odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 13th August 2026, ১৩th August ২০২৬
যে মাসের আকাশে উল্কা ঝরে, মাটিতে ফসল পাকে, ইতিহাসে সাম্রাজ্য ও বিপর্যয়ের স্মৃতি জেগে ওঠে—আগস্ট যেন একই সঙ্গে উৎসব, বিস্ময়, ভয় এবং রূপান্তরের দীর্ঘ উপাখ্যান

বিশেষ উপধারাবাহিক: “শোক, কান্না ও বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট”—প্রথম পর্ব (ধারাবাহিকের মুখবন্ধসহ) │বিস্ময়কর আগস্ট: সম্রাটের নাম, নক্ষত্রের বৃষ্টি, লোকবিশ্বাস ও বিপর্যয়ের এক আশ্চর্য মাস

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৩ August ২০২৬ ১৬:০৪

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৩ August ২০২৬ ১৬:০৪

ধারাবাহিকের মুখবন্ধ / ১২ আগস্ট ২০২৬

বিশেষ উপধারাবাহিক: ‘শোক, কান্না ও বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট

শোক, কান্না বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট: ইতিহাসের আলোঅন্ধকারে মানুষ, মুসলিম বিশ্ব বাঙালির আত্মঅনুসন্ধান

অধিকারপত্রের পাঁচ পর্বের বিশেষ গবেষণাধর্মী ফিচার ধারাবাহিকপ্রকাশকাল: ১২১৬ আগস্ট / আজ থাকছে প্রথম পর্ব

বর্ষপঞ্জির প্রতিটি মাসই সময়ের একটি নির্দিষ্ট পরিসর; কিন্তু সব মাস ইতিহাসে একই অর্থ বহন করে না। কোনো মাস উৎসব ও প্রাচুর্যের স্মৃতি নিয়ে ফিরে আসে, কোনো মাস ঋতুপরিবর্তনের বার্তা দেয়, আবার কোনো মাসের নাম উচ্চারিত হলেই জাতির সম্মিলিত স্মৃতিতে জেগে ওঠে হারানো মানুষ, রক্তাক্ত জনপদ, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন এবং অসমাপ্ত বিচারের দীর্ঘশ্বাস। আগস্ট তেমনই এক বিস্ময়কর ও বৈপরীত্যময় মাস—যার রাতের আকাশে পারসিয়েড উল্কাবৃষ্টি ঝরে, মাঠে ফসল পাকে, প্রাচীন সমাজে পালিত হয় শস্যোৎসব; অথচ যার ইতিহাসের পাতায় পাশাপাশি জমে আছে সাম্রাজ্যের অহংকার, বিশ্বযুদ্ধ, পারমাণবিক ধ্বংস, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ধর্মীয় ও জাতিগত নিপীড়ন, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘ মিছিল এবং সভ্যতার বিবেক কাঁপিয়ে দেওয়া অসংখ্য মানবিক বিপর্যয়।

আগস্টের এই দ্বৈত রূপই আমাদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। যে মাসের নামের সঙ্গে মহিমা ও মর্যাদার ধারণা যুক্ত, সেই মাস কেন বারবার মানুষের অমর্যাদা, নিষ্ঠুরতা ও আত্মবিনাশের সাক্ষী হয়ে ওঠে? যে আগস্টের আকাশ মহাজাগতিক আলোয় দীপ্ত হয়, সেই আগস্টেই কেন হিরোশিমা ও নাগাসাকির আকাশে মানুষের তৈরি কৃত্রিম সূর্য অসংখ্য নিরপরাধ প্রাণ কেড়ে নেয়? যে মাসে বহু জাতি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির আনন্দ উদ্‌যাপন করে, সেই মাসেই কেন স্বাধীনতার পতাকার নিচে চাপা পড়ে দেশভাগে বাস্তুচ্যুত ও পরিচয়চ্যুত মানুষের আর্তনাদ? আর কেন গ্রেগরীয় আগস্টের পাতায় মুসলিম ইতিহাসেরও এত বিদায়, সামরিক বিপর্যয়, পবিত্র স্থানে আগুন, গণহত্যা, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও হারানো স্বদেশের কান্না জমে আছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার প্রয়াসেই অধিকারপত্রের বিশেষ উপধারাবাহিক ফিচার সিরিজ—শোক, কান্না বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট প্রথমে চার পর্বে ধারাবাহিকটি প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু গবেষণার পরিধি বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশ্ব ও বাঙালির ইতিহাসের পাশাপাশি আগস্টে সংঘটিত ইসলামি ও মুসলিম ইতিহাসের করুণ অধ্যায়গুলোর জন্য স্বতন্ত্র একটি পর্ব প্রয়োজন। সেই গবেষণাগত প্রয়োজন থেকেই যুক্ত হয়েছে পঞ্চম ও সমাপনী পর্ব—আগস্টের আকাশে মুসলিম ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন: উম্মাহর অশ্রুভেজা আগস্ট। ফলে ধারাবাহিকটি এখন পাঁচ দিনের, পাঁচ পর্বের একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাধর্মী আয়োজন।

এটি কয়েকটি শোকাবহ তারিখের তালিকা নয়; কোনো মাসকে কুসংস্কারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টাও নয়। বরং প্রাচীন রোম থেকে আধুনিক বাংলাদেশ এবং খিলাফতে রাশেদার প্রথম যুগ থেকে সমকালীন মুসলিম বিশ্বের মানবিক বিপর্যয় পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কে ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য, লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় নৈতিকতা, মানবাধিকার এবং সাধারণ মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতার আলোকে পাঠ করার একটি সাংবাদিক ও গবেষণামূলক প্রয়াস।

এই ধারাবাহিকের কেন্দ্রে কেবল রাজা, সম্রাট, রাষ্ট্রনায়ক কিংবা যুদ্ধজয়ীরা নেই; আছেন ইতিহাসের সাধারণ মানুষ—সীমান্তের কাঁটাতারের এপারে দাঁড়িয়ে ওপারের আত্মীয়ের বিয়ের আলো দেখে কাঁদতে থাকা নারী; দুর্ভিক্ষের শহরে একমুঠো ভাতের অপেক্ষায় থাকা শিশু; পারমাণবিক আগুনে পরিবার হারানো মানুষ; যুদ্ধ, বন্যা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতায় সর্বস্বান্ত কৃষক; রাজনৈতিক নিপীড়নে প্রাণ হারানো তরুণ; জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত উদ্বাস্তু; মসজিদ, বাজার ও আশ্রয়শিবিরে নিহত নিরপরাধ মানুষ; রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে প্রিয়জন হারানো পরিবার এবং ক্ষমতার নির্মমতার সামনে অসহায় শিশু। ইতিহাসের বড় সিদ্ধান্তগুলো শাসকের টেবিলে নেওয়া হলেও তার সবচেয়ে বড় মূল্য প্রায় সব সময় সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়।

কেন এই ধারাবাহিক

আগস্টকে ঘিরে আমাদের স্মৃতি অনেকাংশেই বিচ্ছিন্ন। আমরা একটি হত্যাকাণ্ড স্মরণ করি, কিন্তু তার সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতার বৃহত্তর সংস্কৃতির সম্পর্ক অনুসন্ধান করি না। স্বাধীনতার উৎসব উদ্‌যাপন করি, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দেশভাগ, উদ্বাস্তুতা ও বিচ্ছিন্ন পরিবারের কান্না আড়ালে থেকে যায়। বিশ্বযুদ্ধ ও পারমাণবিক বোমার ইতিহাস পড়ি, কিন্তু প্রশ্ন করি না—বিজ্ঞান কীভাবে নৈতিকতাহীন ক্ষমতার হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্রে পরিণত হলো। দুর্ভিক্ষকে শুধু খাদ্যের অভাব বলে মনে করি, কিন্তু পরীক্ষা করি না—বাজার, প্রশাসন, ঔপনিবেশিক নীতি ও বৈষম্য কীভাবে ভরা গোলার পাশেও মানুষকে অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। মুসলিম বিশ্বের ক্ষত স্মরণ করি, কিন্তু সব সময় দেখি না—কোথায় বহিরাগত আগ্রাসন, কোথায় অভ্যন্তরীণ বিভাজন, কোথায় সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ এবং কোথায় ক্ষমতার নামে ধর্মের অপব্যবহার সাধারণ মানুষের জীবন ধ্বংস করেছে।

এই ধারাবাহিক সেই বিচ্ছিন্ন স্মৃতিগুলোকে একটি নৈতিক ও বিশ্লেষণী বোধের সুতোয় যুক্ত করতে চায়। এর লক্ষ্য আগস্টকে ‘অপয়া’ প্রমাণ করা নয়; বরং দেখানো—ক্যালেন্ডারের কোনো মাস নিজে রক্তাক্ত নয়, মানুষের সিদ্ধান্তই তাকে রক্তাক্ত করে। সময় যুদ্ধ ঘোষণা করে না, সীমান্ত আঁকে না, বোমা নিক্ষেপ করে না, মসজিদে বিস্ফোরক রাখে না, জাতিগত পরিচয়ের কারণে মানুষকে নাগরিকত্বহীন করে না কিংবা কোনো পরিবার নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করে না। ক্ষমতালোভ, সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগত ঘৃণা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রশাসনিক অবহেলা, ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিই একটি তারিখকে জাতীয় বা বৈশ্বিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত করে।

এই অনুসন্ধান অতীতের দিকে তাকানোর পাশাপাশি বর্তমানের কাছেও জবাব চায়। আমরা কি ইতিহাসের শোককে আনুষ্ঠানিকতা, দলীয় বক্তৃতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী পোস্টে সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি সেই শোক থেকে ভবিষ্যতের জন্য নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করব? আমরা কি শুধু নিজেদের পক্ষ, জাতি বা ধর্মের নিহত মানুষের জন্য কাঁদব, নাকি পরিচয় ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি অন্যায় মৃত্যু, প্রতিটি শিশুহত্যা এবং প্রতিটি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে সমানভাবে দাঁড়াব? এই ধারাবাহিক সেই কঠিন আত্মজিজ্ঞাসারই একটি উন্মুক্ত মঞ্চ।

প্রথম পর্ব: আগস্টের নাম, আকাশ বিস্ময়ের উৎস

প্রথম পর্ব—বিস্ময়কর আগস্ট: সম্রাটের নাম, নক্ষত্রের বৃষ্টি, লোকবিশ্বাস বিপর্যয়ের এক আশ্চর্য মাস—পাঠককে নিয়ে যাবে প্রাচীন রোমান বর্ষপঞ্জিতে। একসময় লাতিন ভাষায় ‘ষষ্ঠ’ অর্থে সেক্সটিলিস নামে পরিচিত মাসটি কীভাবে সম্রাট অগাস্টাসের নাম ধারণ করে এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অসংখ্য ভাষায় স্থায়ী হয়ে যায়—সেই ইতিহাস দিয়ে শুরু হবে ধারাবাহিকের যাত্রা। পারসিয়েড উল্কাবৃষ্টি, স্টার্জন মুন, প্রাচীন শস্যোৎসব, কৃষিজীবনের প্রবাদ ও বিভিন্ন অঞ্চলের বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে দেখা যাবে—মানুষ কীভাবে প্রকৃতি ও ঋতুচক্রকে ঘিরে সময়ের সাংস্কৃতিক অর্থ নির্মাণ করেছে। একই সঙ্গে পম্পেইয়ের ধ্বংস, ঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় স্মরণ করিয়ে দেবে—প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ভয়ংকর শক্তি প্রায়ই পাশাপাশি অবস্থান করে।

দ্বিতীয় পর্ব: বাঙালির কান্নার পুরোনো খাতা

দ্বিতীয় পর্ব—বাঙালির জন্য অপয়া মাস, দুর্ভাগ্যের প্রতীকের মাসআগস্ট—বিশ্বের লোকবিশ্বাস থেকে বাঙালির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় প্রবেশ করবে। বাঙালির সংস্কৃতিতে আগস্টকে ‘অপয়া’ বলার কোনো সর্বজনীন প্রবাদ নেই; কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত শোক এই মাসকে আমাদের সম্মিলিত স্মৃতিতে বিশেষ বিষণ্নতা দিয়েছে।

এই পর্বের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বিভাজনের ফলে বাংলা শুধু দুটি রাজনৈতিক ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়নি; বিচ্ছিন্ন হয়েছে পরিবার, নদীপথ, রেলপথ, বাজার, সংস্কৃতি এবং বহু শতকের সামাজিক সম্পর্ক। সীমান্তের এপারে দাঁড়িয়ে ওপারের আত্মীয়ের আনন্দানুষ্ঠানের আলো দেখে কাঁদতে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা দেশভাগের মানবিক মূল্যকে দৃশ্যমান করে—চোখ যেতে পারে, বাতাস ও পাখি যেতে পারে; মানুষ যেতে পারে না। এখানে হিরোশিমা–নাগাসাকি, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, জঙ্গিবাদের উত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনও আলোচিত হবে। মূল অনুসন্ধান—আগস্ট কি সত্যিই বাঙালির জন্য দুর্ভাগ্যের মাস, নাকি ক্ষমতালিপ্সা, রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও সহিংসতাই একে কান্নার প্রতীকে পরিণত করেছে?

তৃতীয় পর্ব: বিশ্বসভ্যতার রক্তাক্ত আগস্ট

তৃতীয় পর্ববিশ্বসভ্যতার রক্তাক্ত আগস্ট: যুদ্ধ, বোমা, বিভাজন প্রতিরোধের ইতিহাস—বাংলার সীমানা অতিক্রম করে আগস্টের বৈশ্বিক অভিঘাত অনুসন্ধান করবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে ওয়ারশর প্রতিরোধ এবং হিরোশিমা–নাগাসাকির পারমাণবিক ধ্বংস এই পর্বের প্রধান ভিত্তি। এখানে থাকবে দেশভাগ, বার্লিন প্রাচীর, প্রাগের রাস্তায় ট্যাংক, ইরাকের কুয়েত দখল, সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যর্থ আগস্ট অভ্যুত্থান এবং ক্রাকাতোয়ার মহাবিস্ফোরণ। তবে এটি শুধু ধ্বংসের দলিল নয়। হাইতির দাসবিদ্রোহ, ওয়ারশর প্রতিরোধ এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের সাম্য ও নাগরিক অধিকারের স্বপ্ন দেখাবে—আগস্টে মানুষ শুধু নিহত হয়নি; দাসত্ব, দখলদারত্ব, বর্ণবৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধেও উঠে দাঁড়িয়েছে।

চতুর্থ পর্ব: বিস্মৃত কান্না পেরিয়ে পনেরোই আগস্টের চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি

চতুর্থ পর্বক্যালেন্ডারের বাইরে আরেক আগস্ট: বাংলার অনাহার, মোগল দরবারের ভ্রাতৃঘাত এবং উদ্বাস্তু মানুষের কান্নাআগস্টের সব কান্না ছাপিয়ে পনেরোই আগস্ট—ধারাবাহিককে নিয়ে যাবে বাঙালির সবচেয়ে গভীর জাতীয় শোকের কেন্দ্রে। দারা শিকোহের হত্যাকাণ্ড, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ, তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, বন্যা, উদ্বাস্তু মানুষের আর্তনাদ এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার নানা অধ্যায় একই ঐতিহাসিক বোধে বিশ্লেষিত হবে। এসব কান্নার মধ্যেই ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর রক্তাক্ত ভোর হয়ে উঠবে পর্বটির কেন্দ্রীয় ও চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি—যেদিন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করা হয়; রেহাই পায়নি দশ বছরের শিশু শেখ রাসেলও।

এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক বা একটি পরিবারের বিরুদ্ধে অপরাধ ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ স্বপ্নের ওপর পরিকল্পিত আঘাত। পর্বটি শোকের আনুষ্ঠানিক পুনরাবৃত্তির বদলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, শিশুহত্যা, দায়মুক্তি, ইতিহাসের ব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের প্রয়োজন নিয়ে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা উত্থাপন করবে।

পঞ্চম সমাপনী পর্ব: মুসলিম ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন উম্মাহর অশ্রুভেজা আগস্ট

গবেষণার বিস্তৃত পরিসর থেকে যুক্ত হওয়া পঞ্চম ও সমাপনী পর্ব—আগস্টের আকাশে মুসলিম ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন: উম্মাহর অশ্রুভেজা আগস্টস্বদেশ বিজয়ের অহংকার পেরিয়ে মানুষের কাছে ফেরার দীর্ঘ আহ্বান—গ্রেগরীয় আগস্টে সংঘটিত ইসলামি ও মুসলিম ইতিহাসের বেদনা, বিজয়, বিপর্যয় এবং আত্মসমালোচনার বহুমাত্রিক পাঠ তুলে ধরবে।

হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)–এর বিদায় থেকে ইয়ারমুক, কনস্টান্টিনোপল, আব্বাসীয় ক্ষমতার রক্তাক্ত পালাবদল ও আল-মিহনা; বসরায় কারামাতীয় তাণ্ডব; মানজিকার্ট, মালাগা, মারজ দাবিক ও মোহাচ; প্রথম ক্রুসেড-পরবর্তী পবিত্র ভূমির দীর্ঘ শোক; দেশভাগ; আল-আকসায় অগ্নিসংযোগ; মাজার-ই-শরিফ; সারায়েভোর মার্কালে বাজার; ইরাকের মাজার ও মসজিদে ভ্রাতৃঘাতী হামলা; রাবা; গৌতার রাসায়নিক মৃত্যু; সিনজারে ইয়াজিদি নিপীড়ন; রোহিঙ্গাদের হারানো স্বদেশ এবং কাবুল বিমানবন্দরের রক্তাক্ত প্রস্থান—এই দীর্ঘ সময়রেখায় দেখা যাবে মুসলিম ইতিহাসের ক্ষত কেবল বহিরাগত আগ্রাসনের ফল নয়। কোথাও সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কোথাও শাসকের ক্ষমতালোভ, কোথাও মুসলমানের হাতে মুসলমানের রক্ত, কোথাও জাতিগত ও মাজহাবি ঘৃণা, আবার কোথাও আন্তর্জাতিক নীরবতা ও বিচারহীনতা বিপর্যয়কে গভীর করেছে।

এই পর্বে হিজরি চান্দ্রবর্ষ ও গ্রেগরীয় সৌরবর্ষের পার্থক্য বিশেষভাবে স্পষ্ট রাখা হবে। কারবালার ট্র্যাজেডির মতো মহররমকেন্দ্রিক ঘটনাকে স্থায়ীভাবে গ্রেগরীয় আগস্টের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হবে না। কারণ ধর্মীয় আবেগের মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথও হলো ইতিহাসের তারিখ, উৎস ও প্রেক্ষাপটের প্রতি সততা। পর্বটির উদ্দেশ্য ধর্মীয় বিদ্বেষ সৃষ্টি করা কিংবা মুসলমানকে শুধু ইতিহাসের অসহায় শিকার হিসেবে দেখানো নয়। বরং প্রশ্ন তোলা—নিজের সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য ন্যায় চাইলে অন্য ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের নিরপরাধ মানুষের অধিকারও কি একই নৈতিক দৃঢ়তায় রক্ষা করতে পারি? মুসলিম উম্মাহর অশ্রু তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা প্রতিশোধ নয়—ন্যায়বিচার, আত্মসমালোচনা, সহমর্মিতা এবং সব নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তিতে রূপ নেবে।

ধারাবাহিকের পরিধি গবেষণাগত অবস্থান

প্রাচীন রোমান বর্ষপঞ্জিতে সেক্সটিলিস নামে পরিচিত মাসটির উৎপত্তি থেকে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই–আগস্টের রক্তাক্ত মানবিক অভিঘাত এবং ২০২১ সালের কাবুল বিমানবন্দরের বিপর্যয় পর্যন্ত দুই সহস্রাব্দেরও বেশি সময় এই ধারাবাহিকের বিস্তৃত কালপরিসর। মহাজাগতিক সৌন্দর্য ও লোকবিশ্বাস থেকে সাম্রাজ্য, যুদ্ধ ও পারমাণবিক ধ্বংস; বাংলার দুর্ভিক্ষ ও দেশভাগ থেকে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা; খিলাফতের প্রথম যুগ থেকে আধুনিক মুসলিম বিশ্বের গণহত্যা, উদ্বাস্তুতা ও রাষ্ট্রহীনতার সংকট—সবকিছুকে একই মানবিক ও বিশ্লেষণী কাঠামোয় বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

