odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Sunday, 16th August 2026, ১৬th August ২০২৬
দেশভাগের কাঁটাতার, হিরোশিমার আণবিক ছাই, পঁচাত্তরের রক্তাক্ত ভোর, একুশে আগস্টের গ্রেনেড আর চব্বিশের জুলাই–আগস্টের লাশ—কেন আগস্ট এলেই বাঙালির সামনে খুলে যায় ইতিহাসের পুরোনো কান্নার খাতা?

বিশেষ উপধারাবাহিক: ‘শোক, কান্না ও বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট’│ দ্বিতীয় পর্ব

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৬ August ২০২৬ ০৪:৫৬

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৬ August ২০২৬ ০৪:৫৬

দেশভাগের কাঁটাতার থেকে হিরোশিমার ছাই, পঁচাত্তরের রক্তাক্ত ভোর থেকে একুশে আগস্টের গ্রেনেড এবং চব্বিশের জুলাইআগস্টের লাশক্যালেন্ডারে আগস্ট এলেই ইতিহাস যেন বাঙালির সামনে খুলে দেয় কান্নার পুরোনো খাতা বিস্ময়কর আগস্টবাঙালির জন্য অপয়া মাস, দুর্ভাগ্যের প্রতীকের মাস

বিশেষ উপধারাবাহিক: ‘শোককান্না  বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট’│ দ্বিতীয় পর্ব

আগস্ট কি সত্যিই বাঙালির জন্য অপয়া, নাকি মানুষের ক্ষমতালোভ, বিভাজনের রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ, প্রতিহিংসা ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতাই মাসটিকে কান্নার প্রতীকে পরিণত করেছে? ব্রাজিলের ‘দুর্ভাগ্যের আগস্ট’ লোকবিশ্বাস থেকে হিরোশিমা–নাগাসাকির আণবিক ধ্বংস, ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও ভোমরা সীমান্তের হৃদয়বিদারক পারিবারিক বিচ্ছেদ, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর সপরিবার হত্যাকাণ্ড, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ১৭ আগস্টের দেশব্যাপী বোমা বিস্ফোরণ এবং ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের রক্তক্ষয়—এই অনুসন্ধানী ও মানবিক ফিচার ইতিহাসের ধারাবাহিক ক্ষতগুলোকে একটি বৃহত্তর নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ‘বিস্ময়কর আগস্ট’ ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব দেখায়—সময় নিজে অভিশপ্ত নয়; মানুষের সিদ্ধান্তই ইতিহাসে অন্ধকার সৃষ্টি করে। তাই প্রতিহিংসা নয়, সত্য, স্মৃতি, ন্যায়বিচার, মানবিক সংযোগ ও জবাবদিহির মধ্য দিয়েই আগস্টকে কান্নার মাস থেকে শিক্ষার মাসে রূপান্তর করতে হবে।

 ‘বি’ অক্ষর দিয়ে শুরু দুটি দেশের নাম—ব্রাজিল ও বাংলাদেশ। ভৌগোলিকভাবে দুই দেশ দুই গোলার্ধে, ভাষা–সংস্কৃতি–ইতিহাসেও বিস্তর ব্যবধান; তবু একটি জায়গায় তাদের অদ্ভুত মিল রয়েছে। উভয় দেশের সমাজ ও ইতিহাসে কৃষির প্রভাব গভীর। মাটি, বৃষ্টি, ফসল ও ঋতুচক্র তাদের লোকজ জীবনবোধ নির্মাণ করেছে। আর আশ্চর্যভাবে, দুই দেশের স্মৃতিতে আগস্টের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অশুভ অনুভব।

ব্রাজিলের বহুল প্রচলিত প্রবাদ—“Agosto, mês do desgosto”; অর্থাৎ, আগস্ট দুঃখ, হতাশা ও দুর্ভাগ্যের মাস। একসময় সেখানে আগস্টে বিয়ে, দীর্ঘ ভ্রমণ কিংবা বড় ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলার রেওয়াজ ছিল। কারও কারও বিশ্বাস ছিল, এ মাসে শুভ কাজ শুরু করলে তার পরিণতি ভালো হয় না। বৈজ্ঞানিকভাবে এসব ধারণার কোনো ভিত্তি নেই; কিন্তু লোকবিশ্বাস তো সব সময় পরীক্ষাগারের সূত্র মেনে জন্মায় না। কোনো সমাজ বারবার কোনো নির্দিষ্ট সময়ে বিপদ, অনিশ্চয়তা কিংবা বেদনাদায়ক ঘটনা দেখলে সেই মাসকে ঘিরে সম্মিলিত ভয় তৈরি হতেই পারে।

ব্রাজিলের ক্ষেত্রে আগস্ট দুর্ভাগ্যের মাস—এ কথা প্রবাদে আছে। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে? আমাদের হয়তো এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত প্রবাদ নেই, কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে মনে হয়—আগস্ট যেন বাঙালির কান্নার মাস। দেশভাগ, বিচ্ছেদ, গণহত্যা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গ্রেনেড হামলা, উগ্রবাদের উত্থান, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, গণআন্দোলনের মৃত্যু—কত রক্ত, কত অশ্রু, কত অসমাপ্ত স্বপ্ন জমে আছে এই একটি মাসের ভেতরে!

তবে শুরুতেই একটি কথা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোনো মাস প্রকৃত অর্থে অপয়া নয়। সময় মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে না; ক্যালেন্ডারের কোনো পাতার হাতে অস্ত্র থাকে না। মানুষই সিদ্ধান্ত নেয়, সীমান্ত আঁকে, যুদ্ধ শুরু করে, বোমা ফেলে, হত্যার পরিকল্পনা করে কিংবা নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালায়। অতএব ‘অপয়া আগস্ট’ মূলত একটি রূপক—আমাদের ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত বেদনাকে বোঝানোর কাব্যিক ভাষা।

মৃত সম্রাট, দেবতার পরিহাস এবং আগস্টের কাল্পনিক অভিশাপ

বাঙালির কাছে আগস্ট কেন এমন কান্নার মাস হয়ে উঠল, তার উত্তর খুঁজতে যদি ইতিহাসের পাশাপাশি কল্পনারও একটি দরজা খুলে দেওয়া যায়, তাহলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন রোমে।

ঐতিহাসিক সত্য হলো, মাসটির নাম প্রথমে ছিল ‘সেক্সটিলিস’—অর্থাৎ ষষ্ঠ মাস। খ্রিষ্টপূর্ব ৮ সালে রোমান সিনেট জীবিত সম্রাট অগাস্টাস সিজারের সম্মানে এর নাম পরিবর্তন করে ‘আগস্টাস’ রাখে। অগাস্টাস পরে ১৯ আগস্ট, ১৪ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। অতএব তাঁর মৃত্যুর দিনকে কেন্দ্র করে মাসটির নামকরণ হয়েছিল—এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য নয়। বরং তাঁর জীবদ্দশাতেই ক্ষমতা ও বিজয়কে অমর করে রাখার উদ্দেশ্যে নামটি গৃহীত হয়েছিল।  

কিন্তু ইতিহাস যেখানে তথ্যের সীমারেখা টেনে দেয়, সাহিত্য সেখানে কল্পনার ঘোড়া ছুটিয়ে দিতে পারে। আসুন, কল্পনা করি—অগাস্টাস মারা যাওয়ার পর রোমের অভিজাতেরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করল, “এই সম্রাটকে আমরা চিরস্মরণীয় করে রাখব। যত দিন পৃথিবীতে ক্যালেন্ডার থাকবে, তত দিন তার নামও থাকবে।”

আরো পড়ুন পূর্বে প্রকাশিত পর্ব: বিশেষ উপধারাবাহিক: “শোক, কান্না ও বিপর্যয়ের বিস্ময়কর আগস্ট”—প্রথম পর্ব (ধারাবাহিকের মুখবন্ধসহ) │বিস্ময়কর আগস্ট: সম্রাটের নাম, নক্ষত্রের বৃষ্টি, লোকবিশ্বাস ও বিপর্যয়ের এক আশ্চর্য মাস │যে মাসের আকাশে উল্কা ঝরে, মাটিতে ফসল পাকে, ইতিহাসে সাম্রাজ্য ও বিপর্যয়ের স্মৃতি জেগে ওঠে—আগস্ট যেন একই সঙ্গে উৎসব, বিস্ময়, ভয় এবং রূপান্তরের দীর্ঘ উপাখ্যান

তখন হয়তো নিয়তির কোনো অদৃশ্য দেবতা মেঘের আড়ালে দাঁড়িয়ে পরিহাসের হাসি হেসেছিল। সে হয়তো বলেছিল— “মৃত মানুষকে তোরা সময়ের বুকে অমর করে রাখতে চাস? ক্ষমতার নামকে প্রতিটি মানুষের মুখে বসিয়ে দিতে চাস? বেশ, তার নাম থাকুক। কিন্তু মনে রাখিস, ক্ষমতার অহংকারের সঙ্গে মানুষের দুর্ভাগ্যের ছায়াও হাঁটে। তোরা যে মাসে সম্রাটকে অমর করলি, সেই মাসে সভ্যতা বারবার নিজের নিষ্ঠুর মুখ দেখবে। বিজয়ের নামে আসবে বিভাজন, রাষ্ট্রের নামে আসবে হত্যাকাণ্ড, প্রযুক্তির নামে নামবে আণবিক আগুন, আর ক্ষমতার নামে ঝরবে মানুষের রক্ত।”

এটি ইতিহাস নয়—নিছক কাব্যিক কল্পনা। তবু আগস্টের ঘটনাপুঞ্জের দিকে তাকালে কখনো কখনো মনে হয়, সেই কাল্পনিক অভিশাপ বুঝি পৃথিবীর বুক থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। অগাস্টাসের নামে নামকরণ করা মহিমান্বিত মাসটিই যেন যুগে যুগে ক্ষমতার সবচেয়ে অমহিমান্বিত রূপের সাক্ষী হয়েছে।

যখন আকাশ থেকে নেমেছিল মানবসভ্যতার তৈরি সূর্য

আগস্টের বিশ্বজনীন কান্নার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতীক হিরোশিমা ও নাগাসাকি। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমার আকাশে নিক্ষেপ করে ‘লিটল বয়’ নামের পারমাণবিক বোমা। একটি মাত্র বিস্ফোরণ মুহূর্তে শহরটিকে আগুন, ধ্বংসস্তূপ ও মানুষের আর্তনাদের সমুদ্রে পরিণত করে। বিস্ফোরণের প্রথম কয়েক মিনিটেই আনুমানিক ৮০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান; পরে পোড়া ক্ষত, তেজস্ক্রিয়তা, ক্যানসার ও অন্যান্য রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বহু গুণ বেড়ে যায়।

তিন দিন পর, ৯ আগস্ট, নাগাসাকিতে নিক্ষেপ করা হয় ‘ফ্যাট ম্যান’। সেখানেও মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যু ঘটে হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশুর। অর্থাৎ দিন দুটি ৫ ও ৬ আগস্ট নয়—ঐতিহাসিকভাবে সঠিক তারিখ ৬ ও ৯ আগস্ট ১৯৪৫। যুদ্ধের ইতিহাসে এই প্রথম এবং এখন পর্যন্ত শেষবার মানুষের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। হ্যারি এস. ট্রুম্যান প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরি

সেদিন আকাশে যে আলো জ্বলে উঠেছিল, সেটি সূর্যের আলো ছিল না; ছিল মানুষের তৈরি ক্ষুদ্র এক নরক। বিস্ফোরণে মানুষ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, কোথাও কোথাও দেয়াল ও পাথরের ওপর তার ছায়া থেকে গিয়েছিল, অথচ মানুষটি আর ছিল না। কোনো শিশুর হাতে হয়তো তখনো সকালের খাবার, কোনো মায়ের কোলে সন্তান, কোনো চিকিৎসক হাসপাতালে রোগী দেখছিলেন, কোনো ছাত্র বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ডে তাদের পৃথিবী বিলীন হয়ে যায়।

হিরোশিমা ও নাগাসাকি তাই শুধু জাপানের ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমগ্র মানবসভ্যতার নৈতিক পরাজয়। বিজ্ঞান মানুষের রোগ সারাতে পারে, অন্ধকার ঘরে আলো দিতে পারে, মহাকাশে পৌঁছে দিতে পারে—আবার ক্ষমতার হাতে সেই বিজ্ঞানই কয়েক মুহূর্তে একটি শহর নিশ্চিহ্ন করতে পারে। আগস্টের আকাশে ফেলা সেই দুটি বোমা পৃথিবীকে শিখিয়েছিল: মানুষের জ্ঞান যত বাড়ে, তার নৈতিকতা যদি সমানভাবে না বাড়ে, তবে উন্নত সভ্যতাই সবচেয়ে ভয়ংকর অসভ্যতায় পরিণত হতে পারে।

বাঙালির আগস্টের কান্না শুরু ১৯৪৭-এর দেশভাগে

বাঙালির আগস্টের দীর্ঘশ্বাস বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৯৪৭ সালে। ১৪ ও ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ভারত ভেঙে জন্ম নেয় পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্র। সেই বিভাজনের ভেতর দিয়ে বাংলা আবারও দ্বিখণ্ডিত হয়—পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ এবং পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। মানচিত্রে একটি রেখা টেনে দেওয়া হলো; কিন্তু সেই রেখা শুধু জমি ভাগ করেনি—ভাগ করেছে নদী, রেলপথ, বাজার, কৃষিজমি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, আত্মীয়তা, শৈশব এবং মানুষের মন।

ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের যুক্তি সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন কংগ্রেস নেতা, ইসলামি চিন্তাবিদ ও অবিভক্ত ভারতের পক্ষে অবস্থানকারী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বারবার সতর্ক করেছিলেন—দেশভাগ সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করবে না; বরং নতুন সংকট সৃষ্টি করবে। তাঁর আপত্তির কেন্দ্রে ছিল একটি মৌলিক সত্য: ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে ভূগোল ভাগ করা গেলেও মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও আত্মীয়তার সম্পর্ককে কেটে আলাদা করা যায় না।

আজাদের সতর্কবাণীকে সামনে রেখে একটি প্রশ্ন তোলা যায়: যদি মুসলমানের নিরাপত্তা ও ইসলামের স্বার্থই দেশভাগের প্রধান যুক্তি হয়ে থাকে, তবে উপমহাদেশের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ঐতিহ্য, মসজিদ, মাদ্রাসা, দরগাহ এবং সুফি সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান নতুন মুসলিম রাষ্ট্রের বাইরে রয়ে গেল কেন? আজমিরে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর দরগাহ, দিল্লিতে হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর স্মৃতিক্ষেত্র, দিল্লির জামে মসজিদ, দারুল উলুম দেওবন্দ, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াসহ অগণিত ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ভারতের সীমানার মধ্যে রয়ে গেল।

তবে এখানে একটি নৈতিক সতর্কতা জরুরি। এসব ঐতিহ্য ‘হিন্দুদের হাতে দিয়ে আসা হয়েছে’—এভাবে বললে ইতিহাসের জটিলতা সাম্প্রদায়িক দোষারোপে সংকুচিত হয়ে যায়। কোনো ধর্মের সাধারণ মানুষ দেশভাগের একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। এটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, অবিশ্বাস এবং ক্ষমতার দর-কষাকষির সম্মিলিত পরিণতি। দেশভাগে হিন্দু, মুসলমান, শিখ—সব সম্প্রদায়ের মানুষ নিহত, বাস্তুচ্যুত ও স্বজনহারা হয়েছে। তাই বিচারের কাঠগড়ায় কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে নয়, বিভাজনের রাজনীতি ও ঔপনিবেশিক কৌশলকে দাঁড় করাতে হবে।

১৯৪৭-এর আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতার উৎসব করেছে, কিন্তু বাংলার বহু পরিবার একই সময়ে বসতভিটা হারিয়েছে। একদিকে পতাকা উঠেছে; অন্যদিকে মানুষের হাতে উঠেছে উদ্বাস্তু জীবনের গাঁটরি। একদিকে জাতীয় সংগীত; অন্যদিকে রেলস্টেশনে হারিয়ে যাওয়া শিশুর কান্না। একদিকে রাষ্ট্রের জন্ম; অন্যদিকে মানুষের পরিচিত পৃথিবীর মৃত্যু।

এই ছিল বাঙালির আগস্টের প্রথম গভীর ক্ষত।

ভোমরা সীমান্তে একটি বিয়েবাড়ির কান্না

দেশভাগের পরিণতি শুধু ইতিহাসের বইয়ে বোঝা যায় না। কখনো একটি কাঁটাতারের বেড়া, একটি টিনের ঘর কিংবা সীমান্তের ওপারের বিয়েবাড়ি পুরো বিভাজনের নিষ্ঠুরতা চোখের সামনে তুলে ধরে।

সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্তে একবার গিয়ে দেখেছিলাম, সীমান্তরেখার পাশে বাংলাদেশের অংশে উঁচু মাটির একটি রাস্তা তৈরি করা হয়েছে—বাঁধের মতো দেখতে, সম্ভবত টহল ও চলাচলের সুবিধার্থে। রাস্তার পাশে একটি টিনের বাড়ি। সেই বাড়ি থেকে ভেসে আসছিল নারীদের সম্মিলিত কান্না। কান্নাটি শোকের মতো গভীর, অথচ সেখানে কারও মৃত্যুর সংবাদ ছিল না।

কৌতূহল থেকে বাড়িটিতে গিয়ে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে জিজ্ঞাসা করলাম, “মহিলারা এভাবে কাঁদছেন কেন?”

তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে প্রথমে বললেন, “কাঁটাতারের ওপারে তাকান।”

তাকিয়ে দেখলাম, সীমান্তের একেবারে কাছেই ভারতের অংশে আলো ঝলমল করছে। সুসজ্জিত একটি গেট, রঙিন বাতি, সাজানো বাড়ি—স্পষ্ট বোঝা যায়, সেখানে বিয়ের আয়োজন চলছে।

বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটি বললেন, “ওই বাড়িতে আজ আমাদেরই বংশের একটি মেয়ের বিয়ে। একেবারে আপন আত্মীয়। এই বাড়ির যেসব নারী কাঁদছেন, তাঁদের কেউ মেয়েটিকে কোলে–পিঠে করে মানুষ করেছেন। অথচ আজ এত কাছে থেকেও তাঁরা বিয়েতে যেতে পারছেন না।”

দূরত্ব হয়তো কয়েক শ গজও নয়। এখান থেকে মানুষের চলাচল দেখা যায়, আলোর রং বোঝা যায়, বাদ্যের শব্দ শোনা যায়। চাইলে উচ্চস্বরে ডাক দিলে হয়তো ওপারের আত্মীয় শুনতেও পাবেন। তবু সেখানে যেতে প্রয়োজন পাসপোর্ট, ভিসা, ইমিগ্রেশন, অনুমোদিত সীমান্তপথ এবং রাষ্ট্রের সম্মতি। চোখ যেতে পারে, কান যেতে পারে, বাতাস যেতে পারে, পাখি যেতে পারে—শুধু মানুষ যেতে পারে না।

কাঁটাতারের এপারে তখন কান্না, ওপারে বিয়ে। অথচ সেই কান্না ও আনন্দ একই পরিবারের।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত বলা হয়। মানচিত্রবিদ বলবেন—এটি সার্বভৌম দুই দেশের বিভাজনরেখা। নিরাপত্তাবিদ বলবেন—সীমান্ত রক্ষায় বেড়া প্রয়োজন। কিন্তু ওই নারীদের কাছে কাঁটাতারটির অন্য অর্থ ছিল। সেটি যেন তাঁদের বুকের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া একটি লোহার রেখা।

দেশভাগ আমাদের শুধু ভূখণ্ডগতভাবে আলাদা করেনি; বহু ক্ষেত্রে আত্মীয়তার স্বাভাবিক চলাচলকেও অপরাধের আশঙ্কায় বেঁধে ফেলেছে। সীমান্তের এক পাশে জন্ম নেওয়া মানুষ অন্য পাশে থাকা নিজের মামাবাড়ি, নানাবাড়ি, পীরের দরগাহ কিংবা পূর্বপুরুষের কবর দেখতে গেলেও রাষ্ট্রীয় অনুমতির মুখাপেক্ষী। দেশভাগ এভাবেই ভূগোল থেকে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করেছে।

হারানো কলকাতা, আসাম মুর্শিদাবাদের প্রশ্ন

দেশভাগের আলোচনায় ‘আমরা কলকাতা হারিয়েছি’, ‘আসামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়েছি’ কিংবা ‘মুর্শিদাবাদ কেন পূর্ববঙ্গে এলো না’—এ ধরনের আক্ষেপ প্রায়ই শোনা যায়। এসব আক্ষেপের মধ্যে ইতিহাস, আবেগ ও রাজনৈতিক কল্পনা একসঙ্গে কাজ করে।

কলকাতা ছিল অবিভক্ত বাংলার রাজধানী, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রকাশনা, শিল্প, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক চিন্তার প্রধান কেন্দ্র। পূর্ববঙ্গের কৃষিজ সম্পদ, বিশেষ করে পাট, কলকাতার শিল্প ও বন্দরের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। দেশভাগ সেই ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ছিন্ন করে দেয়। রেলপথ, নৌপথ, বাজার ও সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পূর্ববঙ্গ কাঁচামাল উৎপাদন করত, আর কলকাতা ছিল প্রক্রিয়াকরণ, ব্যবসা ও যোগাযোগের কেন্দ্র—র‍্যাডক্লিফের রেখা এই পারস্পরিক নির্ভরতাকে এক রাতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে পরিণত করে।

মুর্শিদাবাদ নিয়েও বাঙালির মনে প্রশ্ন আছে। নবাবি বাংলার রাজধানী হিসেবে অঞ্চলটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে মুসলমান জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। কিন্তু র‍্যাডক্লিফ সীমারেখা শুধু জনসংখ্যার একটি সূচক অনুসরণ করে আঁকা হয়নি; নদী, রেলপথ, প্রশাসনিক যোগাযোগ, বন্দর, কৌশলগত প্রয়োজন এবং রাজনৈতিক দর-কষাকষিও সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছিল। ফলে কোনো কোনো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ভারতে এবং কোনো কোনো হিন্দু-অধ্যুষিত অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যায়।

আসামের সিলেট নিয়ে ১৯৪৭ সালে গণভোট হয়েছিল; অধিকাংশ এলাকা পূর্ব পাকিস্তানে যুক্ত হলেও করিমগঞ্জের একটি অংশ ভারতে রয়ে যায়। ফলে দেশভাগ শুধু বাংলাকে দুই ভাগ করেনি; বাংলা ও আসামের বহু পুরোনো সামাজিক–অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও পুনর্বিন্যস্ত করেছে।

আমরা যদি বলি, দেশভাগে শুধু কিছু জেলা হারিয়েছি, তাহলে ক্ষতির গভীরতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না। আমরা হারিয়েছি একটি অবিভক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর। হারিয়েছি সহজ যাতায়াতের পথ। হারিয়েছি এমন এক ভূগোল, যেখানে নদীকে ভিসা নিতে হতো না, নৌকাকে পাসপোর্ট দেখাতে হতো না, আত্মীয়ের বিয়েতে যাওয়ার জন্য দূতাবাসের অনুমতি লাগত না।

স্বাধীনতা এল, কিন্তু আগস্টের অন্ধকার কাটল না

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় দ্বিজাতিতত্ত্বের সীমাবদ্ধতাকেই ঐতিহাসিকভাবে উন্মোচিত করে। ধর্মীয় পরিচয় এক হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ভিত্তিতে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণআন্দোলন এবং নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রথমবার নিজের স্বাধীন রাষ্ট্র ও লাল–সবুজের পতাকা পায়। এই সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার কথা বলেননি; তাঁর রাজনৈতিক স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ।

কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় আবার ফিরে আসে আগস্টের অন্ধকার।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫: একটি পরিবার নয়, একটি স্বপ্নের ওপর গুলি

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করা হয়। নিহত হন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তাঁদের সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেলসহ স্বজনেরা। বিদেশে অবস্থান করায় বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

সেদিন শুধু একজন রাষ্ট্রপতি কিংবা রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয়নি। স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান রাজনৈতিক প্রতীক এবং বাঙালির রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বকে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। শিশুপুত্র শেখ রাসেলের হত্যাকাণ্ড ঘটনাটিকে রাজনৈতিক হত্যার সীমা ছাড়িয়ে এক গভীর মানবিক বর্বরতায় পরিণত করে।

পলাশীর যুদ্ধ ১৭৫৭ সালে সংঘটিত হয়েছিল এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালে—ব্যবধান ২১৪ বছর, ২৪৬ বছর নয়। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলা ঔপনিবেশিক শাসন, অর্থনৈতিক শোষণ, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বৈষম্য অতিক্রম করেছে। সেই দীর্ঘ যাত্রার পর অর্জিত স্বাধীন রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে ১৫ আগস্ট হত্যা করা বাঙালির ইতিহাসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়।

বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার সমালোচনা ইতিহাসবিদেরা করবেন—গণতান্ত্রিক সমাজে তা হওয়াই উচিত। কিন্তু কোনো মতপার্থক্য সপরিবারে হত্যাকাণ্ডকে ন্যায়সংগত করে না। রাজনৈতিক বিরোধের জবাব হত্যা হলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিই ধসে পড়ে।

১৫ আগস্ট তাই কেবল একটি দলের শোক নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক রাজনীতি ও সভ্যতার জন্য সতর্কবার্তা। কারণ সেদিন গুলি লেগেছিল মানুষের শরীরে, কিন্তু রক্তাক্ত হয়েছিল রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাও।

২১ আগস্ট ২০০৪: জনসমাবেশে যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্র

এর প্রায় তিন দশক পর আরেকটি আগস্টে বাংলাদেশ দেখল প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। নিহত হন আইভি রহমানসহ ২৪ জন; আহত হন কয়েক শ মানুষ। অনেকে আজীবনের জন্য শরীরে স্প্লিন্টার বহন করেছেন।

সেদিন একটি জনসভা মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। বক্তৃতামঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ বুঝে ওঠার আগেই বিস্ফোরণ, ধোঁয়া, রক্ত এবং ছিন্নভিন্ন দেহে চারদিক ঢেকে যায়। রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষকে পরাজিত করার জন্য যুক্তি, নির্বাচন কিংবা জনসমর্থনের পরিবর্তে যদি গ্রেনেড ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা শুধু একটি দলের ওপর হামলা থাকে না—তা গণতন্ত্রের অস্তিত্বের ওপর আক্রমণ হয়ে ওঠে। এই মামলার বিচারিক ইতিহাসও জটিল। তবে বিচারিক পরিণতি যা-ই হোক, ২১ আগস্টের হামলায় ২৪ জন মানুষের মৃত্যু ও শত শত মানুষের আহত হওয়ার ঐতিহাসিক সত্য অমোচনীয়।

২১ আগস্ট আমাদের সামনে একটি নির্মম প্রশ্ন রেখে গেছে—কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানুষের সমাবেশে সামরিক গ্রেনেড পৌঁছে দেয়? কোন ঘৃণা একজন প্রতিপক্ষকে শুধু পরাজিত নয়, সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে চায়? আর কতবার রক্ত ঝরলে আমরা বুঝব, সহিংসতার ওপর কোনো টেকসই রাজনীতি নির্মিত হয় না?

উগ্রবাদ ভয়: আগস্টের আরেক অন্ধকার

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের ৬৩ জেলায় প্রায় একই সময়ে পাঁচ শতাধিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ঝালকাঠিতে দুই বিচারককে হত্যাসহ পরবর্তী জঙ্গি হামলাগুলো প্রমাণ করে, সংগঠিত উগ্রবাদ তখন রাষ্ট্র ও সমাজের গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করছিল।

বোমাগুলোর অধিকাংশের ক্ষমতা কম হলেও বার্তাটি ছিল ভয়াবহ: উগ্রবাদী শক্তি দেখাতে চেয়েছিল যে তারা একই সময়ে প্রায় পুরো দেশে হামলা চালাতে সক্ষম। তাদের লক্ষ্য শুধু মানুষ হত্যা নয়; রাষ্ট্রের আইন, বিচারব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং বহুত্ববাদী সমাজকে ভয় দেখানো।

এই ঘটনাও আগস্টে। যেন মাসটি বারবার আমাদের পরীক্ষা নিয়েছে—আমরা কি যুক্তির পাশে থাকব, নাকি অন্ধ বিশ্বাসের কাছে আত্মসমর্পণ করব? আমরা কি রাষ্ট্রকে নাগরিকের অধিকারের ভিত্তিতে নির্মাণ করব, নাকি ভয় ও সহিংসতাকে রাজনৈতিক শক্তির ভাষা হতে দেব?

জুলাইয়ের আন্দোলন যখন আগস্টের রক্তাক্ত দরজায় পৌঁছাল

২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। জুলাই মাসে শুরু হওয়া আন্দোলন দমন, প্রাণহানি, গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট বন্ধ এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে দ্রুত বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। জুলাইয়ের উত্তাল ঢেউ আগস্টে এসে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের দিকে গড়ায়।

কিন্তু পরিবর্তনের মূল্য ছিল ভয়াবহ। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধান ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করেছে এবং এ সময়ে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনুমান করেছে। নিহতদের মধ্যে অনেক শিশু ও তরুণ ছিল। প্রতিবেদনে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার গুলি, নির্যাতন, গ্রেপ্তার এবং অন্যান্য গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার পতনের পর প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ এবং স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনাও বাংলাদেশের মানবিক ক্ষতকে আরও গভীর করে।

আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিচয়, নেতৃত্ব কিংবা পরবর্তী ক্ষমতার বিন্যাস নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কেউ একে জুলাই বিপ্লব, কেউ জুলাই গণঅভ্যুত্থান, কেউ ছাত্র–জনতার আন্দোলন নামে অভিহিত করেন। কিন্তু নামের বিতর্কের আড়ালে নিহত মানুষের পরিচয় হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। কোনো মা তাঁর সন্তানকে রাজনৈতিক পরিভাষায় হারান না; তিনি হারান তাঁর জীবনের একটি অংশ। কোনো তরুণের চোখ নষ্ট হলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব তার অন্ধকার দূর করতে পারে না।

অধিকারের দাবিতে মানুষ রাজপথে নামবে—এটাই গণতন্ত্র। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই কণ্ঠ শোনা, নিরাপত্তা দেওয়া এবং সংলাপের পথ তৈরি করা। প্রতিবাদ দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে প্রতিশোধ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ কিংবা সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষের ওপর হামলাও কোনো মুক্তির রাজনীতি হতে পারে না।

২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট তাই শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এটি নিহত, আহত, দৃষ্টিশক্তি হারানো, কারাবন্দী, নির্যাতিত এবং আতঙ্কিত মানুষের ইতিহাস। আগস্ট আবারও দেখিয়েছে—রাজনীতির বড় বয়ানের নিচে সাধারণ মানুষের কান্নাই সবচেয়ে বেশি চাপা পড়ে।

আগস্ট কি সত্যিই অপয়া?

দেশভাগ ১৯৪৭, হিরোশিমা–নাগাসাকি ১৯৪৫, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, ১৭ আগস্ট ২০০৫, ২১ আগস্ট ২০০৪ এবং ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের রক্তক্ষয়—সব পাশাপাশি রাখলে আগস্টকে অপয়া মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মনে হয়, মাসটি এলেই ইতিহাসের অন্ধকার দরজাগুলো একে একে খুলে যায়।

কিন্তু একটু থেমে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—অপয়া আসলে কে? আগস্ট, নাকি মানুষ?

আগস্ট কোনো দেশ ভাগ করেনি; মানুষ করেছে। আগস্ট হিরোশিমায় বোমা ফেলেনি; রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে মানুষ ফেলেছে। আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি; অস্ত্রধারী মানুষ করেছে। আগস্ট জনসভায় গ্রেনেড ছোড়েনি; মানুষের ঘৃণা ও ষড়যন্ত্র তা করেছে। আগস্ট আন্দোলনকারীদের গুলি করেনি; ক্ষমতা রক্ষার নামে মানুষের তৈরি প্রতিষ্ঠান ও অস্ত্র তা করেছে।

অতএব আগস্টকে অভিশপ্ত বললে আমরা হয়তো নিজেদের দায় কিছুটা ক্যালেন্ডারের ওপর চাপিয়ে দিই। সময় নির্দোষ; মানুষের ক্ষমতালোভ, অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিহিংসা এবং বিচারহীনতাই প্রকৃত অমঙ্গল।

তবু রূপকের দিক থেকে আগস্ট বাঙালির কান্নার মাস। কারণ স্মৃতি সরল যুক্তিতে চলে না। কোনো পরিবার যে মাসে প্রিয়জন হারায়, পরবর্তী বছরগুলোতে সেই মাস এলেই তার বুক কেঁপে ওঠে। জাতির ক্ষেত্রেও তা-ই। আগস্ট এলেই আমাদের সম্মিলিত স্মৃতিতে কাঁটাতারের বেড়া, ধানমন্ডির রক্তাক্ত সিঁড়ি, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের গ্রেনেড, দেশজুড়ে বোমার শব্দ এবং তরুণের রক্তমাখা রাজপথ ফিরে আসে।

অভিশাপ ভাঙার উপায় স্মৃতিকে প্রতিহিংসায় নয়, শিক্ষায় রূপান্তর

যদি সত্যিই কোনো কাল্পনিক দেবতা অগাস্টাসের নামে রাখা মাসটিকে অভিশাপ দিয়ে থাকে, তবে সেই অভিশাপ ভাঙার ক্ষমতাও মানুষের হাতেই রয়েছে। তবে তার জন্য ইতিহাসকে দলীয় সম্পত্তি বানানো যাবে না। নিজের পক্ষের মৃত্যু স্মরণ করে অন্য পক্ষের মৃত্যু অস্বীকার করলে আগস্টের কান্না কখনো শেষ হবে না।

দেশভাগের স্মৃতি আমাদের সাম্প্রদায়িকতা নয়, সম্প্রীতি শেখাক। হিরোশিমা ও নাগাসাকি আমাদের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের প্রয়োজন বোঝাক। ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সর্বজনীন নৈতিক অবস্থান গড়ে তুলুক। ২১ আগস্ট শেখাক, বিরোধী মতকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত পুরো গণতন্ত্রকেই ক্ষতবিক্ষত করে। ১৭ আগস্ট শেখাক, ধর্মের নামে সন্ত্রাস ধর্মকেই কলঙ্কিত করে। আর ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট আমাদের মনে করিয়ে দিক—রাষ্ট্রের চেয়ে মানুষের জীবন বড়, ক্ষমতার চেয়ে অধিকার বড় এবং বিজয়ের চেয়ে ন্যায়বিচার অধিক স্থায়ী।

ভোমরা সীমান্তের সেই বাড়ির নারীরা হয়তো এখনো কোনো বিয়ের আলো দেখে কাঁদেন। সীমান্তের ওপারের আত্মীয়ও হয়তো একই সময়ে আনন্দের ভেতরে শূন্যতা অনুভব করেন। তাঁদের কান্না আমাদের বলে—রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় হতে পারে, সীমান্তও রাজনৈতিক বাস্তবতা; কিন্তু মানুষের সম্পর্ককে কাঁটাতার দিয়ে সম্পূর্ণ ভাগ করা যায় না।

ব্রাজিলের মানুষ প্রবাদে আগস্টকে দুর্ভাগ্যের মাস বলেছে। বাঙালিরা হয়তো তেমন প্রবাদ তৈরি করেনি, কিন্তু আমাদের ইতিহাস আগস্টকে অশ্রুর ভাষায় লিখেছে। এই মাসে আনন্দ আছে—স্বাধীনতার উৎসব আছে, গণজাগরণ আছে, পরিবর্তনের সম্ভাবনাও আছে। কিন্তু প্রতিটি আলোর পাশে এত দীর্ঘ ছায়া যে আগস্ট এলেই বাঙালির মন অকারণে ভারী হয়ে ওঠে না।

আগস্ট তাই অপয়া নয়—আগস্ট একটি আয়না। এই আয়নায় আমরা দেখি ক্ষমতার অহংকার, বিভাজনের নিষ্ঠুরতা, যুদ্ধের উন্মত্ততা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মুখ। একই সঙ্গে দেখি প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা এবং ন্যায়বিচারের জন্য মানুষের অনমনীয় সংগ্রাম।

মাসটির কোনো অভিশাপ থাকলে সেটি আকাশ থেকে নামেনি; আমরা মানুষই তা তৈরি করেছি। আর তাই সেই অভিশাপ মোচনের দায়িত্বও আমাদের। ইতিহাসকে সত্যের সঙ্গে স্মরণ করে, সব হত্যার বিরুদ্ধে সমান নৈতিক অবস্থান নিয়ে, বিভাজনের বদলে মানবিক সংযোগ গড়ে তুলে এবং ক্ষমতার ওপর নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করেই আগস্টকে কান্নার মাস থেকে শিক্ষার মাসে রূপান্তর করা সম্ভব। নতুবা প্রতি বছর আগস্ট ফিরে আসবে—ক্যালেন্ডারে একটি মাস হিসেবে নয়, আমাদের অসমাপ্ত বিচার, অমীমাংসিত ইতিহাস এবং অশ্রুসিক্ত বিবেকের দরজায় কড়া নাড়া এক পুরোনো প্রশ্ন হয়ে।

উপসংহার: আগস্টের কান্না থেকে ইতিহাসের শিক্ষা

আগস্টের ইতিহাস আমাদের সামনে একই সঙ্গে শোক, বিস্ময় এবং আত্মজিজ্ঞাসার এক বিশাল আয়না তুলে ধরে। দেশভাগের কাঁটাতার, হিরোশিমা–নাগাসাকির আণবিক ছাই, ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত ভোর, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ১৭ আগস্টের দেশব্যাপী বোমা বিস্ফোরণ এবং ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের প্রাণহানি—প্রতিটি ঘটনা আলাদা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হলেও এগুলোর গভীরে একটি অভিন্ন সত্য রয়েছে: ক্ষমতার উন্মত্ততা, অসহিষ্ণুতা, প্রতিহিংসা, সাম্প্রদায়িকতা এবং বিচারহীনতার মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়।

তাই আগস্টকে নিছক ‘অপয়া মাস’ বলে দায়মুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কোনো মাস যুদ্ধ শুরু করে না, সীমান্ত টানে না, বোমা ফেলে না কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করে না। এসবের পেছনে থাকে মানুষের সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রের নীতি, ক্ষমতাকেন্দ্রিক ষড়যন্ত্র এবং নৈতিক ব্যর্থতা। সময়কে অভিশপ্ত বললে ইতিহাসের প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায়; অথচ ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে আমাদের ঘটনার পাশাপাশি তার কারণ, দায় এবং পরিণতিকেও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে।

আগস্টের শোককে অর্থবহ করে তোলার একমাত্র পথ হলো স্মৃতিকে প্রতিহিংসার অস্ত্র না বানিয়ে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক শিক্ষার ভিত্তিতে রূপান্তর করা। নিজের পক্ষের নিহত মানুষকে স্মরণ করে অন্য পক্ষের মৃত্যু অস্বীকার করলে কোনো জাতীয় স্মৃতি পূর্ণতা পায় না। প্রতিটি নিরপরাধ প্রাণের মূল্য সমান—সে যে দল, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়েরই হোক না কেন। এই সর্বজনীন নৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠিত না হলে ইতিহাসের ক্ষত শুকাবে না; বরং নতুন নামে, নতুন সময়ে একই সহিংসতা ফিরে আসবে।

আগস্ট তাই কেবল শোক পালনের মাস নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের আত্মসমালোচনার সময়। এই মাস আমাদের শেখায়—ক্ষমতার চেয়ে মানুষের জীবন বড়, রাজনৈতিক বিজয়ের চেয়ে ন্যায়বিচার স্থায়ী, আর প্রতিহিংসার চেয়ে সহমর্মিতা অধিক শক্তিশালী। ইতিহাসের অশ্রুকে যদি আমরা জবাবদিহি, সহনশীলতা ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের অঙ্গীকারে রূপান্তর করতে পারি, তবেই আগস্টের অসংখ্য আত্মত্যাগ ও বেদনা ভবিষ্যতের জন্য কোনো অর্থ বহন করবে।

চূড়ান্ত প্রতিফলন: আগস্ট একটি মাস নয়, বিবেকের দরজায় কড়া নাড়া প্রশ্ন

প্রতি বছর আগস্ট ফিরে আসে একই একত্রিশ দিন নিয়ে; কিন্তু আমরা তাকে গ্রহণ করি স্মৃতির ভিন্ন ভিন্ন ভার নিয়ে। কারও কাছে এই মাস স্বাধীনতার আনন্দ, কারও কাছে হারানো স্বজনের মুখ, কারও কাছে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার দুঃসহ স্মৃতি, আবার কারও কাছে সীমান্তের ওপারে ফেলে আসা বাড়ি ও সম্পর্কের দীর্ঘশ্বাস। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে তারিখগুলো স্থির থাকলেও মানুষের বেদনা কখনো স্থির থাকে না—তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গল্প, ছবি, নীরবতা এবং অশ্রুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।

ভোমরা সীমান্তের বিচ্ছিন্ন পরিবার, হিরোশিমার ছায়া হয়ে যাওয়া মানুষ, ধানমন্ডির রক্তাক্ত সিঁড়ি, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে পড়ে থাকা জুতা, দেশজুড়ে একযোগে বিস্ফোরিত বোমা কিংবা ২০২৪ সালের রাজপথে নিথর হয়ে যাওয়া তরুণ—এরা কেবল ইতিহাসের সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে ছিল একটি নাম, একটি পরিবার, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং ঘরে ফেরার প্রতীক্ষা। ইতিহাসকে মানবিকভাবে পাঠ করার অর্থ হলো সেই সংখ্যাগুলোর ভেতর থেকে মানুষের মুখগুলোকে আবার দৃশ্যমান করে তোলা।

অতএব আগস্টের প্রকৃত অভিশাপ কোনো লোকবিশ্বাসে নয়; তা নিহিত মানুষের বিস্মৃতিতে। যখন আমরা কেবল নিজেদের সুবিধামতো ইতিহাস স্মরণ করি, অপরের কান্নাকে অস্বীকার করি এবং সহিংসতার বিচারকে রাজনৈতিক আনুগত্যের পাল্লায় মাপি—তখনই নতুন বিপর্যয়ের ভিত্তি তৈরি হয়। অন্যদিকে সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ স্মৃতি মানুষকে প্রতিশোধ নয়, প্রতিরোধ শেখায়—ঘৃণার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং মানুষের মর্যাদা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ।

শেষ পর্যন্ত আগস্ট অপয়া নয়—আগস্ট আমাদেরই নির্মিত ইতিহাসের আয়না। সেই আয়নায় আমরা যেমন ক্ষমতার নিষ্ঠুরতা দেখি, তেমনি দেখি মানুষের প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ, ভালোবাসা এবং পুনর্গঠনের অসীম সামর্থ্য। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই আয়নায় নিজেদের ভুল স্বীকার করার সাহস দেখাব? আমরা কি সব হত্যার বিরুদ্ধে একই নৈতিক ভাষায় কথা বলব? আমরা কি স্মৃতিকে বিভাজনের দেয়াল না বানিয়ে ভবিষ্যৎ রক্ষার সেতুতে পরিণত করতে পারব?

উত্তরটি আগস্টের কাছে নেই; উত্তরটি আমাদের কাছেই। কারণ ইতিহাস নিজে কখনো বদলায় না—বদলায় তাকে পাঠ করা মানুষ। আমরা যদি সত্য, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা এবং মানবিক মর্যাদাকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করতে পারি, তবে আগস্ট একদিন শুধু কান্নার মাস হয়ে থাকবে না; হয়ে উঠবে ভুল থেকে শেখা, বিবেক জাগানো এবং নতুন মানবিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের মাস। আর যদি তা না পারি, তবে প্রতি বছর আগস্ট আমাদের অশ্রুসিক্ত বিবেকের দরজায় ফিরে এসে একই প্রশ্ন করবে—আমরা কি ইতিহাস থেকে সত্যিই কিছু শিখেছি, নাকি কেবল নতুন পতাকা ও নতুন স্লোগানের আড়ালে পুরোনো ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি করে চলেছি?

লেখক: অধ্যাপক . মাহবুবুর রহমান লিটু, শিক্ষা  গবেষণা ইনস্টিটিউটঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা  সম্পাদকঅধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#বিস্ময়করআগস্ট #শোককান্নাওবিপর্যয় #বাঙালিরআগস্ট #অপয়াআগস্ট #আগস্টেরইতিহাস #দেশভাগ #বাংলারদেশভাগ #কাঁটাতারেরকান্না #হিরোশিমা #নাগাসাকি #পারমাণবিকবোমা #পনেরোইআগস্ট #বঙ্গবন্ধু #শেখরাসেল #একুশেআগস্ট #গ্রেনেডহামলা #সতেরোইআগস্ট #জুলাইগণঅভ্যুত্থান #জুলাইআগস্ট২০২৪ #মানবাধিকার #রাজনৈতিকসহিংসতা #সাম্প্রদায়িকতা #উগ্রবাদ #গণতন্ত্র #ন্যায়বিচার #ইতিহাসেরশিক্ষা #মানবতাপ্রথম #অধিকারপত্র #OdhikarPatra #AmazingAugust #Partition1947 #Hiroshima #Nagasaki #August21 #JulyUprising #HumanRights #JusticeAndAccountability



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: