odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 15th June 2026, ১৫th June ২০২৬
শান্তির পদক গলায় ঝুলিয়ে অশান্তির সাম্রাজ্য নির্মাণের রূপকথা; শিক্ষা, সংস্কৃতি, মব-রাজনীতি ও ক্ষমতার ব্যঙ্গচিত্রে উন্মোচিত হলো সেইসব ‘শান্তির পূজারি’দের মুখোশ, যাঁরা শান্তির ভাষায় অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে ইতিহাসের বুকে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চান

অশান্তির দেবতারাও বাগিয়ে নেন শান্তি পুরস্কার: অশান্তির বরপুত্রের দখলে আজ শান্তির লীলাভূমি

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৪ June ২০২৬ ১৭:৩৪

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৪ June ২০২৬ ১৭:৩৪

অধিকারপত্র ব্যঙ্গ সাহিত্য কলাম

আজ একটি গল্প বলি, যেখানে শিক্ষক অপমানিত, জ্ঞানচর্চা নিপীড়িত আর মব-সংস্কৃতি পুরস্কৃত—সেই রাজ্যের শাসকই কি সবচেয়ে বড় ‘শান্তিদূত’? এক নির্মম রাজনৈতিক ব্যঙ্গের আয়নায় ক্ষমতা, পুরস্কার ও অশান্তির অন্তর্লোক। এটা খুব বেশি দিন আগের নয়, এইতো সেইদিনের কথা। নোবেল শান্তি পুরস্কার, ক্ষমতা, মব-সংস্কৃতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জ্ঞানচর্চা ও সামাজিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে রচিত এক তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক-সাহিত্যিক ব্যঙ্গচিত্র। ‘অশান্তির দেবতারাও বাগিয়ে নেন শান্তি পুরস্কার’ শীর্ষক এই রূপকধর্মী ফিচারে শান্তিনগরী, সত্যেন্দ্রানন্দ ও অশান্তির বরপুত্রের কাহিনির মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে সেই নির্মম বাস্তবতা, যেখানে শান্তির ভাষা ব্যবহার করে অশান্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়, শিক্ষক ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলোকে দুর্বল করা হয়, আর মব-সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজে ভয়, বিভাজন ও নীরবতার রাজত্ব কায়েম করা হয়। ইতিহাস, রাজনীতি, ক্ষমতা ও মানবিক মূল্যবোধের সংঘাতকে ব্যঙ্গ ও রূপকের মোড়কে বিশ্লেষণ করা এই সাহিত্য ফিচার পাঠককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে—শান্তি কি সত্যিই শান্তির পুরস্কার পায়, নাকি অশান্তির স্থপতিরাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পুরস্কারগুলো দখল করে নেয়?

প্রাক-কথন: সেই সুবর্ণ অতীত ও অলীক স্বপ্ন

অনেক দিন আগের কথা। জগৎসংসারের বিধাতার অদৃশ্য ইচ্ছায় পৃথিবীর এক নিভৃত কোণে কয়েকটি পুণ্যতোয়া নদীর পলি জমিয়া গড়ে উঠিয়াছিল এক অপূর্ব জনপদ। প্রকৃতি যেন আপন হাতে তাহাকে সাজাইয়া তুলিয়াছিল। চারিদিকে সবুজ শস্যের ঢেউ, নদীর কলতান, রাখালের বাঁশির সুর, আর মানুষের মুখে মুখে সৌহার্দ্যের মৃদু হাসি।—সেই ভূমির নাম ছিল শান্তিনগরী।

শান্তিনগরীর মাঝখানে ছিল এক বিস্ময়কর বাগান— “শান্তির বাগিচা”। উহা কেবল বৃক্ষ-লতা-পুষ্পের সমাহার ছিল না; উহা ছিল এক সভ্যতার প্রতীক। সেখানে শিক্ষা ছিল, সংস্কৃতি ছিল, শিল্প ছিল, যুক্তিবোধ ছিল, সহমর্মিতা ছিল। সেই বাগানের প্রতিটি ফুল অহিংসার কথা বলিত, প্রতিটি বৃক্ষ সহিষ্ণুতার শিক্ষা দিত।

বাগানের প্রধান মালি ছিলেন এক বৃদ্ধ ঋষি— সত্যেন্দ্রানন্দ। তিনি বলিতেন, “শান্তি আকাশ হইতে ঝরিয়া পড়ে না। শান্তি ফলাইতে হয়। আর তাহার বীজ হইল শিক্ষা।”

মানুষ তাঁহার কথা শুনিত, শিশু তাঁহার গল্পে বড় হইত, যুবকেরা তাঁহার কাছ হইতে বিবেকের পাঠ লইত। শান্তিনগরী তখন ছিল এক স্বপ্নের দেশ।

কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম নিয়ম আছে। যেখানে শান্তি সবচেয়ে গভীরভাবে শিকড় গাঁথে, সেখানেই অশান্তির ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়। শান্তিনগরীর ক্ষেত্রেও তাহার ব্যতিক্রম ঘটিল না।

প্রথম পরিচ্ছেদ: দেবতার বেশে দানবের আগমন

একদিন দূরদেশ হইতে প্রচণ্ড ঢাকঢোল পিটাইয়া ঘোষণা করা হইল— এক মহামানব আসিতেছেন। তাঁহার গলায় ঝুলিতেছে বিশ্ববিখ্যাত “নোবেল শান্তি পুরস্কার”।

প্রজারা উল্লসিত হইল।তাহারা ভাবিল— যিনি শান্তির জন্য বিশ্বজোড়া সম্মান পাইয়াছেন, তিনি নিশ্চয়ই রাজ্যের দুঃখ-কষ্ট দূর করিবেন। তিনি নিশ্চয়ই ভ্রাতৃত্ব, ন্যায় ও মানবিকতার এক নতুন যুগের সূচনা করিবেন।

কিন্তু প্রজারা একটি বিষয় জানিত না। আধুনিক পৃথিবীতে অনেক সময় শান্তির পদক আর শান্তির চর্চা এক বস্তু নহে। চকচকে পদক কখনো কখনো সবচেয়ে অন্ধকার মুখোশের কাজও করিতে পারে।

সেই মহাপুরুষ মসনদে বসিয়াই এক গম্ভীর বক্তৃতা দিলেন। তিনি বলিলেন—

হে প্রজাগণ! এতদিন তোমরা যাহাকে শান্তি বলিয়া জানিতে, উহা প্রকৃত শান্তি নহে। উহা জড়তা। উহা স্থবিরতা। আমি তোমাদের উন্নত সুখের জীবন উপহার দিতে আসিয়াছি। অতএব প্রস্তুত হও— পরিবর্তনের জন্য।

জনগণ হাততালি দিল। কিন্তু তাহারা বুঝিল না, সেই ‘পরিবর্তন’-এর অভিধানে শান্তির কোনো স্থান ছিল না। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, যেখানে শান্তির বৃক্ষ সবচেয়ে সবল হইয়া ওঠে, সেখানেই অশান্তির বীজ বপনের লোভ জন্মে। শান্তিনগরীর ক্ষেত্রেও তাহার ব্যতিক্রম ঘটিল না। দূরদেশের দিগন্তে তখন আবির্ভূত হইতেছিল এক নতুন নক্ষত্র, যাহার আলো দেখিতে সোনালি, কিন্তু অন্তরে ছিল অগ্নির লেলিহান শিখা।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মুখের মধু ও অন্তরের হলাহল

রাজা কথা বলিতেন অত্যন্ত মধুর ভাষায়। তাঁহার বক্তৃতা শুনিলে মনে হইত যেন কবিতা আবৃত্তি চলিতেছে। তিনি শান্তির কথা বলিতেন, সহিষ্ণুতার কথা বলিতেন, মানবাধিকারের কথা বলিতেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই বাস্তবতা অন্য চেহারা লইল। শস্যক্ষেত্র উন্নয়নের নামে কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হইতে লাগিল। কৃষক উচ্ছেদ হইল। ছোট ছোট জনপদ উধাও হইল।

আর যাহারা প্রশ্ন করিল— তাহাদের বিরুদ্ধে নামিল এক নতুন শক্তি। ইহাদের নাম দেওয়া হইল— “মব”। রাজকীয় বাহিনীর প্রয়োজন পড়িল না। কারণ ভয় সৃষ্টি করিবার জন্য এখন আর সেনাবাহিনীর দরকার হয় না। কয়েকশ উগ্র, বিভ্রান্ত ও উন্মত্ত অনুসারীই যথেষ্ট।

  • যে প্রশ্ন করিল, তাহাকে ঘেরাও করা হইল।
  • যে সমালোচনা করিল, তাহাকে অপমান করা হইল।
  • যে প্রতিবাদ করিল, তাহাকে দেশদ্রোহী আখ্যা দেওয়া হইল।

রাজা তখনও মুচকি হাসিতেছিলেন। কারণ তিনি জানিতেন— মুখে শান্তির বাণী উচ্চারণ করিলে অনেক অপরাধই আড়াল করা যায়।

প্রজারা তখনও বুঝিতে পারে নাই, পদকের দীপ্তি আর চরিত্রের দীপ্তি এক বস্তু নহে। বাহ্যিক জৌলুসে মোহিত জনতা অপেক্ষা করিতে লাগিল এক স্বর্ণযুগের; অথচ অদৃশ্য পর্দার আড়ালে ইতোমধ্যে শুরু হইয়া গিয়াছে অশান্তির নতুন স্থাপত্য নির্মাণ।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: মালী নিধন ও মব লেলাইয়া দেওয়ার মহাকাব্য

অশান্তির বরপুত্রের সবচেয়ে ভয় ছিল কার প্রতি? না, বিরোধী রাজনীতিবিদদের প্রতি নয়।তাঁহার সবচেয়ে ভয় ছিল শিক্ষকদের প্রতি। কারণ শিক্ষকরা মানুষকে প্রশ্ন করিতে শেখায়।তাহারা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝাইতে শেখায়। অতএব প্রথম আঘাত আসিল শিক্ষাঙ্গনের উপর।বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, বিদ্যালয়— একের পর এক প্রতিষ্ঠানে শুরু হইল ভয় প্রদর্শনের রাজনীতি।

  • যে শিক্ষক স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করিলেন, তাঁহাকে অপমান করা হইল।
  • যে অধ্যাপক প্রশ্ন তুলিলেন, তাঁহার বিরুদ্ধে মব নামানো হইল।
  • যে শিক্ষাবিদ যুক্তির ভাষায় কথা বলিলেন, তাঁহাকে জনসমক্ষে লাঞ্ছিত করা হইল।

রাজা তখন বলিলেন— “মালীদের নীরব করো। তাহলেই বাগান আপনাতেই আগাছায় ভরিয়া উঠিবে।” এবং ঠিক তাহাই ঘটিল।এইভাবে ক্ষমতার প্রকৃত রূপ প্রকাশ পাইবার পরও অশান্তির এই স্থপতি সরাসরি আঘাত করেন নাই। তিনি জানিতেন, একটি সমাজকে ধ্বংস করিতে হইলে প্রথমে তাহার বিবেককে স্তব্ধ করিতে হয়। আর সেই বিবেকের প্রথম আশ্রয়স্থল ছিল শিক্ষাঙ্গন।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: নন্দনকানন যখন ভস্মীভূত

শান্তিনগরীর প্রকৃত শক্তি ছিল তাহার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলি। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিল সেইসব প্রতিষ্ঠান। কিন্তু অশান্তির বরপুত্রের চোখে এইসব ছিল বিপজ্জনক। কারণ স্বাধীন চিন্তা স্বৈরতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। অতএব একদিন রাতের আঁধারে আদেশ আসিল। “বাগান পুড়াইয়া দাও।”

এরপরে সবই ইতহাস! আগুন জ্বলিল। প্রথমে বই পোড়িল। পরে যুক্তি পোড়িল। তারপর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পোড়িল। শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজের বিবেককেও লুকাইতে শুরু করিল। আগুনের লেলিহান শিখার আলোয় রাজা বসিয়া ছিলেন। গলায় ঝুলিতেছিল শান্তির পদক। মুখে ছিল প্রশান্ত হাসি।

বাগান পুড়িল, ফুল ঝরিল, কিন্তু প্রশ্ন মরিল না। সেই প্রশ্ন একদিন লাঠিতে ভর দেওয়া এক বৃদ্ধের কণ্ঠে রূপ লইয়া রাজদরবারের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হইল।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ: এক বৃদ্ধের দুঃসাহসিক প্রশ্ন

সেই সময় যখন অধিকাংশ মানুষ নীরব, তখন একদিন বৃদ্ধ সত্যেন্দ্রানন্দ লাঠিতে ভর দিয়া রাজদরবারে উপস্থিত হইলেন। দরবারে উৎসব চলিতেছিল। রাজা তাঁহার নোবেল পদক প্রদর্শন করিতেছিলেন।

বৃদ্ধ দাঁড়াইয়া বলিলেন— “মহারাজ, আপনি তো শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত। তবে আপনার রাজ্যে এত অশান্তি কেন?”

মুহূর্তে সভাকক্ষে নীরবতা নেমে আসিল। চাটুকাররা আতঙ্কিত হইল। প্রহরীরা তরবারি ধরিল। কিন্তু রাজা হাসিলেন। অদ্ভুত এক হাসি। তাচ্ছিল্য, আত্মতুষ্টি ও ব্যঙ্গের মিশ্রণে গড়া হাসি। তিনি বলিলেন—“বৃদ্ধ, তুমি এখনও পৃথিবীকে পুরোনো চোখে দেখো।”

বৃদ্ধের প্রশ্নটি ছিল সহজ; কিন্তু ইতিহাসে অনেক সময় সহজ প্রশ্নই ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর হইয়া ওঠে। কারণ তাহার উত্তর দিতে গিয়া মানুষকে নিজের মুখোশ খুলিতে হয়।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: নোবেল জয়ীর আত্মসাক্ষাৎকার

রাজা ধীরে ধীরে সিংহাসন হইতে নামিলেন। তিনি বৃদ্ধের নিকটে আসিয়া বলিলে— “তুমি জানো কেন আমি শান্তি পুরস্কার পাইয়াছি?”

বৃদ্ধ বলিলেন— “না, মহারাজ।”

রাজা বলিলেন— “কারণ আমি জানি কীভাবে শান্তিকে অশান্তিতে পরিণত করিতে হয়।”

বৃদ্ধ স্তব্ধ।

রাজা বলিয়া চলিলেন—

“শান্তি রক্ষা করা সহজ। যে কোনো সাধারণ মানুষ তাহা পারে। কিন্তু একটি সুশৃঙ্খল সমাজকে বিভক্ত করা, একটি শান্ত রাজ্যকে সংঘাতে ঠেলে দেওয়া, মানুষকে মানুষ হইতে বিচ্ছিন্ন করা— ইহা এক উচ্চতর শিল্প।”

তিনি আরও বলিলেন—

“আমি শিক্ষকদের অপমান করিয়াছি। আমি যুবকদের উন্মত্ত করিয়াছি। আমি মব সংস্কৃতি সৃষ্টি করিয়াছি। আমি প্রশ্নকে অপরাধ বানাইয়াছি। আমি ভয়ের মাধ্যমে শাসন প্রতিষ্ঠা করিয়াছি। এই সবই আমার অর্জন।আর এই কারণেই আমি পুরস্কার পাইয়াছি।”

বৃদ্ধের চোখে জল আসিল। কারণ তিনি বুঝিলেন— রাজা মিথ্যা বলিতেছেন না। তিনি কেবল নিষ্ঠুর সত্য উচ্চারণ করিতেছেন।

সপ্তম পরিচ্ছেদ: দেবতার অমোঘ ও রসাত্মক উত্তর

আমাদের নোবেলজয়ী মহাপুরুষ তাঁহার গলার পদকটি হাত দিয়া একটু নাড়াচাড়া করিলেন, চশমাটি নাকের ডগায় নামাইলেন এবং এক অদ্ভুত হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে বৃদ্ধের প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগিলেন। তাঁহার সেই উত্তরটি ছিল যেমন সহজ, তেমনই ভয়ংকর ও ব্যঙ্গাত্মক। তিনি বলিলেন,

আরে ওহে বৃদ্ধ বাবাজী! তুমি অতিশয় প্রাচীন ও সেকেলে। আধুনিক রাজনীতির ও বিশ্ব-পুরস্কারের অহি-নকুল সম্পর্কটি তোমার ক্ষুদ্র মগজে প্রবেশ করিবে না। শোনো তবে, অতি সহজ ভাষায় বলি— এজন্যই তো আমি শান্তি পুরস্কার জয়ী, কেননা আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে ভালো করিয়া জানে কিভাবে শান্তিকে অশান্তিতে পরিণত করিতে হয়!"

তিনি আরো বলিতে লাগিলেন, আমার কাজ, আমাকে যারা শান্তির পুস্কার দিয়েছে, সেই প্রভূদের কথা শনা ও তাদের নিদ্যেশ বাস্তবায়ন করা। এর পরে একটু থেমে আবারো বলিতে লাগলেন,

শান্তি রক্ষা করা তো অত্যন্ত সহজ ও সাধারণ কাজ। যে কোনো সাধারণ মালীও তাহা পারে। কিন্তু একটা চলন্ত,  জীবন্ত এবং সুশৃঙ্খল শান্তিকে পরম দক্ষতায় কুচকুচে  অশান্তিতে রূপান্তর করিবার জন্য যে আসুরিক মেধা  ও ক্রুরতার প্রয়োজন, তাহা কি সবার থাকে?  উহার জন্যই তো নোবেল কমিটি আমাকে বাছিয়া লইয়াছে!

বৃদ্ধ স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। রাজা তখন আরও খোলসা করিয়া, অত্যন্ত রসালো ও ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তাঁহার ‘মহৎ কীর্তি’র খতিয়ান দিতে লাগিলেন।

অষ্টম পরিচ্ছেদ: হায়েনাদের গর্জন ও নির্বাক প্রকৃতি

ক্রমে রাজ্যের পাখিরা উধাও হইয়া গেল। কোকিলের গান থামিয়া গেল।শিল্পীরা নীরব হইল।

কবিরা আত্মগোপন করিল।শিক্ষকেরা ক্লাসরুমে কথা বলিতে ভয় পাইতে লাগিল।সাংবাদিকেরা শব্দ বাছিয়া লিখিতে লাগিল।মানুষ মুখে হাসি রাখিলেও অন্তরে ভয় লুকাইয়া রাখিল।

আর চারিদিকে কেবল হায়েনাদের গর্জন শোনা যাইতে লাগিল। যাহারা একদিন শান্তির কথা বলিত, তাহারাও সুবিধার আশায় হায়েনাদের দলে নাম লেখাইল। কারণ এই রাজ্যে অশান্তি লাভজনক।আর শান্তি অলাভজনক।

নদীর জলও যেন তাহার চিরচেনা কলতান ভুলিয়া গিয়াছিল। ঘাটে বাঁধা নৌকাগুলি নিথর, মাঝির কণ্ঠে কোনো ভাটিয়ালির সুর নাই; সুরের চাদরে যে নদী একদা প্রাণবন্ত ছিল, আজ তাহা এক শ্মশানের স্তব্ধতায় ঢাকিল। বাতাস যখন গাছের পাতার মধ্য দিয়া বহিয়া যাইত, মনে হইত তাহা কোনো দীর্ঘশ্বাস—যুগ যুগ ধরিয়া সঞ্চিত কোনো কান্নার প্রতিধ্বনি।

শহরের রাজপথগুলি সন্ধ্যায় নির্জন হইতে শুরু করিল। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় মানুষের যে ছায়া পড়িত, তাহা দেখিয়া মানুষ নিজেই চমকিয়া উঠিত। প্রত্যেকে প্রত্যেককে সন্দেহের চোখে দেখিত। ভাই ভাইকে বিশ্বাস করিতে পারিত না, প্রতিবেশী তাহার বহু বছরের চেনা প্রতিবেশীর ঘরের জানালার দিকে তাকাইতে ভয় পাইত। চারিপাশে কেবল কানাকানি আর ফিসফিসানি—ফিসফিসানির শব্দও যেন এক একটি ধারালো অস্ত্রের মতো বাতাসে ভাসিয়া বেড়াইত।

অথচ, প্রাসাদের অন্দরে তখন উৎসবের আলো। সেখানে সোনার পাত্রে মদিরা ঢালা হইতেছে, আর সুবিধাবাদীদের অট্টহাসিতে কাঁপিয়া উঠিতেছে দেয়াল। যাহারা বিবেক বন্ধক রাখিয়াছে, তাহাদের থালায় আজ রাজকীয় খানা। তাহারা যুক্তি সাজায়—"যুগ পাল্টাইয়াছে, সুতরাং আমাদেরও পাল্টাইতে হইবে।" কিন্তু তাহারা বোঝে না, হায়েনার ক্ষুধা কখনো মেটে না; আজ যাহার হাত ধরিয়া তাহারা অন্যকে গ্রাস করিতেছে, আগামীকাল তাহারা নিজেরাই সেই ক্ষুধার খাদ্য হইবে।

প্রকৃতি এই সমস্ত দৃশ্য নিভৃতে দেখিয়াও যেন জড়বৎ হইয়া রহিল। কোনো ঝড় উঠিল না, কোনো বজ্রপাত হইল না। কেবল গোধূলির আকাশটা প্রতিদিন একটু বেশি লাল দেখাইতে লাগিল—যেন তাহা কোনো আসন্ন মহাপ্রলয়ের নীরব পূর্বাভাস।

নবম পরিচ্ছেদ: জ্বলন্ত বাগান ও পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন

এক অমাবস্যার রাতে শান্তির বাগান আবার জ্বলিল। বই, স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি— সবকিছু ধ্বংসের মুখে পড়িল। এক শিশু বৃদ্ধ সত্যেন্দ্রানন্দকে জিজ্ঞাসা করিল— “দাদু, এরা বাগান পোড়ায় কেন?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন— “কারণ বাগান থাকিলে মানুষ সৌন্দর্য দেখতে শেখে। আর সৌন্দর্য দেখিতে শেখা মানুষকে ভয় দেখানো কঠিন।”

শিশুটি আবার প্রশ্ন করিল— “তাহলে এরা শান্তির কথা বলে কেন?”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন— “কারণ সবচেয়ে বড় মিথ্যাগুলো সাধারণত সবচেয়ে সুন্দর শব্দ দিয়াই বলা হয়।”

যখন মালিরা নীরব হয়, তখন বাগানের আগাছারাই রাজা হইয়া বসে। শান্তিনগরীতেও ঠিক তাহাই ঘটিল। শিক্ষক ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলিকে দুর্বল করিবার পর এবার লক্ষ্যবস্তু হইল সমগ্র বাগানটিই।

দশম পরিচ্ছেদ: শয়তানের জবানবন্ধি

অন্ধকারের সিংহাসনে বসিয়া শয়তান মৃদু হাসিল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক পরম তাচ্ছিল্য। সে তাহার চেলো-চামুণ্ডাদের দিকে চাহিয়া বলিতে লাগিল:

"মূর্খেরা ভাবে আমি কেবল ধ্বংস করিতে জানি। তাহারা বোঝে না, ধ্বংসের চেয়েও বড় শিল্প হইল—ধ্বংসের ত্রাস সৃষ্টি করিয়া খোদ ত্রাতার আসনে বসিয়া যাওয়া। এই রাজ্যে আমি সর্প হইয়া ছোবল মারি, আবার ওঝা হইয়া ঝারি।

যখন আমি কাহারো ঘরে আগুন লাগাই, তখন আমিই অন্ধকার গলির ওপার হইতে প্রথম চিৎকার করিয়া বলি—'আগুন! আগুন!'। অতপর আমিই এক বালতি জল হাতে লইয়া দরদী সাজিয়া তাহাদের সামনে গিয়া দাঁড়াই। যাহারা সর্বস্ব হারাইল, তাহারা আমার পায়ে পড়িয়া কাঁদে, আমাকেই তাহাদের রক্ষাকর্তা ভাবিয়া ভক্তি করে। তাহারা জানিতেও পারে না, যে হাত দিয়া আমি তাহাদের অশ্রু মুছাইয়া দিতেছি, সেই হাতই একটু আগে দিয়াশলাইয়ের কাঠিটি জ্বলাইয়াছিল।

এইভাবেই আমি বিষ ছড়াই, আবার অমৃতের বোতল হাতে বাজারে বসি। রোগটাও আমার বাণিজ্য, ওষুধটাও আমার ব্যবসা।

যাহারা সমাজ চালায়, যাহারা সিংহাসনে বসে, তাহারা আমার এই কৌশলটি চমৎকার রপ্ত করিয়াছে। প্রথমে তাহারা রাজ্যে দাঙ্গা বাধায়, মানুষের মধ্যে বিভেদ ও ভয়ের দেয়াল তোলে। যখন চারিদিকে হাহাকার ওঠে, তখন তাহারাই আবার শান্তির শ্বেতকপোত উড়াইয়া মঞ্চে ভাষণ দেয়। মানুষ ভয়ের চোটে তাহাদেরই পায়ে শরণ নেয়।

এই খেলায় কোনো পরাজয় নাই। কারণ, বিষে যাহারা মরিবে, তাহারা তো গেলই; আর যাহারা বাঁচিয়া থাকিবে, তাহারা চিরকাল আমার ওঝাতন্ত্রের দাস হইয়া থাকিবে। শান্তি স্থাপন করিবার প্রয়োজন কী? অশান্তির এই চক্রই তো আমার অনন্ত ক্ষমতার উৎস।

শয়তানের এই অট্টহাসি আর আত্মঅহমিকার বাণী যখন বাতাসের ডানায় চড়িয়া রাজ্যের আনাচে-কানাচে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল, তখন নির্বাক প্রকৃতি যেন আর সহ্য করিতে পারিল না। এতকাল যে নদী স্তব্ধ ছিল, তাহার বুকে আচমকা এক গভীর ঘূর্ণির সৃষ্টি হইল। বনের পশুপাখিরা, যাহারা ভয়ে কুঁকড়িয়া ছিল, তাহারা এক অদ্ভুত ও গম্ভীর স্বরে ডাকিতে শুরু করিল—তাহা গান নয়, তাহা যেন এক আসন্ন ঝড়ের আর্তনাত।

মানুষেরা এতকাল ওঝারূপী এই শয়তানদের দেবতা ভাবিয়া পূজা করিয়া আসিয়াছে। কিন্তু বিষের জ্বালা যখন হাড়ের মজ্জায় গিয়া পৌঁছিল, তখন কিছু কিছু চোখ হইতে অন্ধভক্তির ঠুলি খসিয়া পড়িতে লাগিল।

গ্রামের এক কোণে, যেখানে আলো পৌঁছায় না, সেখানে এক বৃদ্ধ শিক্ষক তাঁহার ভাঙা চশমাটা চোখে দিয়া খাতার পাতায় কাঁপাকাঁপি হাতে লিখিলেন:"যে হাত বিষ ঢালিল, সে হাত কখনো নিরাময় আনিতে পারে না। ওঝা যদি নিজেই সর্প হয়, তবে সেই ওঝার ঝাড়ফুঁক আসলে মৃত্যুরই অন্য নাম।"

কথাটি বাতাস হইতে বাতাসে ছড়াইতে লাগিল। সাংবাদিকেরা, যাহারা এতদিন শব্দ বাছিয়া বাছিয়া ক্ষমতার তোষামোদি করিয়াছিল, তাহাদের মধ্যে দুই-একজন কলমের নিবটা তীক্ষ্ণ করিতে শুরু করিল। কবিরা তাহাদের গোপন আস্তানা হইতে বাহির হইয়া দেওয়ালে দেওয়ালে ছোপ ছোপ রক্তের মতো অক্ষরে লিখিতে লাগিল শয়তানের সেই গোপন মন্ত্রের কথা।

রাজ্যের মানুষ বুঝিতে পারিল, সর্পের দংশন হইতে বাঁচিতে হইলে ওঝার পায়ে মাথা নোয়ানো চলিবে না; বরং ওঝার হাতের লাঠি কাড়িয়া লইয়া তাহার কপট মুখোশটা টানিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিতে হইবে।

শয়তান সিংহাসনে বসিয়া দেখিল, তাহার তৈরি করা ভয়ের চাদরে ফাটল ধরিতে শুরু করিয়াছে। কারণ, মানুষ যখন মৃত্যুকে আর ভয় পায় না, তখন শয়তানের বিষও তাহার কার্যকারিতা হারায়।

শাসকের মুখে শান্তি সম্পর্কে উত্তর শুনিয়া বৃদ্ধ বুঝিলেন, ইহা কেবল এক ব্যক্তির স্বীকারোক্তি নহে; বরং এক সমগ্র যুগের রাজনৈতিক দর্শনের নগ্ন প্রকাশ। এরপর আর হায়েনাদের গর্জনের অর্থ বুঝিতে তাঁহার বিলম্ব হইল না।

উপসংহারমূলক পরিচ্ছেদ: ব্যঙ্গচিত্রের অন্তরালে এক মহা সত্য

এই কাহিনী কেবল কোনো রূপকথা নহে। ইহা আমাদের সময়ের এক নির্মম ব্যঙ্গচিত্র। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— পৃথিবীর বহু ক্ষমতাবান ব্যক্তি শান্তির ভাষা ব্যবহার করিয়াছেন, কিন্তু বাস্তবে অশান্তির স্থপতি হিসাবে কাজ করিয়াছেন। তাহারা শান্তির নামে যুদ্ধ করিয়াছেন। মানবাধিকারের নামে নিপীড়ন করিয়াছেন। গণতন্ত্রের নামে ভয় সৃষ্টি করিয়াছেন। শিক্ষার নামে অজ্ঞতা ছড়াইয়াছেন। অতএব পদকের দিকে নয়, কর্মের দিকে তাকাইতে হইবে।

বক্তৃতার দিকে নয়, বাস্তবতার দিকে তাকাইতে হইবে। কারণ ইতিহাসের আদালত অত্যন্ত ধীর, কিন্তু বিস্মৃত নয়। একদিন না একদিন মুখোশ খুলিবেই। একদিন না একদিন জনগণ বুঝিবে— শান্তি কোনো পুরস্কার নহে, কোনো পদক নহে, কোনো আন্তর্জাতিক সনদ নহে।

শান্তি মানুষের সহজাত অধিকার।আর যাহারা সেই অধিকার হরণ করে, তাহারা গলায় যতই শান্তির পদক ঝুলাইয়া ঘুরুক না কেন, ইতিহাসের বিচারে তাহারা অশান্তির বরপুত্র বলিয়াই পরিচিত হইবে।

শেষ উপাখ্যান: বর্তমানের চিঠি

আজ সেই রাজ্যে এখনো হায়েনারাই গর্জন করে, পাখিরা ফিরে আসে নাই। মাঝে মাঝে কোনো বৃদ্ধ এখনো জিজ্ঞাসা করে, “ভাই, ওই যে মহারাজ নোবেল পাইলেন, অমন অশান্তি কেনো করিতেছেন?”

উত্তরে একটি শিশু হাসিয়া বলে, “দাদু, কারণ অশান্তি না করিলে তাঁহার নোবেল ফিরিয়া যাইবে। শান্তির পুরস্কার পাইবার জন্য অশান্তির আয়োজন আবশ্যক।”

তখন বুড়ো হেসে কাঁদে। আর সেই হাসি-কান্নার মধ্য দিয়েই হয়তো একদিন জন্ম নেবে নব শান্তির বীজ। যেখানে পুরস্কার থাকবে না, থাকবে কেবল সহাবস্থানের আমেজ। যেমন নদীর পলিতে যেমন জন্মে শালিকের বাসা—তেমনি পৃথিবীতে ফিরে আসবে শান্তির চিরন্তন ফসিল।

 “প্রথমে তাহারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পোড়ায়, কেহ কিছু বলে না। পরে তাহারা সংবাদপত্র পোড়ায়, কেহ কিছু বলে না। শেষে তাহারা যখন শান্তির সংজ্ঞা পোড়ায়, তখন দাঁড়াইবার কেহ থাকে না।”

—শান্তিনগরীর পুরানো প্রস্তরলিপি।

অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#অশান্তির_দেবতা #শান্তির_পুরস্কার #নোবেল_শান্তি_পুরস্কার #রাজনৈতিক_ব্যঙ্গ #ব্যঙ্গসাহিত্য #সাহিত্য_ফিচার #অধিকারপত্র #অধিকারপত্র_ব্যঙ্গ_কলাম #শান্তিনগরী #অশান্তির_বরপুত্র #ক্ষমতার_মুখোশ #মব_সংস্কৃতি #শিক্ষক_অপমান #শিক্ষা_ও_সমাজ #জ্ঞানচর্চা #মতপ্রকাশের_স্বাধীনতা #স্বৈরতন্ত্র #গণতন্ত্র #রাজনীতি_ও_সমাজ #সামাজিক_অস্থিরতা #শান্তির_ভাষায়_অশান্তি #ইতিহাসের_আদালত #ক্ষমতা_ও_পুরস্কার #PoliticalSatire #Satire #PeacePrize #NobelPeacePrize #MobCulture #FreedomOfExpression #BanglaLiterature

কীওয়ার্ড

অশান্তির দেবতা, নোবেল শান্তি পুরস্কার, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, মব সংস্কৃতি, শিক্ষক অপমান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জ্ঞানচর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ক্ষমতার মুখোশ, শান্তির ভাষায় অশান্তি, গণতন্ত্র, সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক রূপক, সাহিত্য ফিচার, বাংলা ব্যঙ্গসাহিত্য, সমকালীন সমাজ ও ইতিহাসের ব্যঙ্গচিত্র।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: