odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Wednesday, 4th February 2026, ৪th February ২০২৬
২০২৬ সালের শবে বরাত এবং বাংলাদেশের ঐতিহাসিক রূপান্তর: আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির এক সমন্বিত মহাপর্যালোচনা —হৃদয়ের কাঁটা উপড়ে ফেলে আত্মশুদ্ধি ও ক্ষমাশীলতার পথে এক অনন্য আধ্যাত্মিক রূপান্তর

মহিমান্বিত রজনীর আলোকবর্তিকা: ২০২৬ সালের শবে বরাত ও ফ্যাসাদমুক্ত বাংলাদেশের প্রার্থনা

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৪ February ২০২৬ ০৩:১২

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৪ February ২০২৬ ০৩:১২

বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম

২০২৬ সালের শবে বরাত বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণ। ‘মুশাহিন’ বা বিদ্বেষ বর্জনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশ ও জাতির শান্তির জন্য এক চিলতে প্রার্থনার প্রেক্ষাপটে এই বিশেষ সম্পাদকীয়। জানুন মুক্তির এই রজনীতে ক্ষমা ও নিরাময়ের আধ্যাত্মিক মহিমা।

শাবানের রূপালি চাঁদ যখন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির হিমেল কুয়াশা চিরে উদিত হয়, তখন বাংলার প্রতিটি জনপদ এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহে জেগে ওঠে। আজ পবিত্র শবে বরাত—মুক্তির রজনী, যা কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং এক হাজার বছরের সংস্কৃতি আর বিশ্বাসের সংমিশ্রণ । এবারের শবে বরাত বাংলাদেশের জন্য এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, কারণ এটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন জাতি তার ইতিহাসের এক নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ।

শবে বরাত: ভাষাতাত্ত্বিক উৎস এবং ধর্মীয় দর্শনের গভীরতা

 ‘শবে বরাত’ পরিভাষাটি মূলত ফারসি এবং আরবি শব্দের এক সার্থক সমন্বয়, যা দক্ষিণ এশীয় মুসলিম জনমানসে বিশেষভাবে প্রোথিত। ফারসি ভাষায় ‘শব’ (Shab) শব্দের অর্থ হলো রাত এবং ‘বরাত’ (Barat) শব্দটি আরবি ‘বারাআত’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো মুক্তি, নাজাত বা নিষ্কৃতি । সুতরাং শাব্দিক ও রূপক অর্থে এটি ‘মুক্তির রাত’ হিসেবে পরিচিত। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় এই রাতটিকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ (Lailatun Nisfi min Shaban) বা অর্ধ-শাবানের রজনী বলা হয়, কারণ এটি হিজরি চন্দ্রবর্ষের অষ্টম মাস শাবানের ঠিক মধ্যভাগে অর্থাৎ ১৪ই শাবান দিবাগত রাতে পালিত হয় ।   

বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের নিকট এই রজনীটি ‘লাইলাতুল বারাআত’ বা ‘পাপ ও কলুষতা থেকে নিষ্কৃতি লাভের রজনী’ হিসেবে স্বীকৃত। ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ তাঁর করুণা ও মাগফিরাতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন এবং অগণিত সৃষ্টিকে তাঁর রহমতের চাদরে আবৃত করেন ।

ইসলামি আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে শবে বরাত একটি গভীর অর্থবহ ও বহুস্তরবিশিষ্ট রজনী হিসেবে পরিচিত, যার নাম ও তাৎপর্য বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিতে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ফারসি ও বাংলার মিশ্র প্রেক্ষাপটে প্রচলিত ‘শবে বরাত’ শব্দবন্ধটি মূলত ‘মুক্তির রাত’ বা ‘ভাগ্য নির্ধারণের রাত’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে ‘শব’ অর্থ রাত্রি এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা দায়মুক্তি—এই দুটি ধারণা মিলিয়ে এটি এমন এক রাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে, যখন মানুষ অতীতের ভুল ও গুনাহ থেকে মুক্তি প্রার্থনা করে এবং ভবিষ্যতের জন্য আল্লাহর করুণা কামনা করে। বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান সমাজে এই নামটি কেবল একটি ধর্মীয় পরিভাষা নয়, বরং আশা, ক্ষমা ও আত্মশুদ্ধির আবেগময় এক সাংস্কৃতিক স্মৃতিচিহ্ন।

আরবি পরিভাষায় এই রাতকে বলা হয় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’, যার অর্থ শাবান মাসের মধ্যবর্তী মহিমান্বিত রজনী। এই নামকরণে সময়ের নির্দিষ্টতা ও ধর্মীয় গুরুত্ব একসঙ্গে প্রতিফলিত হয়। শাবান মাসের মাঝামাঝি অবস্থান করায় এটি রমজানের পূর্বপ্রস্তুতির এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত, যেখানে আত্মসমালোচনা, ইবাদতে মনোনিবেশ এবং নৈতিক প্রস্তুতির আবহ তৈরি হয়। এখানে রাতটি শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

একই আরবি ভাষার ভেতরেই ‘লাইলাতুল বারাআত’ নামটি আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। ‘বারাআত’ শব্দের অর্থ পঙ্কিলতা, দায় বা গুনাহ থেকে নিষ্কৃতি। এই নামের মাধ্যমে শবে বরাতকে এমন এক রজনী হিসেবে কল্পনা করা হয়, যখন আল্লাহর অশেষ করুণায় বান্দা পাপের বোঝা থেকে মুক্তি লাভের সুযোগ পায়। এটি আত্মিক পুনর্জন্মের প্রতীক, যেখানে অনুতাপ, ক্ষমাপ্রার্থনা ও নৈতিক শুদ্ধতা একত্রে মিলিত হয়।

তুর্কি মুসলিম সংস্কৃতিতে শবে বরাত পরিচিত ‘বিরাত কান্দিলি’ নামে, যার মধ্যে রয়েছে আলো ও প্রদীপের শক্তিশালী প্রতীকী উপস্থিতি। ‘কান্দিল’ অর্থ প্রদীপ বা আলোকসজ্জা, যা অন্ধকারের মধ্যে আলোর আগমন এবং অন্তরের অন্ধকার দূর হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। এই নামের মধ্য দিয়ে শবে বরাত কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের রাত নয়, বরং সামষ্টিকভাবে আলোর উৎসবের মতো এক আধ্যাত্মিক উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয় ও ইন্দোনেশীয় মুসলিম সমাজে এই রাতকে বলা হয় ‘নিসফু শাবান’, যার অর্থ শাবান মাসের অর্ধাংশ। এই নামকরণে সময়গত নিরিখের পাশাপাশি প্রস্তুতির ভাবনা প্রবলভাবে উপস্থিত। নিসফু শাবান সেখানে আত্মিক প্রস্তুতি, সম্পর্কের পুনর্মিলন এবং আসন্ন রমজানের জন্য মানসিক ও নৈতিক প্রস্তুতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এভাবে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিতে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হলেও শবে বরাতের মূল সুর একটাই—মুক্তি, ক্ষমা, আলো ও আত্মশুদ্ধির সন্ধান।

এই নামকরণের বৈচিত্র্য কেবল শব্দের খেলা নয়, বরং এটি নির্দেশ করে যে ইসলামের মৌলিক বৈশ্বিক কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করেও এই উৎসবটি বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা এবং ইতিহাসের সাথে মিশে একটি বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে । ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এই ‘মুক্তি’র ধারণাটি কেবল পারলৌকিক নয়, বরং একটি অবরুদ্ধ রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা থেকে নাগরিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। 

ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি: হাদিস শাস্ত্র আলেমদের বিশদ দৃষ্টিভঙ্গি

শবে বরাত পালনকে কেন্দ্র করে ইসলামি স্কলারদের মধ্যে বিভিন্ন স্তরের মতভেদ থাকলেও, এর মৌলিক ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসসমূহকে বহু প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ‘হাসান’ (উত্তম) বা ‘সহিহ’ (বিশুদ্ধ) হিসেবে গণ্য করেছেন। যদিও পবিত্র কুরআনে এই রাতের কথা সরাসরি নামসহ উল্লেখ নেই, তবে অনেক মুফাসসির সূরা আদ-দুখানের ১-৪ আয়াতে বর্ণিত ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রজনী বলতে শবে বরাতকেই নির্দেশ করেছেন বলে উল্লেখ করেন, যদিও বৈশ্বিক স্কলারদের একটি বড় অংশ এটিকে লাইলাতুল কদর হিসেবে চিহ্নিত করেন ।   

হাদিসের প্রামাণ্যতা বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা

শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে অন্তত ১০ জন সাহাবি থেকে বিভিন্ন সূত্রে হাদিস বর্ণিত হয়েছে । এর মধ্যে হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন: "আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী (মুশাহিন) ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।"।

মুহাদ্দিস ইবনে হিব্বান তাঁর ‘কিতাবুস সহিহ’-তে এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং আধুনিক সময়ের বিখ্যাত হাদিস বিশারদ নাসিরুদ্দিন আল-বানি একে সহিহ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য একটি হাদিসে পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এই রাতে একাকী মদিনার ‘জান্নাতুল বাকি’ কবরস্থানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ সময় সেজদায় থেকে মৃতদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই রাতে আল্লাহ বনি কালব গোত্রের মেষের পশমের চেয়েও বেশিসংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেন ।

হাদিসের আলোকে শবে বরাতকে ইসলামি ঐতিহ্যে এক অনন্য ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ রজনী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিজগতের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং শিরক ও হিংসায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ছাড়া প্রায় সকলের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। এই ধারণা শবে বরাতকে অনুতাপ, আত্মসমালোচনা ও ক্ষমাপ্রার্থনার এক বিরল সুযোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে বান্দা নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আল্লাহর অসীম করুণার আশ্রয় লাভের আশা করতে পারে।

শবে বরাতের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহর নিকটতম আকাশে বিশেষ অবতরণের ধারণা। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, সূর্যাস্তের পর থেকে ফজর পর্যন্ত এই রাতে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে আহ্বান জানাতে থাকেন—কে ক্ষমা চাইবে, কে রিজিক প্রার্থনা করবে, কে বিপদ থেকে মুক্তি চাইবে। এই আহ্বান রাতটিকে কেবল স্মরণ বা ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এক জীবন্ত, সংলাপমুখর আধ্যাত্মিক সময় হিসেবে রূপ দেয়, যেখানে বান্দা ও রবের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

এই রাতের সঙ্গে পূর্বপুরুষদের জন্য দোয়ার একটি গভীর সম্পর্কও হাদিসে প্রতিফলিত হয়েছে। বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) শবে বরাতের রাতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে মৃত মুসলমানদের জন্য দোয়া করেছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শবে বরাত কেবল জীবিতদের আত্মশুদ্ধির রাত নয়, বরং মৃতদের জন্য মাগফিরাত কামনারও এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এতে জীবিত ও মৃতের মাঝে আধ্যাত্মিক সংযোগের অনুভূতি তৈরি হয় এবং মুসলিম সমাজে পারিবারিক ও প্রজন্মগত দায়বদ্ধতার চেতনা আরও গভীর হয়।

অনেক আলেমের আলোচনায় শবে বরাতের সঙ্গে ভাগ্য নির্ধারণের একটি ধারণাও যুক্ত হয়েছে। কিছু হাদিস ও ব্যাখ্যায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই রাতে আগামী এক বছরের জীবন, মৃত্যু ও রিজিকসংক্রান্ত বিষয়সমূহের একটি সিদ্ধান্তমূলক রূপরেখা নির্ধারিত হয়। যদিও এই বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবুও এই ধারণা মানুষের মনে দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা জাগ্রত করে—যেন সে নিজের কর্ম, নিয়ত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতের নিকটবর্তী হতে পারে।

সবশেষে, শবে বরাতকে দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হাদিসে উল্লেখ আছে, বছরে এমন কয়েকটি রাত রয়েছে যখন দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না, আর শবে বরাত সেই বিশেষ রাতগুলোর অন্যতম। এই বিশ্বাস মুসলমানদেরকে গভীর রাতে ইবাদত, দোয়া ও ইস্তিগফারে মনোনিবেশ করতে অনুপ্রাণিত করে। এভাবে শবে বরাত ক্ষমা, করুণা, স্মরণ এবং ভবিষ্যতের জন্য আত্মিক প্রস্তুতির এক সম্মিলিত রজনী হিসেবে ইসলামী ধর্মীয় চেতনায় বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।

ওলামাদের বিশ্লেষণ এবং শাস্ত্রীয় সতর্কতা

শবে বরাত পালনকে কেন্দ্র করে আধুনিক মুসলিম উম্মাহর মধ্যে তিনটি প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, সালাফি বা কঠোর রক্ষণশীল আলেমগণ এই রাতকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ ইবাদত বা সম্মিলিত অনুষ্ঠানকে ‘বিদআত’ বা নব-উদ্ভাবিত ধর্মীয় প্রথা হিসেবে মনে করেন, কারণ তাঁদের মতে এই সংক্রান্ত অনেক হাদিসের সনদ অত্যন্ত দুর্বল। দ্বিতীয়ত, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের একটি বড় অংশ এবং দেওবন্দি ধারার আলেমগণ মনে করেন যে, যদিও সম্মিলিত উৎসব প্রমাণিত নয়, তবে ব্যক্তিগতভাবে নফল নামাজ, তিলাওয়াত ও পরবর্তী দিনে রোজা রাখা মুস্তাহাব এবং অত্যন্ত সওয়াবের কাজ । তৃতীয়ত, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশ এবং তুরস্কে এই রাতটিকে একটি সামাজিক উৎসবে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যা সুফি ঐতিহ্যের প্রভাবে একটি সমৃদ্ধ রূপ লাভ করেছে ।

মুশাহিনবা বিদ্বেষপোষণকারী: একটি গভীর দার্শনিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

শবে বরাতের আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি প্রধান শর্ত হলো মহান আল্লাহর ক্ষমা লাভের যোগ্যতা অর্জন। হাদিসের বর্ণনায় বারবার দুইটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের কথা বলা হয়েছে যারা এই রাতের অবারিত ক্ষমার বাইরে অবস্থান করেন: মুশরিক এবং মুশাহিন। শিরক বা আল্লাহর সার্বভৌমত্বে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করার বিষয়টি আধ্যাত্মিক অপরাধের শীর্ষে থাকলেও, ‘মুশাহিন’ বা বিদ্বেষপোষণকারীর বিষয়টি সমকালীন সমাজ কাঠামোর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

মুশাহিন শব্দের অর্থ এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব:

আরবি ‘মুশাহিন’ (Mushahin) শব্দের অর্থ হলো এমন ব্যক্তি যার অন্তরে অন্যের প্রতি অহেতুক হিংসা, ঘৃণা, দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা বা প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহা জমা হয়ে থাকে । ইসলামি দর্শনে আনুষ্ঠানিক ইবাদতের চেয়ে হৃদয়ের নির্মলতা ও সামাজিক সম্প্রীতিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন মুমিন সারারাত কপালে সিজদার চিহ্ন ফেললেও যদি তার অন্তরে অন্য কোনো মানুষের প্রতি অমূলক আক্রোশ থাকে, তবে তার সেই কঠোর সাধনা আধ্যাত্মিকভাবে মূল্যহীন হয়ে পড়ে । বিদ্বেষকে একটি সংক্রামক ব্যাধির সাথে তুলনা করা হয়েছে যা মানুষের সকল সুকৃতি বা নেক আমলকে নষ্ট করে দেয়। হাদিসের বর্ণনায় বলা হয়েছে, এটি ঠিক সেই আগুনের মতো যা শুষ্ক লাকড়িকে মুহূর্তের মধ্যে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয় । এই দর্শনের একটি বড় সামাজিক শিক্ষা হলো—সৃষ্টিকর্তার ক্ষমা পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো সৃষ্টির প্রতি ক্ষমাশীল হওয়া। অহংকার বিসর্জন দিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন পুনরায় স্থাপন করাই হলো শবে বরাতের প্রকৃত এবং নীরব ইবাদত ।

ক্ষমা বঞ্চিতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সমাজ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা:

বহারকারীর প্রদত্ত তথ্য এবং নির্ভরযোগ্য হাদিসসমূহের আলোকে শবে বরাতের মহিমান্বিত রাতেও যারা বিশেষ ক্ষমা ও মাগফিরাত থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, তাদের একটি বিশ্লেষণাত্মক তালিকা আলোচনা করা  হলো। হাদিসের আলোকে শবে বরাতের মহিমান্বিত রাতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা ও মাগফিরাতের এক অনন্য সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও কিছু শ্রেণির মানুষ এই করুণা থেকে বঞ্চিত থাকতে পারেন—এমন সতর্কবার্তাও ইসলামী বর্ণনায় এসেছে। এই বঞ্চনার মূল কারণ কেবল ব্যক্তিগত গুনাহ নয়, বরং এমন কিছু বিশ্বাস, আচরণ ও সামাজিক অবস্থান, যা তাওহীদ, ন্যায়বিচার এবং মানবিক সম্পর্কের মৌলিক চেতনাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এর মধ্যে প্রথমেই আসে মুশরিকদের প্রসঙ্গ। যারা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন না করে শিরকে লিপ্ত থাকে, তারা তাওহীদের মূল ভিত্তিকেই অস্বীকার করে। শবে বরাতের ক্ষমা মূলত আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে শুদ্ধ করার সুযোগ; অথচ শিরক সেই সম্পর্কের গোড়াতেই আঘাত হানে। এ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো খাঁটি তওবার মাধ্যমে একত্ববাদের পথে ফিরে আসা এবং আল্লাহর সঙ্গে নিঃশর্ত আনুগত্যের সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।

সুদখোর বা সুদী কারবারে লিপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও কঠোর সতর্কতা এসেছে। সুদ কেবল একটি অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি গরিবের অধিকার হরণ, সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি এবং নৈতিক শোষণের একটি কাঠামো তৈরি করে। এই কারণে শবে বরাতের মতো করুণাময় রাতে তাদের বঞ্চনার কথা বলা হয়েছে। এর প্রতিকার হিসেবে সুদী লেনদেন সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা, অবৈধ সম্পদ থেকে নিজেকে মুক্ত করা এবং ন্যায্য ও মানবিক অর্থনৈতিক চর্চায় ফিরে আসার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

গণক ও জাদুকরদের বিষয়টিও আধ্যাত্মিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তারা অতীন্দ্রিয় শক্তি, ভাগ্য গণনা বা জাদুর মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাসকে বিভ্রান্ত করে এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার জায়গায় ভয় ও কুসংস্কার প্রতিষ্ঠা করে। এই ধরনের আচরণ তাওহীদ ও আকিদার পরিপন্থী হওয়ায় শবে বরাতের মাগফিরাত থেকে বঞ্চনার কারণ হতে পারে। এখান থেকে ফিরে আসার পথ হলো শরিয়তবিরোধী অন্ধকার চর্চা ত্যাগ করে আল্লাহর কুদরতের ওপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করা।

কৃপণতা ও মদ্যপানের মতো অভ্যাসগুলোও এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য। কৃপণ ব্যক্তি সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব ভুলে যায়, আর মদ্যপান ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়। এই দুটি প্রবণতাই সামাজিক সহমর্মিতা ও আত্মসংযমের বিপরীত। তাই শবে বরাতের করুণা পেতে হলে মাদক বর্জন, অন্তরের কৃপণতা দূর করা এবং দান-সদকার মাধ্যমে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ব্যভিচারীদের প্রসঙ্গ এসেছে পারিবারিক ও সামাজিক পবিত্রতার প্রেক্ষাপটে। ব্যভিচার কেবল ব্যক্তিগত গুনাহ নয়, এটি পরিবারব্যবস্থা, বিশ্বাস ও চারিত্রিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়। এই কারণে এমন ব্যক্তিরা শবে বরাতের বিশেষ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে হাদিসে ইঙ্গিত রয়েছে। এর প্রতিকার হলো চারিত্রিক পবিত্রতা অর্জন, নফসের লাগাম টেনে ধরা এবং আল্লাহভীতির মাধ্যমে জীবনকে সংযমের পথে ফিরিয়ে আনা।

পিতা-মাতাকে কষ্টদানকারীদের ব্যাপারটিও ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর। মা-বাবা পরিবার ও সমাজের ভিত্তি; তাঁদের অবহেলা বা কষ্ট দেওয়া মানে সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেওয়া। তাই শবে বরাতের মতো বরকতময় রাতেও তাদের জন্য বঞ্চনার সতর্কতা এসেছে। এখান থেকে উত্তরণের পথ হলো আন্তরিকভাবে মা-বাবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাঁদের সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং আজীবন সেবা ও সম্মানের সঙ্গে তাঁদের পাশে থাকা।

সবশেষে বিদ্বেষী বা মুশাহিনদের কথা উল্লেখযোগ্য, যারা অন্তরে শত্রুতা পুষে রাখে এবং সামাজিক সংহতিকে নষ্ট করে। হিংসা ও বিদ্বেষ মানুষকে ক্ষমা ও মাগফিরাতের আবহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। শবে বরাতের প্রকৃত শিক্ষা হলো মন পরিষ্কার করা, সব শত্রুতা ভুলে যাওয়া এবং পারস্পরিক কোলাকুলি ও সমঝোতার মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করা। এই আত্মিক ও সামাজিক পরিশুদ্ধতাই শবে বরাতের মর্মবাণীকে বাস্তব জীবনে অর্থবহ করে তোলে।

এই সতর্কবার্তাগুলো কেবল পরকালীন শাস্তির ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল, শোষণমুক্ত এবং ন্যায়পরায়ণ সমাজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

বাংলার শবে বরাত: সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক বিবর্তন

বাংলাদেশের জনপদে শবে বরাত কেবল একটি ধর্মীয় দিবস নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। হিজরি অষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই অঞ্চলের শবে বরাত পালনের রীতিতে এক অনন্য বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এই বিবর্তনের মূলে রয়েছে বাংলার সুফি ঘরানার আধ্যাত্মিকতা এবং মধ্যযুগীয় সুলতানি ও মোঘল আমলের রাজকীয় প্রভাবের মিশেল ।

ঢাকার নবাবদের আভিজাত্য এবং উৎসবের রূপায়ণ

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের গবেষণা অনুযায়ী, উনিশ শতকের শেষভাগে ঢাকার নবাবরা শবে বরাতকে একটি বর্ণাঢ্য এবং সর্বজনীন উৎসবে রূপান্তরিত করেছিলেন । সে সময় মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভাব এবং ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে শবে বরাতকে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে পালন করা শুরু হয়। নবাবরা এই রাতে লালকুঠী, আহসান মঞ্জিলসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যাপক আলোকসজ্জা করতেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘মিষ্টান্ন’ বিতরণ করতেন । তখন বর্তমান সময়ের মতো বাণিজ্যিক মিষ্টির দোকানের আধিক্য না থাকায় ঘরে তৈরি দানাদার ও সুস্বাদু ‘হালুয়া’ হয়ে ওঠে প্রধান মিষ্টান্ন ।

হালুয়া-রুটিএবং বাংলার খাদ্য-সংস্কৃতির নৃবিজ্ঞান

বাংলার মুসলিম সমাজে শবে বরাত মানেই হলো হালুয়া-রুটি, পায়েস এবং বিভিন্ন নকশি খাবারের ছড়াছড়ি। নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, মধ্যযুগ থেকেই গ্রামীণ বাংলায় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবগুলোতে দরিদ্র প্রতিবেশীদের মাঝে খাদ্য বিতরণের মাধ্যমে পুণ্য অর্জনের একটি প্রথা প্রচলিত ছিল । ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন তাঁর ‘The Rise of Islam and the Bengal Frontier’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের খাদ্য বিতরণ মূলত একটি সুসংহত সামাজিক সংহতি এবং সাম্যবাদী চেতনার প্রতীক হিসেবে কাজ করে ।

শবে বরাতের খাবার কেবল খাদ্যগ্রহণের বিষয় নয়, বরং এর ভেতর দিয়ে বাংলার সামাজিক স্মৃতি, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও পারস্পরিক সম্পর্কের এক গভীর চিত্র ফুটে ওঠে। চালের গুঁড়োর রুটি গ্রামবাংলার কৃষিজীবী ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে, যা সহজতা ও মাটির কাছাকাছি জীবনবোধকে ধারণ করে এবং এই খাবার প্রতিবেশীদের বাড়িতে বাড়িতে বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সুসম্পর্ককে দৃঢ় করে। বুট ও সুজির হালুয়া মিষ্টতা ও ধৈর্যের প্রতীক হিসেবে শবে বরাতের রাতে বিশেষ গুরুত্ব পায়, একই সঙ্গে এটি গরিব ও দুস্থ মানুষের মাঝে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বণ্টনের সুযোগ তৈরি করে, যা সামাজিক দায়িত্ববোধকে সামনে আনে। নকশি ও ফেন্সি রুটি পুরান ঢাকার নবাবী আভিজাত্যের স্মারক হিসেবে শৈল্পিক রুচি ও নান্দনিকতার প্রকাশ ঘটায় এবং পরিবারকেন্দ্রিক উৎসবমুখী পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে। অন্যদিকে বিরিয়ানি ও তবারক শবে বরাতের সামাজিক ভোজের ধারণাকে শক্তিশালী করে, যেখানে খাবার ভাগাভাগির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক ঐক্য এবং সম্মিলিত ইবাদতের সামাজিক বন্ধন আরও গভীর হয়ে ওঠে।এই হালুয়া-রুটি তৈরির পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট বা বাধ্যতামূলক ধর্মীয় আদেশ না থাকলেও, এটি এখন বাঙালির হৃদয়ে একটি গভীর সামাজিক স্মৃতি (Social Memory) হিসেবে গেঁথে আছে, যা মানুষকে একে অন্যের কাছে টেনে আনে এবং ধর্মীয় গাম্ভীর্যের মাঝে আনন্দের ছোঁয়া দেয় ।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী উৎসবমুখরতা

পুরান ঢাকায় শবে বরাতের আবহ বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি বর্ণিল। এখানে ‘কঙ্গালি ভোজ’ বা অভাবী মানুষের জন্য বিশাল খাবারের আয়োজন করা হয় । তবারক হিসেবে বিরিয়ানি বা বড় বাপের পোলায় খায়-জাতীয় খাবার বিতরণ করা হয় প্রতিটি মহল্লার মসজিদে। সন্ধ্যার পর প্রতিটি বাড়ির জানালায় ও ব্যালকনিতে মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালানো হয়, যা শহরকে এক মায়াবী রূপ দেয়। চকবাজার এবং নাজিমুদ্দিন রোডের বিখ্যাত বেকারিগুলো বছরের এই একটি দিনেই কুমির, মাছ বা বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আকৃতির বিশাল নকশি রুটি তৈরি করে থাকে, যা দেখতে শত শত মানুষ ভিড় জমায় ।.

মুক্তির আলো ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধি

শবে বরাত মূলত ফারসি শব্দ, যেখানে 'শব' অর্থ রাত এবং 'বরাত' অর্থ মুক্তি বা নাজাত । হাদিসের ভাষায় একে 'লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান' বা অর্ধ-শাবানের রজনী বলা হয় । সৃষ্টির আদিকাল থেকে বিশ্বাস করা হয়, এই রাতে মহান আল্লাহ তাঁর করুণার দ্বার উন্মুক্ত করে দেন এবং অগণিত গুনাহগার বান্দাকে ক্ষমা করেন।

শবে বরাতের প্রকৃত সার্থকতা কেবল সারারাত জেগে থাকা বা আলোকসজ্জার মধ্যে নয়, বরং এর মূল নিহিত রয়েছে 'আত্মশুদ্ধি' বা পবিত্রতার মধ্যে। আমাদের মনের গভীর কোণে জমে থাকা পাপের পঙ্কিলতা ধুয়ে ফেলার এটিই শ্রেষ্ঠ সময়। যেমনটি সাম্প্রতিক সময়ের দেখা যায়—অন্ধকারের মাঝে অসংখ্য প্রদীপের শিখা যেমন আশার আলো দেখায়, ঠিক তেমনি ইবাদত ও তওবা মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করে।

‘মুশাহিন’ বর্জন: শুদ্ধির প্রথম শর্ত

শবে বরাতের অবারিত ক্ষমার রাতেও কিছু মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হন। হাদিস অনুযায়ী, মুশরিক এবং ‘মুশাহিন’ বা বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আল্লাহ সবাইকে ক্ষমা করেন। এখানে ‘মুশাহিন’ শব্দটির গুরুত্ব অপরিসীম। যিনি অন্যের প্রতি হিংসা, ঘৃণা বা প্রতিশোধের আগুন হৃদয়ে পুষে রাখেন, তার কোনো ইবাদতই এই রাতে কবুল হয় না।

শবে বরাতের বিশুদ্ধি অর্জনের জন্য প্রথম কাজ হলো নিজের হৃদয়কে ঘৃণা থেকে মুক্ত করা। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষাটি সবচেয়ে বেশি জরুরি। ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সমাজে যে বিভেদ বা অস্থিরতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, শবে বরাতের ক্ষমা ও সহনশীলতার শিক্ষা তা প্রশমিত করতে পারে যেভাবে ‘হৃদয়ের কাঁটা’ উপড়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে, আধ্যাত্মিকভাবে এটিই হলো প্রকৃত রূহানি রূপান্তর বা শুদ্ধি।

ইবাদতের বিনম্র আয়োজন

শবে বরাতের রাতে মুমিনদের করণীয় প্রধান কাজগুলো হলো:

  • ব্যক্তিগত নফল নামাজ: রাসূলুল্লাহ (সা.) এই রাতে দীর্ঘ সিজদার মাধ্যমে ইবাদত করতেন 
  • তওবা ইস্তিগফার: বিগত জীবনের ভুলের জন্য অশ্রুসিক্ত চোখে ক্ষমা প্রার্থনা করা ।
  • কুরআন তিলাওয়াত জিকির: হৃদয়ের প্রশান্তি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য জিকিরে মগ্ন থাকা ।
  • সিয়াম পালন: শাবানের ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ ।
  • কবর জিয়ারত: মৃত আত্মীয়-স্বজন ও পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করা ।

পুরান ঢাকার নবাবী আভিজাত্য থেকে শুরু করে গ্রামের মেঠোপথ পর্যন্ত বিস্তৃত আমাদের এই শবে বরাত পালনের সংস্কৃতি। যদিও হালুয়া-রুটি বা আলোকসজ্জা সরাসরি ইবাদতের অংশ নয়, তবুও এটি আমাদের সামাজিক সংহতি ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক প্রাচীন রেওয়াজ ।

২০২৬: ফ্যাসাদমুক্ত বাংলাদেশের জন্য এক চিলতে প্রার্থনা

২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ যখন আমরা সিজদায় অবনত হই, তখন আমাদের মোনাজাত কেবল ব্যক্তিগত মুক্তির জন্য নয়, বরং এই জনপদ ও প্রিয় মাতৃভূমির জন্য হওয়া উচিত। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর বাণীতে ঠিক এই কথাটিই বলেছেন—সব অন্যায়, অবিচার ও কুসংস্কার পরিহার করে শান্তির ধর্ম ইসলামের সৌন্দর্যে সমাজকে আলোকিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি ।

চিত্রের সেই শান্তির পায়রা যেমন জলপাই ডাল নিয়ে শান্তির বার্তা দেয়, শবে বরাতের প্রার্থনাও যেন বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে। আমাদের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এই পবিত্র রাতটি যেন বিদ্বেষ ও সহিংসতা দূর করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি করে।

পরিশেষে, শবে বরাত কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি এক বছরের আমলনামার বাজেট এবং পরবর্তী বছরের সংকল্প গ্রহণের রজনী। আসুন, ২০২৬ সালের এই মহিমান্বিত রাতে আমরা নিজেদের শুদ্ধ করি, একে অন্যকে ক্ষমা করি এবং একটি সুখী ও শান্তিময় বাংলাদেশের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলি।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের সকলকে ক্ষমা হেফজত করুন।

আমীন

 ✍️ অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র  (odhikarpatranews@gmail.com)

 #শবেবরাত২০২৬ #নতুনবাংলাদেশ #আত্মশুদ্ধি #ক্ষমা #আলোকবর্তিকা #শান্তিরপায়রা #আধ্যাত্মিকজাগরণ #মুশাহিন #বাংলাদেশ২০২৬ #ShabEBarat2026 #Forgiveness #PeaceBangladesh #SpiritualHealing #LailatulBarat #NewBangladesh



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: