।
বিভিন্ন মধ্যযুগীয় বিবরণে দেখা যায়, আব্বাসীয় কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্মূল করতে উমাইয়া পরিবারের বহু পুরুষ সদস্যকে খুঁজে বের করে হত্যা করে। ক্ষমা ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক ভোজসভায় উমাইয়া সদস্যদের ডেকে এনে হত্যার যে কাহিনি ইতিহাসে ‘রক্তের ভোজ’ নামে পরিচিত, তা আব্বাসীয় বিজয়ের নির্মম প্রতিশোধপরায়ণ চরিত্রের প্রতীক হয়ে আছে। যুবরাজ আবদুর রহমান ইবনে মুয়াবিয়া প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে উত্তর আফ্রিকা হয়ে আন্দালুসে পৌঁছান এবং পরে কর্ডোবায় উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বেঁচে যাওয়া না হলে উমাইয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সেই স্পেনীয় অধ্যায়ও হয়তো রচিত হতো না।
ইসলামের ইতিহাসের ট্র্যাজেডি কেবল যুদ্ধক্ষেত্র, রাজপ্রাসাদ কিংবা রক্তাক্ত ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ ছিল না; কখনো জ্ঞান, বিশ্বাস ও বিবেকের জগতেও নেমে এসেছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ভারী স্টিমরোলার। আব্বাসীয় যুগে ‘পবিত্র কোরআন সৃষ্ট—নাকি আল্লাহর অনাদি ও অবিনশ্বর বাণী’—এই জটিল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ককে কেন্দ্র করে আলেম ও বিচারকদের ওপর যে রাষ্ট্রীয় মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ইতিহাসে তা ‘আল-মিহনা’—অর্থাৎ পরীক্ষা বা কঠিন পরীক্ষাকাল—নামে পরিচিত। এটি ছিল ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এমন এক অন্ধকার অধ্যায়, যখন কোনো তাত্ত্বিক মতের সত্যতা যুক্তি, গবেষণা ও মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত না হয়ে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছিল।
আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুনের শাসনামলে গ্রিক দর্শন ও যুক্তিবাদী ধর্মতত্ত্বের প্রভাবে মুতাজিলা চিন্তাধারা রাজদরবারে বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। ২১৮ হিজরি বা ৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করেন, কোরআন আল্লাহর সৃষ্টি বা ‘মাখলুক’। প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কাজি ও প্রভাবশালী আলেমদের এই মত স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। যাঁরা তা মানতে অস্বীকৃতি জানান, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ, পদচ্যুতি, কারাবাস, শিকলবন্দিত্ব ও শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়। আল-মামুনের মৃত্যুর পরও খলিফা আল-মুতাসিম ও আল-ওয়াসিকের সময়ে এই নিপীড়ন অব্যাহত ছিল। অবশেষে আল-মুতাওয়াক্কিলের শাসনামলে, আনুমানিক ৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে, রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া এই ধর্মতাত্ত্বিক পরীক্ষা বন্ধ হয়। প্রায় পনেরো বছর স্থায়ী আল-মিহনা মুসলিম জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে দেখিয়ে দেয়—রাষ্ট্র যখন কোনো ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকে একমাত্র সত্য ঘোষণা করে, তখন ধর্মের মর্যাদা রক্ষিত হয় না; বরং চিন্তার স্বাধীনতা, আলেমের বিবেক এবং জ্ঞানের স্বাভাবিক বিকাশই বিপন্ন হয়ে পড়ে।
হাদিস সংগ্রহ ও জ্ঞানার্জনের জন্য তিনি কুফা, বসরা, মক্কা, মদিনা, ইয়েমেন, দামেস্ক এবং মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন জ্ঞানকেন্দ্রে দীর্ঘ সফর করেন। সীমিত সামর্থ্য, কঠিন যাত্রাপথ ও অনিশ্চিত জীবিকার মধ্যেও তাঁর অনুসন্ধান থামেনি। তিনি ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর কাছ থেকে ফিকহ অধ্যয়ন করেন এবং তাঁদের মধ্যে জ্ঞানগত শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক আদান-প্রদানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ইমাম আহমদের বিদ্যাবত্তা সম্পর্কে তাঁর সমসাময়িক ও পরবর্তী জীবনীকারেরা অসংখ্য প্রশংসামূলক বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন। ইবরাহিম আল-হারবি তাঁকে ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় সমৃদ্ধ এক বিরল মনীষী হিসেবে স্মরণ করেছেন। কুতাইবা ইবনে সাঈদের নামে প্রচলিত বর্ণনায় তাঁকে সুফিয়ান আল-সাওরি, আল-আওজায়ি, ইমাম মালিক ও লাইস ইবনে সাদের মতো পূর্ববর্তী মহান আলেমদের উত্তরসূরি হিসেবে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
এখানে তাঁর অবস্থানের তাৎপর্য শুধু ‘কোরআন সৃষ্টি কি না’—এই ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়। আরও গভীর প্রশ্ন ছিল: কোনো শাসক কি রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে বিশ্বাসের ব্যাখ্যা নির্ধারণ করতে পারেন? কোনো আলেমকে কি কারাগার ও চাবুকের ভয় দেখিয়ে একটি তাত্ত্বিক মত গ্রহণে বাধ্য করা যায়? ইমাম আহমদের প্রতিরোধ এই প্রশ্নের ঐতিহাসিক উত্তর হয়ে আছে—জ্ঞানকে আদেশ দিয়ে সৃষ্টি করা যায় না, আর বিশ্বাসকে নির্যাতনের মাধ্যমে সত্যে পরিণত করা যায় না। রাষ্ট্র যখন চিন্তার অভিভাবক না হয়ে চিন্তার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে, তখন ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা প্রাণ হারায় এবং আলেম শাসকের বিবেক না হয়ে দরবারের প্রতিধ্বনিতে পরিণত হন।
২৪১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল, অধিক গ্রহণযোগ্য গ্রেগরীয় রূপান্তর অনুযায়ী ৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ২ আগস্ট, বাগদাদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ইন্তেকাল করেন—৩১ আগস্ট নয়। তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৪ বা ৭৫ বছর। তাঁর মৃত্যু মুসলিম হাদিস, ফিকহ ও ধর্মতাত্ত্বিক জ্ঞানচর্চায় এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করে। তাঁর জানাজায় অগণিত মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়ে ঐতিহাসিক ঐকমত্য থাকলেও আট লাখ পুরুষ, ষাট হাজার নারী এবং সেদিনই বিশ হাজার অমুসলিমের ইসলাম গ্রহণের যে বিপুল সংখ্যা পরবর্তী জীবনীসাহিত্যে পাওয়া যায়, সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নয়। তাই সংখ্যাগুলোকে নিশ্চিত পরিসংখ্যান না বলে তাঁর অসাধারণ জনপ্রিয়তা বোঝাতে ব্যবহৃত ঐতিহ্যগত বর্ণনা হিসেবেই দেখা সমীচীন।
৯২৩ সালের ১১ আগস্ট রাতের অন্ধকারে বাহরাইনভিত্তিক কারামাতীয়দের প্রায় ১,৭০০ সদস্যের একটি দ্রুতগামী বাহিনী আব্বাসীয় খিলাফতের সমৃদ্ধ বন্দরনগরী বসরায় আক্রমণ চালায়। আবু তাহির আল-জান্নাবির নেতৃত্বাধীন বাহিনী মই ব্যবহার করে নগরপ্রাচীর অতিক্রম করে, প্রহরীদের পরাস্ত করে এবং ফটক এমনভাবে অবরুদ্ধ করে দেয় যাতে নগরের প্রতিরোধকারীরা সহজে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে না পারেন। প্রথমে অনেকে ঘটনাটিকে একটি সাধারণ বেদুইন লুণ্ঠন অভিযান ভেবেছিলেন; সেই ভুল অনুমানের সুযোগেই আক্রমণকারীরা দ্রুত শহরের ভেতরে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে।
বসরার স্থানীয় শাসক সাবুক আল-মুফলিহি সীমিত সৈন্য নিয়ে প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিহত হন। ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বন্দী ও দাসে পরিণত করার কথা পাওয়া যায়। সামরিক প্রতিরোধ ভেঙে পড়ার পর নিরস্ত্র সৈনিক ও সাধারণ নাগরিকের ওপর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। এরপর টানা সতেরো দিন, ২৮ আগস্ট পর্যন্ত, নগরীতে লুণ্ঠন চলে। ধনসম্পদ, অস্ত্র ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বহু নারী, শিশু ও সাধারণ অধিবাসীকে বন্দী করে দাস হিসেবে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। আব্বাসীয় সাহায্যকারী বাহিনী যখন পৌঁছায়, ততক্ষণে আক্রমণকারীরা বিপুল লুণ্ঠিত সম্পদ ও বন্দী নিয়ে বসরা ত্যাগ করেছে। ঘটনাটির সময়কাল, আক্রমণকারী বাহিনীর আনুমানিক শক্তি এবং লুণ্ঠনের বিবরণ আধুনিক গবেষণায়ও আলোচিত হয়েছে।
বসরার সতেরো দিনের তাণ্ডব আব্বাসীয় রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দুর্বলতা, গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং দূরবর্তী প্রদেশ রক্ষায় অক্ষমতা প্রকাশ করে। মাত্র প্রায় ১,৭০০ আক্রমণকারী কীভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরীকে এত দিন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে লুণ্ঠন করতে পেরেছিল—এই প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের গভীরতা বোঝায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি নৈতিক: মুসলমানের পরিচয় বহনকারী একটি বাহিনী কীভাবে মুসলিম নারী-শিশুকে দাসে পরিণত করল? বসরার ধ্বংস তাই বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়; মুসলিম সমাজের ভেতরের উগ্রতা, ক্ষমতালোভ ও মানবিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধে এক নির্মম অভিযোগ।
১০৭১ সালের ২৬ আগস্ট মানজিকার্টের যুদ্ধে সেলজুক সুলতান আলপ আরসালানের বাহিনী বাইজেন্টাইন সম্রাট রোমানোস চতুর্থের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে এবং সম্রাট বন্দী হন। আনাতোলিয়ায় তুর্কি উপস্থিতি বিস্তারের ইতিহাসে এটি বড় মোড়। পরবর্তী জনপ্রিয় বর্ণনায় যুদ্ধটিকে কখনো বাইজেন্টাইন পতনের একমাত্র কারণ, কখনো ক্রুসেডের সরাসরি সূচনা হিসেবে দেখানো হয়। বাস্তবতা বেশি জটিল: যুদ্ধ-পরবর্তী বাইজেন্টাইন গৃহসংঘাত, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ধীরে ধীরে ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বদল বৃহত্তর পরিবর্তন ঘটায়।
এই বিজয়ের মানবিক স্মৃতিতে আলপ আরসালানের বন্দী সম্রাটের প্রতি তুলনামূলক সংযত আচরণের বর্ণনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিজিতকে অপমান ও হত্যা না করে সমঝোতার পথে যাওয়া—যদিও বিবরণের অলংকার ও উৎসভেদ আছে—ক্ষমতার মুহূর্তে সংযমের একটি নৈতিক প্রতীক হয়ে আছে। কিন্তু এর পরবর্তী অস্থিরতা অসংখ্য জনপদের জীবন বদলে দেয়। তাই মানজিকার্টকে কেবল তলোয়ারের গৌরব হিসেবে নয়, বিজয়ের পর শান্তি নির্মাণের দায়িত্ব হিসেবেও পড়তে হবে। শত্রুকে হারানো সহজ; শত্রুতাকে হারানো কঠিন। যুদ্ধ জয়ের পর যদি ন্যায়ভিত্তিক সহাবস্থান তৈরি না হয়, তবে বিজয়ের বীজ থেকেই পরবর্তী সংঘাত জন্ম নেয়।
প্রথম ক্রুসেডের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় রচিত হয় ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই, প্রায় পাঁচ সপ্তাহের অবরোধ শেষে ক্রুসেডার বাহিনী জেরুজালেম দখল করার পর। নগরীর প্রতিরোধ ভেঙে পড়লে মুসলমান ও ইহুদি অধিবাসীদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। অসংখ্য মানুষ প্রাণ বাঁচাতে আল-আকসা মসজিদ, কুব্বাতুস সাখরা ও নগরীর ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন; কিন্তু পবিত্র প্রাঙ্গণও তাঁদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। নারী, শিশু, ধর্মীয় সাধক, আলেম ও সাধারণ নাগরিকের রক্তে জেরুজালেমের পথ ও উপাসনালয় রঞ্জিত হয়। ইহুদি অধিবাসীদের একটি অংশ সিনাগগে আশ্রয় নিয়েও অগ্নিসংযোগ ও হত্যার শিকার হন।
ক্রুসেডার ইতিহাসলেখক রেমন্ড অব আগুইলার্স আল-আকসা ও টেম্পল মাউন্ট এলাকায় হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতা বোঝাতে রক্তের মধ্যে ঘোড়া চলার বিভীষিকাময় চিত্র ব্যবহার করেছেন। তাঁর বর্ণনায় রক্ত ঘোড়ার হাঁটু ও লাগাম পর্যন্ত উঠেছিল; আর গেস্তা ফ্রাঙ্কোরাম–এ যোদ্ধাদের গোড়ালি পর্যন্ত রক্তে চলার কথা পাওয়া যায়। এই বাক্য ইবনে আল-আসিরের নয়। আধুনিক ইতিহাসবিদেরা একে আক্ষরিক পরিমাপের পরিবর্তে মধ্যযুগীয় যুদ্ধসাহিত্যের ধর্মীয় ও প্রতীকী অতিশয়োক্তি হিসেবে দেখেন। অর্থাৎ রক্ত সত্যিই হাঁটুসমান জমেছিল—এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাসসম্মত নয়; কিন্তু বর্ণনাটি হত্যাকারীদের উন্মত্ততা এবং ঘটনার মানসিক অভিঘাতের একটি শক্তিশালী দলিল।
জেরুজালেম প্রায় ৮৮ বছর মুসলিম রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। ১১৮৭ সালে হিত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করার পর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি নগরী পুনরুদ্ধার করেন। ১০৯৯ সালের হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি জীবন্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি সাধারণ খ্রিষ্টান অধিবাসীদের বিরুদ্ধে সমপর্যায়ের নির্বিচার প্রতিশোধমূলক হত্যাযজ্ঞ চালাননি। অধিকাংশকে মুক্তিপণ বা নির্ধারিত শর্তে নিরাপদে নগরী ত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়; দরিদ্র ও অসহায় বহু মানুষের মুক্তির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। জেরুজালেমের ইতিহাসে এই দুই বিপরীত আচরণ দেখায়—বিজয়ীর প্রকৃত মহত্ত্ব প্রতিপক্ষের রক্তে নয়, প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সংযম প্রদর্শনে।
আন্দালুসের শেষ যুগে মালাগা ছিল গ্রানাডা আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। ১৪৮৭ সালে কাস্তিল ও আরাগনের যৌথ বাহিনী দীর্ঘ অবরোধের পর ১৮ আগস্ট শহরটি দখল করে। অবরুদ্ধ নগরে খাদ্যাভাব, রোগ ও ভয়ের সঙ্গে প্রতিরোধ চলেছিল। আত্মসমর্পণের পর বহু অধিবাসীকে দাসত্ব, বন্দিত্ব বা স্থানচ্যুতির মুখে পড়তে হয়—যদিও কার ভাগ্যে কী ঘটেছিল, সামাজিক অবস্থান ও আলোচনার শর্তভেদে তা এক ছিল না। মালাগার পতন ১৪৯২ সালে গ্রানাডার চূড়ান্ত পতনের পথে একটি বড় দরজা খুলে দেয়।
আন্দালুস নিয়ে মুসলিম আবেগে হারানো সভ্যতার সৌন্দর্য—কর্ডোবার পাঠাগার, স্থাপত্য, বিজ্ঞান, কবিতা ও বহু সংস্কৃতির সহাবস্থান—প্রবলভাবে উপস্থিত। কিন্তু শুধু হারানো গৌরবের বিলাপ যথেষ্ট নয়। অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ক্ষুদ্র রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ক্ষমতার সংকীর্ণতা এবং পরিবর্তিত সামরিক বাস্তবতা বুঝতে না পারাও পতনের পটভূমি তৈরি করেছিল। মালাগার বন্দর থেকে শিকলে বাঁধা মানুষের সারি আমাদের শেখায়, সভ্যতা কেবল প্রাসাদে টেকে না; ন্যায়, ঐক্য, জ্ঞান, দূরদর্শিতা ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তায় টেকে। অতীতের স্থাপত্য নিয়ে অহংকার করে বর্তমানের দুর্বলকে অবহেলা করলে আন্দালুসের পাঠ শেখা হয় না।
১৫১৬ সালের ২৪ আগস্ট মারজ দাবিকের যুদ্ধে অটোমান সুলতান প্রথম সেলিম মামলুক বাহিনীকে পরাজিত করেন। সিরিয়া এবং পরে মিসরের ওপর অটোমান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ খুলে যায়। দশ বছর পর ১৫২৬ সালের ২৯ আগস্ট মোহাচের যুদ্ধে সুলতান সুলেমানের বাহিনী হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় লুইয়ের বাহিনীকে পরাজিত করে; রাজা পলায়নের সময় মারা যান এবং মধ্য ইউরোপের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আসে। মুসলিম সাম্রাজ্যিক ইতিহাসে এগুলো শক্তি ও সম্প্রসারণের উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে লেখা হয়।
কিন্তু সাম্রাজ্যের মানচিত্র যত বড় হয়, মানুষের নিরাপত্তা সব সময় তত বড় হয় না। যুদ্ধক্ষেত্রের দ্রুত বিজয়ের পর আসে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, কর, সম্পত্তির হাতবদল, বন্দিত্ব, পরিবার বিচ্ছেদ এবং নতুন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। বিজয়ী পক্ষের ভালো শাসন ও ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ থাকলেও যুদ্ধের ক্ষত অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাসের পরিণত পাঠক তাই একই সঙ্গে দুই সত্য ধারণ করেন: এসব বিজয় নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পথ খুলেছিল; আবার বহু মানুষের জীবন কেড়ে ও বদলে দিয়েছিল। গৌরব যদি নিহতের মুখ ভুলিয়ে দেয়, তবে তা শিক্ষা নয়—অহংকার।
১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের মূল নামাজকক্ষ—আল-কিবলি মসজিদে—অগ্নিসংযোগ করেন অস্ট্রেলীয় নাগরিক ডেনিস মাইকেল রোহান। আগুন দ্রুত দক্ষিণ-পূর্ব অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং কাঠের ছাদসহ ঐতিহাসিক স্থাপনার বড় অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে অপূরণীয় ক্ষতি ছিল শতাব্দীপ্রাচীন মিম্বারে নূরুদ্দিন বা মিম্বারে সালাহউদ্দিন সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া।
এখানে ইতিহাসের একটি সূক্ষ্ম সংশোধন প্রয়োজন। মিম্বরটি সুলতান সালাহউদ্দিন নিজে নির্মাণ করেননি। জাঙ্গি শাসক নূরুদ্দিন মাহমুদ ১২শ শতাব্দীতে জেরুজালেম মুক্ত হওয়ার প্রত্যাশায় আলেপ্পোয় অসাধারণ কারুকাজে এটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের পর মিম্বরটি আল-আকসায় এনে স্থাপন করেন। ফলে এটি নূরুদ্দিনের স্বপ্ন ও সালাহউদ্দিনের বিজয়—দুই ঐতিহাসিক স্মৃতির সম্মিলিত প্রতীক ছিল। ১৯৬৯ সালের আগুনে সেই প্রায় আট শতাব্দী পুরোনো শিল্পকর্ম ছাই হয়ে যায়। জর্ডানের হাশেমি রাজপরিবারের তত্ত্বাবধানে পরে এর একটি সুদক্ষ প্রতিরূপ নির্মাণ করে ২০০৭ সালে আল-আকসায় স্থাপন করা হয়।
বসনিয়া যুদ্ধ ইউরোপের মাটিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিপীড়ন, অবরোধ ও গণহত্যার এক ভয়াবহ স্মৃতি। ১৯৯৫ সালের ২৮ আগস্ট সারায়েভোর মার্কালে বাজার এলাকায় মর্টার হামলায় ৪৩ জন নিহত এবং ৭৫ জন আহত হন—পরবর্তী আন্তর্জাতিক বিচারিক নথিতে এমন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; কিছু প্রাথমিক প্রতিবেদনে সংখ্যা সামান্য ভিন্ন ছিল। বাজার ছিল সামরিক ঘাঁটি নয়—মানুষ সেখানে খাদ্য কিনতে, পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করতে গিয়েছিল। এক মুহূর্তে দৈনন্দিন জীবন রক্তাক্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সারায়েভোর বেসামরিক মানুষের ওপর স্নাইপার ও গোলাবর্ষণের দীর্ঘ সন্ত্রাসকে বিচারিকভাবে বিশ্লেষণ করে। আদালতের ভাষ্যে, শহরে এমন কোনো নিরাপদ জায়গা ছিল না যেখানে মানুষ নিশ্চিন্ত থাকতে পারত। মার্কালে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাজার, হাসপাতাল, স্কুল বা উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু বানানো কেবল সামরিক অপরাধ নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার ধ্বংসের পরিকল্পিত কৌশল।
বসনিয়ার ক্ষত মুসলমানদের জন্য বিশেষ স্মৃতি হলেও এর শিক্ষা সর্বজনীন: ঘৃণামূলক ভাষা, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার এবং প্রতিবেশীকে ‘অন্য’ বানানোর রাজনীতি কখনো হঠাৎ গণহত্যায় পৌঁছায় না; দীর্ঘদিনের অবমাননা, মিথ্যাচার ও দায়মুক্তি তার পথ তৈরি করে। তাই গণহত্যা প্রতিরোধ শুরু হয় ভাষা থেকে—মানুষকে অমানুষ বলার প্রথম বাক্যটির প্রতিবাদ দিয়ে।
আফগানিস্তানের মাজার-ই-শরিফ ১৯৯৮ সালের ৮ আগস্ট তালেবানের দখলে যাওয়ার পর হাজারা জনগোষ্ঠী ও শিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো হাজারো মানুষের মৃত্যুর কথা নথিবদ্ধ করেছে; সুনির্দিষ্ট সংখ্যা অনিশ্চিত। ঘরে ঘরে তল্লাশি, রাস্তায় আটক, পরিচয় দেখে হত্যা এবং ইরানি কূটনীতিকদের মৃত্যুর ঘটনা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ায়। জাতিগত পরিচয়, ধর্মীয় মতভেদ ও যুদ্ধের প্রতিশোধ একসঙ্গে একটি নগরকে মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত করে।
এই ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে কেবল বাইরের শক্তির হাতে মুসলমানের নির্যাতন নিয়ে কথা বলা নৈতিকভাবে অসম্পূর্ণ। হাজারা শিশুর রক্তও মুসলিম ইতিহাসের রক্ত; শিয়া মায়ের কান্না সুন্নি মায়ের কান্নার চেয়ে কম পবিত্র নয়। ইসলামের ভেতরের মতভেদকে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার লাইসেন্স বানানো বিশ্বাসের প্রতি চরম অবমাননা। মাজার-ই-শরিফ আমাদের বাধ্য করে জিজ্ঞেস করতে: আমরা কি উম্মাহ বলতে কেবল নিজের মতের মানুষকে বুঝি? যদি তা-ই হয়, তবে ভ্রাতৃত্বের ভাষা মুখে আছে, হৃদয়ে নেই।
২০০৩ সালের ২৯ আগস্ট নাজাফে ইমাম আলীর মাজারের কাছে গাড়িবোমা বিস্ফোরণে আয়াতুল্লাহ মুহাম্মদ বাকির আল-হাকিমসহ বহু মানুষ নিহত হন। বিদেশি দখল, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পতন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ইরাককে এমন এক অন্ধকারে ঠেলে দেয়, যেখানে মাজার, জানাজা, বাজার ও মসজিদও নিরাপদ ছিল না। আট বছর পর ২০১১ সালের ২৮ আগস্ট বাগদাদের উম্মুল কুরা মসজিদে রমজানের সময় আত্মঘাতী হামলায় বহু মুসল্লি নিহত হন। মানুষ নামাজে দাঁড়িয়েছিল, কেউ হয়তো ইফতারের পর কোরআন পড়ছিল, কেউ পরিবারের জন্য দোয়া করছিল—সেখানেই বিস্ফোরণ তাদের দেহ ছিন্ন করে।
পবিত্র স্থানকে হামলার মঞ্চ বানানো কেবল মানুষ হত্যা নয়; বিশ্বাসের নিরাপদ আশ্রয়কেও ভেঙে দেওয়া। যে হামলাকারী আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে আল্লাহর ঘরে নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে, সে রাজনৈতিক লক্ষ্য যাই বলুক, তার কাজ ইসলামের প্রাণরক্ষার নীতির বিপরীত। ইরাকের এই আগস্টগুলো দেখায়, বিদেশি হস্তক্ষেপ ও দখল যেমন সমাজ ভাঙে, তেমনি অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সেই ভাঙনকে দীর্ঘস্থায়ী করে। কেবল বাইরের ষড়যন্ত্র বলে নিজেদের দায় মুছে ফেলা যায় না; ঘৃণার বক্তা, অর্থদাতা, অস্ত্রবাহক এবং নীরব সমর্থক—সবার দায় আছে।
২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট কায়রোর রাবা আল-আদাবিয়া ও নাহদা স্কয়ারে অবস্থানরত সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সরাতে মিসরের নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানে শুধু রাবা স্কয়ারেই অন্তত ৮১৭ জন এবং সম্ভবত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার কথা বলা হয়; সরকারি ও অন্যান্য হিসাবে সংখ্যা ভিন্ন। ঘটনাটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিভাজন থাকলেও একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না—ঘনবসতিপূর্ণ অবস্থানস্থলে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার অসংখ্য পরিবারকে মুহূর্তে শোকাহত করে এবং রাষ্ট্রের বৈধতা ও মানবাধিকারের ওপর গভীর প্রশ্ন তোলে।
রাবার শিক্ষা কোনো দলকে নিষ্পাপ ঘোষণা করা নয়; বরং রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র থাকলেও নাগরিকের প্রাণকে অবজ্ঞা করার অধিকার নেই। রাজনৈতিক মতভেদ যখন প্রতিপক্ষকে “নির্মূলযোগ্য” শত্রুতে পরিণত করে, তখন মসজিদের আজান, হাসপাতালের করিডর ও মায়ের আর্তনাদও ক্ষমতার হিসাবের নিচে চাপা পড়ে। মুসলিম সমাজের ক্ষতি হয় দ্বিমুখী—একদিকে জীবনহানি, অন্যদিকে ন্যায়বিচার ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা পরিবর্তনের ওপর আস্থা ভেঙে যায়।
সিরিয়ার গৌতায় ২০১৩ সালের ২১ আগস্টের রাসায়নিক হামলা আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে শীতল দৃশ্যগুলোর একটি। জাতিসংঘের তদন্তে আইন তারমা, মোয়াদামিয়া ও জামালকা এলাকায় সারিন বহনকারী ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য রকেট ব্যবহারের ‘স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ’ পাওয়া যায়। পরীক্ষিত রক্তের ৮৫ শতাংশ নমুনায় সারিনের উপস্থিতি ধরা পড়ে; পরিবেশগত নমুনা ও রকেটের ধ্বংসাবশেষেও একই স্নায়ুবিষের প্রমাণ মেলে। জাতিসংঘ হতাহতের পূর্ণ সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি, তবে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত ও আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
সেদিন মানুষ গোলাবর্ষণ থেকে বাঁচতে বেজমেন্ট ও নিচতলায় আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু ভারী বিষাক্ত গ্যাস নিচু স্থানে জমে গিয়ে আশ্রয়কক্ষকেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত করে। অনেকের শরীরে বাহ্যিক আঘাত ছিল না; হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, বমি, খিঁচুনি ও অচেতনতা—তারপর মৃত্যু। চিকিৎসক ও উদ্ধারকারীরা একসঙ্গে অসংখ্য নিথর শরীর দেখেছেন। যুদ্ধের প্রচলিত শব্দ—গুলি, বিস্ফোরণ, আগুন—এখানে যেন অনুপস্থিত; ছিল নিঃশব্দে শ্বাস কেড়ে নেওয়া মৃত্যু।
রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ। কিন্তু গৌতার শিক্ষা আরও বড়: কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় বেসামরিক মানুষ হত্যাকে বৈধ করে না। যুদ্ধক্ষেত্রে সত্য প্রায়ই প্রচারণার শিকার হয়; তাই স্বাধীন তদন্ত, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং জবাবদিহি অত্যন্ত জরুরি। শিশু কোন পক্ষের, মা কোন মতাদর্শের—সারিন তা জিজ্ঞেস করে না। মানবিক আইনও তাই পক্ষ দেখে না।
মুসলিম ইতিহাসের ক্ষত বলতে শুধু মুসলমানের ক্ষত বোঝালে ইতিহাস ও নৈতিকতা দুটোই সংকুচিত হয়। ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট তথাকথিত ইসলামিক স্টেট ইরাকের সিনজার অঞ্চলে ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ চালায়। হাজারো মানুষ নিহত বা অপহৃত হন; নারী ও কিশোরীদের যৌনদাসত্বে বাধ্য করা হয়; অসংখ্য পরিবার সিনজার পাহাড়ে পানি ও খাদ্যহীন অবস্থায় আটকে পড়ে। জাতিসংঘের তদন্তে এই অপরাধকে ইয়াজিদিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অপরাধীরা ইসলামের নাম ব্যবহার করেছিল, কিন্তু তাদের দাসত্ব, ধর্ষণ, হত্যা ও জবরদস্তি ইসলামের ন্যায় ও করুণার সম্পূর্ণ বিপরীত।
এই ঘটনা মুসলমানের জন্য বিশেষ আত্মসমালোচনার জায়গা। ‘ওরা মুসলমান নয়’ বলে ইয়াজিদিদের যন্ত্রণা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না; আবার ‘অপরাধীরা প্রকৃত মুসলমান নয়’ বলেই দায় শেষ হয় না। ধর্মের নাম অপহৃত হলে তাকে কেবল বক্তব্যে ফেরানো যায় না—নিপীড়িতকে রক্ষা, অপরাধীর বিচার, বিদ্বেষমূলক ব্যাখ্যার প্রতিরোধ এবং বেঁচে ফেরা নারী-শিশুর মর্যাদা পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে ফেরাতে হয়। কোনো সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা মুসলিম সমাজের জন্য দয়া নয়; এটি ঈমান, নাগরিকতা ও মানবতার পরীক্ষা।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রাখাইনে যে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করে, তা দ্রুত গ্রাম পোড়ানো, নির্বিচার হত্যা, গণধর্ষণ ও ব্যাপক বিতাড়নে রূপ নেয়। জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্যানুসন্ধানী মিশন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিপ্রায় তদন্ত ও বিচারের সুপারিশ করে। মেডসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের প্রথম মাসেই অন্তত ৬,৭০০ রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার অনুমান দেয়, যাদের মধ্যে ছোট শিশুও ছিল। কয়েক মাসে সাত লাখের বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়; আগের ঢলসহ বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা পরে দশ লাখ ছাড়ায়। তাই ‘এক মাসে দশ লাখ পালিয়েছে’—এমন প্রচলিত বাক্য সঠিক নয়; সময়সীমা ও মোট জনসংখ্যা আলাদা করে দেখা জরুরি।
সেদিন নাফ নদী কেবল দুই দেশের সীমান্ত ছিল না; জীবন ও মৃত্যুর মাঝের সরু জলরেখা ছিল। কেউ গুলিবিদ্ধ শিশুকে কোলে নিয়ে নৌকায় উঠেছেন, কেউ জঙ্গলে সন্তান প্রসব করেছেন, কেউ বৃদ্ধ বাবা-মাকে ফেলে আসার অপরাধবোধ নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাংলাদেশে পৌঁছেছেন। কক্সবাজারের কাদামাটিতে বাঁশ ও ত্রিপলের ঘর উঠেছে, কিন্তু ঘর মানেই স্বদেশ নয়। শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশু মিয়ানমারের গ্রামের গল্প শোনে, অথচ সেই মাটি কখনো দেখেনি। তার পরিচয় একটি কার্ডে, চলাচল কাঁটাতারে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় আটকে আছে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ প্রথম দিকে ভাত, কাপড়, আশ্রয় ও সান্ত্বনা ভাগ করে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু দীর্ঘ সংকট স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপও সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতা স্বীকার করা রোহিঙ্গাবিরোধিতা নয়। সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন; নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করা; অপরাধের বিচার; এবং বাংলাদেশের বোঝা ন্যায়সংগতভাবে ভাগ করে নেওয়া। জোর করে অনিরাপদ স্থানে ফেরত পাঠানো যেমন অনৈতিক, তেমনি অনির্দিষ্টকাল শিবিরে বন্দী জীবনও কোনো সমাধান নয়।
২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্রুত পালাবদলের পর হাজারো মানুষ কাবুল বিমানবন্দরের দিকে ছুটেছিল। ২৬ আগস্ট অ্যাবি গেটের কাছে আত্মঘাতী বোমা হামলায় বিপুলসংখ্যক আফগান বেসামরিক মানুষ এবং ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হন। নিহত আফগানদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে উৎসভেদ আছে, কিন্তু দৃশ্যটি অমোচনীয়: হাতে কাগজপত্র, কোলে শিশু, বিদেশগামী বিমানে ওঠার ক্ষীণ আশা—তার মাঝখানে বিস্ফোরণ। যারা দেশ ছাড়তে চেয়েছিল, সবাই কোনো এক রাজনৈতিক পক্ষের দালাল ছিল না; কেউ নারীশিক্ষার কর্মী, কেউ অনুবাদক, কেউ সাংবাদিক, কেউ কেবল সন্তানের নিরাপত্তা চাওয়া অভিভাবক।
আফগানিস্তানের ইতিহাসে বিদেশি আগ্রাসন, প্রক্সি যুদ্ধ, সশস্ত্র মতাদর্শ, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক শক্তির খেলা সাধারণ মানুষকে বারবার মূল্য দিতে বাধ্য করেছে। কাবুল বিমানবন্দরের হামলা দেখায়, সাম্রাজ্য ও সরকারের পতনের বিশ্লেষণের মাঝখানে মানুষ কত সহজে হারিয়ে যায়। ‘কে জিতল’ প্রশ্নের আগে তাই জিজ্ঞেস করা উচিত—কে বাঁচল, কে দেশ হারাল, কার স্কুল বন্ধ হলো, কার কণ্ঠ স্তব্ধ হলো? রাজনৈতিক বিজয় যদি নাগরিককে বিমানবন্দরের নর্দমায় দাঁড়িয়ে জীবনের ভিক্ষা চাইতে বাধ্য করে, সেই বিজয়ের নৈতিকতা কোথায়?
এই ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি সরল ‘মুসলমান বনাম অন্যরা’ গল্প পাওয়া যায় না। বরং ইতিহাস অনেক বেশি কঠিন। কোথাও মুসলিম রাষ্ট্র বহিরাগত শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে, কোথাও মুসলমান জাতিগত নিপীড়নের শিকার, কোথাও মুসলমানের হাতেই মসজিদে মুসলমান নিহত, কোথাও রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সাধারণ মানুষের শ্বাস কেড়ে নিয়েছে। অর্থাৎ মুসলিম ইতিহাসের ক্ষত কেবল বাইরের শত্রু দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অদূরদর্শী নেতৃত্ব, সাম্প্রদায়িকতা, জ্ঞানবিমুখতা, দায়মুক্তি এবং ক্ষমতার লোভও সমানভাবে দায়ী।
হজরত আবু বকর (রা.)–এর জীবন ঐক্য, ত্যাগ ও দায়িত্বশীল উত্তরাধিকারের শিক্ষা দেয়। কনস্টান্টিনোপলের ব্যর্থতা অযৌক্তিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও দুর্বল রসদের মূল্য দেখায়। মানজিকার্ট বিজয়ের সময় সংযমের সম্ভাবনা মনে করায়। মালাগা সভ্যতার ভঙ্গুরতা শেখায়। দেশভাগ বলে—ধর্মের নামে আঁকা সীমান্তও ন্যায়, ভাষা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মর্যাদার প্রশ্ন মেটাতে পারে না। বসনিয়া দেখায় ঘৃণামূলক ভাষা কীভাবে হত্যার প্রস্তুতি নেয়। বাগদাদের মসজিদ বলে উগ্রতা নিজের ঘরও পুড়িয়ে দেয়। গৌতা জানায় আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগহীন হলে নিষিদ্ধ অস্ত্রও ফিরে আসে। আর রোহিঙ্গা সংকট আমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে—মানবতা কি কেবল আবেগ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব?
বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস বহুমাত্রিক। এখানে পলাশীর পরাধীনতা আছে, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম আছে, পাকিস্তান আন্দোলন আছে, ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ আছে, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার অসমাপ্ত লড়াই আছে। তাই বিশ্ব মুসলিম ইতিহাসের কোনো ক্ষতকে বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনুবাদ করতে হলে আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলো প্রয়োজন। অন্ধ অনুকরণ বা উত্তেজনামূলক স্লোগান নয়—প্রয়োজন জ্ঞান, ন্যায় ও বিবেক।
আগস্ট শেষে বর্ষার পানি শুকিয়ে যায়, কিন্তু ইতিহাসের ক্ষত নিজে থেকে শুকায় না। মদিনায় প্রথম খলিফার সরল বিদায় ক্ষমতার অনিত্যতা শেখায়; ইয়ারমুক ও মানজিকার্ট বিজয়ের মানবিক মূল্য মনে করায়; কনস্টান্টিনোপল ব্যর্থ উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপদ দেখায়; মালাগা ও দেশভাগ হারানো স্বদেশের ব্যথা বোঝায়; আল-আকসা পবিত্রতার পারস্পরিক দায়িত্ব শেখায়; মাজার-ই-শরিফ ও ইরাক ভ্রাতৃঘাতী ঘৃণার মুখ উন্মোচন করে; মার্কালে বেসামরিক জীবনের ভঙ্গুরতা দেখায়; রাবা ও গৌতা রাষ্ট্রীয় শক্তির সীমা প্রশ্ন করে; সিনজার সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাকে ঈমানের পরীক্ষায় পরিণত করে; রোহিঙ্গা শিবির আমাদের দরজায় ন্যায়বিচারের অসমাপ্ত আবেদন রেখে যায়; কাবুল বিমানবন্দর রাজনৈতিক বিজয়ের নিচে চাপা পড়া সাধারণ মানুষের মুখ দেখায়।
এই ইতিহাস পড়ে মুসলমান যদি কেবল ক্রুদ্ধ হয় কিন্তু ন্যায়বান না হয়, কেবল নিজের ক্ষত দেখে কিন্তু অন্যের ক্ষত অস্বীকার করে, কেবল অতীতের গৌরব বলে কিন্তু বর্তমানের নির্যাতিতকে আশ্রয় না দেয়—তবে স্মরণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ইসলামের করুণা মানুষের পরিচয়পত্র দেখে কাজ করে না। নিরপরাধ প্রাণের মর্যাদা সর্বজনীন; অত্যাচারীর ধর্ম অপরাধকে হালাল করে না, নির্যাতিতের ধর্ম তার অধিকার কমায় না।
চূড়ান্ত প্রার্থনা
আগস্ট ফিরে আসুক স্মৃতি নিয়ে, কিন্তু নতুন লাশ নিয়ে নয়। মসজিদে ফিরে আসুক প্রার্থনার নিরাপত্তা, রাজপথে প্রতিষ্ঠিত হোক মানুষের প্রতিবাদের অধিকার, উদ্বাস্তু ফিরে পাক নিজের ভূমি, আর কোনো শিশুর শ্বাসে যেন যুদ্ধের বিষ প্রবেশ না করে। মুসলিম বিশ্বের অশ্রুভেজা আগস্টের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রার্থনা হোক—
হে আল্লাহ, ইতিহাসের শিক্ষা বোঝার প্রজ্ঞা দাও; বিভেদের বদলে ভ্রাতৃত্ব, প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতার অহংকারের বদলে মানবিকতা প্রতিষ্ঠার শক্তি দাও। পৃথিবীর কোনো জাতির ক্যালেন্ডারে আরেকটি রক্তাক্ত আগস্ট যোগ হতে দিও না।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)