তথ্য ও সংখ্যার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকটি উৎসনির্ভর সতর্কতা অনুসরণ করবে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ঘটনার তারিখ, সৈন্যসংখ্যা বা হতাহতের হিসাবে উৎসভেদ থাকলে সেই মতভেদ উল্লেখ করা হবে; অযাচাইকৃত সংখ্যাকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হবে না। আধুনিক গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিচারিক নথি, মানবাধিকার সংস্থা এবং স্বীকৃত ঐতিহাসিক গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ধর্মীয়, জাতীয় ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে নিরপরাধ মানুষের মর্যাদাই থাকবে ধারাবাহিকের প্রধান নৈতিক মানদণ্ড।

সংশোধিত প্রকাশসূচি: পাঁচ দিন, পাঁচ পর্ব

১২ আগস্টপ্রথম পর্ব

বিস্ময়কর আগস্ট: সম্রাটের নাম, নক্ষত্রের বৃষ্টি, লোকবিশ্বাস বিপর্যয়ের এক আশ্চর্য মাস

আগস্টের নাম ও উৎপত্তি, মহাজাগতিক বিস্ময়, প্রাচীন উৎসব, লোকবিশ্বাস এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য ও বিপর্যয়ের দ্বৈত রূপ।

১৩ আগস্টদ্বিতীয় পর্ব

বাঙালির জন্য অপয়া মাস, দুর্ভাগ্যের প্রতীকের মাসআগস্ট

দেশভাগের কাঁটাতার থেকে হিরোশিমার ছাই, পঁচাত্তরের রক্তাক্ত ভোর থেকে একুশে আগস্টের গ্রেনেড এবং ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট—বাঙালির কান্নার পুরোনো খাতা।

১৪ আগস্টতৃতীয় পর্ব

বিশ্বসভ্যতার রক্তাক্ত আগস্ট: যুদ্ধ, বোমা, বিভাজন প্রতিরোধের ইতিহাস

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ওয়ারশ, পারমাণবিক ধ্বংস, দেশভাগ, বার্লিন প্রাচীর, প্রাগ, কুয়েত, সোভিয়েত আগস্ট অভ্যুত্থান ও ক্রাকাতোয়ার মধ্য দিয়ে ধ্বংস এবং মানবপ্রতিরোধের বৈপরীত্যময় দলিল।

১৫ আগস্টচতুর্থ পর্ব

ক্যালেন্ডারের বাইরে আরেক আগস্ট: বাংলার অনাহার, মোগল দরবারের ভ্রাতৃঘাত এবং উদ্বাস্তু মানুষের কান্নাআগস্টের সব কান্না ছাপিয়ে পনেরোই আগস্ট

দারা শিকোহ, রবীন্দ্রনাথ, বাংলার দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, বন্যা ও উদ্বাস্তু মানুষের আর্তনাদ পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও মানবিক মূল্যায়ন।

১৬ আগস্টপঞ্চম সমাপনী পর্ব

আগস্টের আকাশে মুসলিম ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন: উম্মাহর অশ্রুভেজা আগস্টস্বদেশ বিজয়ের অহংকার পেরিয়ে মানুষের কাছে ফেরার দীর্ঘ আহ্বান

প্রথম খলিফার বিদায় থেকে সামরিক বিপর্যয়, দেশভাগ, পবিত্র স্থানে আগুন, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত, গণহত্যা, রাসায়নিক হামলা, রোহিঙ্গার হারানো স্বদেশ ও কাবুলের রক্তাক্ত প্রস্থান—মুসলিম ইতিহাসের ক্ষতকে প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও আত্মসমালোচনার আলোয় পাঠ।

ধারাবাহিকের প্রধান লক্ষ্য

এই পাঁচ পর্বের আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু অতীত স্মরণ নয়; স্মৃতির সামাজিক ও নৈতিক অর্থ পুনরুদ্ধার করা। ধারাবাহিকটি বিশেষভাবে চেষ্টা করবে—

  1. আগস্টের ঐতিহাসিক, প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্যকে একটি সমন্বিত পাঠে উপস্থাপন করতে;
  2. আলোচিত ঘটনার পাশাপাশি বিস্মৃত সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি, শিশুহত্যা ও স্বজনহানির বেদনা সামনে আনতে;
  3. যুদ্ধ, দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ, গণহত্যা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সাম্প্রদায়িকতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কাঠামোগত কারণ অনুসন্ধান করতে;
  4. বাঙালি, মুসলমান বা অন্য কোনো পরিচয়ের একচোখা স্মৃতির বদলে প্রতিটি নিরপরাধ মানুষের মর্যাদাকে সমান গুরুত্ব দিতে;
  5. ইতিহাসের ভুল তথ্য, অতিরঞ্জিত সংখ্যা এবং হিজরি–গ্রেগরীয় তারিখের বিভ্রান্তি এড়িয়ে উৎসনির্ভর ইতিহাসচর্চাকে উৎসাহিত করতে;
  6. শোককে প্রতিহিংসায় নয়, ন্যায়বিচার, মানবিক রাষ্ট্র, সম্প্রীতি ও গণহত্যা প্রতিরোধের অঙ্গীকারে রূপান্তর করতে।

শোককে স্মৃতি, স্মৃতিকে দায়িত্বে রূপান্তর

কোনো মাস প্রকৃত অর্থে অপয়া নয়। আগস্টের হাতে অস্ত্র নেই; সে কোনো শহরে বোমা ফেলে না, কোনো জাতিকে বিভক্ত করে না, মসজিদ বা উপাসনালয়ে আগুন দেয় না এবং কোনো শিশুকে হত্যা করে না। মানুষই যুদ্ধ শুরু করে, সীমান্ত আঁকে, হত্যার ষড়যন্ত্র রচনা করে, ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়কে বিভাজনের অস্ত্রে পরিণত করে এবং ক্ষমতার জন্য মানবতাকে বিসর্জন দেয়। তাই আগস্টকে ঘিরে এই ধারাবাহিক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর কালপঞ্জি নয়; এটি ক্ষমতালোভ, সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, প্রশাসনিক অবহেলা এবং বিচারহীনতার একটি সমালোচনামূলক পাঠ।

ইতিহাস স্মরণের উদ্দেশ্য নতুন শত্রু তৈরি করা নয়। দেশভাগে মুসলমানের কান্না সত্য, হিন্দু ও শিখের কান্নাও সত্য; মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, একইভাবে ইয়াজিদি, খ্রিষ্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ, হিন্দু বা অন্য যেকোনো পরিচয়ের নিরপরাধ মানুষের ওপর নিপীড়নও সমান নিন্দনীয়। অপরাধীর ধর্ম অপরাধকে বৈধ করে না, নির্যাতিতের ধর্ম তার অধিকার কমায় না। যে স্মৃতি শুধু নিজের ক্ষত দেখে এবং অন্যের ক্ষত অস্বীকার করে, তা ন্যায়বিচারের ভিত্তি হতে পারে না।

অতএব এই ধারাবাহিকের আহ্বান—আগস্টের শোককে দুর্বলতার অশ্রুতে নয়, ইতিহাসসচেতনতার শক্তিতে রূপ দেওয়া; স্মৃতিকে প্রতিশোধের আগুনে নয়, ন্যায়বিচারের আলোয় রাখা; এবং কান্নার শেষে এমন একটি বাংলাদেশ ও পৃথিবীর শপথ নেওয়া, যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ হত্যায়, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রতিহিংসায় এবং ধর্ম বিভাজনের অস্ত্রে পরিণত হবে না। প্রতিটি শিশু নিরাপদ থাকবে, প্রতিটি মানুষের মর্যাদা সুরক্ষিত হবে এবং কোনো জাতির ক্যালেন্ডারে আরেকটি রক্তাক্ত আগস্ট যুক্ত হবে না।

১২–১৬ আগস্ট প্রতিদিন পড়ুন অধিকারপত্রের পাঁচ পর্বের বিশেষ আয়োজন—‘শোক, কান্না ও বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট’। ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা প্রশ্ন করব: আগস্ট কি সত্যিই অপয়া, নাকি মানুষের লোভ, ঘৃণা, ক্ষমতালিপ্সা এবং একই ভুল পুনরাবৃত্তির প্রবণতাই এই মাসকে বারবার রক্তাক্ত করেছে?

আগস্ট চলছে—কাঁদো বাঙালি, কাঁদো। কিন্তু কান্নার শেষে শপথ করো: আর কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, আর কোনো শিশুর রক্ত নয়, আর কোনো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি নয়

বিশেষ উপধারাবাহিক: ‘শোক, কান্না বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট’│প্রথম পর্ব

বিস্ময়কর আগস্ট: সম্রাটের নাম, নক্ষত্রের বৃষ্টি, লোকবিশ্বাস বিপর্যয়ের এক আশ্চর্য মাস

যে মাসের আকাশে উল্কা ঝরে, মাটিতে ফসল পাকে, ইতিহাসে সাম্রাজ্য বিপর্যয়ের স্মৃতি জেগে ওঠেআগস্ট যেন একই সঙ্গে উৎসব, বিস্ময়, ভয় এবং রূপান্তরের দীর্ঘ উপাখ্যান

বছরের ক্যালেন্ডারে আগস্ট আসে অষ্টম মাস হিসেবে। কিন্তু তার পরিচয় কেবল একত্রিশ দিনের একটি সময়খণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। এই মাসের শরীরে যেন পাশাপাশি বাস করে কয়েকটি বিপরীত পৃথিবী। কোথাও গ্রীষ্মের শেষ আলোয় বাগান ভরে ওঠে পাকা ফল ও শস্যে, কোথাও বর্ষার মেঘ নদী ও জনপদের ওপর ছড়িয়ে দেয় সজীবতা; আবার কোথাও ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, তাপপ্রবাহ কিংবা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত আগস্টকে পরিণত করে বিপর্যয়ের স্মারকে। রাতের আকাশে এ মাসেই দেখা যায় বছরের অন্যতম আকর্ষণীয় উল্কাবৃষ্টি। লোকজ সংস্কৃতিতে আগস্ট কখনো সৌভাগ্যের, কখনো অমঙ্গলের; কখনো মুক্তির উৎসবের মাস, আবার কখনো বিস্মৃত ইতিহাসের নীরব ভান্ডার।

এক পুরোনো প্রবাদে বলা হয়—“আগস্টে যখন বৃষ্টি নামে, তখন যেন মধু ও মদ ঝরে।” কথাটি আক্ষরিক নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কৃষিজীবনের অভিজ্ঞতা। সময়মতো আগস্টের বৃষ্টি অর্থ শস্যের প্রাণ ফিরে পাওয়া, ফলের রস বেড়ে ওঠা এবং আসন্ন ফসলের সম্ভাবনা। কিন্তু এই একই মাস যখন অতিবৃষ্টি, ঝড় কিংবা দাবানল নিয়ে আসে, তখন সেই মধুই মুহূর্তে বিষাদে রূপ নেয়। এই দ্বৈত চরিত্রই আগস্টকে বছরের অন্য মাসগুলোর চেয়ে আলাদা করে তোলে।

আগস্টের নাম যখন আগস্ট ছিল না

আজ আমরা যে মাসকে আগস্ট বলি, প্রাচীন রোমে তার নাম ছিল ‘সেক্সটিলিস’ (Sextilis)। লাতিন ভাষায় শব্দটির অর্থ ‘ষষ্ঠ’। কারণ রোমের প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে বছর শুরু হতো মার্চ থেকে; সে হিসাবে সেক্সটিলিস ছিল বছরের ষষ্ঠ মাস। পরবর্তী সময়ে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি বর্ষপঞ্জির শুরুতে স্থান পাওয়ায় মাসটির অবস্থান বদলে অষ্টম হলেও পুরোনো নামটি বহুদিন টিকে ছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব ৮ সালে রোমান সিনেট মাসটির নাম পরিবর্তন করে ‘আগস্টাস’ রাখে রোমের প্রথম সম্রাট অগাস্টাস সিজারের সম্মানে। এর আগে জুলিয়াস সিজারের স্মরণে ‘কুইন্টিলিস’ মাসের নাম পরিবর্তন করে জুলাই করা হয়েছিল। রোমান শাসকেরা বুঝেছিলেন, ক্যালেন্ডার শুধু সময় গণনার উপকরণ নয়; মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে ক্ষমতার স্মৃতি স্থায়ী করে রাখারও এক অসাধারণ মাধ্যম। প্রাসাদ, মূর্তি কিংবা বিজয়স্তম্ভ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু মাসের নাম প্রতিদিন মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়। সেই হিসেবে আগস্ট এক জীবন্ত রাজনৈতিক স্মৃতিসৌধ—যেখানে প্রাচীন রোমের সাম্রাজ্যবাদী গৌরব আজও অদৃশ্য অক্ষরে লেখা রয়েছে।  

অগাস্টাসের নামের মধ্যেও রয়েছে তাৎপর্য। ‘Augustus’ শব্দটি মহিমান্বিত, সম্মানিত বা পূজনীয় অর্থ বহন করে। ফলে আগস্ট শুধু একজন সম্রাটের নাম ধারণ করেনি; তার সঙ্গে জুড়ে নিয়েছে মহিমা, কর্তৃত্ব ও ঐশ্বর্যের ধারণাও। ইতিহাসের পরিহাস হলো—যে রোমান সাম্রাজ্য বহু শতাব্দী আগে বিলীন হয়েছে, তার এক সম্রাটের উপাধি আজও বিশ্বের অসংখ্য ভাষায় বছরের একটি মাসের নাম হয়ে বেঁচে আছে।

রাতের আকাশে নক্ষত্রের আতশবাজি

আগস্টের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর বিস্ময় দেখা যায় রাতের আকাশে। প্রতি বছর জুলাইয়ের শেষভাগ থেকে আগস্টের মধ্যভাগ পর্যন্ত পৃথিবী সুইফট–টাটল ধূমকেতুর ফেলে যাওয়া ধূলিকণা ও ক্ষুদ্র পাথুরে কণার স্রোতের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। এই কণাগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে প্রচণ্ড ঘর্ষণে জ্বলে উঠলে আকাশজুড়ে আলোর রেখা দেখা যায়। আমরা একে উল্কা বা ‘ছুটন্ত তারা’ বলি।

এটি পারসিয়েড উল্কাবৃষ্টি (Perseid Meteor Shower)—বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দর্শনীয় জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলোর একটি। সাধারণত আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এর তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। অনুকূল পরিবেশ, পরিষ্কার আকাশ এবং চাঁদের আলো কম থাকলে ঘণ্টায় প্রায় ৫০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত উল্কা দেখা যেতে পারে। কোনো কোনোটি এত উজ্জ্বল হয় যে আগুনের গোলার মতো আকাশের দীর্ঘ পথ আলোকিত করে চলে যায়।  

শহরের বৈদ্যুতিক আলোর দূষণ থেকে দূরে কোনো খোলা মাঠ, নদীর চর কিংবা গ্রামের অন্ধকার আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে এই উল্কাবৃষ্টি দেখা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। মনে হয়, মহাবিশ্ব বুঝি কয়েক মুহূর্তের জন্য তার রহস্যের দরজা খুলে দিয়েছে। অথচ যাকে আমরা নক্ষত্রের পতন বলে কল্পনা করি, তা প্রকৃতপক্ষে ধূমকেতুর ফেলে যাওয়া অতি ক্ষুদ্র কণার মৃত্যুদীপ্তি। বিজ্ঞান এখানে বিস্ময় নষ্ট করে না; বরং তাকে আরও গভীর করে।

আগস্টের পূর্ণিমার নামও বেশ অভিনব—‘স্টার্জন মুন’ (Sturgeon Moon)। উত্তর আমেরিকার কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঋতুভিত্তিক নামকরণে এর উৎপত্তি। গ্রীষ্মের শেষভাগে গ্রেট লেকস অঞ্চলে বিশালাকৃতির স্টার্জন মাছ তুলনামূলকভাবে বেশি ধরা পড়ত বলে আগস্টের পূর্ণিমা এই নাম পেয়েছে। অর্থাৎ আকাশের চাঁদের নামও এখানে মানুষের খাদ্যসংগ্রহ, জলজ পরিবেশ এবং ঋতুচক্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

খাবারের নামে দিবস, প্রতিবেশির বারান্দায় জুকিনি

আধুনিক বিশ্বে আগস্ট এমন কিছু বিচিত্র দিবসের আশ্রয়, যেগুলো শুনলে মনে হতে পারে ইতিহাসের সঙ্গে রসিকতারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে আগস্টের প্রথম শনিবার পালিত হয় ‘ন্যাশনাল মাস্টার্ড ডে’। ৪ আগস্ট ‘চকলেট চিপ কুকি ডে’। আরও অভিনব ৮ আগস্টের একটি অনানুষ্ঠানিক আয়োজন—‘প্রতিবেশীর বারান্দায় গোপনে কিছু জুকিনি রেখে আসার দিবস’!

এই হাস্যরসাত্মক দিবসের পেছনে রয়েছে বাস্তব কৃষি-অভিজ্ঞতা। গ্রীষ্মের শেষভাগে অনেক গৃহস্থের বাগানে জুকিনি এত বেশি উৎপন্ন হতো যে মালিকেরা তা খেয়ে বা পরিচিতদের দিয়ে শেষ করতে পারতেন না। অতিরিক্ত সবজি তাই প্রতিবেশীর বাড়িতে রেখে আসার মজার প্রথায় পরিণত হয়। খাদ্য উদ্বৃত্তের একটি ছোট্ট সমস্যা ক্রমে সামাজিক রসিকতা ও অনানুষ্ঠানিক উৎসবের রূপ নেয়।

তবে আগস্টের সব বিস্মৃত উদ্‌যাপন এত হালকা নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ১ আগস্ট আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের কাছে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মুক্তির উৎসব। ১৮৩৪ সালের এই দিনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশগুলোতে দাসপ্রথা বিলোপসংক্রান্ত আইন কার্যকর হয় এবং প্রায় আট লাখ দাসত্ববন্দী মানুষ মুক্তির আইনি স্বীকৃতি লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর একাংশ দিনটিকে ‘August First Day’ হিসেবে সভা, শোভাযাত্রা, বক্তৃতা ও ভোজের মাধ্যমে পালন করত। মার্কিন গৃহযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে এ উদ্‌যাপন ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু বিস্মৃত সেই দিবস মনে করিয়ে দেয়—ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ কখনো কখনো মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকেও ধারণ করে।

১৯৩৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ১৯ আগস্টকে ‘ন্যাশনাল এভিয়েশন ডে’ ঘোষণা করেন। দিনটি উড়োজাহাজের অন্যতম উদ্ভাবক অরভিল রাইটের জন্মদিন। আকাশে মানুষের উড্ডয়নের যে স্বপ্ন একসময় অসম্ভব কল্পনা বলে মনে হতো, আগস্টের এই দিবস তারই স্মারক।

শস্য, রুটি প্রাচীন উৎসব

আগস্ট মূলত ফসল ও প্রাচুর্যের মাস—এই ধারণা বহু প্রাচীন। কেল্টিক সংস্কৃতিতে জুলাইয়ের শেষ কিংবা আগস্টের শুরুতে পালিত হতো লুগনাসাদ (Lughnasadh) নামের শস্যোৎসব। পরবর্তী খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে এর একটি রূপ ‘ল্যামাস’ (Lammas) নামে পরিচিত হয়। শব্দটি এসেছে ‘লোফ মাস’ বা রুটির ধর্মীয় উৎসবের ধারণা থেকে।

নতুন কাটা শস্য দিয়ে তৈরি প্রথম রুটি উপাসনালয়ে নিবেদন করা হতো। এটি শুধু ধর্মীয় আচার ছিল না; প্রকৃতি, কৃষক, শ্রম, খাদ্য ও সামাজিক জীবনের পারস্পরিক নির্ভরতার স্বীকৃতিও ছিল। একটি রুটির ভেতরে যে মাটি, বৃষ্টি, বীজ, রোদ এবং মানুষের শ্রম একাকার হয়ে থাকে, ল্যামাস উৎসব মানুষকে সেই সত্য স্মরণ করিয়ে দিত।

বাংলাদেশের বর্ষাকালীন আগস্টের সঙ্গেও এই কৃষিনির্ভর অনুভূতির মিল খুঁজে পাওয়া যায়। শ্রাবণ–ভাদ্রের এই সন্ধিক্ষণে মাঠ, বিল, নদী ও গ্রামীণ জীবনে বর্ষার পূর্ণতা দেখা দেয়। আমন ধানের জমি, পাট কাটা, মাছভরা জলাশয় এবং বৃষ্টিস্নাত জনপদ—সব মিলিয়ে আমাদের আগস্টও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের মাস। তবে বন্যা ও নদীভাঙনের আশঙ্কা একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির দান এবং প্রকৃতির আঘাত প্রায়ই পাশাপাশি আসে।

বিড়ালের নয় জীবন এবং আগস্টের অদ্ভুত লোকবিশ্বাস

আগস্টকে ঘিরে পৃথিবীর নানা দেশে এমন সব লোকবিশ্বাস জন্ম নিয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক সত্য না হলেও মানবসমাজের ভয়, আশা ও কল্পনাশক্তি সম্পর্কে মূল্যবান ধারণা দেয়। পুরোনো আইরিশ কিংবদন্তি থেকে প্রচলিত ‘ক্যাট নাইটস’ শুরু হয় ১৭ আগস্ট। লোককথা অনুযায়ী, এক ডাইনি আটবার বিড়ালে রূপান্তরিত হয়ে আবার মানুষের চেহারায় ফিরতে পারত; কিন্তু নবমবার আর মানুষ হতে পারত না। এই কাহিনির সঙ্গে বিড়ালের ‘নয়টি জীবন’ থাকার জনপ্রিয় প্রবাদের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

আগস্টের আবহাওয়া নিয়েও বহু প্রবাদ প্রচলিত। বলা হতো, আগস্টে যতবার কুয়াশা দেখা যাবে, পরবর্তী শীতে ততবার তুষারপাত হবে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ অস্বাভাবিক গরম হলে দীর্ঘ ও তুষারময় শীত আসবে—এমন ধারণাও ছিল। আবার গরম জুলাইয়ের পর ঠান্ডা আগস্ট এলে সামনে শুষ্ক ও কঠিন শীত অপেক্ষা করছে বলে মনে করা হতো।

এসব প্রবাদ আধুনিক আবহাওয়াবিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস নয়। তবে এগুলোকে নিছক কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিলে কৃষিভিত্তিক সমাজের পর্যবেক্ষণ-ঐতিহ্যটি অদৃশ্য হয়ে যায়। আবহাওয়া দপ্তর, উপগ্রহ কিংবা কম্পিউটার মডেল উদ্ভাবনের বহু আগে মানুষ মেঘ, বাতাস, কুয়াশা, প্রাণীর আচরণ ও ফসলের পরিবর্তন দেখে ভবিষ্যৎ অনুমানের চেষ্টা করত। লোকপ্রবাদ সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সাংস্কৃতিক দলিল।

কোথাও প্রাচুর্যের মাস, কোথাও অমঙ্গলের

ব্রাজিলের একটি বহুল প্রচলিত কথা—‘Agosto, mês do desgosto’; অর্থাৎ আগস্ট হলো দুঃখ ও দুর্ভাগ্যের মাস। ঐতিহ্যগতভাবে এ মাসে অনেকে বিয়ে, দীর্ঘ ভ্রমণ কিংবা বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলতেন। সৌভাগ্যের প্রতীক বা তাবিজের বিক্রিও বেড়ে যেত।

কেন এমন ধারণা জন্মেছিল, তার একক উত্তর নেই। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য, সমুদ্রযাত্রার ঝুঁকি, ঋতু পরিবর্তন, অতীতের রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া ভয়—সব মিলিয়ে বিশ্বাসটি শক্তিশালী হয়ে থাকতে পারে। পাশের দেশ আর্জেন্টিনাতেও আগস্ট নিয়ে অদ্ভুত একটি পুরোনো বিশ্বাস ছিল—এ মাসে চুল ধুলে নাকি মৃত্যুকে আহ্বান করা হয়!

এসব ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবু এগুলো দেখায়, মানুষ সময়কে কখনো নিরপেক্ষ বলে ভাবেনি। কোনো মাসকে সে ভালোবাসে, কোনো মাসকে ভয় পায়; কোনো তারিখকে পবিত্র করে, আবার কোনো তারিখকে অশুভ বলে দূরে রাখে। প্রকৃতপক্ষে ক্যালেন্ডারের পাতায় মানুষ নিজের সম্মিলিত স্মৃতি ও মানসিকতাকেই লিখে রাখে।

পম্পেইয়ের আকাশে আগুন

আগস্টের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি রচিত হয়েছিল ৭৯ খ্রিষ্টাব্দে। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ২৪ আগস্ট ইতালির মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরিতে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। ছাই, গরম গ্যাস ও আগ্নেয় পদার্থের নিচে চাপা পড়ে পম্পেই ও হারকিউলেনিয়াম নগরী। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান; জীবন্ত নগর মুহূর্তে পরিণত হয় স্তব্ধ সমাধিক্ষেত্রে।

ভিসুভিয়াস শুধু মানুষ হত্যা করেনি; অদ্ভুতভাবে সে ইতিহাসকেও সংরক্ষণ করেছে। আগ্নেয় ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া ঘরবাড়ি, দেয়ালচিত্র, বাজার, পাত্র, খাদ্যদ্রব্য এবং মানুষের শরীরের অবয়ব শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রায় অক্ষত ছিল। ফলে পম্পেই আজ প্রাচীন রোমের দৈনন্দিন জীবন বোঝার এক অসামান্য প্রত্নতাত্ত্বিক জানালা। যে বিপর্যয় একটি নগরকে নিশ্চিহ্ন করেছিল, সেই বিপর্যয়ই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য নগরটির স্মৃতি সংরক্ষণ করে গেছে—আগস্টের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে?

ঝড়ের মাস: ধ্বংসের ভেতরেও অপ্রত্যাশিত মোড়

উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে আগস্ট ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের সক্রিয় সময়। ইতিহাসের কয়েকটি বিধ্বংসী হারিকেন এ মাসে আঘাত হেনেছে—১৯৮০ সালে হারিকেন অ্যালেন, ১৯৯২ সালে অ্যান্ড্রু, ২০০৫ সালে ক্যাটরিনা এবং ২০১৭ সালে হার্ভি। প্রতিটি ঝড় শুধু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস করেনি; রাষ্ট্রের প্রস্তুতি, সামাজিক বৈষম্য, নগরপরিকল্পনা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী ন্যায়বিচার সম্পর্কেও কঠিন প্রশ্ন তুলেছে।

১৮১৪ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে ঘটে আরও বিস্ময়কর ঘটনা। ব্রিটিশ সেনারা হোয়াইট হাউস, ক্যাপিটলসহ বিভিন্ন সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পরদিন, ২৫ আগস্ট, প্রবল ঝড় ও টর্নেডো শহরটিতে আঘাত হানে। ঝড়ে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটলেও প্রবল বৃষ্টি আগুন নেভাতে সাহায্য করে। প্রকৃতি একই ঘটনায় ধ্বংসকারী এবং রক্ষাকারী—দুই ভূমিকাতেই আবির্ভূত হয়েছিল।

এই ঘটনাগুলো আগস্টের একটি কঠিন শিক্ষা সামনে আনে: প্রাকৃতিক ঘটনা বিপদে পরিণত হয় মানুষের বসতি, প্রস্তুতির অভাব, দারিদ্র্য ও অব্যবস্থাপনার সঙ্গে মিলিত হয়ে। ঝড়ের শক্তি প্রাকৃতিক হলেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা প্রায়ই সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দ্বারা নির্ধারিত হয়।

আগস্ট আসলে আমাদের কী শেখায়?

আগস্টের গল্প শুধু বিস্ময়কর কিছু তথ্যের সমাবেশ নয়। এটি সময়, প্রকৃতি এবং মানুষের সম্পর্কের এক বহুমাত্রিক পাঠ। এই মাসের নাম আমাদের নিয়ে যায় রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতার রাজনীতিতে; পূর্ণিমা ও উল্কাবৃষ্টি উন্মুক্ত করে মহাবিশ্বের বিশালতা; শস্যোৎসব স্মরণ করায় খাদ্যের পেছনে প্রকৃতি ও মানুষের শ্রম; মুক্তির বিস্মৃত উদ্‌যাপন সামনে আনে দাসত্ববিরোধী সংগ্রাম; লোকবিশ্বাস দেখায় মানুষের ভয় ও কল্পনার জগৎ; আর আগ্নেয়গিরি, ঘূর্ণিঝড় ও দাবানল মনে করিয়ে দেয় সভ্যতার ভঙ্গুরতা।

আগস্ট তাই কেবল গ্রীষ্মের শেষ কিংবা বর্ষার একটি মাস নয়। এটি একই সঙ্গে সম্রাটের অহংকার ও দাসত্বমুক্ত মানুষের আনন্দ, কৃষকের আশা ও দুর্যোগপীড়িত মানুষের কান্না, লোককথার রহস্য ও বিজ্ঞানের বিস্ময়। এর রাতের আকাশে ধূমকেতুর ধূলিকণা আগুন হয়ে ঝরে; মাটিতে শস্য পাকে; সমুদ্রের বুকে ঝড় জন্ম নেয়; ইতিহাসের নিচে চাপা পড়া নগর আবার প্রত্নতত্ত্বের আলোয় জেগে ওঠে।

ক্যালেন্ডারের পাতায় আগস্ট প্রতি বছর ফিরে আসে। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, সে কখনো একইভাবে ফেরে না। তার সঙ্গে ফিরে আসে প্রাচীন সাম্রাজ্যের স্মৃতি, মুক্তির হারানো উৎসব, কৃষিজীবনের প্রবাদ, মহাবিশ্বের আলোকরেখা এবং প্রকৃতির অনিশ্চয়তার বার্তা। তাই আগস্টকে শুধু পার হয়ে যাওয়া যায় না; তাকে পড়তে হয়—ইতিহাসের মতো, আকাশের মতো এবং মানুষের বহুযুগের বিস্ময়ভরা এক খোলা বইয়ের মতো।

বি.দ্র. আগামীকালের পর্ব

আগামীকাল প্রকাশিত হবে এই সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব: বাঙালির কান্নার পুরোনো খাতা—‘বাঙালির জন্য অপয়া মাস, দুর্ভাগ্যের প্রতীকের মাসআগস্ট—বিশ্বের লোকবিশ্বাস থেকে বাঙালির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় প্রবেশ করবে। ব্রাজিলের প্রবাদে আগস্টকে দুর্ভাগ্য ও বিষাদের মাস বলা হয়; কিন্তু বাঙালির ক্ষেত্রে এমন কোনো সর্বজনীন প্রবাদ না থাকলেও ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত শোক এই মাসকে এক বিশেষ বিষণ্নতা দিয়েছে।

এই পর্বের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বিভাজনের ফলে বাংলা শুধু দুটি রাজনৈতিক ভূখণ্ডে পরিণত হয়নি; বিভক্ত হয়েছে পরিবার, নদীপথ, রেলপথ, বাজার, সংস্কৃতি এবং বহু শতকের সামাজিক সম্পর্ক। সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্তে কাঁটাতারের এপারে দাঁড়িয়ে ওপারের আত্মীয়ের বিয়ের আলো দেখে কাঁদতে থাকা একটি পরিবারের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেশভাগের সেই মানবিক মূল্যকে দৃশ্যমান করে তুলবে। কয়েক শ গজের দূরত্বে আনন্দ দেখা যায়, গান শোনা যায়—কিন্তু সেখানে যেতে প্রয়োজন পাসপোর্ট, ভিসা ও রাষ্ট্রের অনুমতি। চোখ যেতে পারে, বাতাস যেতে পারে, পাখি যেতে পারে; মানুষ যেতে পারে না।

এই পর্বে হিরোশিমা–নাগাসাকির মানবিক বিপর্যয়, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর হত্যাকাণ্ড, একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, জঙ্গিবাদের উত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে সংঘটিত প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথাও আলোচিত হবে। মূল অনুসন্ধানটি থাকবে—আগস্ট কি বাঙালির জন্য সত্যিই অপয়া, নাকি মানুষের ক্ষমতালিপ্সা, রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও সহিংসতাই এই মাসকে কান্নার প্রতীকে পরিণত করেছে?

লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, শিক্ষা  গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা  সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#শোক_কান্না_ও_বিপর্যয়ের_বিস্ময়কর_আগস্ট #পাঁচ_পর্বের_ধারাবাহিক #আগস্টের_ইতিহাস #রক্তাক্ত_আগস্ট #পনেরোই_আগস্ট #বঙ্গবন্ধু #শেখ_রাসেল #মুসলিম_ইতিহাস #উম্মাহর_অশ্রুভেজা_আগস্ট #দেশভাগ #রোহিঙ্গা #মানবতা #ন্যায়বিচার #ইতিহাসের_আত্মজিজ্ঞাসা #OdhikarPatra

তথ্যভিত্তি: লেসলি কেনেডির “The Surprising History of August”, HISTORY; প্রকাশিত ১ আগস্ট ২০২৫, সর্বশেষ হালনাগাদ ৪ আগস্ট ২০২৫।

 

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: