odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 26th May 2026, ২৬th May ২০২৬
মোবাইল সংযোগ বাড়লেও মানসম্মত ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস ও দক্ষতায় রয়ে গেছে বড় ঘাটতি

ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে বাংলাদেশ: বৈষম্যই বড় বাধা

odhikarpatra | প্রকাশিত: ২৫ May ২০২৬ ২৩:৪৪

odhikarpatra
প্রকাশিত: ২৫ May ২০২৬ ২৩:৪৪

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ১৭:২৫

অধিকার পত্র ডেস্ক : বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু মোবাইল সংযোগ নিশ্চিত করা নয়; বরং মানসম্মত ইন্টারনেট সুবিধা, স্মার্ট ডিভাইসে প্রবেশাধিকার, নারী-পুরুষের প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর করা এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে সবার অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রবেশাধিকার ও ব্যবহার সংক্রান্ত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেশের ডিজিটাল বাস্তবতার এক জটিল চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, মোবাইল ফোন ব্যবহার প্রায় সর্বজনীন হলেও উন্নত ডিজিটাল সম্পৃক্ততায় অঞ্চল, লিঙ্গ ও আয়ের ভিত্তিতে এখনো বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ৯৮ শতাংশের বেশি মানুষের মোবাইল সংযোগ থাকলেও কম্পিউটার রয়েছে মাত্র ৮.৯ শতাংশ পরিবারে। আবার ৭২.৮ শতাংশ পরিবারের স্মার্টফোন থাকলেও কার্যকর ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে মাত্র ৫৫.১ শতাংশ পরিবারের কাছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি এখন ‘ভোগ-উৎপাদন বৈপরীত্য’-এ রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ মানুষ ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করতে পারলেও সফটওয়্যার উন্নয়ন, অনলাইনভিত্তিক কাজ, ডিজিটাল উদ্যোক্তা কার্যক্রম কিংবা উৎপাদনশীল পেশাগত কাজে অংশ নিতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সরঞ্জাম অনেকের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারিত হলেও অঞ্চলভেদে প্রযুক্তি ব্যবহারে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। বিশেষ করে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ ও কম্পিউটার মালিকানায় গ্রামীণ অঞ্চলের তুলনায় সিটি করপোরেশন এলাকাগুলো অনেক এগিয়ে।

ময়মনসিংহ বিভাগে স্মার্টফোন ব্যবহারে শহর ও গ্রামের পার্থক্য ১২ শতাংশ, ইন্টারনেট সংযোগে ১৫.৪ শতাংশ এবং কম্পিউটার মালিকানায় ১২.৬ শতাংশ ব্যবধান দেখা গেছে। রংপুরেও একই ধরনের বৈষম্য রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগে শহর ও গ্রামের মধ্যে কম্পিউটার মালিকানার ব্যবধান সর্বোচ্চ ২৩.৯ শতাংশ।

লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের চিত্রও উদ্বেগজনক। চট্টগ্রাম বিভাগে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নারী-পুরুষের ব্যবধান না থাকলেও স্মার্টফোন মালিকানায় এখনো ৬.৫ শতাংশ পার্থক্য রয়েছে।

ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ঢাকা বিভাগে পুরুষদের ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৭৫ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা ৬৬.৫ শতাংশ। খুলনায় পুরুষদের হার ৭৩.৫ শতাংশের বিপরীতে নারীদের ৬০.১ শতাংশ। আর চট্টগ্রামে পুরুষদের ৬৮.৩ শতাংশের বিপরীতে নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৬৪ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তিগত স্মার্টফোনের অভাব নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তায় বড় বাধা তৈরি করছে। বিশেষ করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহারে ব্যক্তিগত ডিভাইসের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

রংপুর বিভাগে নারী-পুরুষের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি, যা ২২ শতাংশে পৌঁছেছে।

জেলা পর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্মার্টফোন ও কম্পিউটার ব্যবহারে ঢাকা, গাজীপুর ও ফেনী এগিয়ে থাকলেও পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম ও নড়াইল অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে পঞ্চগড়ে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একক জাতীয় আইসিটি নীতি দিয়ে এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য আলাদা পরিকল্পনা ও বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।

গবেষণায় ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির তিনটি বড় বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে—ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, ডিভাইস ও ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য এবং গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।

টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, গ্রামাঞ্চলে মোবাইল ও ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সীমিত উপস্থিতিই ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিকে ধীর করছে। তিনি মনে করেন, দেশজুড়ে ৪জি মোবাইল ব্রডব্যান্ড নিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ মানুষ আরও বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারে আগ্রহী হবেন।

তিনি আরও বলেন, স্মার্টফোনের উচ্চমূল্যও বড় বাধা। তাই কম আয়ের মানুষের নাগালে ডিভাইস পৌঁছে দিতে সরকারি নীতিগত সহায়তা জরুরি। একইসঙ্গে ডিজিটাল ভূমিসেবা ও অন্যান্য অনলাইন সরকারি সেবা সম্প্রসারণ করলে সাধারণ মানুষ আরও বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারে উৎসাহিত হবে।

গবেষণার সার্বিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের ডিজিটাল বিভাজন এখন আরও জটিল হয়ে উঠছে। মৌলিক সংযোগ প্রায় সর্বজনীন হলেও অর্থপূর্ণ ডিজিটাল ক্ষমতায়ন এখনো অসম রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল সুবিধা যেন শুধু নির্দিষ্ট শহর বা উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা সারা দেশে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, আঞ্চলিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক ক্ষমতায়নের মাধ্যম হয়ে ওঠে—সেই লক্ষ্যেই এখন কাজ করতে হবে।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: