odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 6th July 2026, ৬th July ২০২৬
একটি প্রজন্ম শুধু এইচএসসি পরীক্ষা দেয়নি—সময়, সংকট আর অনিশ্চয়তারও পরীক্ষা দিয়েছে; তবু স্বপ্ন দেখার সাহস হারায়নি।

একটু ডিস্টার্ব, অন্যরকম শক্তি ও মেধা, গিনিপিগের মতো এক্সপেরিমেন্টের বাহক, একটি অস্থির সময়ের পরিমাপের বাইরে শিখনঘাটতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি ব্যাচের গল্প: প্রেক্ষিত এইচএসসি ২০২৬

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৫ July ২০২৬ ১৭:২৩

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৫ July ২০২৬ ১৭:২৩

আমার কৈফিয়ত: কেন এই নিবন্ধ?

২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর দেশের শিক্ষা অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে একটি পরিসংখ্যান—একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পরীক্ষার জন্য নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৬.৪৩ শতাংশ শেষ পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম এবং নীতিনির্ধারকেরা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছেন—এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কোথায় গেল? কেন তারা পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারল না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্যই মূলত এই ধারাবাহিক গবেষণাধর্মী নিবন্ধটি রচিত হয়েছে।

শিক্ষাবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক ও শিক্ষা গবেষক হিসেবে গত চব্বিশ বছর ধরে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়, শিক্ষক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রতিবন্ধিতা-সম্পর্কিত নানা বিষয়ে গবেষণা ও কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পেশাগত দায়বদ্ধতা এবং গভীর বিবেকের তাড়নাই আমাকে আর নীরব থাকতে দেয়নি। মূলত সেই দায়বোধ থেকেই এই নিবন্ধটি লিখছি।

তবে এটি কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়। আবেগ ও বিবেকের তাড়না আমাকে কলম ধরতে উদ্বুদ্ধ করলেও, নিবন্ধটির প্রতিটি বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আমি একজন বস্তুনিষ্ঠ শিক্ষা গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতার প্রতিই সর্বোচ্চ নিষ্ঠাবান থাকার চেষ্টা করেছি।

আমার পর্যবেক্ষণে, এই সংকটকে আমরা অনেকেই কেবল ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের দুই বছরের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু একজন শিক্ষা গবেষক হিসেবে আমি মনে করি, এভাবে দেখলে প্রকৃত কারণগুলো আড়ালেই থেকে যাবে। একটি এইচএসসি ব্যাচের বাস্তবতা বুঝতে হলে তাদের পুরো শিক্ষাজীবনের পথচলা, বিশেষ করে কৈশোরের শেষ কয়েক বছরের অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ কোনো শিক্ষার্থী একদিনে ঝরে পড়ে না; দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত, সামাজিক, মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিঘাতের সঞ্চিত ফল একসময় ঝরে পড়ার মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে একটি গভীর শিক্ষাগত সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে এসএসসি পাস করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল, সেখানে ২০২৪ সালের এসএসসি-উত্তীর্ণ ব্যাচে ঝরে পড়ার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬.৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ, আগের দুই শিক্ষাবর্ষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার শেষ ধাপে পৌঁছানোর আগেই শিক্ষা-ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এটি কেবল একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; বরং একটি জাতীয় সতর্কবার্তা, যা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং সামাজিক বাস্তবতার কঠিন প্রতিফলন।

কিন্তু এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের ওপর দোষারোপ করা নয়। বরং এই ব্যতিক্রমী প্রজন্মের শিক্ষাজীবনকে একটি দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা-গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার চেষ্টা করা। এই ব্যাচ এমন একটি প্রজন্ম, যারা শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ধারাবাহিকভাবে নানা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। তাদের শিক্ষাজীবনের শেষ কয়েক বছর ছিল অনিশ্চয়তা, শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন, মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন, জাতীয় অস্থিরতা, কলেজজীবনের বিলম্বিত সূচনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের সময়। শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই বা পরীক্ষার বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক, মানসিক ও মানবিক অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে তার প্রভাব অনেক সময় পরীক্ষার ফলাফলে নয়, বরং পরীক্ষার হলে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যায় প্রতিফলিত হয়।

এই নিবন্ধে আমি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই—যদি একটি প্রজন্মের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চিত মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত চাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে তাদের ঝরে পড়াকে কি শুধুই ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে ব্যাখ্যা করা যায়? নাকি এটিকে রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সমাজ—সবার সম্মিলিত দায়িত্বের আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত? আমার বিশ্বাস, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ শুধু ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের জন্য নয়; বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা পরিকল্পনা, সংকটকালীন শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা-অধিকার নিশ্চিত করার জন্যও অত্যন্ত জরুরি।

এই কারণেই এই ধারাবাহিক নিবন্ধ। এটি কোনো আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া নয়; আবার কেবল পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণও নয়। এটি একটি প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া শিক্ষাযাত্রার ইতিহাস বোঝার চেষ্টা, একটি জাতীয় শিক্ষা-সংকটের অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি আরও মানবিক, স্থিতিস্থাপক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণের আহ্বান।

এই গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজনে নিবন্ধটি হয়তো প্রচলিত সংবাদ-ফিচারের তুলনায় কিছুটা দীর্ঘ হয়েছে। তবে আমার আন্তরিক প্রত্যাশা, শিক্ষা নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তা, অভিভাবক এবং বিষয়টিতে আগ্রহী পাঠকেরা যদি কিছুটা সময় নিয়ে ধৈর্য ও গভীর মনোযোগসহ এই নিবন্ধটি পাঠ করেন, তাহলে তাঁরা উপলব্ধি করতে পারবেন যে ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের সংকট কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং এটি বহু বছরের সঞ্চিত শিক্ষাগত, সামাজিক, মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিঘাতের সম্মিলিত পরিণতি।

এই লেখাটি এমন এক সময়ে লিখছি, যখন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নানামুখী অস্থিরতা, নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং দৃশ্যমান-অদৃশ্য নানা প্রভাবের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। তবুও আশার কথা হলো, এই প্রতিকূল পরিবেশেও এ দেশের অসংখ্য কিশোর-তরুণ নিজেদের মেধা, অধ্যবসায় ও আত্মপ্রচেষ্টায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে।

কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতাও ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে এবং তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আর দেশে ফিরে আসছে না। এর পেছনে নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক, পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ রয়েছে। যদি এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকে, তবে জাতি তার মূল্যবান মানবসম্পদের একটি বড় অংশ হারাতে পারে। একই সময়ে নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন স্তরে যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

বর্তমান প্রজন্ম, বিশেষ করে জেনারেশন–জেড, অধিক সচেতন, তথ্যসমৃদ্ধ এবং ন্যায়বোধে সংবেদনশীল। তাই তারা যখন দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অসঙ্গতি, বৈষম্য বা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়, তখন অনেকের পক্ষেই তা সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না। এই বাস্তবতার প্রতিফলন আমি কেবল একজন গবেষক হিসেবে নয়, একজন অভিভাবক ও পরিবারের সদস্য হিসেবেও দেখেছি। আমার নিজের পরিবারেও কয়েকজন মেধাবী তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার সন্ধানে বিদেশে চলে গেছে—কেউ অস্ট্রেলিয়ায়, কেউ যুক্তরাষ্ট্রে। তাদের এই সিদ্ধান্ত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বৃহত্তর একটি সামাজিক বাস্তবতার অংশ বলেই আমার মনে হয়েছে।

এই প্রবণতাগুলো যদি যথাসময়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করা হয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় আস্থা, গুণগত মান, ন্যায্যতা ও দূরদর্শী সংস্কার নিশ্চিত করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে জাতিকে আরও জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

এই কারণেই একজন শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও শিক্ষা গবেষক হিসেবে আমি নীরব থাকতে পারিনি। সেই দায়বোধ থেকেই এই নিবন্ধটি লেখা। আলোচনার পরিধি ও বিষয়ের জটিলতার কারণে লেখাটি হয়তো কিছুটা দীর্ঘ হয়েছে। তবুও আশা করি, সামগ্রিক প্রেক্ষাপট ও সমস্যার আন্তঃসম্পর্ক অনুধাবনের স্বার্থে আপনি ধৈর্যসহকারে পুরো লেখাটি পড়বেন এবং আপনার মূল্যবান মতামত ও সমালোচনার মাধ্যমে আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করবেন।

এই নিবন্ধের আরেকটি বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট করে বলতে চাই। আজকের এই পরিস্থিতির জন্য কে দায়ী—সেই দায় নির্ধারণ বা দোষারোপ করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। কারণ, এই সংকটের শিকড় অনুসন্ধান করতে গেলে হয়তো আমরা এমন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হব, যেখানে দায়ের পরিধি এতটাই বিস্তৃত যে সরকার, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, এমনকি আমাদের মতো শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরাও নিজেদের সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্ত দাবি করতে পারব না। একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবনে যে গভীর অভিঘাত সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ঘটনার ফল নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা বহুস্তরীয় সিদ্ধান্ত, সামাজিক বাস্তবতা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত পরিণতি।

সেজন্য এই নিবন্ধের লক্ষ্য অতীতের বিচারসভা বসানো নয়; বরং অতীতকে অনুধাবন করে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করা। আমাদের এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—এই ব্যতিক্রমী প্রজন্মের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা, তাদের বাস্তবতাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা এবং সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আরও মানবিক, স্থিতিস্থাপক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা নীতি গড়ে তোলা। আমরা যদি আজ এই সংকটকে যথাযথভাবে বুঝতে পারি, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে আর কোনো প্রজন্মকে এমন অনিশ্চয়তা, অবিচার, শিক্ষাগত বিচ্ছিন্নতা কিংবা মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। সেটিই হবে এই নিবন্ধ রচনার প্রকৃত সার্থকতা।

সবশেষে, আমি একটি বিনীত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অনুরোধ জানাতে চাই। যদি আমরা আজও এই ব্যাচের অভিজ্ঞতা ও সংকটকে যথাযথভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই, তবে এই শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে এবং জাতীয় জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আরও জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে—যার প্রভাব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবার ওপরই পড়বে। তাই ২০২৬ সালের এই মেধাবী ও সম্ভাবনাময় প্রজন্মকে যথাযথভাবে বুঝতে, তাদের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে এবং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়নে সহায়তা করতে এই নিবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি।

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

২০১৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে যাত্রা শুরু করে ২০২৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষার হলে পৌঁছানো এই প্রজন্মের গল্প শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এক অস্থির যুগের জীবন্ত দলিল। মহামারি, দীর্ঘ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, বারবার পরিবর্তিত শিক্ষাক্রম, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন, সামাজিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মধ্য দিয়েও তারা শেখার পথ ছাড়েনি। এই নিবন্ধে তথ্য, গবেষণা, শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে কেন ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচকে কেবল নম্বর দিয়ে নয়, বরং তাদের স্থিতিস্থাপকতা, অভিযোজনক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত। এটি একই সঙ্গে একটি প্রজন্মের প্রতি শ্রদ্ধা, একটি শিক্ষা ব্যবস্থার আত্মসমালোচনা এবং ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারের জন্য এক শক্তিশালী আহ্বান। 

প্রতিটি প্রজন্মেরই একটি গল্প থাকে। কারও গল্প যুদ্ধের, কারও গল্প দুর্ভিক্ষের, কারও গল্প স্বাধীনতার। আবার এমনও কিছু প্রজন্ম আছে, যাদের গল্প কোনো একটি ঘটনার নয়; বরং একের পর এক পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নীতিগত দোদুল্যমানতা এবং সময়ের নির্মম অভিঘাতে লেখা হয়। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ঠিক তেমনই একটি প্রজন্ম। তাদের গল্প কেবল একটি পাবলিক পরীক্ষার গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে এক অস্থির সময়ে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্মের জীবনপঞ্জি।

২০১৪ সালে প্রায় ৩২ লাখ ছোট্ট শিশু প্রথম শ্রেণির শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেছিল। তাদের কাঁধে ছিল নতুন স্কুলব্যাগ, হাতে নতুন বই, চোখে নতুন পৃথিবী দেখার বিস্ময়। কিন্তু সেই বিস্ময়ের যাত্রাপথ ছিল সরল নয়। হারাধনের দশ ছেলের গল্পের মতো শিক্ষার প্রতিটি ধাপে কেউ দারিদ্র্যের কাছে হেরেছে, কেউ ঝরে পড়েছে সামাজিক বৈষম্যের কাছে, কেউ পরাজিত হয়েছে পারিবারিক সংকটে, কেউ হারিয়ে গেছে দুর্যোগে, কেউ শিক্ষাব্যবস্থার ফাঁকফোকরে। দীর্ঘ বারো বছরের সেই যাত্রা শেষে আজ তারা দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন হয়ে। সংখ্যার এই পতন কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি অসংখ্য অসমাপ্ত স্বপ্ন, নীরব বিদায় এবং অদৃশ্য বঞ্চনার ইতিহাস।

এই প্রজন্ম এমন এক সময়ে বড় হয়েছে, যখন শিক্ষার পথ ছিল বারবার পরিবর্তিত মানচিত্রের মতো। তারা পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যসূচি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল; তারপর বৈশ্বিক মহামারি এসে তাদের শ্রেণিকক্ষ কেড়ে নিল। বিদ্যালয়ের ঘণ্টা থেমে গেল, খেলার মাঠ নিঃশব্দ হয়ে গেল, বন্ধুরা পরিণত হলো মোবাইল ফোনের ক্ষুদ্র পর্দায়। শেখা স্থানান্তরিত হলো টেলিভিশনের সম্প্রচার, অনলাইন ক্লাস এবং অ্যাসাইনমেন্টভিত্তিক ব্যবস্থায়। পরে শেখার ক্ষতি পূরণের নামে এলো সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, অগ্রাধিকারভিত্তিক পাঠ্যসূচি এবং পরিবর্তিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা। আবার সেই সময়েই জাতীয় শিক্ষাক্রম পরিবর্তন নিয়ে শুরু হলো নতুন বিতর্ক, সংশোধন, পুনর্বিবেচনা এবং নীতিগত অস্থিরতা। ফলে এই ব্যাচ এমন এক শিক্ষাজীবন অতিক্রম করেছে, যেখানে একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যক্রম, দীর্ঘ বিদ্যালয় বন্ধ, বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং পরিবর্তিত শিক্ষা নীতির অভিজ্ঞতা একত্রে উপস্থিত।

এই কারণেই ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচকে কেবল একটি পরীক্ষার ব্যাচ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। শিক্ষাতত্ত্বের ভাষায় তারা একটি disrupted educational cohort, একটি learning-interrupted generation—এমন একটি প্রজন্ম, যাদের শেখার ধারাবাহিকতা বারবার ভেঙেছে, কিন্তু শেখার আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি ভাঙেনি। তারা এক অর্থে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগারের নীরব অংশগ্রহণকারী—যেখানে নীতি বদলেছে, পদ্ধতি বদলেছে, মূল্যায়ন বদলেছে, কিন্তু পরিবর্তনের ভার সবচেয়ে বেশি বহন করেছে শিক্ষার্থীরাই। অনেক সময় মনে হয়, তারা যেন শিক্ষাব্যবস্থার নীরব গিনিপিগ—যাদের ওপর পরিবর্তনের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়েছে, কিন্তু যাদের দীর্ঘমেয়াদি শেখা, মানসিক স্বাস্থ্য, বৌদ্ধিক বিকাশ কিংবা জীবনের ওপর সেই পরিবর্তনের প্রভাব কতটা পড়ল, তা নিয়ে খুব কমই প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধান হয়েছে।

এই প্রজন্মকে বোঝার জন্য শুধু তাদের এইচএসসি পরীক্ষার নম্বর দেখা যথেষ্ট নয়। কারণ একটি পরীক্ষার ফল একজন শিক্ষার্থীর একটি দিনের পারফরম্যান্স জানায়; কিন্তু একটি প্রজন্মের গল্প জানতে হলে তার বারো বছরের যাত্রাপথ পড়তে হয়।—আসলে তাদের দেখতে হবে একটি দীর্ঘ জীবনরেখার ভেতর দিয়ে—যেখানে রয়েছে শেখার হারিয়ে যাওয়া সময়, অপূর্ণ সামাজিকীকরণ, অনিশ্চয়তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম, মানসিক চাপ, ডিজিটাল বৈষম্য, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, পরিবর্তিত শিক্ষানীতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অদৃশ্য উদ্বেগ। কারণ এই প্রজন্ম শুধু একটি পরীক্ষা দেয়নি; তারা বারো বছর ধরে সময়, সমাজ, রাষ্ট্র, নীতি, দুর্যোগ এবং ইতিহাসেরও একের পর এক পরীক্ষা দিয়েছে।

সম্ভবত ইতিহাস একদিন ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচকে শুধু একটি পরীক্ষার ব্যাচ হিসেবে মনে রাখবে না। বরং মনে রাখবে এমন একটি প্রজন্ম হিসেবে, যারা বারো বছরে একাধিক জাতীয় সংকট, বৈশ্বিক মহামারি, শিক্ষানীতির পরিবর্তন এবং সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। তাদের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে এইচএসসি ফলাফলে নয়; বরং আগামী ১০–১৫ বছরে তারা গবেষণাগারে, শিল্পে, প্রযুক্তিতে, উদ্যোক্তা হিসেবে, নাগরিক নেতৃত্বে এবং জ্ঞানচর্চায় কী অবদান রাখে, তার মাধ্যমে।

তবু এই গল্প কেবল হারানোর নয়। এটি এমন একটি প্রজন্মের গল্প, যারা বারবার হোঁচট খেয়েও এগিয়ে চলেছে; যারা অস্থিরতার মধ্যেও স্থিতিস্থাপকতা শিখেছে; যারা অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়নি। তাই ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের গল্প আসলে একটি জাতিরও গল্প—যেখানে প্রশ্নটি কেবল তারা কত নম্বর পেল?” নয়; বরং আমরা তাদের কী ধরনের শিক্ষা দিলাম, কী ধরনের মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ দিলাম, আর তাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কী প্রত্যাশা করতে পারে?” —এই নিবন্ধ সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজারই একটি প্রয়াস।

সোনা আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়: চরম পরীক্ষার যাত্রী এক প্রজন্ম

লোকমুখে একটি প্রবাদ আছেসোনা আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়। কিন্তু সব আগুন সমান নয়। কিছু আগুন মানুষকে ভস্ম করে, আবার কিছু আগুন মানুষকে আরও দৃঢ়, আরও দীপ্ত, আরও সহনশীল করে তোলে। ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ যেন সেই দ্বিতীয় আগুনেরই যাত্রী। তারা শুধু একটি পরীক্ষার হলে বসেনি; তারা শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত সময়, সংকট, অনিশ্চয়তা, নীতিগত পরিবর্তন, মহামারি এবং সামাজিক অস্থিরতার একের পর এক অগ্নিপরীক্ষা অতিক্রম করেছে।

এই প্রজন্মের গল্পের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—তারা শুধু সংকটের মধ্য দিয়ে হাঁটেনি; তারা সংকটের সঙ্গেই সহাবস্থান করতে শিখেছে। অনিশ্চয়তা তাদের কাছে ব্যতিক্রম নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। এটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, আবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও। কারণ কোনো সমাজ যদি দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তাকে স্বাভাবিক জীবনধারা হিসেবে মেনে নিতে শেখে, তবে সে সমাজ ধীরে ধীরে ভবিষ্যৎ নির্মাণের সাহস হারাতে শুরু করে। তখন দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক টিকে থাকার কৌশলই হয়ে ওঠে প্রধান জীবনদক্ষতা। তরুণেরা তখন আগামীকালকে নির্মাণ করার চেয়ে আজকের দিনটিকে নিরাপদে পার করার কৌশলই বেশি রপ্ত করে।

তবু এই ব্যাচের গল্প হতাশার নয়। কারণ প্রতিকূলতা তাদের পরিচয় নয়; প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার ক্ষমতাই তাদের প্রকৃত পরিচয়। তারা ঝড় দেখেছে, কিন্তু চলার ইচ্ছা হারায়নি; তারা শ্রেণিকক্ষ হারিয়েছে, কিন্তু শেখার আকাঙ্ক্ষা হারায়নি; তারা অনিশ্চয়তার ভেতর বেড়ে উঠেছে, কিন্তু স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়নি। তাই এই প্রজন্মকে কেবল শেখার ঘাটতির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা অন্যায় হবে।

বরং এখন দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যদি উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক মানবসম্পদ গঠনে সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ করা যায়, তবে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ তরুণরাই একদিন বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিযোজনক্ষম, উদ্ভাবনী, স্থিতিস্থাপক এবং বিশ্বমানের মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছেযে প্রজন্ম সবচেয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করে, সুযোগ পেলে তারাই প্রায়শই একটি জাতির সবচেয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।

একটি অস্থির সময়ের শিক্ষার্থী হিসেবে বেড়ে ওঠা একটি ব্যাচ: দৃষ্টির আড়ালে থাকা অদেখা গল্প

শিক্ষাজীবনের ইতিহাসে সব ব্যাচ এক রকম নয়। কোনো প্রজন্মের পরিচয় তার পাঠ্যবই দিয়ে, কোনো প্রজন্মের পরিচয় তার পরীক্ষার ফল দিয়ে, আবার কোনো প্রজন্মের পরিচয় নির্ধারিত হয় সময়ের নির্মম অভিঘাতে। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ঠিক তেমনই এক প্রজন্ম। শিক্ষা গবেষণার ভাষায় এদের একটি disrupted educational cohort, learning-interrupted generation, এমনকি crisis generation হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। কারণ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুব কম শিক্ষার্থীই প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে এত বৈচিত্র্যময় জাতীয় ও বৈশ্বিক সংকট, নীতিগত পরিবর্তন, মহামারি, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষাব্যবস্থার পুনঃপুন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। তাদের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; বরং প্রতিবার বদলে যাওয়া বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে নতুন করে মানিয়ে নেওয়া।

সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে তাদের শেখার ধারাবাহিকতায় (Continuity of Learning)। শিক্ষা একটি নদীর মতো—তার প্রবাহ থেমে গেলে নদী যেমন খণ্ডিত হয়, তেমনি শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে জ্ঞানের বিকাশও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ বিদ্যালয় বন্ধ, সীমিত শ্রেণিকক্ষ, অনলাইন ও বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং অনিয়মিত পাঠদানের ফলে এই ব্যাচের শেখার স্বাভাবিক ছন্দ বহুবার ব্যাহত হয়েছে। ফলে অনেকেই বিচ্ছিন্ন তথ্য অর্জন করেছে, কিন্তু সেই জ্ঞানকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে একটি সুসংহত বোধ বা ধারণা নির্মাণের সুযোগ সবসময় পায়নি।

কোভিড-১৯-এর পর বিশ্বজুড়ে Learning Loss নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই ব্যাচের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর—এটি অনেকাংশে Competency Loss-এ রূপ নিয়েছে। কারণ শিক্ষা কেবল তথ্য অর্জনের নাম নয়; শিক্ষা হলো অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিতর্ক, সহযোগিতা এবং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা অর্জনের প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানাগারে হাতে-কলমে কাজ, দলগত প্রকল্প, উপস্থাপনা, গবেষণামূলক কার্যক্রম কিংবা শ্রেণিকক্ষের বিতর্ক—এসব অভিজ্ঞতার একটি বড় অংশ তাদের নাগালের বাইরে থেকে গেছে। ফলে জ্ঞান কিছুটা অর্জিত হলেও উচ্চতর দক্ষতা (Higher-order Skills) ও সামগ্রিক যোগ্যতা (Competency)-এর বিকাশ সমানভাবে ঘটেছে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

এই ব্যাচের শিক্ষাজীবনের আরেকটি স্থায়ী সঙ্গী ছিল দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা (Chronic Uncertainty)। তারা এমন এক কৈশোর পার করেছে, যেখানে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন ছিল—বিদ্যালয় কবে খুলবে, পরীক্ষা কবে হবে, কোন সিলেবাসে হবে, মূল্যায়নের নিয়ম কী হবে, পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ কীভাবে চলবে? মনোবিজ্ঞানের ভাষায় দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, সিদ্ধান্তহীনতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে। এই ব্যাচ সেই অভিজ্ঞতা কেবল বইয়ে পড়েনি; তারা তা জীবন দিয়ে অনুভব করেছে।

বিদ্যালয় শুধু পাঠদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সামাজিক জগত। এখানেই বন্ধুত্ব জন্ম নেয়, নেতৃত্বের অনুশীলন হয়, সহমর্মিতা শেখা হয়, মতবিনিময়, খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও দলগত কাজের মধ্য দিয়ে একজন কিশোর তার ব্যক্তিত্ব নির্মাণ করে। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় এই ব্যাচের একটি বড় অংশ সেই স্বাভাবিক সামাজিকীকরণের সুযোগ হারিয়েছে। তাদের শিক্ষাজীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঋতুই যেন অসমাপ্ত থেকে গেছে।

অন্যদিকে, শেখার সুযোগ সীমিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষার গুরুত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে শিক্ষা ধীরে ধীরে অনেকের কাছে জ্ঞান অনুসন্ধানের পথ না হয়ে পরীক্ষায় ভালো ফল করার কৌশলে পরিণত হয়েছে। কৌতূহল, অনুসন্ধিৎসা, সৃজনশীলতা এবং আবিষ্কারের আনন্দের পরিবর্তে নম্বর, GPA এবং ভর্তি প্রতিযোগিতাই শিক্ষাজীবনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা গভীর শিক্ষার (Deep Learning) পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে পৃষ্ঠতলীয় শেখার (Surface Learning) প্রবণতাকে উৎসাহিত করেছে।

এই অভিজ্ঞতাগুলোর প্রভাব শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো ভবিষ্যতের বৌদ্ধিক বিকাশেও দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে। সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking) বিকশিত হয় প্রশ্ন, বিতর্ক ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে। গবেষণামনস্কতা (Research Mindset) গড়ে ওঠে অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। নতুন ধারণা নিয়ে ভাবার আত্মবিশ্বাস (Intellectual Confidence) তৈরি হয় ধারাবাহিক সাফল্য, সহযোগিতামূলক শিক্ষা এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশে। যখন এই অভিজ্ঞতাগুলো বারবার ব্যাহত হয়, তখন শিক্ষার্থীরা কখনও কখনও নিজের সম্ভাবনা সম্পর্কেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ধারণাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার পরিবর্তে পরীক্ষাভিত্তিক মুখস্থনির্ভর শেখার প্রবণতাও বাড়তে পারে।

তবে এই গল্প শুধু সীমাবদ্ধতার নয়। ইতিহাসের একটি বৈপরীত্য হলো—প্রতিকূলতা যেমন কিছু কেড়ে নেয়, তেমনি কিছু নতুন শক্তিও তৈরি করে। ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। তারা দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করেছে। তারা ডিজিটাল প্রযুক্তিকে শেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শিখেছে। অনিশ্চয়তার মধ্যেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস অর্জন করেছে। প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিক স্থিতিস্থাপকতা (Resilience) তৈরি হয়েছে। অনেকেই আত্মশিক্ষা (Self-directed Learning)-এর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে—যা ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

অতএব, ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচকে কেবল শেখার ঘাটতির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। তাদেরকে বুঝতে হবে একটি ব্যতিক্রমী প্রজন্ম হিসেবে—যারা হারিয়েছে অনেক কিছু, কিন্তু অর্জনও করেছে সময়ের কঠিন বিদ্যালয়ে শেখা কিছু অনন্য জীবনদক্ষতা। এখন দায়িত্ব রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমাজের—তাদের শেখার ঘাটতি পূরণ করা, মানসিক সুস্থতা পুনর্গঠন করা, গবেষণামনস্কতা বিকশিত করা এবং সেই স্থিতিস্থাপকতাকে উদ্ভাবনী শক্তিতে রূপান্তর করা। কারণ যথাযথ নীতিগত সহায়তা পেলে এই অস্থির সময়ের শিক্ষার্থীরাই একদিন বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিযোজনক্ষম, জ্ঞাননির্ভর এবং ভবিষ্যতমুখী মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে।

২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ: কালের প্রশ্ন, এক প্রজন্মের কাঁধে কত ভার?

পরীক্ষার হলে কলম ধরিবার পূর্বেই যাহাদের জীবনের খাতায় লেখা হইয়া গিয়াছে অনিশ্চয়তার অসংখ্য পৃষ্ঠা, তাহারাই ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। মহামারীর ছায়ায় সূচনা, রাজনৈতিক পালাবদলের ঢেউয়ে দোদুল্যমান শিক্ষাবর্ষ, প্রযুক্তির আকস্মিক ঝড়ে বদলে যাওয়া পাঠক্রম — এই ব্যাচ কেবল পাঠ্যবইয়ের পরীক্ষাই দেয় নাই, দিয়াছে সময়ের পরীক্ষা। তাহাদের প্রতিটি বর্ষ যেন একেকটি প্রশ্নপত্র, যেখানে নম্বর বরাদ্দ ছিল ধৈর্য, সহনশীলতা আর স্বপ্নকে বাঁচাইয়া রাখিবার কৌশলে। প্রশ্ন জাগে, একটি প্রজন্মের মেধা যাচাই করিতে রাষ্ট্র আর কতগুলি অদৃশ্য পরীক্ষা গ্রহণ করিবে?

সাধারণভাবে আমরা মনে করি, একজন শিক্ষার্থী তার জীবনে কয়েকটি পাবলিক পরীক্ষা দেয়—পিইসি, এসএসসি, এইচএসসি। কিন্তু ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের দিকে তাকালে মনে হয়, তাদের বিরুদ্ধে পরীক্ষার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। প্রশ্নপত্রে ছিল তিন ঘণ্টার পরীক্ষা; কিন্তু জীবনে ছিল বারো বছরের পরীক্ষা।

  • প্রথম পরীক্ষা ছিল সময়ের পরীক্ষা। যে সময়ে তাদের শেখার কথা ছিল, সেই সময়ই কখনও বিদ্যালয় বন্ধ, কখনও পাঠ্যসূচি পরিবর্তন, কখনও নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি, কখনও আবার পূর্বের পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ, তারা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় হয়েছে, যেখানে পরিবর্তনই ছিল একমাত্র স্থায়ী বিষয়।
  • দ্বিতীয় পরীক্ষা ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। দীর্ঘ কোভিড-১৯ মহামারিতে তারা শিখেছে, শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে হয় না; আবার এটাও শিখেছে যে, শ্রেণিকক্ষের বিকল্পও পুরোপুরি সম্ভব নয়। মোবাইল ফোন, দুর্বল ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, একাকীত্ব, অনলাইন ক্লাসের সীমাবদ্ধতা—সবকিছুর মধ্যেও তাদের এগিয়ে যেতে হয়েছে।
  • তৃতীয় পরীক্ষা ছিল অসমতার পরীক্ষা। শহরের একজন শিক্ষার্থী হয়তো প্রতিদিন অনলাইন ক্লাস করেছে, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থীর সেই সুযোগ ছিল না। একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলেও শেখার সুযোগ ছিল সমান নয়। শিক্ষাতত্ত্বের ভাষায় এটিকে inequality of opportunity to learn বলা হয়।
  • চতুর্থ পরীক্ষা ছিল মানসিক স্থিতিস্থাপকতার পরীক্ষা। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন বন্ধুত্ব, খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি সম্পর্ক ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ব্যাচের অনেকেই সেই অভিজ্ঞতার একটি অংশ হারিয়েছে। ফলে তাদের অনেককে একাডেমিক চাপের পাশাপাশি আবেগীয় অনিশ্চয়তার সঙ্গেও লড়াই করতে হয়েছে।
  • পঞ্চম পরীক্ষা ছিল স্বপ্ন ধরে রাখার পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে কি না, পরিবার আর্থিকভাবে টিকে থাকবে কি না, পরীক্ষা কবে হবে, সিলেবাস কী হবে—এমন অসংখ্য অনিশ্চয়তার মধ্যেও তাদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে হয়েছে।

সংখ্যার ভাষায় ২০২৬ ব্যাচের এইচএসসিএক দিনে পরীক্ষার হলে একটি ছোট রাষ্ট্র

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে আরেকটি বিশাল আয়োজন। এবার দেশের ,৩১৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ১২,৭০,৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী ২,৭৯৭টি পরীক্ষাকেন্দ্রে অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ৬,৪৮,৬১৪ জন ছাত্রী এবং ৬,২১,৯৬৯ জন ছাত্র। Regular পরীক্ষার্থী ৯,৪৭,৯৪৩ জন, আর ৩,১০,৮৮১ জন irregular, যাদের একটি বড় অংশ পূর্ববর্তী বছরের অকৃতকার্য বা অসম্পূর্ণ পরীক্ষার্থী। 

সংখ্যাগুলোকে কেবল পরীক্ষার পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বাস্তবে একদিনে পরীক্ষার হলে বসছে এমন মানুষের সংখ্যা বিশ্বের বহু দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। অর্থাৎ, একটি মাত্র পাবলিক পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ এমন একটি মানবসমাবেশ পরিচালনা করে, যা অনেক স্বাধীন রাষ্ট্রের মোট নাগরিকসংখ্যাকেও অতিক্রম করে।—এটি যেমন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রমাণ, তেমনি একটি মৌলিক প্রশ্নও উত্থাপন করে—এত বিশাল প্রশাসনিক শক্তি, অর্থ, সময় ও মানবসম্পদ যদি কেবল একটি পরীক্ষা আয়োজনেই ব্যয় হয়, তাহলে শেখার গুণগত মান উন্নয়নে আমরা সমান শক্তি বিনিয়োগ করছি কি?

পৃথিবীর কতগুলো দেশের জনসংখ্যা বাংলাদেশের এইচএসসি পরীক্ষার্থীর চেয়েও কম?—একটু হাসি, একটু আত্মজিজ্ঞাসা

একটু কল্পনা করুন।—ধরা যাক, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সবাইকে নিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করা হলো। সেই রাষ্ট্রের জনসংখ্যা হবে ১২ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি

মজার বিষয় হলো, পৃথিবীতে এমন প্রায় ৪৫৫০টি সার্বভৌম দেশ রয়েছে, যাদের মোট জনসংখ্যাই এর চেয়ে কম। আরও মজার তথ্য হচ্ছে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে অন্তত Curaçao (প্রায় ১.৬ লাখ), Cape Verde (প্রায় ৫.৩ লাখ) এবং New Zealand-এর মতো ছোট জনসংখ্যার দেশ রয়েছে; এর মধ্যে কুরাসাওকেপ ভার্দে—উভয়ের জনসংখ্যাই বাংলাদেশের এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যার অনেক নিচে। 

ভাবুন তো, বিশ্বকাপে একটি দেশের পুরো জনগণকে মাঠে নামানো সম্ভব নয়; কিন্তু বাংলাদেশে একটি পরীক্ষার দিন যেন একটি ছোট রাষ্ট্রের সমান মানুষ একসঙ্গে উত্তরপত্র লিখছে! তাই হয়তো পৃথিবীর অন্য কোনো গ্রহের কোনো ভিনগ্রহবাসী যদি সেদিন বাংলাদেশে এসে জিজ্ঞেস করে——“এত মানুষ কোথায় যাচ্ছে?”

উত্তর হবে—

—“যুদ্ধে নয়, ভোটে নয়, উৎসবে নয়; সবাই পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে!”

ভিনগ্রহবাসী আবার প্রশ্ন করতে পারে—

—“তাহলে তোমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত জিনিস কী?”

আমরা হয়তো একটু লজ্জা পেয়ে উত্তর দেব—

—“ধান, পাট, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি… পরীক্ষার্থীও।”

হারাধনের ছেলেদের মতো হারিয়ে যাওয়া একটি ব্যাচ: ৩২ লাখ থেকে ১২.৭০ লাখএকটি শিক্ষাজীবনের নীরব ক্ষয়

একটি নদীর জন্ম হয় পাহাড়ের বুকে ছোট্ট একটি ঝরনা হিসেবে। তারপর পথে পথে অসংখ্য উপনদী এসে তাকে বড় করে, আবার কোথাও ভাঙন, কোথাও পলি, কোথাও মরুকরণ, কোথাও দখলে তার জলরাশি হারিয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মোহনায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে নদীটি আর সেই শুরুর নদীটি থাকে না। ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের শিক্ষাজীবনের গল্পও অনেকটা তেমনই—এটি কেবল শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার গল্প নয়; এটি একটি জাতির শিক্ষা-প্রবাহে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প।

২০১৪ সালে যখন এই ব্যাচের শিশুরা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তখন তাদের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৩ লাখ। সেই দিনটি ছিল তাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাযাত্রার সূচনা। নতুন বইয়ের গন্ধ, নতুন ইউনিফর্ম, নতুন খাতা আর অসীম স্বপ্ন নিয়ে তারা প্রবেশ করেছিল বিদ্যালয়ের দরজায়। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে যারা ঢুকেছিল, সবাই আর শেষ পর্যন্ত একই দরজা দিয়ে বের হতে পারেনি।

২০১৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির সময় এসে সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় আনুমানিক ২৬ থেকে ২৮ লাখে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষার মূলধারা থেকে হারিয়ে যায়। কেউ অর্থনৈতিক কারণে, কেউ সামাজিক বাস্তবতায়, কেউ বিদ্যালয় পরিবর্তনের জটিলতায়, কেউ অদৃশ্য প্রশাসনিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতায়। এরপর ২০১৯ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে উত্তরণের সময় আরও একটি ছাঁকনি কাজ করে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে cohort-এর আকার সংকুচিত হয়ে দাঁড়ায় আনুমানিক ২৪ থেকে ২৬ লাখে

এই ক্ষয় কিন্তু সমান গতিতে চলেনি। মাধ্যমিক পর্যায়ের শেষভাগে, বিশেষ করে নবম ও দশম শ্রেণিতে এসে ক্ষয়ের গতি আরও তীব্র হয়েছে। ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখের কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রথম শ্রেণিতে যাত্রা শুরু করা শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ তখন আর মূল ধারার শিক্ষায় নেই। এরপর আসে আরেকটি বড় মোড়—এসএসসি পাসের পর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি। এখানেই সবচেয়ে বড় ছাঁকনি কাজ করে। কেউ অর্থনৈতিক কারণে পড়াশোনা ছাড়ে, কেউ কর্মজীবনে প্রবেশ করে, কেউ কারিগরি বা অন্য ধারায় যায়, আবার কেউ স্থায়ীভাবেই শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ফলে ২০২৬ সালে এসে এই দীর্ঘ যাত্রার শেষে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১২,৭০,৫৮৩ জন শিক্ষার্থী। আর তাদের মধ্যে নিয়মিত (Regular) পরীক্ষার্থী মাত্র ,৪৭,৯৪৩ জন। অর্থাৎ ২০১৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে যাত্রা শুরু করা সম্ভাব্য cohort-এর মাত্র প্রায় ২৯ থেকে ৩২ শতাংশ নির্ধারিত সময়ে নিয়মিতভাবে এইচএসসি পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পেরেছে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ কোথায় হারিয়ে গেল—এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত।

এই পরিসংখ্যান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে। এবারের পরীক্ষায় ,১০,৮৮১ জন irregular পরীক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ,৯৫,১০৬ জন এক বিষয়ে এবং ৬৪,৬৭০ জন দুই বিষয়ে পূর্ববর্তী ব্যর্থতার কারণে আবার পরীক্ষা দিচ্ছে। অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে শেখার ঘাটতি (learning gap) শুধু ঝরে পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রেই বিলম্বিত শিক্ষাজীবন, পুনরাবৃত্ত পরীক্ষা এবং দীর্ঘায়িত একাডেমিক যাত্রায় রূপ নিয়েছে। এটিই শিক্ষাবিদদের ভাষায় Delayed Learning Bill—যার অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানসিক মূল্য অনেক বড়।

লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানও একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এবার পরীক্ষায় ৬,৪৮,৬১৪ জন ছাত্রী, যেখানে ছাত্র ৬,২১,৯৬৯ জন। এটি বাংলাদেশের নারীর শিক্ষায় অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে একই সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক বণ্টন একটি নতুন উদ্বেগও সৃষ্টি করছে। মানবিক বিভাগে ৬,১৭,৬৯৭ জন, বিজ্ঞান বিভাগে মাত্র ২,৭৯,২৩৭ জন, এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১,৬৯,৬৮৩ জন। বিশেষ করে গ্রামীণ কলেজগুলোতে বিজ্ঞান শিক্ষক সংকট, পর্যাপ্ত পরীক্ষাগারের অভাব, গণিতভীতি এবং বিজ্ঞান শিক্ষার উচ্চ ব্যয় অনেক শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান ধারা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর পড়তে পারে।

এই cohort-এর গল্প তাই একটি নদীর গল্প। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নদীটি ছিল প্রশস্ত, প্রাণবন্ত এবং সম্ভাবনায় ভরপুর। কিন্তু মাধ্যমিকের মোহনায় এসে তার স্রোত সরু হয়েছে। এসএসসি-পরবর্তী উচ্চমাধ্যমিকে এসে সেই নদীর অনেক জল বালুচরে আটকে গেছে। সবচেয়ে বড় ক্ষয় ঘটেছে তিনটি স্থানে—প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণে, নবম-দশম শ্রেণির এসএসসি প্রস্তুতির সময় এবং এসএসসি-পরবর্তী একাদশ শ্রেণিতে ধরে রাখার পর্যায়ে। এই তিনটি ধাপই এখন বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ক্ষয় আরও গভীর। যদি প্রথম শ্রেণিতে প্রায় ৩০৩৩ লাখ শিক্ষার্থী যাত্রা শুরু করে এবং নিয়মিতভাবে এইচএসসি পরীক্ষায় পৌঁছায় মাত্র .৪৮ লাখ, তাহলে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী একই ধারাবাহিক শিক্ষাপথ সম্পন্ন করতে পারেনি। এর অর্থ শুধু কয়েক লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে—এতটুকু নয়। এর অর্থ, রাষ্ট্রের বিপুল শিক্ষা বিনিয়োগের একটি অংশ প্রত্যাশিত মানবসম্পদে রূপান্তরিত হয়নি; পরিবারগুলো বই, কোচিং, পোশাক, পরিবহন, পরীক্ষা ফি এবং বছরের পর বছর সুযোগব্যয়ের (opportunity cost) বোঝা বহন করেছে; আর দেশের শ্রমবাজার সম্ভাব্য দক্ষ মানবসম্পদের একটি বড় অংশ হারিয়েছে।

আর irregular পরীক্ষার্থীদের এই .১০ লাখের সারি আমাদের আরও বড় একটি সত্যের সামনে দাঁড় করায়। একই শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, পুনরায় প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে, পরিবারকে আবারও ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, আর শিক্ষার্থীকে নতুন করে মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এটি কেবল একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার গল্প নয়; এটি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার নীরব বিল, যার মূল্য অনেক সময় নম্বরপত্রে ধরা পড়ে না। শিক্ষা অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি hidden cost, আর শিক্ষাতত্ত্বের ভাষায় এটি শিখনঘাটতির বিলম্বিত মূল্য (Delayed Bill of Learning Loss)—যার সুদ পরিশোধ করে শুধু শিক্ষার্থী নয়, পুরো সমাজ।

একটি পরীক্ষার হলে একটি ছোট পৃথিবী: আমরা কি পরীক্ষার্থী উৎপাদনের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, নাকি মানবসম্পদ তৈরির পথে হাঁটব?

ভাবুন তো, একদিন সকালে বাংলাদেশে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। পৃথিবীর কোনো এক আন্তর্জাতিক সংস্থা ঘোষণা দিল—“আজ জন্ম নিল একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র।” সেই রাষ্ট্রের জনসংখ্যা ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, পৃথিবীর প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যাই এর চেয়ে কম। অর্থাৎ, বাংলাদেশের ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার হলে বসা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা একাই পৃথিবীর বহু স্বাধীন দেশের মোট নাগরিকসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়।

এবার কল্পনাকে আরেকটু এগিয়ে নেওয়া যাক। এই ১২.৭ লাখ তরুণ-তরুণীকে যদি আগামী চার বছর ধরে প্রতিদিন নিয়মিত ফুটবল প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো? যদি প্রতিটি উপজেলা থেকে সেরা প্রতিভা বাছাই করে বিজ্ঞানসম্মত কোচিং, পুষ্টি, ক্রীড়া চিকিৎসা ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করা যেত? তাহলে হয়তো একদিন বাংলাদেশও বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার স্বপ্নকে কেবল কবিতা নয়, বাস্তব পরিকল্পনায় রূপ দিতে পারত। কারণ প্রতিভার সংকটের চেয়ে বড় সংকট আমাদের পরিকল্পনার সংকট।

আবার ফুটবল নয়, যদি এই একই জনগোষ্ঠীকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি-উদ্ভাবন, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, ভাষা প্রযুক্তি কিংবা উচ্চমানের কারিগরি দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা যেত? তাহলে এরা শুধু পরীক্ষার্থী থাকত না; তারা হতো বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উৎপাদনশীল শক্তি। যে দেশ বছরে একদিনে ১২ লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীকে একই সময়ে সংগঠিত করতে পারে, সেই দেশ চাইলে একই সাংগঠনিক সক্ষমতা দিয়ে ১২ লক্ষ দক্ষ মানবসম্পদও তৈরি করতে পারে।

কিন্তু এখানেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ লুকিয়ে আছে। আমরা পৃথিবীকে বিস্মিত করি পরীক্ষার আকার দিয়ে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই বিস্মিত করতে পারি উদ্ভাবনের আকার দিয়ে। আমরা লক্ষ লক্ষ তরুণকে একই দিনে প্রশ্নপত্রের সামনে বসাতে পারি, কিন্তু সবাইকে গবেষণাগারে, উদ্ভাবনকেন্দ্রে, স্টার্টআপে, প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে বা আন্তর্জাতিক দক্ষতা প্রতিযোগিতায় পৌঁছে দিতে পারি না। মনে হয়, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে দক্ষ উৎপাদন লাইন হলো—পরীক্ষার্থী উৎপাদন; অথচ জাতির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমস্যা-সমাধানকারী মানুষ উৎপাদন

পরীক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। মূল্যায়নও অপরিহার্য। কিন্তু যখন একটি জাতির শিক্ষা-পরিকল্পনা ধীরে ধীরে শেখার চেয়ে পরীক্ষাকে, দক্ষতার চেয়ে নম্বরকে এবং উদ্ভাবনের চেয়ে সার্টিফিকেটকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে, তখন শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা এমন একটি কারখানায় পরিণত হয়, যেখানে চকচকে মোড়কে পণ্য বের হচ্ছে, কিন্তু ভেতরে কতটা কার্যকর, তার পরীক্ষা খুব কমই হচ্ছে।

সময় এসেছে একটি মৌলিক সংস্কার-দর্শন গ্রহণ করার। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—একজন পরীক্ষার্থী নয়, একজন দক্ষ নাগরিক। যদি প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লক্ষাধিক তরুণ-তরুণীর প্রত্যেকের জন্য অন্তত একটি উচ্চমূল্যের দক্ষতা নিশ্চিত করা যায়—হোক তা প্রযুক্তি, ভাষা, গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, ক্রীড়া বা সৃজনশীল শিল্প—তাহলে এই পরীক্ষার হলই একদিন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানবসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

জাতির প্রকৃত শক্তি প্রশ্নপত্রে নয়; প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার ক্ষমতায়। আর সেই ক্ষমতা তৈরি করতে পারলেই বাংলাদেশ কেবল পরীক্ষার্থী সংখ্যায় নয়, উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সূচকেও বিশ্বের সামনে নতুন পরিচয়ে দাঁড়াতে পারবে।

একটি প্রজন্ম, বহু পরীক্ষাগার: ২০১৪-এর প্রথম শ্রেণি থেকে ২০২৬-এর এইচএসসিশিক্ষার্থীরা কি ছাত্র ছিল, নাকি শিক্ষা সংস্কারের পরীক্ষামূলক সংস্করণ?

২০১৪ সালে যখন এই ব্যাচের শিশুরা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তখন তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল—নতুন ব্যাগ, নতুন খাতা আর প্রথম স্কুলের ঘণ্টা। তারা জানত না, আগামী বারো বছরে তারা শুধু বাংলা, ইংরেজি বা গণিত শিখবে না; বরং বাংলাদেশের শিক্ষা নীতির একের পর এক পরিবর্তন, পরীক্ষামূলক উদ্যোগ, পাঠ্যক্রম সংশোধন, মহামারি, মূল্যায়ন পদ্ধতির রদবদল এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেরও নীরব সাক্ষী হয়ে উঠবে। মনে হয়, তারা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কম, আর শিক্ষা সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি “পাইলট প্রকল্পের অংশগ্রহণকারী” বেশি।

এক সময় তাদের বলা হলো—মুখস্থবিদ্যা ছাড়ো, দক্ষতা অর্জন করো। তারপর আবার বলা হলো—পরীক্ষা হবে, তবে আগের মতো নয়। এরপর মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন আলোচনা, পাঠ্যবইয়ে ধারাবাহিক পরিবর্তন, কিছু বই সংশোধন, কিছু বিষয় পুনর্লিখন, কিছু বিষয় সংযোজন, কিছু বিষয় বর্জন। এদিকে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের বিতর্ক, পাঠ্যবই সংশোধন নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক মতভেদ, বিভিন্ন পর্যায়ে নীতিগত পুনর্বিবেচনা—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেনি, তারা কোন দর্শনের শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়ছে। এক বছরে যে পদ্ধতিকে ভবিষ্যতের শিক্ষা বলা হয়েছে, পরের বছর সেটিই আবার পুনর্মূল্যায়নের টেবিলে উঠে এসেছে।

তারপর এলো কোভিড-১৯। প্রায় দেড় বছরের দীর্ঘ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, সীমিত অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল বৈষম্য, শেখার ক্ষতি, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, পুনর্বিন্যস্ত পরীক্ষা—এসবের ফলে এই ব্যাচের শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে মোবাইল ফোনের ছোট পর্দায় আটকে গেল। আন্তর্জাতিক গবেষণা—বিশেষ করে UNESCO, UNICEF এবং World Bank—দেখিয়েছে, দীর্ঘ স্কুল বন্ধের ফলে শেখার ক্ষতি (learning loss), সামাজিক-আবেগিক দক্ষতার ঘাটতি এবং শিক্ষাগত বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে ছিল না।

শিক্ষাবিজ্ঞানে একটি মৌলিক নীতি রয়েছে—curriculum stability matters। অর্থাৎ, পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে ধাপে ধাপে, গবেষণাভিত্তিক, শিক্ষক-প্রস্তুতির সঙ্গে সমন্বিত এবং পর্যাপ্ত সময় দিয়ে বাস্তবায়িত। কারণ পাঠ্যক্রম শুধু একটি বইয়ের তালিকা নয়; এটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের কৌশল, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, শিক্ষাসামগ্রী, অভিভাবকের প্রত্যাশা এবং শিক্ষার্থীর শেখার অভ্যাস—সবকিছুর সমন্বিত কাঠামো। এই কাঠামো বারবার দ্রুত পরিবর্তিত হলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় শিক্ষার্থীরাই।

এই ব্যাচের দিকে তাকালে মনে হয়, তাদের শিক্ষাজীবন ছিল অনেকটা এমন একটি বাসযাত্রা, যেখানে চালক মাঝপথে বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন—“সামনের রাস্তা বদলানো হয়েছে”, “এখন নতুন রুট”, “এখন আবার পুরোনো রুট”, “এবার একটু অপেক্ষা করুন, নতুন মানচিত্র আসছে।” যাত্রীরা অবশ্যই গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়, কিন্তু বারবার রুট বদলালে ক্লান্তি, বিভ্রান্তি এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার। শিক্ষা সংস্কার করা ভুল নয়; বরং সময়ের সঙ্গে সংস্কার অপরিহার্য। কিন্তু trial-and-error-এর প্রধান ক্ষেত্র যদি কোটি কোটি শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষ হয়ে যায়, তাহলে তার সামাজিক মূল্য অত্যন্ত বড়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেমন নতুন ওষুধ মানুষের ওপর প্রয়োগের আগে বহু ধাপের পরীক্ষা হয়, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তনের আগে সীমিত পরিসরে পাইলট, স্বাধীন মূল্যায়ন, শিক্ষক প্রস্তুতি এবং পর্যাপ্ত প্রমাণভিত্তিক পর্যালোচনা অপরিহার্য।

তাই ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে যাচ্ছে। তারা কেবল একটি পরীক্ষার ব্যাচ নয়; তারা আমাদের শিক্ষা নীতির সাফল্য, সীমাবদ্ধতা, সাহসী উদ্যোগ, ত্রুটি, সংশোধন এবং পুনর্বিবেচনার জীবন্ত ইতিহাস। এই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—শিক্ষার্থীদের কখনোই নীতিগত পরীক্ষার বিষয়বস্তু বানানো উচিত নয়; বরং শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রে থাকতে হবে তাদের শেখা, তাদের মানসিক বিকাশ এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ কারণ একটি পাঠ্যক্রম বদলানো সহজ; কিন্তু একটি প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া শিক্ষাবর্ষ, শেখার আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনা অনেক বেশি কঠিন।

২০২৬ সালের নিয়মিত HSC ব্যাচের শিক্ষাজীবনের এই নিয়ে চারবার  পাবলিক পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেয়েছে ।  মূল্যায়নের ধারাবাহিকতা ছিল মোটামুটি এমন—

  • ২০১৪ — প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি
  • ২০১৮ — পিইসি/পিএসসি পরীক্ষা দিয়েছে
  • ২০২১ — জেএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কোভিড-১৯-এর কারণে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি
  • ২০২৪ — এসএসসি পরীক্ষা
  • ২০২৬ — এইচএসসি পরীক্ষা

এইবার এইচএসসি গেওয়া  এই ব্যাচটি স্পেশাল, কারণ এই ব্যাচটি প্রতিনিধিত্ব করছে এমন একটি প্রজন্মের, যারা একটি জাতীয় পাবলিক পরীক্ষা (পিইসি) দিয়েছে, কিন্তু পরবর্তী জাতীয় পাবলিক পরীক্ষা (জেএসসি) দেওয়ার সুযোগ পায়নি, কিন্তু সার্টিফিকেট পেয়েছে। এরপর কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এসএসসি ও এরপরে নতুন সরকারের একটি ব্যবস্থার অধীনে এইচএসসি সম্পন্ন করছে। ফলে তাদের শিক্ষাজীবনের মূল্যায়ন কাঠামো পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অনেক ব্যাচের তুলনায় ব্যতিক্রমী।

  • পিইসি/পিএসসি (Primary Education Completion Examination): তারা এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। যদি তারা ২০১৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নিয়মিতভাবে অগ্রসর হয়ে থাকে, তাহলে তারা ২০১৮ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পিইসি/পিএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
  • জেএসসি (Junior School Certificate): তারা জেএসসি পরীক্ষা দিতে পারেনি। কারণ এই cohort ২০২১ সালে অষ্টম শ্রেণিতে ছিল, কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে জেএসসি/জেডিসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তীতে সরকার ২০২২ সালেও এই পরীক্ষা আর নেয়নি এবং পরে এটি কার্যত বিলুপ্ত হয়। ফলে এই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগই পায়নি।

এই ব্যাচের টাইমলাইনের আয়নায়: একটি প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া Contact Time

মানুষ শুধু বই পড়ে বড় হয় না; মানুষ সময়ও পড়ে। আর ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ এমন এক প্রজন্ম, যারা পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের পাশাপাশি সময়ের প্রতিটি অস্থির অধ্যায়ও পড়েছে। তাদের শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং জাতীয় সংকট, বৈশ্বিক মহামারি, শিক্ষানীতির পরিবর্তন, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং বারবার বদলে যাওয়া বাস্তবতার মধ্য দিয়েই তারা বড় হয়েছে। যেন তাদের পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি পাতার পাশে আরেকটি অদৃশ্য ইতিহাসের বই খুলে ছিল, যেখানে লেখা ছিল—সংকট, পরিবর্তন, অভিযোজন এবং অপেক্ষার গল্প।
এই ব্যাচের দীর্ঘ বারো বছরের শিক্ষাযাত্রার টাইমলাইন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে তিন ধরনের গভীর বিঘ্ন বা disruption চোখে পড়ে।
  • প্রথমটি কাঠামোগত বিঘ্ন (Structural Disruption)। এই সময়ে পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রশ্নের ধরন, শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাদর্শ নিয়ে ধারাবাহিক পরিবর্তন, সংশোধন ও পুনর্বিন্যাস ঘটেছে। একজন শিক্ষার্থী যখন একটি শিক্ষাদর্শের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখছে, ঠিক তখনই তাকে আবার নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হতে হয়েছে। ফলে শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা অনেক ক্ষেত্রেই নীতিগত অস্থিরতার অভিঘাতে ব্যাহত হয়েছে।
  • দ্বিতীয়টি প্রাতিষ্ঠানিক বা সিস্টেমিক বিঘ্ন (Systemic Disruption)। কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘ সময় বিদ্যালয় বন্ধ, অনলাইন শিক্ষার অসম সুযোগ, ডিজিটাল বৈষম্য, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং শেখার ঘাটতি এই প্রজন্মের শিক্ষাজীবনে এক অভূতপূর্ব প্রভাব ফেলেছে। তারা এমন একটি সময় দেখেছে, যখন বিদ্যালয় ছিল, কিন্তু শ্রেণিকক্ষ ছিল না; শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু মুখোমুখি পাঠদান ছিল না; বই ছিল, কিন্তু শেখার পরিবেশ ছিল অসম। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো সচল থাকলেও শেখার অভিজ্ঞতা ছিল গভীরভাবে বিচ্ছিন্ন।
  • তৃতীয়টি সামাজিক বিঘ্ন (Societal Disruption)। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভিন্ন সময়ের জাতীয় আন্দোলন, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, পারিবারিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাবও তাদের শিক্ষাজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ তারা শুধু বিদ্যালয়ের ভেতরের নয়, বিদ্যালয়ের বাইরের অস্থির সমাজেরও শিক্ষার্থী।
শিক্ষাতত্ত্বে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে—Academic Learning Time (ALT) এবং Opportunity to Learn (OTL)। প্রথমটি বোঝায় একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থে কত সময় কার্যকরভাবে শেখার কাজে সম্পৃক্ত ছিল, আর দ্বিতীয়টি বোঝায় তার শেখার বাস্তব সুযোগ কতটা ছিল। ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের ক্ষেত্রে এই দুটি সূচকই বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাদের শ্রেণিকক্ষের প্রকৃত Contact Time বহুবার কমেছে, শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙেছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিথস্ক্রিয়া সীমিত হয়েছে, আর অনেক ক্ষেত্রে শেখার সুযোগ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে অসম হয়ে পড়েছে। ফলে শুধুমাত্র একটি লিখিত পরীক্ষার ফল দিয়ে এই প্রজন্মের অর্জন বা সক্ষমতা বিচার করা শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও অসম্পূর্ণ মূল্যায়ন হবে।
তাই ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচকে কেবল একটি পরীক্ষার্থী-দল হিসেবে নয়, বরং একটি Disrupted Cohort, একই সঙ্গে একটি Resilient Generation হিসেবে দেখাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। কারণ তারা শুধু বারো বছরের শিক্ষা সম্পন্ন করেনি; তারা বারো বছরের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার একাধিক কাঠামোগত রূপান্তর, বৈশ্বিক মহামারি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা এবং জাতীয় সংকটের মধ্য দিয়েও শেখার যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। তারা শুধু পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নের উত্তর দেয়নি; সময়ের প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজেছে।
এই প্রজন্ম আমাদের একটি গভীর নীতিগত শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা সংস্কার কখনোই শুধু নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন বই বা নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তনের নাম নয়। একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার ধারাবাহিক শেখার সময়—তার Contact Time, তার Learning Continuity, তার Opportunity to Learn। একবার সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।
অতএব, ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত—স্থিতিশীলতা (Stability), ধারাবাহিকতা (Continuity) এবং প্রমাণভিত্তিক সংস্কার (Evidence-based Reform)। কারণ একটি প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া শ্রেণিকক্ষ শুধু কিছু পাঠঘণ্টা হারানোর গল্প নয়; সেটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, সৃজনশীলতা এবং জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নেরও হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প।

অদৃশ্য পাঠ্যবই: ২০১৪ থেকে ২০২৬একটি প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য কি কখনো আমাদের শিক্ষাক্রমের বিষয় ছিল?

২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা যখন ২০১৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তখন কেউ কল্পনাও করেনি যে তাদের শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ কাটবে অনিশ্চয়তা, বিচ্ছিন্নতা এবং ধারাবাহিক সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এই বারো বছরের শিক্ষাযাত্রায় তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন, সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের প্রভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, কোভিড-১৯ মহামারিতে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যালয় বন্ধ, অনলাইন শিক্ষার বৈষম্য, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং পরবর্তী সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও থেকে যায়—এই পুরো সময়ে তাদের মানসিক সুস্থতার জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত ছিল?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি, শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যপুস্তকে জীবনদক্ষতা, মূল্যবোধ, সামাজিক-আবেগিক শিক্ষা (Social and Emotional Learning) এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে কিছু উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বিদ্যালয়ভিত্তিক সমন্বিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা (school mental health system) এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ বিদ্যালয় ও কলেজে প্রশিক্ষিত স্কুল কাউন্সেলর, স্কুল সাইকোলজিস্ট, trauma-informed support system বা নিয়মিত মনোসামাজিক সহায়তা কর্মসূচি নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার চাপ, পারিবারিক সংকট, শোক, উদ্বেগ বা দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার মতো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেও সেগুলো মোকাবিলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা খুব সীমিত।

শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের গবেষণা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা ও পুনঃপুন বিঘ্নিত শিক্ষাজীবন শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ (anxiety), পরীক্ষাভীতি, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, মনোযোগের সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং শেখার প্রেরণা হ্রাস সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে কৈশোর এমন একটি সময়, যখন পরিচয়বোধ, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক সম্পর্ক দ্রুত গড়ে ওঠে। এই সময়ে দীর্ঘ বিদ্যালয় বন্ধ বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শুধু একাডেমিক নয়, আবেগীয় বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশের ধারণা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত নয়, তবে এগুলোকে এখনও একটি পূর্ণাঙ্গ, ধারাবাহিক এবং প্রমাণভিত্তিক School Mental Health Framework-এ রূপ দেওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু হিসেবে রয়েছে, কিন্তু বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন সংস্কৃতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থী সহায়তা ব্যবস্থায় পর্যাপ্তভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।

দুর্যোগ, মহামারি রাজনৈতিক অস্থিরতার সন্তান: ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের মানসিক ভূগোল

২০২৬ সালে যারা এইচএসসি পরীক্ষার হলে বসছে, তারা আসলে শুধু একটি পরীক্ষার ব্যাচ নয়; তারা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক অস্থির সময়ের জীবন্ত দলিল। ২০১৪ সালের দিকে যখন এদের অনেকেই প্রথম শ্রেণিতে প্রবেশ করে, তখন তারা ছিল বই-খাতা-কাঁধে ছোট্ট শিশু; আর আজ তারা এমন এক প্রজন্ম, যারা শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত দেখেছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সড়ক-নিরাপত্তা আন্দোলনের উত্তাপ, কোভিড-১৯ মহামারিতে দীর্ঘ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, অনলাইন শিক্ষার অসমতা, পারিবারিক আয়ের চাপ, মূল্যস্ফীতি, জলবায়ুজনিত বন্যা-ঘূর্ণিঝড়, এবং ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তরের অনিশ্চয়তা। তাদের শিক্ষাজীবন যেন একটি সোজা রাস্তা ছিল না; বরং ছিল বারবার ভাঙা সেতু, ডুবন্ত ঘাট, বন্ধ দরজা ও হঠাৎ খুলে যাওয়া ডিজিটাল জানালার গল্প।

মনোবৈজ্ঞানিকভাবে এই ব্যাচকে বোঝার জন্য শুধু পাঠ্যসূচি বা পরীক্ষার ফল দেখা যথেষ্ট নয়। কোভিডকালের দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা তাদের সামাজিকীকরণে ছেদ ঘটিয়েছে; অনলাইন ক্লাসের অসম প্রবেশাধিকার অনেকের মধ্যে শেখার ঘাটতি ও আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি করেছে; দীর্ঘ সময় ঘরে আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের একাংশে উদ্বেগ, মনোযোগের ঘাটতি, পরীক্ষাভীতি ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অনুভূতি বাড়িয়েছে। আবার রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তাদের মননে তৈরি করেছে নিরাপত্তাহীনতার এক নীরব ছায়া—যেখানে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ও ভবিষ্যৎ—সবকিছুই অনেক সময় অনিশ্চিত মনে হয়েছে।

তবে এই প্রজন্মকে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত প্রজন্ম বলা অন্যায় হবে। তারা একই সঙ্গে এক ধরনের resilient generation—সহনশীলতার প্রজন্ম। তারা জানে ক্লাসরুম বন্ধ হলেও শেখা থেমে থাকে না, পরীক্ষা পিছিয়ে গেলেও জীবন থেমে থাকে না, আর অনিশ্চয়তার ভেতরেও এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে হয়। কিন্তু এই সহনশীলতাকে রাষ্ট্র যদি কেবল পরীক্ষার হলে বসিয়ে নম্বরের দাঁড়িপাল্লায় মাপে, তাহলে এই প্রজন্মের অভিজ্ঞতা অপচয় হবে। তাদের জন্য দরকার trauma-informed education, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, flexible assessment, academic recovery programme এবং career counselling। কারণ ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ আমাদের বলে দিচ্ছে—একটি প্রজন্ম শুধু বই পড়ে বড় হয় না; তারা সময়ের আঘাত, সমাজের ভয়, প্রযুক্তির অসমতা, পরিবারের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে মানুষ হয়ে ওঠে

এই ব্যাচের শিক্ষাজীবনের হারিয়ে যাওয়া ঋতুগুলো: কোনো মার্কশিটে লেখা থাকবে না

২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মার্কশিটে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান কিংবা ইতিহাসের নম্বর লেখা থাকবে। কিন্তু তাদের জীবনের আরেকটি অদৃশ্য মার্কশিট আছে, যেখানে কোনো শিক্ষা বোর্ড নম্বর দেয় না। সেখানে লেখা আছে—হারিয়ে যাওয়া বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বাতিল হওয়া শিক্ষা সফর, বন্ধ হয়ে যাওয়া বিতর্ক প্রতিযোগিতা, না-হওয়া বিজ্ঞান মেলা, অসমাপ্ত স্কাউট ক্যাম্প, হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বন্ধুত্বের বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষককে সরাসরি প্রশ্ন করার হারিয়ে যাওয়া সুযোগ এবং কৈশোরের সবচেয়ে সুন্দর সামাজিক অভিজ্ঞতাগুলোর অনুপস্থিতি।

একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই থেকে আসে না। শিক্ষাবিদ John Dewey বহু আগেই বলেছিলেন, “Education is not preparation for life; education is life itself.” অর্থাৎ শিক্ষা মানে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়; শিক্ষা মানে বিদ্যালয়ের প্রতিটি অভিজ্ঞতা। শ্রেণিকক্ষের আলোচনায় মতবিনিময়, মাঠে হার-জিত শেখা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আত্মবিশ্বাস অর্জন, বিজ্ঞান মেলায় ব্যর্থ হয়ে আবার নতুনভাবে চেষ্টা করা, শিক্ষককে প্রশ্ন করে যুক্তি শেখা—এসবই শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ কিন্তু ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের ক্ষেত্রে এই “অদৃশ্য পাঠ্যক্রম” (Hidden Curriculum)-এর বড় একটি অংশ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। তারা পরীক্ষার সিলেবাস শেষ করেছে, কিন্তু জীবনের সিলেবাসের কিছু অধ্যায় অপঠিত রয়ে গেছে।

শিক্ষা সমাজবিজ্ঞানে Hidden Curriculum বলতে বোঝায় সেই শিক্ষা, যা বইয়ে লেখা থাকে না, কিন্তু বিদ্যালয়ের পরিবেশ থেকে শেখা হয়। সময়নিষ্ঠা, দলগত নেতৃত্ব, সহমর্মিতা, গণতান্ত্রিক আচরণ, ভিন্নমতকে সম্মান করা, সংঘাত সমাধান, সামাজিক দায়িত্ববোধ—এসবের অধিকাংশই শ্রেণিকক্ষের বাইরে গড়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় এই শিক্ষাগুলোও সীমিত হয়েছে।

এর ফলে এই প্রজন্মের বৌদ্ধিক বিকাশে একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটতে পারে। তারা তথ্য সংগ্রহে আগের চেয়ে দক্ষ হয়েছে, কারণ ডিজিটাল প্রযুক্তি তাদের হাতে এসেছে। কিন্তু তথ্যকে সমষ্টিগতভাবে বিশ্লেষণ করা, মুখোমুখি বিতর্ক করা, ভিন্নমতের সঙ্গে যুক্তিতর্কে অংশ নেওয়া, নেতৃত্ব গ্রহণ করা কিংবা সামাজিক পরিসরে নিজের অবস্থান তৈরি করার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। অর্থাৎ information literacy কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু social learning-এর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। —এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। তারা শিক্ষাবর্ষ সম্পন্ন করেছে, কিন্তু শৈশব ও কৈশোরের কিছু ঋতু আর কখনো ফিরে পাবে না।

আর সেখানেই শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিহিত আছে—একটি জাতি শুধু শিক্ষাবর্ষ হারায় না; যখন বিদ্যালয় তার পূর্ণ সামাজিক ও মানবিক ভূমিকা পালন করতে পারে না, তখন একটি প্রজন্ম তার বিকাশের অমূল্য সময় হারায়। সেই হারানো সময় কোনো সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, অতিরিক্ত পরীক্ষা বা ভালো ফল দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা যায় না। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষা পরিকল্পনায় বিদ্যালয়কে শুধু পাঠদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং শিশু ও কিশোরের বৌদ্ধিক, সামাজিক, আবেগীয় ও নাগরিক বিকাশের জীবন্ত পরিবেশ হিসেবে পুনর্গঠন করাই হবে সবচেয়ে বড় শিক্ষা সংস্কার উদ্যোগ।

স্পাইরাল কারিকুলামের ভাঙা সিঁড়ি: ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ কি তাদের নির্ধারিত Competency Learning Outcomes সত্যিই অর্জন করতে পেরেছে?

শিক্ষাক্রম তত্ত্বের একটি মৌলিক ধারণা হলো Spiral Curriculum, যা Jerome Bruner প্রস্তাব করেছিলেন। এই ধারণা অনুযায়ী, একটি বিষয় একবার পড়িয়ে শেষ করা হয় না; বরং একই ধারণা বা competency বিভিন্ন শ্রেণিতে ক্রমাগত আরও গভীর, জটিল এবং প্রয়োগভিত্তিক রূপে ফিরে আসে। অর্থাৎ, প্রথম শ্রেণিতে যে ভাষা দক্ষতার ভিত্তি তৈরি হয়, সেটি তৃতীয় শ্রেণিতে বিস্তৃত হয়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে বিশ্লেষণী ক্ষমতায় রূপ নেয় এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে সমালোচনামূলক চিন্তা, গবেষণা ও জ্ঞান নির্মাণের ভিত্তি হয়ে ওঠে। একইভাবে গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, যোগাযোগ দক্ষতা এবং মূল্যবোধও স্তরভিত্তিকভাবে (developmentally sequenced) গড়ে ওঠার কথা।

কিন্তু ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের শিক্ষাজীবনে এই স্পাইরাল ধারাবাহিকতা বারবার বিঘ্নিত হয়েছে। কোনো একটি competency পুরোপুরি আয়ত্ত করার আগেই বিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে; কোনো ধারণা অনুশীলনের আগেই পাঠ্যসূচি সংক্ষিপ্ত হয়েছে; কোনো দক্ষতা প্রয়োগের আগেই পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে শিক্ষাবিজ্ঞানের ভাষায় curriculum continuity এবং instructional coherence—উভয়ই একাধিকবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ধরা যাক, সপ্তম শ্রেণিতে একজন শিক্ষার্থীর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান (scientific inquiry) দক্ষতা বিকাশের কথা ছিল। স্বাভাবিক অবস্থায় সে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করবে, দলগত কাজ করবে, পর্যবেক্ষণ লিখবে, ভুল থেকে শিখবে। কিন্তু দীর্ঘ বিদ্যালয় বন্ধ, সীমিত ব্যবহারিক কার্যক্রম এবং বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার কারণে সেই অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। একইভাবে ভাষা শিক্ষায় বিতর্ক, উপস্থাপনা, সহপাঠী-শিক্ষণ কিংবা গণিতে ধারাবাহিক সমস্যা সমাধানের অনুশীলনও অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ব্যাহত হয়েছে। ফলে জ্ঞান (knowledge) কিছুটা অর্জিত হলেও দক্ষতা (skills), মনোভাব (attitudes) এবং বাস্তব প্রয়োগক্ষমতা (application) সমানভাবে বিকশিত হয়েছে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার। Learning Outcome এবং Competency এক জিনিস নয়। Learning Outcome বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট পাঠ বা শ্রেণি শেষে শিক্ষার্থী কী জানবে বা কী করতে পারবে। কিন্তু Competency হলো দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা—যেখানে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, মনোভাব এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগের ক্ষমতা একত্রে কাজ করে। একটি পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া মানেই competency অর্জিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত শিক্ষা গবেষণা সমর্থন করে না।

এই ব্যাচের ক্ষেত্রে তাই একটি Competency Gap তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ শেখার ধারাবাহিকতা যতবার ভেঙেছে, ততবার competency development-এর সিঁড়িতেও ফাঁক তৈরি হয়েছে। কেউ হয়তো তথ্য মুখস্থ করেছে, কিন্তু সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ শিখতে পারেনি; কেউ সূত্র জানে, কিন্তু বাস্তব সমস্যায় তা প্রয়োগের সুযোগ পায়নি; কেউ পরীক্ষায় লিখেছে, কিন্তু সহযোগিতা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ কিংবা সৃজনশীল সমস্যা সমাধানের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেনি।

এর প্রভাব কেবল একাডেমিক নয়; এটি এই প্রজন্মের মনোসত্ত্ব (psyche), পরিচয়বোধ (identity formation) এবং চিন্তণ কাঠামো (cognitive development)-কেও প্রভাবিত করতে পারে। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন মস্তিষ্কে উচ্চতর নির্বাহী কার্যক্ষমতা (executive functions)—যেমন পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ—দ্রুত বিকশিত হয়। বিদ্যালয়ের ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা, সহপাঠীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া, শিক্ষক-নেতৃত্বাধীন আলোচনা, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং প্রকল্পভিত্তিক শেখা এই বিকাশকে সমৃদ্ধ করে। যখন এই অভিজ্ঞতাগুলো বারবার ব্যাহত হয়, তখন শেখার পাশাপাশি সামাজিক-আবেগিক বিকাশেও প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এই বিশ্লেষণের একটি ইতিবাচক দিকও আছে। এই প্রজন্ম একই সঙ্গে resilience, adaptability এবং uncertainty management-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতাও অর্জন করেছে। তারা শিখেছে কীভাবে দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে হয়, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয় এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও এগিয়ে যেতে হয়। এগুলোও ২১শ শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ competency।

তাই ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচকে মূল্যায়নের সময় একটি মৌলিক নীতিগত সতর্কতা প্রয়োজন। তাদের অর্জনকে শুধুমাত্র একটি তিন ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষার ফল দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। বরং এই cohort-এর ক্ষেত্রে শিক্ষা গবেষণার ভাষায় learning recovery, competency recovery এবং developmental recovery—এই তিনটি মাত্রাকেই বিবেচনায় নিতে হবে।

এই প্রজন্ম আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। কারিকুলাম কেবল একটি দলিল নয়; এটি একটি ধারাবাহিক বিকাশের যাত্রাপথ। সেই যাত্রাপথে যদি বারবার সেতু ভেঙে যায়, তবে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হলেও পথের অভিজ্ঞতা আর আগের মতো থাকে না। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পাঠ্যক্রম পরিবর্তন নয়, বরং শেখার ধারাবাহিকতা, competency-এর ক্রমবিকাশ এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর সামগ্রিক মানবিক বিকাশকে সুরক্ষিত রাখা।

২০২৬ ব্যাচের পরীক্ষা, বারো বছরের হিসাব: এইচএসসি কি শুধু শিক্ষার্থীর জ্ঞান মাপে, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য-ব্যর্থতারও রিপোর্ট কার্ড?

একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। প্রশ্নটি হয়তো কিছুটা অস্বস্তিকর, কিন্তু প্রয়োজনীয়। ধরা যাক, ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার হলে বসে কোনো শিক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞানের উত্তরে লিখল—“স্যার, এই অধ্যায়টি যখন পড়ানো হচ্ছিল, তখন আমাদের বিদ্যালয় বন্ধ ছিল।” ইতিহাসের খাতায় লিখল—“এই অংশটি অনলাইনে পড়েছি, কিন্তু আমাদের এলাকায় তখন ইন্টারনেট সংযোগই ছিল না।” কিংবা গণিতের উত্তরে লিখল—“যে সময় বীজগণিত শেখার কথা ছিল, তখন আমরা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুদ্ধ করছিলাম।”

পরীক্ষক নিশ্চয়ই সেই উত্তরগুলোর জন্য কোনো নম্বর দেবেন না। উত্তরপত্রে লেখা হবে—শূন্য।

কিন্তু এখানেই আরেকটি বড় প্রশ্ন জন্ম নেয়। সেই শূন্য নম্বর কি কেবল শিক্ষার্থীর প্রাপ্য? নাকি সেই শূন্যের একটি অংশ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার, আমাদের নীতিনির্ধারণের, এমনকি আমাদের রাষ্ট্রেরও প্রাপ্য?

প্রশ্নটি ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্বস্তিকর। কারণ আমরা পরীক্ষার হলে একজন শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করি, কিন্তু খুব কমই মূল্যায়ন করি সেই পুরো ব্যবস্থাকে, যে ব্যবস্থাটি তাকে সেই পরীক্ষার বেঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে।

অথচ অন্য সব ক্ষেত্রেই আমরা ভিন্নভাবে চিন্তা করি। একজন চিকিৎসকের অস্ত্রোপচার ব্যর্থ হলে শুধু চিকিৎসক নন, হাসপাতালের ব্যবস্থা, চিকিৎসা-প্রোটোকল ও মাননিয়ন্ত্রণও পর্যালোচিত হয়। একটি সেতু ভেঙে পড়লে শুধু নির্মাণশ্রমিককে নয়, নকশা, তদারকি ও প্রকৌশল ব্যবস্থাকেও তদন্তের আওতায় আনা হয়। একটি বিমান দুর্ঘটনায় শুধু পাইলট নয়, পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতাও বিশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফল আশানুরূপ না হলে আমরা প্রায় স্বভাবগতভাবে সব দায় শিক্ষার্থীর কাঁধেই চাপিয়ে দিই।

বাস্তবে এইচএসসি শুধু একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রেরও পরীক্ষা। উত্তরপত্রে কলম ধরে শিক্ষার্থী লিখছে ঠিকই, কিন্তু অদৃশ্যভাবে সেখানে উত্তর দিচ্ছে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, জাতীয় শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক, বিদ্যালয় পরিচালনা, শিক্ষা প্রশাসন, পারিবারিক সহায়তা এবং সামগ্রিক জাতীয় শিক্ষানীতিও। একজন শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র তাই নিছক ব্যক্তিগত সক্ষমতার দলিল নয়; এটি একটি শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘ বারো বছরের সম্মিলিত কর্মদক্ষতারও প্রতিফলন।

শিক্ষা গবেষণায় বহুল আলোচিত একটি ধারণা হলো System Accountability। এর মূল কথা অত্যন্ত সহজ—যদি একই ধরনের দুর্বলতা হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে একসঙ্গে দেখা যায়, তবে সেটিকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যদি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী গণিতে দুর্বল হয়, তাহলে প্রশ্ন শুধু—“শিক্ষার্থীরা পড়েনি কেন?”—এখানেই শেষ হতে পারে না। বরং আরও বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আমরা কি কার্যকরভাবে গণিত শেখাতে পেরেছি?” যদি বিজ্ঞানভীতি বাড়তে থাকে, তাহলে সেটি শুধু শিক্ষার্থীর মানসিকতার সমস্যা নয়; সেটি বিজ্ঞান শিক্ষক, পরীক্ষাগার, পাঠ্যপুস্তক, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শেখার পরিবেশ—সবকিছুর সম্মিলিত প্রতিফলন।

এই কারণেই বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলো আজ আর শুধু উচ্চঝুঁকির (High-stakes) পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে না। তারা শিক্ষার্থীর নম্বরের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষক-সহায়তা, শ্রেণিকক্ষের শেখার গুণগত মান, মানসিক সুস্থতা, উপস্থিতি, দক্ষতা অর্জন, সামাজিক-আবেগীয় বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত অগ্রগতিও মূল্যায়ন করে। কারণ শিক্ষা কোনো একক ব্যক্তির প্রকল্প নয়; এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক বিনিয়োগ। তাই এর ফলও সম্মিলিতভাবেই বিচার করতে হয়।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা রয়েছে। এইচএসসি ফল প্রকাশের দিন যদি শুধু জিপিএ–৫-এর সংখ্যা, পাসের হার কিংবা বোর্ডভিত্তিক সাফল্য নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্রের অনেকটাই অদেখা রেখে দিই। বরং একই দিনে একটি জাতীয় শিক্ষা কার্যকারিতা প্রতিবেদন (National Education Effectiveness Report) প্রকাশ করা যেতে পারে, যেখানে এই ব্যাচের বারো বছরের Retention Rate, Learning Loss, বাস্তব Academic Contact Time, শিক্ষক ঘাটতি, বিষয়ভিত্তিক বৈষম্য, বিজ্ঞান–মানবিক–কারিগরি ধারায় প্রবেশের প্রবণতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সম্ভাব্য গতিপথ বিশ্লেষণ করা হবে।

সেদিন এইচএসসি ফলাফল শুধু “কে কত নম্বর পেল?”—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে না; বরং আরও বড় একটি প্রশ্নেরও উত্তর দিতে শুরু করবে—“গত বারো বছরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা একটি প্রজন্মকে কতটা কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে পেরেছে?”

২০২৬ ব্যাচের  পরীক্ষার্থী সংখ্যা প্রকট করছে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় লুকিয়ে থাকা নতুন ভূগোল

পরিসংখ্যানেরও একটি নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা কখনো শুষ্ক নয়; বরং অনেক সময় হাজার শব্দের চেয়েও গভীর গল্প বলে। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার পরিসংখ্যানও ঠিক তেমনই একটি গল্প বলছে। প্রথম দৃষ্টিতে চোখে পড়ে মাত্র একটি সংখ্যা—১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, এই একটি সংখ্যার ভেতরে আসলে লুকিয়ে আছে তিনটি ভিন্ন বাংলাদেশ। একটি সাধারণ শিক্ষার বাংলাদেশ, একটি মাদ্রাসা শিক্ষার বাংলাদেশ এবং আরেকটি কারিগরি শিক্ষার বাংলাদেশ। তিনটি ধারাই একই দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরি করছে, কিন্তু তাদের শিক্ষাগত বাস্তবতা, লিঙ্গবিন্যাস, বিষয় নির্বাচন, দক্ষতা অর্জনের পথ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সম্ভাবনা এক নয়। যেন একই নদী তিনটি ভিন্ন মোহনায় গিয়ে তিন রকম স্রোতে বিভক্ত হয়েছে।
 
সবচেয়ে বড় স্রোত এখনও সাধারণ শিক্ষার। মোট ১২.৭১ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন, অর্থাৎ প্রায় ৮৪ শতাংশ, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দিচ্ছে। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ৯২ হাজার ৯০৫ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে লাখ হাজার ৯৬৪ জন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মূল প্রবাহ এখনও সাধারণ শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। অথচ শিল্পায়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থা এবং দক্ষতানির্ভর বৈশ্বিক শ্রমবাজারের যুগে কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণ এখনও মোট শিক্ষার্থীর এক-দশমাংশেরও কম। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ পরিকল্পনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

ঢাকামুখী শিক্ষার মানচিত্র: সুযোগও কি রাজধানীকেন্দ্রিক?

বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশের শিক্ষার আরেকটি ভূগোল উন্মোচন করে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে এবার পরীক্ষার্থী প্রায় লাখ হাজার, যা দেশের যেকোনো বোর্ডের তুলনায় অনেক বেশি। এরপর রয়েছে রাজশাহী, যশোর, দিনাজপুর এবং চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। প্রথম দর্শনে এটি জনসংখ্যার প্রতিফলন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর।
 
এই বৈষম্যের পেছনে রয়েছে উন্নত কলেজের ঘনত্ব, উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ, নগরায়ণ, কোচিং শিল্পের বিস্তার, দক্ষ শিক্ষকের প্রাপ্যতা এবং রাজধানীকেন্দ্রিক শিক্ষা অবকাঠামোর দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীভবন। ঢাকামুখী এই শিক্ষার্থী-স্রোত যেন নীরবে বলে দেয়—বাংলাদেশে এখনও মানসম্মত উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সমানভাবে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছাতে পারেনি। শিক্ষা এখনও অনেকাংশে ভৌগোলিক ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল।

মানবিক বিভাগের আধিপত্য: সংকট, নাকি সম্ভাবনা?

এইচএসসি পরিসংখ্যানের সবচেয়ে আলোচিত চিত্রটি বিষয়ভিত্তিক বণ্টনে। লাখ ১৭ হাজার ৬৯৭ জন শিক্ষার্থী মানবিক বিভাগে অধ্যয়ন করছে—যা সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে ২ লাখ ৭৯ হাজার ২৩৭ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৩ জন।
 
এই চিত্রকে একমাত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। একদিকে বিজ্ঞান শিক্ষার উচ্চ ব্যয়, পর্যাপ্ত পরীক্ষাগারের অভাব, দক্ষ শিক্ষক সংকট, গণিতভীতি এবং গ্রামীণ কলেজে বিজ্ঞান অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা অনেক শিক্ষার্থীকে মানবিক ধারায় নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মানবিক বিভাগকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে “দুর্বল শিক্ষার্থীর বিভাগ” হিসেবে দেখার যে সামাজিক প্রবণতা রয়েছে, সেটিও বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ রাষ্ট্রের প্রশাসক, শিক্ষক, বিচারক, সাংবাদিক, গবেষক, সমাজবিজ্ঞানী, কূটনীতিক, উন্নয়নকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের বড় একটি অংশ এই ধারার শিক্ষার্থী থেকেই উঠে আসে।
 
তবু একটি নীতিগত প্রশ্ন থেকেই যায়। বাংলাদেশ যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বায়োটেকনোলজি, সেমিকন্ডাক্টর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হতে চায়, তখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমুখী শিক্ষার্থীর তুলনামূলক কম অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের দক্ষ মানবসম্পদ ঘাটতির পূর্বাভাসও হতে পারে। তাই মানবিক বিভাগের মর্যাদা রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি বিজ্ঞান শিক্ষাকে আরও সহজলভ্য, আকর্ষণীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মেয়েরা এগিয়ে, কিন্তু গন্তব্য কোথায়?

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিকগুলোর একটি হলো—৬ লাখ ৫৬ হাজার ৫৮৯ জন ছাত্রী এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, যেখানে ছাত্রের সংখ্যা লাখ ১৩ হাজার ৯৯৪। সংখ্যার বিচারে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েরা এখন এগিয়ে।
 
এটি আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। গত দুই দশকের উপবৃত্তি কর্মসূচি, নারীর শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবারগুলোর ইতিবাচক মনোভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি ফল এটি। কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—এই ছাত্রীদের কতজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাবে? কতজন দক্ষ কর্মজীবনে প্রবেশ করবে? কতজন গবেষণাগারে, শিল্পে, প্রযুক্তিখাতে বা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে? আর কতজন সামাজিক চাপ, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে মাঝপথে থেমে যাবে? ভর্তি ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সাফল্যকে কর্মজীবনের সাফল্যে রূপান্তরিত করাই এখন বাংলাদেশের পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

Irregular পরীক্ষার্থী: সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শিক্ষাব্যবস্থার নীরব সতর্কবার্তা

এই বছরের পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য সম্ভবত RegularIrregular পরীক্ষার্থীর অনুপাত। মোট লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন নিয়মিত পরীক্ষার্থীর বিপরীতে লাখ ১০ হাজার ৮৮১ জন অনিয়মিত পরীক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রতি চারজন পরীক্ষার্থীর একজন নির্ধারিত সময়ে শিক্ষাজীবনের এই ধাপে পৌঁছাতে পারেনি।
 
এই সংখ্যা কেবল পরীক্ষার ফলাফলের পরিসংখ্যান নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা চাপ, শেখার ঘাটতি, পুনরাবৃত্তি, মানসিক ক্লান্তি, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং মূল্যায়নব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। একজন অনিয়মিত পরীক্ষার্থী মানে শুধু একজন বিলম্বিত শিক্ষার্থী নয়; এর অর্থ একটি পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয়, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ এবং রাষ্ট্রের জন্য পুনরায় বিনিয়োগের প্রয়োজন। শিক্ষা অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি Hidden Cost, আর শিক্ষা গবেষণার ভাষায় এটি Delayed Learning-এর দৃশ্যমান প্রতিফলন।

সংখ্যা থেকে নীতিতে: এখন গুণগত রূপান্তরের সময়

২০২৬ সালের এইচএসসি পরিসংখ্যান বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। আজকের চ্যালেঞ্জ আর শুধু কতজন পরীক্ষা দিল বা কতজন পাস করল—সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত প্রশ্নগুলো আরও গভীর।
  • কেন বিজ্ঞান ও কারিগরি ধারায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি?
  • কেন প্রতি চারজনের একজন নির্ধারিত সময়ে শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারছে না?
  • কেন মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ এখনও ভৌগোলিকভাবে এত অসম?
  • আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ১২ লাখ ৭০ হাজার তরুণ-তরুণীকে আমরা কীভাবে শুধু পরীক্ষার্থী নয়, বরং উদ্ভাবক, গবেষক, দক্ষ পেশাজীবী, উদ্যোক্তা এবং বৈশ্বিক মানবসম্পদে রূপান্তর করব?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অতীতের পরীক্ষাকেন্দ্রিক কাঠামোতেই আটকে থাকবে, নাকি ২১শ শতাব্দীর দক্ষতা, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নভিত্তিক এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার দিকে সাহসী পদক্ষেপ নেবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে কেবল তার পরীক্ষার ফল নয়; বরং সেই পরীক্ষার্থীদের কতজনকে সে জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিকতার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছে দিতে পেরেছে।

এই ব্যাচের শিক্ষা, ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারের পাঁচটি দিক-নির্দেশ

২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ শুধু একটি পরীক্ষা দেয়নি; তারা আমাদের শিক্ষা সংস্কারের জন্যও কিছু স্পষ্ট বার্তা রেখে যাচ্ছে।

  • প্রথমত, প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষিত স্কুল কাউন্সেলর নিয়োগ করা এখন বিলাসিতা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের অপরিহার্য শর্ত।
  • দ্বিতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে Psychological First Aid, Trauma-informed Teaching এবং কৈশোরকালীন মানসিক স্বাস্থ্যকে বাধ্যতামূলক উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর প্রথম মানসিক আশ্রয়ও হয়ে ওঠেন।
  • তৃতীয়ত, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে Social and Emotional Learning (SEL) পাঠ্যক্রমের অংশ হওয়া উচিত। ২১শ শতাব্দীর নাগরিক গড়তে শুধু জ্ঞান নয়; সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহযোগিতা, যোগাযোগ এবং মানসিক স্থিতিস্থাপকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
  • চতুর্থত, মহামারি, দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, দুর্যোগ কিংবা বড় সামাজিক সংকটের পর Psychosocial Recovery Programme বাধ্যতামূলকভাবে চালু করা প্রয়োজন। কারণ বিদ্যালয় পুনরায় খুলে দিলেই শেখা স্বাভাবিক হয়ে যায় না; শিক্ষার্থীর মনও পুনর্গঠনের সুযোগ চায়।
  • পঞ্চমত, শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য মূল্যায়নের সূচক হিসেবে শুধু পরীক্ষার ফল নয়; শিক্ষার্থীর Well-being, Sense of Belonging, School Connectedness, মানসিক সুস্থতা এবং শেখার আনন্দকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সুস্থ মন ছাড়া গভীর শিক্ষা সম্ভব নয়।

২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ আমাদের একটি গভীর সত্য মনে করিয়ে দেয়। আমরা তাদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও ইতিহাস শিখিয়েছি; কিন্তু যখন তারা ভয়, অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক সংকট কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মুখোমুখি হয়েছে, তখন তাদের মানসিক স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলার জন্য আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ছিল সীমিত। তাই ২১শ শতাব্দীর শিক্ষা সংস্কারে মানসিক স্বাস্থ্যকে আর একটি অতিরিক্ত বা প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে শিক্ষার মৌলিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

হয়তো তখনই আমরা উপলব্ধি করতে পারব—একটি পরীক্ষার খাতা আসলে শুধু একজন শিক্ষার্থীর নয়; সেটি একটি জাতির শিক্ষা-দর্শন, নীতিনির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও আয়না। আর সেই আয়নায় যদি কোনো দাগ দেখা যায়, তবে শুধু আয়নাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই; আমাদের নতুন করে দেখতে হবে আলোকে, ঘরকে, আর সেই মুখটিকেও—যে মুখটির নাম বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা।

এই ব্যাচের জন্য উচ্চশিক্ষার নতুন হিসাব, আর বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাসংস্কারের নতুন পথরেখা

২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচের গল্প শেষ হয় না পরীক্ষার ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে। বরং সেখান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি বড় পরীক্ষা। কারণ এই ব্যাচ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করবে এমন এক অভিজ্ঞতা নিয়ে, যা আগের বহু ব্যাচের সঙ্গে এক নয়। তারা শুধু নতুন শিক্ষার্থী নয়; তারা একটি ব্যতিক্রমী শিক্ষাজীবনের যাত্রী—যারা বই পড়েছে, পরীক্ষা দিয়েছে, কিন্তু তাদের অনেকগুলো স্কুলজীবন তারা পুরোপুরি বাঁচতে পারেনি।

হয়তো একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্লাসে এই ব্যাচের কোনো শিক্ষার্থী নীরবে বলবে—“স্যার, আমরা বই পড়েছি, পরীক্ষা দিয়েছি, কিন্তু আমাদের অনেকগুলো স্কুলজীবন আমরা বাঁচতে পারিনি।”

এই বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাদের হারানো contact time, অসম্পূর্ণ সামাজিকীকরণ, শেখার ঘাটতি, মানসিক চাপ এবং অস্থির সময়ের দীর্ঘ ছায়া। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি ধরে নেয়, ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ আগের সব ব্যাচের মতোই স্বাভাবিক সামাজিক ও শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে, তাহলে সেটি হবে বড় নীতিগত ভুল। তাদের জন্য প্রথম বর্ষ থেকেই দরকার Academic Recovery, Intellectual Recovery, Psychological Recovery এবং Social Recovery—অর্থাৎ শেখার ঘাটতি পূরণ, মুখস্থনির্ভরতা থেকে গবেষণা ও সমালোচনামূলক চিন্তায় উত্তরণ, দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মানসিক প্রভাব মোকাবিলা, এবং দলগত কাজ, নেতৃত্ব, বিতর্ক ও সহযোগিতার অভিজ্ঞতা পুনর্গঠন।

এই cohort-কে “কোভিড ব্যাচ” বা “সংকটের ব্যাচ” বলে থেমে গেলে চলবে না। তাদের দেখতে হবে Learning Recovery Generation হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তাদের জন্য Academic Bridging Course, Critical Thinking, Academic Writing, Research Skills, Mental Health and Well-being Support, Learning Gap Assessment, Project-based Learning এবং Collaborative Learning-এর মতো কর্মসূচি এখন আর অতিরিক্ত সুবিধা নয়; বরং ন্যায্য শিক্ষাগত সহায়তা।

আর জাতীয় শিক্ষানীতির জন্য এই ব্যাচ একটি নির্মম কিন্তু প্রয়োজনীয় সত্য তুলে ধরেছে—ভর্তি নয়, ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধিতে সাফল্য দেখিয়েছে, কিন্তু সেই শিশুকে Grade 1 থেকে HSC পর্যন্ত মর্যাদা, দক্ষতা ও ধারাবাহিক শেখার সুযোগ দিয়ে ধরে রাখার প্রশ্নে এখনও গভীর সংকট রয়ে গেছে। এখন সময় এসেছে Grade 1–12 Unique Student ID, cohort tracking, Grade 5–6 transition support, Grade 9–10 risk dashboard, SSC–HSC transition grant, science retention policy এবং competency-based HSC reform নিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার।

এইচএসসি পরীক্ষাকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। একটি মাত্র লিখিত পরীক্ষা কোনো তরুণের পূর্ণ সম্ভাবনা মাপতে পারে না। ভবিষ্যতের মূল্যায়নে project, practical assessment, oral presentation, portfolio, research assignment এবং competency-based questions যুক্ত করতে হবে। কারণ ২১শ শতাব্দীর পৃথিবী মুখস্থ উত্তর নয়; সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং নৈতিক বোধসম্পন্ন মানুষ চায়।

শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় আমরা শুধু পরীক্ষার্থী দেখি না; দেখি হারিয়ে যাওয়া সহপাঠী, অসমাপ্ত স্কুলজীবন, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, শ্রেণিকক্ষহীন দিন, অনিশ্চয়তার ভিতর বেড়ে ওঠা কিশোর মন, এবং তবু বেঁচে থাকা এক অসাধারণ সম্ভাবনা। এখন প্রশ্ন হলো—আমরা কি তাদের শুধু ফলাফলের তালিকায় রাখব, নাকি তাদের ভবিষ্যতের বাংলাদেশের নির্মাতা হিসেবে প্রস্তুত করব?

একটি জাতির ভবিষ্যৎ ভর্তি-পরিসংখ্যানে নয়; নির্ধারিত হয় কতজন শিক্ষার্থীকে সে শেষ পর্যন্ত মানুষ, নাগরিক, চিন্তক, কর্মী, উদ্ভাবক ও স্বপ্নদ্রষ্টায় রূপান্তর করতে পারে—সেই ক্ষমতায়। ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচ তাই শুধু একটি পরীক্ষার ব্যাচ নয়; তারা বাংলাদেশের শিক্ষাসংস্কারের নতুন পথরেখা।

শেষকথা: একটি প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে আমরা নিজেদেরই দেখি

একদিন এই ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের নাম হয়তো কোনো ফলাফলের তালিকায় আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাদের জিপিএ, মেধাতালিকা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সংবাদও সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস যদি ন্যায়বিচার করে, তবে এই প্রজন্মকে সে শুধু একটি পরীক্ষার ব্যাচ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসের এক অসাধারণ সহনশীল প্রজন্ম হিসেবে মনে রাখবে। তারা এমন এক সময়ে বড় হয়েছে, যখন পরিবর্তন ছিল নিয়ম, অনিশ্চয়তা ছিল নিত্যসঙ্গী, আর শিক্ষা ছিল বারবার পুনর্লিখিত একটি মানচিত্র। তবুও তারা থেমে যায়নি। তারা অপেক্ষা করেছে, মানিয়ে নিয়েছে, আবার নতুন করে পথচলা শুরু করেছে।

এই প্রজন্ম আমাদের একটি গভীর সত্য শিখিয়ে দিয়েছে—একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার পরীক্ষার ফল নয়, তার মানুষের সম্ভাবনা। একটি নম্বরপত্র একজন শিক্ষার্থীর একটি দিনের পারফরম্যান্স জানাতে পারে, কিন্তু একটি প্রজন্মের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় তার সংকট মোকাবিলার ক্ষমতা, তার স্বপ্ন ধরে রাখার সাহস, তার শেখার আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ইচ্ছাশক্তিতে। এই শিক্ষার্থীরা কেবল পাঠ্যবই পড়েনি; তারা সময়কে পড়েছে, সমাজকে পড়েছে, অনিশ্চয়তাকে পড়েছে এবং জীবনকে পড়েছে।

কিন্তু এই গল্প আমাদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। শিক্ষা সংস্কার কখনোই কেবল নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন বই বা নতুন পরীক্ষার নিয়ম প্রবর্তনের নাম হতে পারে না। প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে একজন শিশুর ধারাবাহিক শেখা, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সম্ভাবনা। কারণ একটি প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া শ্রেণিকক্ষ, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্ব, হারিয়ে যাওয়া শেখার সময় কিংবা হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস কোনো সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, অতিরিক্ত পরীক্ষা বা ভালো ফল দিয়ে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা যায় না।

তাই ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত স্থিতিশীলতা, গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, শিক্ষকদের প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক শেখার নিশ্চয়তা। শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র নয়, যেখানে কোটি কোটি শিশুর জীবনকে পরীক্ষামূলক পরিবর্তনের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। প্রতিটি সংস্কারের আগে প্রমাণ, পাইলট বাস্তবায়ন, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ অপরিহার্য।

সবচেয়ে বড় কথা, ২০২৬ সালের এইচএসসি ব্যাচকে আমরা করুণা নয়, সম্মান জানাই। কারণ তারা আমাদের শিখিয়েছে—প্রতিকূলতা মানুষকে ভেঙেও দিতে পারে, আবার গড়েও তুলতে পারে। তারা প্রমাণ করেছে, শ্রেণিকক্ষের দরজা বন্ধ হতে পারে, কিন্তু শেখার ইচ্ছা বন্ধ হয় না; পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে যেতে পারে, কিন্তু স্বপ্নের যাত্রা থেমে থাকে না।

হয়তো একদিন এই তরুণদের মধ্য থেকেই কেউ নতুন ওষুধ আবিষ্কার করবে, কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে, কেউ শ্রেণিকক্ষে হাজারো শিশুর ভবিষ্যৎ গড়বে, কেউ উদ্যোক্তা হয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, কেউ গবেষণাগারে নতুন জ্ঞান নির্মাণ করবে, আবার কেউ রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসবে। তখন আমরা বুঝতে পারব—২০২৬ সালের এইচএসসি ছিল শুধু একটি পরীক্ষা নয়; এটি ছিল একটি জাতির ভবিষ্যৎকে ধারণ করে এগিয়ে চলা এক প্রজন্মের নীরব অগ্নিপরীক্ষা।

ইতিহাসের কাছে তাই আমাদের একটাই আবেদন—এই প্রজন্মকে শুধু তাদের প্রাপ্ত নম্বর দিয়ে নয়, তারা কী কী প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এখানে পৌঁছেছে, সেই আলোয় মূল্যায়ন করা হোক। আর রাষ্ট্রের কাছে একটাই প্রত্যাশা—যে প্রজন্ম সময়ের এত পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের সামনে এবার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা হোক, যেখানে শিক্ষার্থীদের আর বারবার অনিশ্চয়তার পরীক্ষা দিতে না হয়; বরং তারা নিশ্চিন্ত মনে জ্ঞান, সৃজনশীলতা, গবেষণা এবং মানবিকতার মাধ্যমে নিজেদের ও দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে। সেই দিনই এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে, আর সেটিই হবে বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন।

তাই আমার শেষ কথা:

২০২৬ সালের এইচএসসি শুধু একটি পরীক্ষার ব্যাচ নয়—বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার আয়না এই প্রজন্মের দিকে তাকালে আমরা নিজেদেরই দেখি।

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#HSC2026 #এইচএসসি২০২৬ #HSCExamination #একটি_প্রজন্মের_গল্প #শিক্ষাজীবন #বাংলাদেশের_শিক্ষা #EducationReform #LearningLoss #LearningRecovery #ResilientGeneration #DisruptedGeneration #শিক্ষা_সংস্কার #শিক্ষানীতি #মানসিক_স্বাস্থ্য #শিক্ষা_মনোবিজ্ঞান #CompetencyBasedEducation #LearningContinuity #FutureOfEducation #HigherEducation #BangladeshEducation #StudentLife #EducationResearch #HumanCapital #YouthDevelopment #AcademicJourney #EducationPolicy #অধিকারপত্র #ProfessorMahbubLitu #বাংলাদেশ #শিক্ষার_ভবিষ্যৎ



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: