odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 2nd July 2026, ২nd July ২০২৬
রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, আন্তোনিও গ্রামশি ও পাওলো ফ্রেইরির কল্পিত সংলাপে পুনর্পাঠ করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদর্শন, একাডেমিক স্বাধীনতা, শিক্ষক নিগ্রহ, গবেষণার সংকট এবং ভবিষ্যতের পুনর্জাগরণের পথরেখা।

১০৫ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: আত্মার সন্ধানে এক বিশ্ববিদ্যালয় │ চার দার্শনিকের আলোয় সংকট, স্বাধীনতা ও আগামী শতকের স্বপ্ন

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১ July ২০২৬ ২০:৩৫

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১ July ২০২৬ ২০:৩৫

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক স্পেশাল

বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই কেবল ইট-পাথরের স্থাপত্য নয়, পাঠ্যসূচির অনুশাসন নয়, কিংবা সনদ বিতরণের এক প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও নয়। একটি প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হলো জাতির বৌদ্ধিক বিবেক, সভ্যতার আত্মসমালোচনার আয়না এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন নির্মাণের কর্মশালা। যে সমাজ তার বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের আগামীকে পড়তে পারে না, সে সমাজ একদিন নিজের ইতিহাসও পড়তে ভুলে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সেই আত্মজিজ্ঞাসার দরজাই খুলে দিয়েছে অধিকারপত্র স্টুডিও। আয়োজন করা হয়েছে এক কল্পিত, অথচ চিন্তার স্তরে গভীরভাবে বাস্তব, আন্তর্জাতিক গোলটেবিল বৈঠকের। আলোচনার সঞ্চালনায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অধিকারপত্রের উপদেষ্টা সম্পাদক অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু। তাঁর সঙ্গে চিন্তার এই বিরল সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন চার ভিন্ন ভূখণ্ডের চার বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক—রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, আন্তোনিও গ্রামশি এবং পাওলো ফ্রেইরি। সময়, ভূগোল ও ইতিহাসের সীমানা অতিক্রম করে তাঁরা যেন এক টেবিলে বসেছেন একটি মাত্র প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে—একটি বিশ্ববিদ্যালয় কবে সত্যিকার অর্থে একটি জাতির বিবেক হয়ে ওঠে?
আলোচনার পরিধি কেবল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিক স্মৃতিচারণায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফিরে দেখা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদর্শন, ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক অর্ডিন্যান্সের চেতনা, একাডেমিক স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তি, গবেষণার সংকট, বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ের বাস্তবতা, শতবর্ষোত্তর অভিযাত্রার দিকনির্দেশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়-রাজনীতির দীর্ঘ ছায়াকে। একই সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী শিক্ষক নিগ্রহ, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার বিস্তার, রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি, মুক্তবুদ্ধির সংকোচন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
এই সাহিত্যধর্মী, বিশ্লেষণাত্মক ও বর্ণনামূলক প্রতিবেদনটি সেই কল্পিত সংলাপেরই বৌদ্ধিক পুনর্নির্মাণ। এখানে কোনো একক মতের বিজয় নেই; আছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, আত্মসমালোচনার পর আত্মসমালোচনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মা কোথায় হারিয়ে যায়, কেন র‌্যাংকিং কখনও কখনও মরুভূমির মরীচিকার মতো দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করে, কীভাবে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি জ্ঞানের স্বাধীনতাকে ক্ষয় করে, কেন ‘মব সন্ত্রাস’ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়, এবং কীভাবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর নিরাপত্তাহীনতা শেষ পর্যন্ত একটি জাতির ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চিত করে তোলে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করা হয়েছে চার দার্শনিকের ভিন্ন ভিন্ন বৌদ্ধিক পরম্পরার আলোয়।
এ কেবল একটি কাল্পনিক গোলটেবিল নয়; এটি ইতিহাস, দর্শন ও সমকালীন বাস্তবতার এক অন্তর্মুখী সংলাপ। বাংলার জ্বলন্ত শ্রেণিকক্ষ, আহত শিক্ষকের মুখ, নীরব গবেষণাগার, উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী এবং অনাগত শতকের সম্ভাবনাকে চারটি বিশ্বদৃষ্টির ভিন্ন আলোয় দেখার এক সচেতন প্রয়াস। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ কেবল তার ভবনের ভবিষ্যৎ নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জাতির চিন্তার স্বাধীনতা, মানবিক সাহস এবং সভ্যতার আগামী অধ্যায়।

প্রস্তাবনা: অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়ে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মজিজ্ঞাসা

১৯২১ সালের ১ জুলাই। পূর্ববাংলার আকাশে তখন নতুন দিনের প্রত্যাশা। নদীমাতৃক ভূখণ্ডের নির্মল বাতাস, নবজাগরণের বৌদ্ধিক আবহ এবং জাতির আত্মমর্যাদার আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে জন্ম দিয়েছিল এক ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের। সত্য, জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার আদর্শকে ধারণ করে যাত্রা শুরু করেছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়, আজ তার পথচলার ১০৫ বছর। সেই প্রতিষ্ঠান—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক জাগরণ, রাজনৈতিক চেতনা এবং জাতীয় ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এর প্রতিটি ইট, প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি করিডর বহন করে একটি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের স্মৃতি।

কিন্তু শতবর্ষ অতিক্রমের এই গৌরবময় প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঘিরে উচ্চারিত হচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতার ভাষ্য। ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময় বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনকে গভীর অনিশ্চয়তা, সহিংসতা ও অবিশ্বাসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পরিবেশ বহু ক্ষেত্রে বিঘ্নিত হয়েছে; শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; মুক্তবুদ্ধির চর্চা নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। সামরিক শাসন, গণআন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম কিংবা জঙ্গিবাদের মতো প্রতিটি জাতীয় সংকটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন দেশের বিবেকের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তেমনি বর্তমান সময়ও আমাদের সামনে নতুন এক আত্মসমালোচনার প্রশ্ন উত্থাপন করছে—বিশ্ববিদ্যালয় কি এখনও জ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতার আশ্রয়স্থল হিসেবে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা অক্ষুণ্ন রাখতে পারছে?

এই প্রেক্ষাপটেই অধিকারপত্রের বিশেষ আয়োজন—একটি কল্পিত কিন্তু চিন্তাগতভাবে গভীর গোলটেবিল আলোচনা। আলোচনার সঞ্চালনায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু। তাঁর সঙ্গে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বচিন্তার চার প্রভাবশালী দার্শনিক—গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের অনন্য কণ্ঠ রোজা লুক্সেমবার্গ, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষাদর্শনের প্রবক্তা জন ডিউই, সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও বৌদ্ধিক নেতৃত্বের তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশি এবং মুক্তিকামী শিক্ষার বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক পাওলো ফ্রেইরি। তাঁদের ভাবনা ও দর্শনের আলোকে এই আলোচনা অনুসন্ধান করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের ঐতিহ্য, বর্তমানের সংকট এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে।

শতবর্ষ পেরিয়ে আত্মসমালোচনার প্রাঙ্গণে

বর্ষার মেঘ যখন বুড়িগঙ্গার আকাশে নেমে আসে, তখন কার্জন হলের লাল ইটের দেয়াল যেন ইতিহাসের অগণিত স্মৃতি নিঃশব্দে উচ্চারণ করে। ১৯২১ সালের সেই সূচনা থেকে ২০২৬ সালের এই সময় পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এটি একটি জাতির বৌদ্ধিক অভিযাত্রার মহাকাব্য। এই প্রাঙ্গণে বিকশিত হয়েছে অসংখ্য মনীষীর চিন্তা, জন্ম নিয়েছে স্বাধীনতার স্বপ্ন, ভাষা আন্দোলনের অঙ্গীকার, গণঅভ্যুত্থানের সাহস এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস আসলে বাংলাদেশের ইতিহাসেরই আরেকটি পাঠ।

তবু প্রতিষ্ঠার ১০৫ বছরে এসে উদ্‌যাপনের আনন্দের পাশাপাশি এক গভীর উদ্বেগও আমাদের ঘিরে ধরে। শিক্ষা কি ক্রমে কেবল সনদ অর্জনের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, নাকি এখনও তা মানুষকে মুক্তচিন্তা, নৈতিক সাহস এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার পথে পরিচালিত করার শক্তি ধারণ করে আছে? সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাঙ্গনে যে অস্থিরতা, সহিংসতা, শিক্ষক নিগ্রহ এবং গোষ্ঠীকেন্দ্রিক শক্তির উত্থান প্রত্যক্ষ করা গেছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক চরিত্র ও স্বাধীন বৌদ্ধিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

এই জটিল বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ‘অধিকারপত্র স্টুডিও’ আয়োজন করেছে একটি কল্পিত কিন্তু বৌদ্ধিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ গোলটেবিল আলোচনা। এখানে ইতিহাস, দর্শন ও সমকাল মুখোমুখি হয়েছে এক অভিন্ন প্রশ্নে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে তার প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শকে পুনরুদ্ধার করতে পারে, এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণে আবারও কীভাবে জ্ঞানের বাতিঘর হয়ে উঠতে পারে?

স্টুডিওর নীরব আলোকচ্ছটায় মুখোমুখি বসেছেন চার মহাদেশের চার অনন্য চিন্তাবিদ। আলোচনার সঞ্চালনায় অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু তাঁদের সামনে উন্মোচন করছেন একের পর এক মৌলিক প্রশ্ন। গণতন্ত্র, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্ষমতা, মুক্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক দায়িত্ব—এই বহুমাত্রিক বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, আন্তোনিও গ্রামশি এবং পাওলো ফ্রেইরি তাঁদের নিজ নিজ দার্শনিক অবস্থান থেকে বিশ্লেষণ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত, বর্তমান ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। ইতিহাস ও কল্পনার সংমিশ্রণে নির্মিত এই সাহিত্যধর্মী সংলাপ কেবল একটি কাল্পনিক আলোচনা নয়; বরং আমাদের সময়কে নতুনভাবে বোঝার এক বৌদ্ধিক অনুশীলন।

গান শুনুন: খুব ভালোবাসি বিশ্ববিদ্যালয় তোমায় │ University of Dhaka 105th Anniversary Tribute Song (8:05)

প্রথম পর্ব: যখন সময়ের সীমানা ভেঙে চার দার্শনিক এসে বসলেন অধিকারপত্র স্টুডিওতে

বাইরে বৃষ্টি। ঢাকার আকাশে আষাঢ়ের মেঘ। শাহবাগের কৃষ্ণচূড়া ভিজছে নীরবে। কার্জন হলের লাল ইটগুলো যেন এক শতকের ইতিহাস ধুয়ে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। বাতাসে ভেসে আসছে টিএসসির চায়ের গন্ধ, বটতলার আড্ডা, অপরাজেয় বাংলার দীর্ঘশ্বাস, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নীরবতা এবং অগণিত পদচারণার শব্দ।

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

কিন্তু অধিকারপত্র স্টুডিওতে আজকের আয়োজন শুধুই একটি আনুষ্ঠানিক স্মরণসভা নয়। আজ এখানে সময়ের দেয়াল ভেঙে গেছে। ইতিহাস বর্তমানের সঙ্গে করমর্দন করছে। দর্শন কথা বলছে বাস্তবতার সঙ্গে।

স্টুডিওর মাঝখানে একটি গোল টেবিল। টেবিলের মাঝখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক। তার চারপাশে পাঁচটি আসন। মধ্যখানে বসেছেন সঞ্চালক—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ এবং অধিকারপত্রের উপদেষ্টা সম্পাদক ড. মাহবুব লিটু। তার ডান পাশে বসেছেন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তক রোজা লুক্সেমবার্গ। বাম পাশে বসেছেন আধুনিক শিক্ষাদর্শনের স্থপতি জন ডিউই। সামনের আসনে বসেছেন সাংস্কৃতিক আধিপত্য তত্ত্বের প্রণেতা আন্তোনিও গ্রামশি। আর শেষ প্রান্তে বসেছেন মুক্তিকামী শিক্ষার মহান দার্শনিক পাওলো ফ্রেইরি।

সময় থমকে গেছে। ইতিহাস শুনছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন নিজেই নিজের বিচারসভায় উপস্থিত হয়েছে।

ড. মাহবুব লিটু আলোচনার সূচনা করলেন—

"আজ আমরা কোনো ব্যক্তির বিচার করতে বসিনি। আমরা বিচার করতে চাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মাকে। আমরা জানতে চাই—যে বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির জাতীয়তাবাদ, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার জন্ম দিয়েছে—সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ কোথায় দাঁড়িয়ে?"

স্টুডিও নিস্তব্ধ। তিনি আবার বললেন—

"১৯২১ সালে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ব বাংলার মানুষের উচ্চশিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য, সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে, যদিও গবেষণায় বিনিয়োগ সীমিত। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অবস্থান করছে।"

তারপর তিনি টেবিলের মাঝখানে রাখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অর্ডিন্যান্সটি হাতে তুলে নিলেন। তিনি বললেন— "এই বইটি কেবল একটি আইন নয়। এটি একটি দর্শন। এটি একটি সামাজিক চুক্তি। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধান।"

তিনি কয়েকটি ধারা খুলে পড়লেন। সেখানে লেখা—

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হবে—

  • জ্ঞান সৃষ্টি করা,
  • গবেষণা করা,
  • জ্ঞান বিস্তার করা,
  • শিল্প, বিজ্ঞান ও মানববিদ্যার বিকাশ ঘটানো,
  • এবং ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা শ্রেণি নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্মুক্ত রাখা।

ড. লিটু বললেন—

"দেখুন। কত আশ্চর্যের বিষয়! বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় যে অর্ডিন্যান্স প্রণীত হয়েছিল, সেখানে 'গবেষণা', 'জ্ঞান সৃষ্টি', 'একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন' এবং 'সবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়'—এই চারটি ধারণা একই কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হয়েছে। এটি কেবল প্রশাসনিক আইন নয়। এটি একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় দর্শনের দলিল।"

রোজা লুক্সেমবার্গ মৃদু হেসে বললেন—"আমি বহু আগে বলেছিলাম—স্বাধীনতা সবসময়ই ভিন্নমতাবলম্বীর স্বাধীনতা। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমত নিরাপদ না হয়, তবে সেটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকে না; সেটি প্রশাসনিক কার্যালয়ে পরিণত হয়।"

জন ডিউই যোগ করলেন— "বিশ্ববিদ্যালয় কোনো মুখস্থবিদ্যার কারখানা নয়। এটি একটি জীবন্ত গণতন্ত্র। এখানে প্রশ্ন করার অধিকার না থাকলে শিক্ষা মৃত হয়ে যায়।"

গ্রামশি ধীরে ধীরে বললেন—"ক্ষমতাসীনরা সব সময় বিশ্ববিদ্যালয় দখল করতে চায়। কারণ যে বিশ্ববিদ্যালয় মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—সে রাষ্ট্রকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে গণতন্ত্র রক্ষা করা।"

পাওলো ফ্রেইরি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন—"যেখানে শিক্ষক ভয় পায়, সেখানে শিক্ষার্থীও মুক্ত হয় না। আর যেখানে শিক্ষককে অপমান করা হয়, সেখানে জ্ঞান উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।"

স্টুডিওর পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে।

ড. মাহবুব লিটু এবার একটি নতুন প্রশ্ন তুললেন।

"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের সময় আমরা গবেষণাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে বহু উদ্যোগ নিয়েছিলাম—শিক্ষক মূল্যায়ন কাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ (Foundation Certificate in University Teaching Learning), গবেষণা নৈতিকতা নীতিমালা, গবেষণা নৈতিকতা কমিটি, কনফারেন্স কমিটি, DOI ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিশন ও মিশন প্রণয়ন, সেন্টেনিয়াল রিসার্চ গ্রান্ট এবং প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক আন্তঃবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ—এসব ছিল বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।"

তিনি থামলেন।

তারপর গভীর কণ্ঠে বললেন—"কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম প্রশ্ন রয়ে গেছে। যে সমাজ তার নির্মাতাকে স্মরণ করে না, যে প্রতিষ্ঠান অবদানকে স্বীকৃতি না দিয়ে উল্টো অপমানের সংস্কৃতি তৈরি করে, সেই প্রতিষ্ঠান কি দীর্ঘমেয়াদে উৎকর্ষ ধরে রাখতে পারে?"

স্টুডিওতে নেমে এলো দীর্ঘ নীরবতা।

সেই নীরবতা ভাঙলেন রোজা লুক্সেমবার্গ।

তিনি শুধু একটি বাক্য বললেন—"যে প্রতিষ্ঠানে কৃতজ্ঞতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে, সেখানে সৃজনশীলতা ধীরে ধীরে নির্বাসিত হয়।"

এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের দীর্ঘ আলোচনার দরজা খুলে গেল।

  দ্বিতীয় পর্ব:  কাল্পনিক মহোত্তম গোলটেবিল সংলাপ: তত্ত্ব ও বাস্তবের মেলবন্ধন

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু (সঞ্চালক): শ্রদ্ধেয় সুধী ও বিশ্বজ্ঞানের আলোকবর্তিকা বহনকারী দার্শনিকবৃন্দ, অধিকারপত্র স্টুডিওর পক্ষ থেকে আপনাদের জানাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন। আজ আমরা এমন এক ক্ষণে সমবেত হয়েছি, যখন আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে। কিন্তু এই উদযাপন আনন্দের নয়, এ যেন এক গভীর আত্মানুসন্ধান ও বেদনার আরতি। ১৯২১ সালে যখন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববঙ্গের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মাঝে জ্ঞানালোকের বিস্তার ঘটানো এবং একটি সুশিক্ষিত, প্রগতিশীল নেতৃত্ব তৈরি করা। আজ শতবর্ষ পার করে আমরা একবিংশ শতাব্দীর গভীর সংকটের চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আছি। সাম্প্রতিক বাজেট অধিবেশনে আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটে গবেষণার অংশ প্রায় ০%-এর কাছাকাছি! অথচ এই অবিশ্বাস্য দৈন্যের মধ্যেও বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

কিউএস (QS) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং ২০২৭ অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থান ৬০৪ এবং এশিয়ায় ১৩২তম। টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) ২০২৬ অনুযায়ী আমরা ৮০১-১০০০ ক্যাটাগরিতে আছি। সিডব্লিউআর (CWUR) অনুযায়ী অবস্থান ১৫০৭ এবং ইউএস নিউজ (US News) অনুযায়ী ৬৭৩। আমি আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই—যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার প্রাণ স্তব্ধ করে রাখা হয়, যেখানে শিক্ষকেরা প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক ও কাঠামোগত নিপীড়নের শিকার হন, তার এই অস্তিত্বের লড়াইকে আপনারা কীভাবে দেখেন? জন ডিউই, আপনার প্রগতিশীল শিক্ষাতত্ত্বের আলোকেই না হয় আলোচনা শুরু হোক।

জন ডিউই: ধন্যবাদ ড. মাহবুব লিটু। আপনার সঞ্চালনা এবং আপনার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি এই গভীর আকুলতা আমাকে স্পর্শ করেছে। আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, "Education is not preparation for life; education is life itself." বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, এটি সমাজেরই একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস যখন আমি পাঠ করি, তখন দেখি এটি ছিল একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ফসল। কিন্তু বর্তমান যুগে আপনারা যখন 'র‍্যাংকিং'-এর সংখ্যাতাত্ত্বিক বেড়াজালে আটকে পড়েন, তখন আমার কিছুটা সংশয় হয়। সংখ্যার এই খেলা প্রায়শই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়।

গবেষণার বাজেট প্রায় ০% রাখা সত্ত্বেও শিক্ষকেরা যে নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় টিকিয়ে রেখেছেন, তা প্রশংসনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী। শিক্ষা যদি একটি সমাজকে গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও চিন্তাশীল করে তুলতে না পারে, তবে সেই শিক্ষার র‍্যাংকিং দিয়ে কী হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হলো শিক্ষার্থীর মধ্যে 'Critical Inquiry' বা সমালোচনামূলক অনুসন্ধিৎসা তৈরি করা। যখন একটি সমাজ তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মুক্তচিন্তাকে অবদমিত করে, তখন শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে।

রোজা লুক্সেমবার্গ: ডিউই-র কথার সূত্র ধরেই আমি বলতে চাই, তবে কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। ড. লিটু, আপনি যে র‍্যাংকিংয়ের কথা বলছেন, তা আসলে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি নয়া-উদারবাদী (Neo-liberal) হাতিয়ার। এই র‍্যাংকিং পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের করপোরেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে তৈরি, যা তৃতীয় বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। আসল সত্যটা হলো, গবেষণা বাজেট ০% রাখা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি শাসকশ্রেণীর একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তারা চায় না একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা মুক্ত ও স্বাধীন চিন্তার অধিকারী হোক। কারণ, স্বাধীন চিন্তা সবসময়ই প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রশক্তি ও শোষকশ্রেণীর ভিত কাঁপিয়ে দেয়। "Freedom is always and exclusively freedom for the one who thinks differently." ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল ঔপনিবেশিক কাঠামোর ভেতরে এক টুকরো স্বাধিকারের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু আজ যখন আমি শুনি যে সেখানে ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নেই, উল্টো তাদের 'ভিকটিমাইজড' করা হচ্ছে, তখন আমার রক্ত টগবগ করে ওঠে। শৃঙ্খল ভাঙার গান যারা গাইবে, তারা নিজেই আজ শৃঙ্খলিত!

আন্তোনিও গ্রামশি: রোজা ঠিকই ধরেছেন। এখানে আমাদের 'সাংস্কৃতিক আধিপত্য' বা 'Cultural Hegemony'-র তত্ত্বটি বুঝতে হবে। শাসকশ্রেণী কেবল পুলিশ বা লাঠি দিয়ে শাসন করে না, তারা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সমাজকে শাসন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক 'হেজিমনি' বা আধিপত্য ভাঙার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ১৯৫২ কিংবা ১৯৭১ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে পাল্টা-হেজিমনি (Counter-hegemony) তৈরি করেছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা কী দেখছি? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজ চরম 'রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি' প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। শিক্ষকেরা যখন সত্যের সন্ধান ছেড়ে ক্ষমতার চাটুকারিতায় লিপ্ত হন, যখন তারা স্বাধীন বুদ্ধিজীবী (Organic Intellectual) না হয়ে শাসকদলের তল্পিবাহক বা 'Traditional Intellectual'-এ পরিণত হন, তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের পতন ঘটে।

ড. লিটু, আমি আপনার লেখা ও কাজের সাথে পরিচিত। আপনি শতবর্ষ উদযাপনের সময় যে সুদূরপ্রসারী উদ্যোগগুলো নিয়েছিলেন—যেমন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য 'এফসিটিএল' (FCTL) বা 'Foundation Certificate in University Teaching Learning' প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক মূল্যায়ন কৌশল প্রণয়ন, কিংবা গবেষণার এথিক্স কমিটি ও ফিল্ডওয়ার্ক নীতিমালা তৈরি—এগুলো ছিল মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্টার-হেজিমনি তৈরির প্রয়াস। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই ব্যবস্থার ভেতরে থাকা সুবিধাভোগী ও লেজুরবৃত্তিক গোষ্ঠী আপনার সেই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো আপনাকে অপদস্থ করার এক জঘন্য সংস্কৃতি চালু করেছে। এটি অত্যন্ত চেনা একটি ফ্যাসিবাদের লক্ষণ।

পাওলো ফ্রেইরি: গ্রামশির কথার রেশ ধরে আমি বলব, ড. মাহবুব লিটুর সাথে যা ঘটেছে, তা হলো 'Oppressor' বা নিপীড়কের চিরায়ত মনস্তত্ত্ব। নিপীড়ক গোষ্ঠী কখনো প্রকৃত সংস্কারককে সহ্য করতে পারে না। কারণ সংস্কার মানেই হলো অন্ধকারের দেয়াল ভেঙে আলোর প্রবেশ ঘটানো। আমি আমার 'Pedagogy of the Oppressed' গ্রন্থে বলেছিলাম, শিক্ষা কখনো নিরপেক্ষ হতে পারে না; এটি হয় মানুষকে মুক্ত করার হাতিয়ার, নয়তো তাকে দাস বানানোর শৃঙ্খল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাসে ড. লিটু যে 'FCTL' চালু করেছিলেন (যার নামকরণও তাঁরই দেওয়া), তা ছিল শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতিকে আধুনিক ও মানবিক করার একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। শিক্ষকেরা যদি নিজেরাই প্রশিক্ষিত ও স্বাধীন না হন, তবে তারা শিক্ষার্থীদের কীভাবে মুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন?

কিন্তু আজ বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে যে 'মব সন্ত্রাস' বা গণ-আদালতের নামে উন্মাদনা আমরা দেখছি, তা শিক্ষার মূল চেতনাকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে যেভাবে ৩ হাজারের বেশি শিক্ষক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, জোরপূর্বক পদত্যাগ করাতে বাধ্য করা হয়েছে, তা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরায় কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে, তখন বুঝতে হবে সমাজটি একটি গভীর নৈতিক অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। একে শিক্ষা বলা যায় না, এ হলো 'Banking Education'-এর চূড়ান্ত বিকৃতি, যেখানে সংলাপের কোনো স্থান নেই, আছে কেবল হিংসা আর প্রতিশোধের লেলিহান শিখা।

গান শুনুন:  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়│ DU at 105 │ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গান│ Anniversary Songs, Podcasts & Special Discussions @ অধিকারপত্র │ LearningBdFun

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু (সঞ্চালক): আপনাদের এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমার ভেতরের ক্ষতকে যেন আরও স্পষ্ট করে তুলল। হ্যাঁ, সত্য কথা বলতে কী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের প্রশাসনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আমি গর্বিত ছিলাম। আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম একটি আন্তর্জাতিক মানের 'Educational Ecosystem' বা শিক্ষাগত বাস্তুতন্ত্র তৈরি করার। যেখানে শিক্ষকেরা আন্তর্জাতিক জার্নালে যৌথ প্রকাশনা করবেন, বৈশ্বিক গবেষণা তহবিলে প্রবেশাধিকার পাবেন। এই লক্ষ্যেই আমি দিনরাত পরিশ্রম করে 'ভিশন এবং মিশন স্টেটমেন্ট' তৈরি করেছিলাম, যা সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলে পাস হয়েছিল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঢাবির 'মাস্টার প্ল্যান' এবং 'একাডেমিক উন্নয়ন ও স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান' প্রণীত হয়েছিল আমার হাত ধরে।

আমরা শতবর্ষ উপলক্ষে শিক্ষকদের গবেষণা বাড়াতে 'Centennial Research Grant' (CRG) চালু করেছিলাম, যার অধীনে আমার নেতৃত্বে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকল্প 'Accessibility and Inclusion for Students with Disabilities: Transforming University of Dhaka aligning with Sustainable Development Goals' সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং তার আলোকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিশেষ প্রতিবন্ধী নীতিমালার খসড়া তৈরি হয়। অথচ আজ যখন ফিরে তাকাই, দেখি সেই প্রশাসন, সেই শিক্ষাঙ্গন আজ মব জাস্টিসের আখড়া। যারা কোনোদিন একটি লাইন গবেষণা করেনি, যারা কেবল রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি করে পদ-পদবি পেয়েছে, তারা আজ সর্বেসর্বা। আর আমাদের মতো স্বাধীন গবেষকদের ভাগ্যে জোটে অপদস্থতা ও ভিকটিমাইজেশন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর যে আগুন বাংলার শ্রেণিকক্ষে পুড়েছে, তা নিয়ে আপনাদের মন্তব্য কী?

রোজা লুক্সেমবার্গ: ড. লিটু, আপনার এই লড়াইকে আমি স্যালুট জানাই। আপনি যে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন, তা-ই তো আসল বিপ্লব। কিন্তু মনে রাখবেন, বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল সমাজব্যবস্থা সবসময়ই প্রকৃত প্রগতিশীলদের ভিকটিমাইজ করে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে যে গণঅভ্যুত্থান হলো, তা ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই বিপ্লবের ফসল চুরি করে নিয়েছে একদল সুবিধাবাদী 'মব' বা উগ্র জনতা। তারা বিপ্লবের নাম করে শিক্ষাঙ্গনে নতুন ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে। ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের কোনো নিরাপত্তা নেই। প্রশাসন নিজেই আজ মেরুদণ্ডহীন। তারা মবদের তুষ্ট করতে ব্যস্ত। কোনো তদন্ত ছাড়া, কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানো হচ্ছে। এটি আসলে 'ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিরই' আরেকটি রূপান্তর। এক স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে যদি আমরা আরেক উগ্র মব-তন্ত্রের জন্ম দিই, তবে তাকে মুক্তি বলা যায় না। বাংলার শ্রেণিকক্ষে আজ যে আগুন জ্বলছে, তা আসলে মুক্তচিন্তার চিতাভস্ম।

জন ডিউই: একদম ঠিক। যেখানে আইনি প্রক্রিয়া বা 'Due Process' লঙ্ঘিত হয়, সেখানে গণতন্ত্র বাঁচতে পারে না। ১৯৭৩ সালের 'Dhaka University Ordinance' বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ তো আমি পড়েছি। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে। উপাচার্য বা সিন্ডিকেট মবদের চাপের মুখে এভাবে নতিস্বীকার করতে পারেন না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া প্রশাসনের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু আজ যখন প্রশাসন নিজেই ভিকটিমদের রক্ষা না করে নিপীড়কদের সহযোগী হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা সংকটের মুখে পড়ে। মব জাস্টিস কখনো জাস্টিস বা ন্যায়বিচার হতে পারে না; এটি হলো নৈরাজ্য। এই নৈরাজ্য বন্ধ না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনোদিন বৈশ্বিক স্তরে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে না।

আন্তোনিও গ্রামশি: এখানেই আমাদের বুঝতে হবে যে, এই মব সন্ত্রাস আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি হলো সমাজে সুদীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা 'অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতির' ফসল। যখনই কোনো দেশে বড় political পরিবর্তন ঘটে, তখনই একটি শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়। শিক্ষকেরা আজ এতটাই বিভক্ত যে এক দল শিক্ষক যখন লাঞ্ছিত হন, অন্য দল শিক্ষক তখন নীরব থাকেন বা আনন্দ পান। এই যে শিক্ষকদের নৈতিক স্খলন ও সংহতির অভাব, এটাই মবদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। ড. লিটু, আপনার তৈরি FCTL বা শিক্ষক মূল্যায়ন কৌশল যদি সঠিকভাবে কার্যকর থাকত, তবে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা থাকত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কাছে, কোনো উগ্র মবের কাছে নয়। কিন্তু রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তির কারণে শিক্ষকেরা নিজেরাই নিজেদের মর্যাদা ধূলিসাৎ করেছেন।

পাওলো ফ্রেইরি: এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কিন্তু আমাদেরই খুঁজতে হবে। সংলাপই (Dialogue) হলো মুক্তির একমাত্র পথ। কিন্তু সংলাপ হতে হবে সমতার ভিত্তিতে। আজ যে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের পদত্যাগ করাচ্ছে, তারা আসলে শোষকের মনস্তত্ত্বই ধারণ করছে। "The oppressed, instead of striving for liberation, tend themselves to become oppressors." এই চক্র ভাঙতে হবে। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক স্তরে আরও শক্ত অবস্থান তৈরিতে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। ড. লিটু, আপনি যে মাস্টার প্ল্যান এবং একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান তৈরি করেছিলেন, সেটিকে ডাস্টবিন থেকে তুলে এনে আলোর মুখ দেখাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করতে হবে লেজুরবৃত্তিক রাজনীতি থেকে।

 তৃতীয় পর্ব: কলঙ্কের কালো অধ্যায়: ৫ আগস্ট পরবর্তী শিক্ষক নিগ্রহের করুণ আখ্যান

গোলটেবিল সংলাপের সেই তাত্ত্বিক আলোচনার গভীরতা যখন আমাদের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, তখন অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মোড় হলেও, এর পরবর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনে যে অন্ধকার নেমে এসেছে, তা নজিরবিহীন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন (যেমন বাংলাদেশ টাইমস, সমকাল, মানবকথা ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল) অনুযায়ী, আগস্ট-পরবর্তী মাত্র কয়েক মাসে সারা দেশে ৩ হাজারের বেশি শিক্ষক মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত এই নিগ্রহের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।

যে শিক্ষকের হাত ধরে বাঙালি প্রথম বর্ণমালা চিনেছিল, যাঁর জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত হয়ে তরুণ সমাজ দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে, সেই শিক্ষকদের কান ধরে উঠ-বস করানো, শারীরিক লাঞ্ছনা, এবং জোরপূর্বক সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি কেবল কোনো ব্যক্তির লাঞ্ছনা নয়, এটি সমগ্র শিক্ষকতা পেশার এবং একটি জাতির মেরুদণ্ডের ওপর কুঠারাঘাত। ইউনেস্কোর ২০২৪ সালের গ্লোবাল রিপোর্ট অন টিচার্স (Global Report on Teachers)-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, শিক্ষকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হলে তা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে। বাংলাদেশে আজ ঠিক সেই ট্র্যাজেডিই ঘটছে। সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি শিক্ষক আজ শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারছেন না এক অজানা আতঙ্কে।

  চতুর্থ পর্ব:. স্বায়ত্তশাসনের অমর্যাদা ও ভিকটিমাইজেশনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় ঐতিহাসিক 'The Dhaka University Order, 1973' বা ১৯৭৩ সালের অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত এই অর্ডিন্যান্সের মূল ভিত্তিই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, সিন্ডিকেট ও ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বর্তমান প্রশাসন এই ঐতিহাসিক আইনি দলিলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মব জাস্টিসের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত উন্নয়নে, আন্তর্জাতিকীকরণে এবং শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তনে আজীবন অবদান রেখেছেন, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি ভিকটিমাইজেশনের শিকার। অধিকারপত্র স্টুডিওর উপদেষ্টা সম্পাদক ও ঢাবি ফ্যাকাল্টি অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটুর উদাহরণটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শতবর্ষ উদযাপন কমিটির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন, তা আজ ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মেধা ও শ্রমে তৈরি হওয়া 'এফসিটিএল' (FCTL) আজ অবহেলিত। যে মানুষটি ঢাবির ইতিহাসে প্রথম একাডেমিক উন্নয়ন ও স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান উপহার দিলেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক মানের সিআরজি (CRG) গবেষণা সম্পন্ন করে বিশেষ নীতিমালা তৈরি করলেন, তাঁকে উপযুক্ত সম্মান ও স্বীকৃতি না দিয়ে উল্টো প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক নোংরামির মাধ্যমে অপদস্থ করার অপসংস্কৃতি প্রবর্তন করা হয়েছে। ভিন্নমতাবলম্বী হওয়ার কারণে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক চরিত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

  পঞ্চম পর্ব:. সংকট থেকে উত্তরণ: বৈশ্বিক স্তরে ঢাবির শক্ত অবস্থান তৈরিতে করণীয় ও আগামীর পথচলা

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে যারা পথ চলে, তারাই টিকে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি তার গৌরবময় অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হয় এবং বৈশ্বিক মানচিত্রে একটি শক্ত মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে হয়, তবে এই মুহূর্তে এক আমূল ও বৈপ্লবিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। অধিকারপত্র স্টুডিওর এই ঐতিহাসিক সংলাপ থেকে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে আগামীর পথচলার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ১০ দফা অ্যাকশন প্ল্যান বা ব্লু-প্রিন্ট প্রস্তাব করা হলো:

  • ১. মব জাস্টিসের অবসান ও আইনি প্রক্রিয়ার পুনর্বহাল: বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের মব জাস্টিস, উগ্র উন্মাদনা এবং জোরপূর্বক পদত্যাগের সংস্কৃতিকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। ১৯৭৩ সালের অর্ডিন্যান্সের ধারাগুলোকে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করে সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা কেবল ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে তদন্ত সাপেক্ষে বিচার করা যাবে, রাস্তার মবদের দ্বারা নয়।
  • ২. ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তা ও ভিকটিমাইজেশন বন্ধ করা: বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুক্তমতের চারণভূমি। রাজনৈতিক বা আদর্শিক ভিন্নমতের কারণে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে যেন কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বা শারীরিক হেনস্থার শিকার হতে না হয়, তার পূর্ণ গ্যারান্টি প্রশাসনকে দিতে হবে। অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটুর মতো আন্তর্জাতিক মানের গবেষক ও শিক্ষাবিদদের ওপর অন্যায় অপদস্থতার অবসান ঘটিয়ে তাঁদের অবদানকে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
  • ৩. লেজুরবৃত্তিক রাজনীতির আমূল সংস্কার ও একাডেমিক প্রাধান্য: শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দলীয় লেজুরবৃত্তির রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক পদায়নের ক্ষেত্রে একমাত্র যোগ্যতা হতে হবে একাডেমিক এক্সিলেন্স, গবেষণা ও মেধা—কোনো রাজনৈতিক দলের চাটুকারিতা নয়। উপাচার্য থেকে শুরু করে ডিন ও হলের প্রাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক রেকর্ড বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • ৪. গবেষণা বাজেট বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিকীকরণ: সিনেটের বাজেট অধিবেশনে গবেষণা বাজেট ০% থেকে বাড়িয়ে ন্যূনতম ১৫%-এ উন্নীত করতে হবে। শতবর্ষে প্রবর্তিত 'Centennial Research Grant' (CRG)-কে একটি স্থায়ী সংবিধিবদ্ধ তহবিলে রূপান্তর করতে হবে। থাইল্যান্ডের কাসেটসার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলোর (MoU) প্রকৃত বাস্তবায়ন ঘটিয়ে নিয়মিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও উচ্চমানের জার্নাল প্রকাশনা নিশ্চিত করতে হবে।
  • ৫. এফসিটিএল (FCTL) ও শিক্ষক মূল্যায়ন কৌশলের বাধ্যতামূলক বাস্তবায়ন: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু কর্তৃক প্রবর্তিত 'Foundation Certificate in University Teaching Learning' (FCTL) প্রশিক্ষণকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নবাগত শিক্ষকের জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে, শিক্ষার্থীদের দ্বারা 'শিক্ষক মূল্যায়ন কৌশল' (Teacher Evaluation Strategy) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চালু করতে হবে, যাতে শিক্ষাদানের গুণগত মান আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত হয় এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
  • ৬. ডিজিটাল রূপান্তর ও এস্পায়ারেশনাল একাডেমিক প্ল্যান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও পরীক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করতে হবে। প্রতিটি প্রকাশনা ও গবেষণাপত্রের জন্য ডিওআই (DOI) নম্বর যুক্ত করা এবং অনলাইন ভিজিবিলিটি বা উপস্থিতি নিশ্চিত করার যে উদ্যোগ ড. লিটু নিয়েছিলেন, তা দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। ২০২৭ সালের কিউএস র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষ ৫০০-এর মধ্যে স্থান করে নেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'এস্পায়ারেশনাল একাডেমিক রোডম্যাপ' প্রণয়ন করতে হবে।
  • ৭. অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও প্রতিবন্ধী নীতিমালার বাস্তবায়ন: ড. লিটুর নেতৃত্বে সম্পন্ন হওয়া সিআরজি গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আন্তর্জাতিক মানের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ অ্যাক্সেসিবিলিটি (র‌্যাম্প, ব্রেইল লাইব্রেরি, বিশেষ সফটওয়্যার) এবং তাদের অধিকার রক্ষায় বিশেষ নীতিমালার খসড়াটি অনতিবিলম্বে সিন্ডিকেটে পাস করে বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • ৮. অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মাস্টার প্ল্যানের সঠিক অনুসরণ: বিগত ৯৩ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন প্রায় ৫৬.৫৬% হ্রাস পেয়ে ৬০০ একর থেকে ২৬০.৬১৪ একরে এসে ঠেকেছে, অথচ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজারের ওপরে। এই তীব্র স্থান সংকটের সমাধানে ড. লিটুর সময়ে প্রণীত 'ঢাবি মাস্টার প্ল্যান' এবং 'একাডেমিক উন্নয়ন ও স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান' কঠোরভাবে অনুসরণ করে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে হবে।
  • ৯. কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভূমিকম্প ও মব সন্ত্রাসের কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে গভীর ট্রমা ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দূরীকরণে প্রতিটি হলে এবং অনুষদে পেশাদার 'মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং কেন্দ্র' স্থাপন করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনের বৈরিতা দূর করে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ 'Educational Ecology' বা শিক্ষাগত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।
  • ১০. অধিকারপত্র স্টুডিওর মতো স্বাধীন থিংক-ট্যাংকের সাথে কোলাবোরেশন: বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে 'অধিকারপত্র'-এর মতো স্বাধীন নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও থিংক-ট্যাংকের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণকে স্বাগত জানাতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক আত্মতুষ্টি পরিহার করে নিয়মিত গণশুনানি ও সংলাপের আয়োজন করতে হবে।

 ষষ্ঠ পর্ব: লাল ইটের দেয়ালে নতুনের কেতন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি বর্তমান সংকটের অধ্যায়টি কলঙ্কের। কিন্তু কার্জন হলের লাল ইটের দেয়ালগুলো জানে, কীভাবে ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠতে হয়। রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, আন্তোনিও গ্রামশি আর পাওলো ফ্রেইরির কাল্পনিক সংলাপ আমাদের যে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, তা হলো—সংস্কার ব্যতিরেকে কোনো প্রতিষ্ঠানের মুক্তি নেই। আর প্রকৃত সংস্কার করতে হলে অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটুর মতো নিবেদিতপ্রাণ, মেধাবী ও স্বাধীনচেতা শিক্ষাবিদদের অবদমন নয়, বরং তাঁদের যোগ্য আসনে বসাতে হবে। মব-সন্ত্রাসের অন্ধকার চাদর ফুঁড়ে আবার জেগে উঠুক আমাদের প্রিয় বিদ্যাপীঠ, আবার মুখরিত হোক জ্ঞানালোকের অবিনাশী সংলাপে—১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই হোক আমাদের দীপ্ত অঙ্গীকার। কিছুক্ষণ বিরতির পরে আবারো আলোচনা শুরু।

"বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানের ভান্ডার নয়, এটি একটি জাতির বিবেক।"—আলোচনা শুরু করেন সঞ্চালক ড. মাহবুব লিটু। তিনি তাঁর চার দার্শনিক অতিথিকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রশ্ন করেন—"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় তার মূল লক্ষ্য কী ছিল? আর আজ সেই লক্ষ্য কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে?"

পাওলো ফ্রেইরি তাঁর করুণ চোখে আলো ফেলে বললেন, "শিক্ষা এক ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা নয়, যেখানে শিক্ষক জমা দেন, আর শিক্ষার্থী নেয়। শিক্ষা হলো সমস্যাবোধক—যেখানে মানুষ নিজের জগৎকে বুঝতে শেখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সেই মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালির বিবেককে জাগ্রত করা, তাকে স্বাধীনতার স্বাদ দেওয়া। কিন্তু আমি দেখছি, আজ এখানকার শ্রেণিকক্ষে আগুন—শিক্ষকরা নিগৃহীত, শিক্ষার্থীরা অস্থির। এটা কোনো শিক্ষাঙ্গন নয়, এটি যুদ্ধক্ষেত্র।"

জন ডিউই মাথা নেড়ে বললেন, "আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা হলো জীবন, জীবনের প্রস্তুতি নয়। ১৯২১ সালে যখন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম—প্রতিটি ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মশাল। কিন্তু এখন মশাল নিভে যাচ্ছে। কারণ, যে প্রতিষ্ঠান বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার জন্য প্রতিষ্ঠিত, সেখানে আজ শিক্ষকদের ভিন্নমত প্রকাশ করলে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।"

রোজা লুক্সেমবার্গ, যিনি মুক্তি ও গণতন্ত্রের প্রবক্তা, বলেন, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত গৌরবময়। কিন্তু যে গৌরব আজ ধ্বংসের মুখে, সেটির জন্য দায়ী কেবল বাহ্যিক শক্তি নয়, দায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর দুর্বলতা। 'চার্চ ও রাষ্ট্র' বা 'শিক্ষা ও রাজনীতির' সম্পর্ক যেখানে এত ঘনিষ্ঠ যে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে ক্ষমতার লেজুড়বৃত্তিক প্রতিষ্ঠান, সেখানে মুক্তবুদ্ধি চর্চার আর অবকাশ থাকে না।"

ড. লিটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি জানেন, এই কথাগুলো শুধু তাত্ত্বিক নয়; এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংকটের আয়না। তিনি এগিয়ে গেলেন দ্বিতীয় প্রশ্নে।

সপ্তম পর্ব:: র‌্যাংকিংয়ের মরীচিকা ও অভ্যন্তরীণ ক্ষয়

"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল কাঠামোতে রয়েছে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও রাজনৈতিক প্রভাব। র‌্যাংকিংয়ের এই অবস্থা আপনারা কীভাবে দেখেন?"—প্রশ্নটি স্পষ্ট।

আন্তোনিও গ্রামশি তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি নিয়ে বলেন, "র‌্যাংকিং শুধু একটি সূচক নয়, এটি হেগেমোনির লড়াই। ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানের প্রযোজক, আর আমরা হয়ে যাই উপভোক্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে আজ অবহেলিত, সেটি বলতে বোঝায় যে তাঁরা নিজস্ব জ্ঞান-উৎপাদন ও গবেষণা সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।"

জন ডিউই যোগ করলেন, "গবেষণা শুধু কয়েকজন অধ্যাপকের ব্যক্তিগত তৎপরতা নয়; এটি একটি সংস্কৃতি। কিন্তু আপনি যখন শিক্ষকদের নিরাপত্তাহীন করে দেন, তাদের ভিন্নমত প্রকাশের জন্য শাস্তি দেন, তখন গবেষণা কোথায়? আপনি যদি শিক্ষকদের মূল্যায়নে রাজনৈতিক মানদণ্ড ব্যবহার করেন, তাহলে প্রতিভা উজ্জীবিত হয় না, দমিত হয়।"

সঞ্চালক ড. লিটু হালকা চোখে বললেন, "আমি নিজেও সম্প্রতি ক্যাম্পাসে এক বিতর্কিত পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছি। শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে 'জুলাই আন্দোলনের' নামে মব সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, যখন কোনো শিক্ষককে অমানবিকভাবে অপদস্থ করা হয়, তখন র‌্যাংকিং উন্নীত হবে কীভাবে? শিক্ষার্থীদের তো প্রথমে শেখানো উচিত, শিক্ষক হবেন তাঁদের বন্ধু ও পথপ্রদর্শক, শত্রু নয়।"

পাওলো ফ্রেইরি বলেন, "হ্যাঁ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ভঙ্গুর। যে সমাজে শিক্ষককে সন্ত্রাসের মুখে পড়তে হয়, সেখানে শিক্ষার আদর্শ নিহিত থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সংকট নয়; এটি পুরো সমাজের রোগ। যে সমাজ শিক্ষককে হারায়, সে সমাজ তার নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ভবিষ্যতকে ধ্বংস করে।"

এবার রোজা লুক্সেমবার্গ কঠোর হন। "আমি প্রশ্ন রাখতে চাই, র‌্যাংকিংয়ের জন্য আপনারা কতটা সাংগঠনিক সংস্কার আনছেন? শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ—এগুলো কি যথেষ্ট হচ্ছে? সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, গবেষণা খাতে বরাদ্দ নগণ্য। তবে আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সঞ্চালক ড. লিটু নিজে সেন্টেনিয়াল রিসার্চ গ্র্যান্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন, যা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু সেই উদ্যোগকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ স্বীকৃতি না দিয়ে উল্টো তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।"

ড. লিটু গম্ভীর হয়ে বলেন, "সত্যি বলতে, আমি নিজে এই প্রজেক্টের অংশ ছিলাম। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো নির্মাণের কথা বলেছিলাম, যা শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু কিছু মহল এসব উদ্যোগকে 'সন্দেহজনক' হিসেবে দেখেছে। অথচ আমরা সরকারের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কাজ করছিলাম। এই যে উদ্যোগকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা, প্রশাসনের বাধা—এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।"

অষ্টম পর্ব: আগুনের গ্রীষ্ম—২০২৪-এর কলঙ্ক

"এবার কথা বলি ২০২৪ সালের সেই ভয়াল আগস্টের কথা। অভ্যুত্থানের নামে শিক্ষাঙ্গনে যে অগ্নিসংযোগ হয়েছে, তা কীভাবে দেখছেন?"—সঞ্চালক প্রশ্নটি করেন। দার্শনিকদের মুখে তখন এক ধরনের হতাশা।

পাওলো ফ্রেইরি চোখ বন্ধ করেন। তারপর বলেন, "আমি লিখেছিলাম, 'দমন-পীড়িতদের শিক্ষা'—কিন্তু আজ দমন-পীড়িতেরা নিজেরাই দমনকারী হয়ে উঠেছে। যারা শিক্ষকের কাছে জ্ঞান নিতে আসে, তারা এখন শিক্ষককে জ্ঞানের রাহু বলে মনে করে। যে অগাস্টে তারা জয় উদযাপন করেছে, সেই অগাস্টেই তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ হাতছাড়া করেছে।"

তিনি তথ্য দিয়ে বলেন, "৩০০০ শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হয়েছে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গায়েবি শিক্ষক, কর্মচারী, এমনকি সাধারণ শিক্ষার্থীরাও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। এরা কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি হয়েছে।"

রোজা লুক্সেমবার্গ বলেন, "আমি সমাজতন্ত্রের কথা বলি, কিন্তু এই কাজটি সমাজতন্ত্র নয়, এটি সন্ত্রাস। 'মব জাস্টিস' নামে যে কু-সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে, এটি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। শিক্ষাঙ্গনে কোনো শিক্ষককে যদি অপমান করেই পদত্যাগ করানো হয়, তবে সেটি সাংগঠনিক অবক্ষয়ের নজির।"

জন ডিউই জানতে চান— "শিক্ষকরা কি আদৌ কোনো প্রতিবাদ করতে পেরেছেন? কোথায় ছিল প্রশাসন?"

ড. লিটু উত্তর দেন, "বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রশাসন নীরব ছিল। কেউ কেউ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদাসীন ছিলেন। আবার অনেকে চুপ থাকাটাকে 'বুদ্ধিমত্তা' ভাবছেন। কিন্তু একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমার মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বই ঝুঁকির মধ্যে পড়লে প্রশাসনকে সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। কিন্তু আমরা দেখি, উপাচার্য ও অন্যান্য কর্মকর্তারা যখন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, তখন শিক্ষকরা আরও বেশি অসহায় হন।"

আন্তোনিও গ্রামশি বলেন, "আমার 'হেগেমোনি' ধারণা অনুযায়ী, বুদ্ধিজীবীরা যখন নীরব থাকেন, তখন ক্ষমতাসীনরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য নিজেদের করে নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সম্প্রদায়কে যদি ইতিহাসের বিচারে দাঁড় করানো হয়, তাহলে তাঁরা কিন্তু অনেক বার দমনের মুখে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু এই ২০২৪-এর অগাস্টে তাঁরা দাঁড়াতে পারেননি। কারণ, বাইরের আঘাত যেমন ছিল, ভেতরে ছিল বিভাজন। শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক দলগত দ্বন্দ্ব এত তীব্র যে, তাঁরা একে অপরের বিরুদ্ধে চালিত হয়েছেন।"

ড. লিটু একটু থেমে বললেন, "এটি সত্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি দীর্ঘদিনের। ক্যাম্পাসে 'নীল দল' ও 'সাদা দল'—এই দলগত সংস্কৃতি শিক্ষাকে ধ্বংস করেছে। আজকের ঘটনায় কেবল বহিরাগত দুষ্কৃতীরা জড়িত ছিল না; কিছু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিজেরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চালিত হয়েছে।"

নবম পর্ব: নিগৃহীতের আত্মকথা, রাজনীতির বাঁধন

ফ্রেইরি গভীরভাবে বলেন, "আপনি যত বেশি শিক্ষককে নিগৃহীত করবেন, সমাজ তত বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হবে। যেমন, অধ্যাপক পলাশের কথা—যিনি 'মব জাস্টিস'-এর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি প্রতিবাদী হয়েছিলেন বলেই পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে কোনো সম্মান দেয়নি। এরকম অনেক শিক্ষক আছেন, যাঁরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করেও নীরব মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।"

জন ডিউই বললেন, "আমার কাছে শিক্ষা হলো গণতন্ত্রের স্কুল। কিন্তু যখন শিক্ষকরা ভয়ে থাকেন, কথা বলতে পারেন না, নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন না, তখন ওই স্কুলে গণতন্ত্র শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, শিক্ষকদের দমন করা একটি সমাজের ভবিষ্যৎকে দমন করার সমান।"

সঞ্চালক ড. লিটু প্রসঙ্গ তুললেন, "শিক্ষক নিগ্রহের এই ঘটনা শুধু একটি দিন বা মাসের ঘটনা নয়। আগস্টের তিন মাসে প্রায় ৩০০০ শিক্ষক পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক এখনও শূন্য পদে বসতে পারছেন না। তাঁদের অনেকে বেকার, অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। আর যে শিক্ষকরা রয়ে গেছেন, তাঁরা আতঙ্কে কাটাচ্ছেন দিন। গবেষণা, প্রকাশনা, পাঠদান—সবই স্তব্ধ।"

লুক্সেমবার্গ বলেন, "আমি দেখি, এখানে শুধু সন্ত্রাস নয়, রয়েছে শ্রেণি-বৈষম্য, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু শিক্ষকদের লক্ষ্যবস্তু করা। যেমন ৪৯ জন সংখ্যালঘু শিক্ষককে বিশেষভাবে পদত্যাগ করানো হয়েছে। বরিশালের প্রণয় কান্ত অধিকারী শিক্ষকের ওপর হামলার কথা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বরখাস্তের ঘটনা—এগুলো আর গোপন নেই।"

ড. লিটু বলেন, "এর প্রতি আমাদের প্রতিবাদ ছিল, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। সংবাদমাধ্যমে এসেছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান ছিল না। বরং অনেকে এই ঘটনাকে 'ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া' বলে প্রচার করেছেন। অথচ এটি কোনো স্বাভাবিকতা নয়, এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য লজ্জার।"

ফ্রেইরি শুনে বলেন, "যারা শিক্ষকের চোখের সামনে ভয় দেখায়, তারা আসলে শিক্ষকদের ভেতরের সত্তাকে হত্যা করে। এবং তারপর সেই সত্তার জায়গায় আসে নীরবতা। নীরব শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা শেখে নীরবতা, শেখে আত্মসমর্পণ।"

দশম পর্ব: জন ডিউইয়ের ডাকে—শিক্ষার সংস্কার এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য

জন ডিউই এবার সরাসরি সঞ্চালককে বলেন, "ড. লিটু, আপনি যেহেতু একজন শিক্ষাবিদ, তাই আপনাকে জিজ্ঞেস করছি—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন কী পথ নেবে? শতবর্ষ উদযাপনের সময় কি কেবল ফুলেল আয়োজন করবে, নাকি আত্মসমালোচনা করবে?"

ড. লিটু উত্তর দেন, "প্রশাসন ও বর্তমান শিক্ষানীতির কাঠামোতে সংস্কার জরুরি। কিন্তু সংস্কার বলতে আমি বুঝি কেবল কারিকুলাম পরিবর্তন নয়; আমি বুঝি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে আস্থা প্রতিষ্ঠা, শিক্ষকদের মূল্যায়নে রাজনৈতিক প্রভাব নির্মূল, বিশ্ববিদ্যালয়কে সন্ত্রাস-মুক্ত রাখার আইনি কাঠামো তৈরি, এবং গবেষণাকে উৎসাহিত করা।"

ডিউই বলেন, "শিক্ষকদের মানসিক সহায়তা দরকার। যাঁরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের কাউন্সেলিং ও থেরাপি প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মনোবিজ্ঞান কেন্দ্র থাকতে পারে, যা শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করবে। এটা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বাস্তব প্রয়োজন।"

গ্রামশি বলেন, "সংস্কারের আরেকটি স্তর হলো—সাংস্কৃতিক আধিপত্য। আপনাদের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে পুনরায় সক্রিয় হতে হবে। প্রকাশনা, সেমিনার, আলোচনা—এসবের মাধ্যমে একটি বিকল্প বক্তব্য তৈরি করতে হবে। যে বক্তব্য শিক্ষক নিগ্রহের বিরুদ্ধে, যে বক্তব্য মুক্তবুদ্ধির পক্ষে।"

সঞ্চালক ড. লিটু বলেন, "এই মুহূর্তে শিক্ষকদের ঐক্য খুব জরুরি। তাঁরা যদি বিচ্ছিন্ন থাকেন, তাঁদের প্রতিটি কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে যায়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক, সমাজ, সাংবাদিক—সবার ভূমিকা রয়েছে।"

একাদশ পর্ব: সঞ্চালকের ভূমিকা, অদেখা ষড়যন্ত্র ও স্বীকৃতিহীনতা

আলোচনার মাঝে লুক্সেমবার্গ হঠাৎ প্রশ্ন করেন, "ড. লিটু, আপনি এই আলোচনার সঞ্চালক, কিন্তু আপনার ভূমিকা ও আপনার উপেক্ষার বিষয়েও জানতে চাই। আপনিও কি কোনোভাবে নিগৃহীত হয়েছেন?"

ড. লিটু একটু হেসে বলেন, "আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনও শারীরিক হামলার শিকার হইনি। কিন্তু হ্যাঁ, প্রশাসনিক ও একাডেমিক ক্ষেত্রে আমাকে অনেক বাধা দিতে দেখা গেছে। যেমন সেন্টেনিয়াল রিসার্চ গ্র্যান্টের প্রকল্পটি আমরা অনেক কষ্টে পেয়েছিলাম, কিন্তু তার বাস্তবায়নে প্রশাসন তেমন আগ্রহ দেখায়নি। আবার আমার মতামত প্রকাশের জন্যও অনেক সময় আমাকে নানা দিক থেকে অস্বস্তিতে ফেলা হয়েছে।"

তিনি বলেন, "আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে কিছু প্রস্তাব দিয়েছিলাম—শিক্ষক প্রশিক্ষণ (FCTL), ডিজিটাল অবকাঠামো, গবেষণা নীতিমালা। কিন্তু এর বেশিরভাগই যথাযথ মূল্যায়ন পায়নি। এই সংস্কৃতি আমাদের সবার জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনছে।"

গ্রামশি বললেন, "হেজিমোনি বোঝার জন্য আপনাকে বুঝতে হবে, কারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর কারা নেয় না। ক্যাম্পাসে কে আসল কর্তা—উপাচার্য, প্রশাসক, না শিক্ষক-শিক্ষার্থী? আমরা যদি আধিপত্যের এই প্রশ্ন না করি, সংস্কার সম্ভব নয়।"

ড. লিটু বলেন, "শিক্ষকদের প্রশাসনে আরও বেশি প্রতিনিধিত্ব থাকা জরুরি। বিভিন্ন বোর্ড, কমিটিতে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। কিন্তু সেটি তখনই কার্যকর হবে, যখন শিক্ষকেরা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে পেশাদারিত্বে বিশ্বাসী হবেন।"

ফ্রেইরি বলেন, "এই যে শিক্ষকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও তাঁদের পেশাগত নিরাপত্তা—এটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের ও প্রশাসনের দায়িত্ব। যদি একজন শিক্ষক ভয় পান যে তাঁর মতামতের জন্য তাঁকে হয়রানি করা হবে, তবে তিনি আর মুক্ত মনে শিক্ষা দিতে পারেন না।"

দ্বাদশ পর্ব: বর্তমানে চিত্র, উত্তোরণের সন্ধান

বর্তমান প্রসঙ্গে আলোচনা ঘুরিয়ে ফ্রেইরি প্রশ্ন করেন, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের দিনে শুধু শিক্ষক নিগ্রহ নয়, সাধারণ শিক্ষার্থীরাও নিরাপত্তাহীন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান কোথায় যেন অন্য মোড় নিয়েছে। এখন ক্যাম্পাসের চিত্র কী?"

ড. লিটু বলেন, "বাস্তবতা হলো, বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা অনেক সময় সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ। আমরা দেখেছি, হলের নিরাপত্তা, ক্যাম্পাসের আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষার্থীদের মেন্টাল হেলথ—এসব বিষয়ে টেকসই কোনো উদ্যোগ নেই। শিক্ষার্থীরা যখন অস্থির, তখন প্রশাসন শক্ত হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করে বরং দুর্বলতা দেখায়।"

ডিউই বলেন, "আমি মনে করি, সংকট থেকে উত্তোরণের প্রথম শর্ত হলো শান্তি ও সংলাপ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী-প্রশাসন—এই ত্রিভুজের মধ্যে ন্যূনতম বিশ্বাস তৈরি না হলে কোনো উদ্যোগই সফল হবে না। ইতিমধ্যে যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁদের জন্য পুনর্বাসন কর্মসূচি জরুরি।"

তিনি আরও বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং উন্নয়নের জন্য গবেষণায় বিনিয়োগ, শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানো, ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি—এসব প্রয়োজন। কিন্তু এর আগে দরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।"

লুক্সেমবার্গ বলেন, "শিক্ষাঙ্গনের গণতন্ত্রকরণ খুবই জরুরি। যখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারে, তখন তারা প্রতিষ্ঠানকে নিজের করে নেয়। আর যদি তারা প্রতিষ্ঠানকে নিজের না মানে, তবে তারা তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু উপাচার্যের নয়—এটা প্রতিটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দায়িত্ব।"

ড. লিটু বলেন, "আমি সম্প্রতি কয়েকটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। তাঁরা গবেষণা অবকাঠামো, শিক্ষক মূল্যায়ন ও শৃঙ্খলা নিয়ে কাজ করছেন। যেমন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। আমাদের আরও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাড়াতে হবে, বিশেষ করে গবেষণায়।"

গ্রামশি শেষ প্রশ্নে বলেন, "সংকট উত্তরণের পথ সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভব নয়। শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা, শিক্ষার্থীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন—এই তিন স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনর্গঠন করতে হবে। আর হ্যাঁ, স্বীকৃতি—যাঁরা ভালো কাজ করেন, তাঁদের সম্মান জানানো উচিত। এটা সংস্কৃতির অংশ।"

 ত্রয়োদশ পর্ব: স্বীকৃতিহীনতার সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ড. লিটু বলেন, "আমি স্বীকৃতির কথা বলতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশে যাঁরা অবদান রাখেন, তাঁদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া অনেক জায়গায় হয় না। আবার কারও কারও অবদান ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়। যেমন আমি যে প্রকল্পটি করেছি, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে গর্বিত করার মতো ছিল, কিন্তু উল্টো প্রশাসন আমার ওপর নানা বাধা আরোপ করে।"

"আমার ধারণা, স্বীকৃতিহীনতার এই সংস্কৃতি শিক্ষকদের মনোবল ভাঙে। অথচ ইতিহাস দেখায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অবদান রয়েছে। সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।"

ডিউই বলেন, "আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষাব্যবস্থায় স্বীকৃতি একটি শক্তিশালী প্রেরণা। কিন্তু স্বীকৃতি যখন অযাচিতভাবে বঞ্চিত হয়, তখন সেটি হতাশার জন্ম দেয়। আমি আপনার প্রতি সংহতি জানাই, ড. লিটু।"

ফ্রেইরি বলেন, "শিক্ষকদের পেশাগত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক মূল্যায়নের পরিবর্তে গবেষণা ও শিক্ষাদানের মানদণ্ডে শিক্ষকদের বিচার করতে হবে।"

লুক্সেমবার্গ বলেন, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অবশ্যই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে পশ্চিমা র‌্যাংকিংয়ের পেছনে ছুটতে হবে; বরং নিজস্ব মান ও মাপকাঠি তৈরি করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।"

 চতুর্দশ পর্ব: অগ্নি থেকে আলোর পথ

আলোচনার এক পর্যায়ে সঞ্চালক ড. লিটু সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, "আমাদের আলোচনা এখানেই শেষ করছি। আশা করি, এই কঠিন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যিকারের বন্ধুরা কাজ করবেন। আগামীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে অগ্নিস্নাত, কিন্তু ধ্বংসের ছাই থেকেই নতুন সৃষ্টি জন্মায়।"

পাওলো ফ্রেইরি বলেন, "আমার শেষ কথা: শিক্ষকরা যখন নিরাপদ হবেন, শিক্ষার্থীরা যখন প্রশ্ন করতে পারবে, প্রশাসন যখন স্বচ্ছ হবে—তখনই এই বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থে একটি বিশ্ববিদ্যালয় হবে। আর এখনও সময় আছে।"

রোজা লুক্সেমবার্গ বলেন, "আমি মুক্তির স্বপ্ন দেখি—শিক্ষকের মুক্তি, শিক্ষার্থীর মুক্তি, আর বাঙালির মুক্তি। এই মুক্তি ফিরিয়ে আনতে সংগ্রাম করতে হবে। এই সংগ্রাম কেবল রাজপথে নয়, ক্যাম্পাসের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে, প্রতিটি গ্রন্থাগারে, প্রতিটি গবেষণাগারে।"

জন ডিউই বলেন, "শিক্ষা কখনও শেষ হয় না। আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী—আমরা সবাই একসাথে এগিয়ে যেতে পারি। সংকটকে পুঁজি করে নতুন পথ তৈরি করতে হবে।"

আন্তোনিও গ্রামশি বলেন, "আমার শেষ বক্তব্য: যে জাতি তার শিক্ষকদের সম্মান দেয়, সেই জাতি ইতিহাসে টিকে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাস তার শিক্ষকদের গৌরবের ইতিহাস। আগামীর ইতিহাসও যেন শিক্ষকদের গৌরবের হয়—সেটা নিশ্চিত করাটা সবার কর্তব্য।"

ড. লিটু শেষ বলেন, "আমার বিশ্বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সত্যি সত্যিই ফিরে পাবে তার অতীত ঐতিহ্য। সেই দার্শনিক স্বপ্ন যেখানে বাঙালি জাতি তার নিজস্ব উচ্চশিক্ষায় উদ্ভাসিত হবে, যেখানে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থাকবে না, যেখানে মুক্তবুদ্ধি চর্চা হবে, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থা ও ভালোবাসা থাকবে। সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম।"

 শেষ কথা: বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ। ১০৫ বছর পেরিয়ে গেলেও, আজকে এই প্রতিষ্ঠান যে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি, তা কখনও উপেক্ষণীয় নয়। শিক্ষক নিগ্রহ, রাজনৈতিক প্রভাব, 'মব সন্ত্রাস', বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিংয়ের পতন—এসব যেন স্মৃতির পর্দায় এক গ্লানি ছড়ায়। কিন্তু গ্লানির মাঝেও আলোর রেখা দেখা যায়—যেখানে কিছু মানুষ নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে, উন্নত করতে, বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে।

আগামীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সবার চেষ্টার ফসল। সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি আমাদের প্রত্যেকের অংশ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী, অভিভাবক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী—সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে। রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, গ্রামশি, ফ্রেইরি—এই দার্শনিকদের চিন্তা যদি আমরা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারি, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একদিন আবারও সারা বিশ্বের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। সেই দিন আসুক, সেই আলো ফুটুক।

পরিশিষ্ট: ক্লান্তিহীন শতবর্ষের দর্পণে কালান্তরের হাহাকার

 জ্ঞানালোকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি আজ মব-সন্ত্রাস ও লেজুরবৃত্তির চিতাভস্মে ম্রিয়মাণ?

 ১. উপক্রমণিকা: শতবর্ষের আঙিনায় দাঁড়িয়ে এক বিষণ্ণ আরতি

বৈশাখের তপ্ত রৌদ্র পেরিয়ে শ্রাবণের মেঘপুঞ্জ যখন মেঘনা-পদ্মার অববাহিকা ছুঁয়ে বুড়িগঙ্গার তীরে এসে আছড়ে পড়ে, তখন কার্জন হলের লাল ইটের দেয়ালে দেয়ালে যেন শতাব্দীর প্রাচীন কোনো দীর্ঘশ্বাস প্রতিধ্বনিত হয়। ১৯২১ সালের সেই রৌদ্রোজ্জ্বল ১লা জুলাই থেকে ২০২৬ সালের এই ধূসর ক্ষণ—দীর্ঘ একশত পাঁচ বছরের এক সুবিশাল মহাকাব্যিক পথচলা। যে আঙিনা একদিন জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, সত্যেন্দ্রনাথ বসু কিংবা আর সি মজুমদারের পদচারণায় মুখরিত ছিল, যে প্রাঙ্গণের ঘাসে ঘাসে লেপ্টে আছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী রক্তিম আলপনা; সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ তার ১০৫তম জন্মতিথিতে দাঁড়িয়ে আনন্দাশ্রুর চেয়ে বেদনার জলছবিই বেশি আঁকছে।

একবিংশ শতাব্দীর এই কাললগ্নে এসে আমাদের হৃদয়ে এক গভীর প্রশ্নের উদয় হয়—শিক্ষা কি কেবলই সনদের কারখানায় রূপান্তরিত হয়েছে, নাকি তা মানুষের আত্মিক মুক্তির অনন্ত সোপান? সমকালের দর্পণে যখন আমরা তাকাই, তখন এক ভয়াল রূপ দৃশ্যমান হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে যে অভূতপূর্ব অস্থিরতা, মব-সন্ত্রাস আর শিক্ষক নিগ্রহের কালো মেঘ পুঞ্জীভূত হয়েছে, তা মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্রের ভিত্তিমূলকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এই মহাসংকটের মুহূর্তে, ঐতিহাসিক সত্যকে উন্মোচন করতে এবং আগামীর মুক্তির পথনকশা তৈরি করতে 'অধিকারপত্র স্টুডিও' আয়োজন করেছে এক অভূতপূর্ব কাল্পনিক মহোত্তম গোলটেবিল বৈঠক।

স্টুডিওর মৃদু আলোয়, চারপাশের স্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে উপবিষ্ট আছেন শিক্ষাতত্ত্ব ও সমাজ-দর্শনের চার দিকপাল। প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের কারিগর, অধিকারপত্রের উপদেষ্টা সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটুর সুনিপুণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সঞ্চালনায় এই চার বিশ্বখ্যাত চিন্তাবিদ—জার্মান মার্ক্সবাদী বিপ্লবী রোজা লুক্সেমবার্গ, আমেরিকার প্রগতিশীল শিক্ষাদর্শনক জন ডিউই, ইতালীয় সংস্কৃতি ও হেজিমনি তত্ত্বের জনক আন্তোনিও গ্রামশি এবং ব্রাজিলের মুক্তিকামী শিক্ষার প্রবক্তা পাওলো ফ্রেইরি—একত্রে বসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত, বর্তমান ও অনাগত ভবিষ্যৎকে ব্যবচ্ছেদ করতে। সাহিত্যধর্মী, ছন্দময় গদ্যের এ এক অনন্য তাত্ত্বিক মহাকাব্য।

 ২. কাল্পনিক মহোত্তম গোলটেবিল সংলাপ: তত্ত্ব ও বাস্তবের মেলবন্ধন

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু (সঞ্চালক): শ্রদ্ধেয় সুধী ও বিশ্বজ্ঞানের আলোকবর্তিকা বহনকারী দার্শনিকবৃন্দ, অধিকারপত্র স্টুডিওর পক্ষ থেকে আপনাদের জানাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন। আজ আমরা এমন এক ক্ষণে সমবেত হয়েছি, যখন আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে। কিন্তু এই উদযাপন আনন্দের নয়, এ যেন এক গভীর আত্মানুসন্ধান ও বেদনার আরতি। ১৯২১ সালে যখন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববঙ্গের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মাঝে জ্ঞানালোকের বিস্তার ঘটানো এবং একটি সুশিক্ষিত, প্রগতিশীল নেতৃত্ব তৈরি করা। আজ শতবর্ষ পার করে আমরা একবিংশ শতাব্দীর গভীর সংকটের চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে আছি। সাম্প্রতিক বাজেট অধিবেশনে আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটে গবেষণার অংশ প্রায় ০%-এর কাছাকাছি! অথচ এই অবিশ্বাস্য দৈন্যের মধ্যেও বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান কিন্তু একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

কিউএস (QS) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং ২০২৭ অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থান ৬০৪ এবং এশিয়ায় ১৩২তম। টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) ২০২৬ অনুযায়ী আমরা ৮০১-১০০০ ক্যাটাগরিতে আছি। সিডব্লিউআর (CWUR) অনুযায়ী অবস্থান ১৫০৭ এবং ইউএস নিউজ (US News) অনুযায়ী ৬৭৩। আমি আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই—যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার প্রাণ স্তব্ধ করে রাখা হয়, যেখানে শিক্ষকেরা প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক ও কাঠামোগত নিপীড়নের শিকার হন, তার এই অস্তিত্বের লড়াইকে আপনারা কীভাবে দেখেন? জন ডিউই, আপনার প্রগতিশীল শিক্ষাতত্ত্বের আলোকেই না হয় আলোচনা শুরু হোক।

জন ডিউই: ধন্যবাদ ড. মাহবুব লিটু। আপনার সঞ্চালনা এবং আপনার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি এই গভীর আকুলতা আমাকে স্পর্শ করেছে। আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, "Education is not preparation for life; education is life itself." বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, এটি সমাজেরই একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস যখন আমি পাঠ করি, তখন দেখি এটি ছিল একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ফসল। কিন্তু বর্তমান যুগে আপনারা যখন 'র‍্যাংকিং'-এর সংখ্যাতাত্ত্বিক বেড়াজালে আটকে পড়েন, তখন আমার কিছুটা সংশয় হয়। সংখ্যার এই খেলা প্রায়শই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়।

গবেষণার বাজেট প্রায় ০% রাখা সত্ত্বেও শিক্ষকেরা যে নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় টিকিয়ে রেখেছেন, তা প্রশংসনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী। শিক্ষা যদি একটি সমাজকে গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও চিন্তাশীল করে তুলতে না পারে, তবে সেই শিক্ষার র‍্যাংকিং দিয়ে কী হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হলো শিক্ষার্থীর মধ্যে 'Critical Inquiry' বা সমালোচনামূলক অনুসন্ধিৎসা তৈরি করা। যখন একটি সমাজ তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মুক্তচিন্তাকে অবদমিত করে, তখন শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে।

রোজা লুক্সেমবার্গ: ডিউই-র কথার সূত্র ধরেই আমি বলতে চাই, তবে কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। ড. লিটু, আপনি যে র‍্যাংকিংয়ের কথা বলছেন, তা আসলে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি নয়া-উদারবাদী (Neo-liberal) হাতিয়ার। এই র‍্যাংকিং পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের করপোরেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে তৈরি, যা তৃতীয় বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। আসল সত্যটা হলো, গবেষণা বাজেট ০% রাখা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি শাসকশ্রেণীর একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তারা চায় না একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা মুক্ত ও স্বাধীন চিন্তার অধিকারী হোক। কারণ, স্বাধীন চিন্তা সবসময়ই প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রশক্তি ও শোষকশ্রেণীর ভিত কাঁপিয়ে দেয়। "Freedom is always and exclusively freedom for the one who thinks differently." ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল ঔপনিবেশিক কাঠামোর ভেতরে এক টুকরো স্বাধিকারের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু আজ যখন আমি শুনি যে সেখানে ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নেই, উল্টো তাদের 'ভিকটিমাইজড' করা হচ্ছে, তখন আমার রক্ত টগবগ করে ওঠে। শৃঙ্খল ভাঙার গান যারা গাইবে, তারা নিজেই আজ শৃঙ্খলিত!

আন্তোনিও গ্রামশি: রোজা ঠিকই ধরেছেন। এখানে আমাদের 'সাংস্কৃতিক আধিপত্য' বা 'Cultural Hegemony'-র তত্ত্বটি বুঝতে হবে। শাসকশ্রেণী কেবল পুলিশ বা লাঠি দিয়ে শাসন করে না, তারা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সমাজকে শাসন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক 'হেজিমনি' বা আধিপত্য ভাঙার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ১৯৫২ কিংবা ১৯৭১ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে পাল্টা-হেজিমনি (Counter-hegemony) তৈরি করেছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা কী দেখছি? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজ চরম 'রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি' প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। শিক্ষকেরা যখন সত্যের সন্ধান ছেড়ে ক্ষমতার চাটুকারিতায় লিপ্ত হন, যখন তারা স্বাধীন বুদ্ধিজীবী (Organic Intellectual) না হয়ে শাসকদলের তল্পিবাহক বা 'Traditional Intellectual'-এ পরিণত হন, তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের পতন ঘটে।

ড. লিটু, আমি আপনার লেখা ও কাজের সাথে পরিচিত। আপনি শতবর্ষ উদযাপনের সময় যে সুদূরপ্রসারী উদ্যোগগুলো নিয়েছিলেন—যেমন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য 'এফসিটিএল' (FCTL) বা 'Foundation Certificate in University Teaching Learning' প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক মূল্যায়ন কৌশল প্রণয়ন, কিংবা গবেষণার এথিক্স কমিটি ও ফিল্ডওয়ার্ক নীতিমালা তৈরি—এগুলো ছিল মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্টার-হেজিমনি তৈরির প্রয়াস। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই ব্যবস্থার ভেতরে থাকা সুবিধাভোগী ও লেজুরবৃত্তিক গোষ্ঠী আপনার সেই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো আপনাকে অপদস্থ করার এক জঘন্য সংস্কৃতি চালু করেছে। এটি অত্যন্ত চেনা একটি ফ্যাসিবাদের লক্ষণ।

পাওলো ফ্রেইরি: গ্রামশির কথার রেশ ধরে আমি বলব, ড. মাহবুব লিটুর সাথে যা ঘটেছে, তা হলো 'Oppressor' বা নিপীড়কের চিরায়ত মনস্তত্ত্ব। নিপীড়ক গোষ্ঠী কখনো প্রকৃত সংস্কারককে সহ্য করতে পারে না। কারণ সংস্কার মানেই হলো অন্ধকারের দেয়াল ভেঙে আলোর প্রবেশ ঘটানো। আমি আমার 'Pedagogy of the Oppressed' গ্রন্থে বলেছিলাম, শিক্ষা কখনো নিরপেক্ষ হতে পারে না; এটি হয় মানুষকে মুক্ত করার হাতিয়ার, নয়তো তাকে দাস বানানোর শৃঙ্খল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাসে ড. লিটু যে 'FCTL' চালু করেছিলেন (যার নামকরণও তাঁরই দেওয়া), তা ছিল শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতিকে আধুনিক ও মানবিক করার একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। শিক্ষকেরা যদি নিজেরাই প্রশিক্ষিত ও স্বাধীন না হন, তবে তারা শিক্ষার্থীদের কীভাবে মুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন?

কিন্তু আজ বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে যে 'মব সন্ত্রাস' বা গণ-আদালতের নামে উন্মাদনা আমরা দেখছি, তা শিক্ষার মূল চেতনাকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে যেভাবে ৩ হাজারের বেশি শিক্ষক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, জোরপূর্বক পদত্যাগ করাতে বাধ্য করা হয়েছে, তা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরায় কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে, তখন বুঝতে হবে সমাজটি একটি গভীর নৈতিক অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। একে শিক্ষা বলা যায় না, এ হলো 'Banking Education'-এর চূড়ান্ত বিকৃতি, যেখানে সংলাপের কোনো স্থান নেই, আছে কেবল হিংসা আর প্রতিশোধের লেলিহান শিখা।

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু (সঞ্চালক): আপনাদের এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমার ভেতরের ক্ষতকে যেন আরও স্পষ্ট করে তুলল। হ্যাঁ, সত্য কথা বলতে কী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের প্রশাসনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আমি গর্বিত ছিলাম। আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম একটি আন্তর্জাতিক মানের 'Educational Ecosystem' বা শিক্ষাগত বাস্তুতন্ত্র তৈরি করার। যেখানে শিক্ষকেরা আন্তর্জাতিক জার্নালে যৌথ প্রকাশনা করবেন, বৈশ্বিক গবেষণা তহবিলে প্রবেশাধিকার পাবেন। এই লক্ষ্যেই আমি দিনরাত পরিশ্রম করে 'ভিশন এবং মিশন স্টেটমেন্ট' তৈরি করেছিলাম, যা সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলে পাস হয়েছিল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঢাবির 'মাস্টার প্ল্যান' এবং 'একাডেমিক উন্নয়ন ও স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান' প্রণীত হয়েছিল আমার হাত ধরে।

আমরা শতবর্ষ উপলক্ষে শিক্ষকদের গবেষণা বাড়াতে 'Centennial Research Grant' (CRG) চালু করেছিলাম, যার অধীনে আমার নেতৃত্বে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকল্প 'Accessibility and Inclusion for Students with Disabilities: Transforming University of Dhaka aligning with Sustainable Development Goals' সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং তার আলোকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিশেষ প্রতিবন্ধী নীতিমালার খসড়া তৈরি হয়। অথচ আজ যখন ফিরে তাকাই, দেখি সেই প্রশাসন, সেই শিক্ষাঙ্গন আজ মব জাস্টিসের আখড়া। যারা কোনোদিন একটি লাইন গবেষণা করেনি, যারা কেবল রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি করে পদ-পদবি পেয়েছে, তারা আজ সর্বেসর্বা। আর আমাদের মতো স্বাধীন গবেষকদের ভাগ্যে জোটে অপদস্থতা ও ভিকটিমাইজেশন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর যে আগুন বাংলার শ্রেণিকক্ষে পুড়েছে, তা নিয়ে আপনাদের মন্তব্য কী?

রোজা লুক্সেমবার্গ: ড. লিটু, আপনার এই লড়াইকে আমি স্যালুট জানাই। আপনি যে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন, তা-ই তো আসল বিপ্লব। কিন্তু মনে রাখবেন, বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল সমাজব্যবস্থা সবসময়ই প্রকৃত প্রগতিশীলদের ভিকটিমাইজ করে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে যে গণঅভ্যুত্থান হলো, তা ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই বিপ্লবের ফসল চুরি করে নিয়েছে একদল সুবিধাবাদী 'মব' বা উগ্র জনতা। তারা বিপ্লবের নাম করে শিক্ষাঙ্গনে নতুন ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে। ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের কোনো নিরাপত্তা নেই। প্রশাসন নিজেই আজ মেরুদণ্ডহীন। তারা মবদের তুষ্ট করতে ব্যস্ত। কোনো তদন্ত ছাড়া, কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানো হচ্ছে। এটি আসলে 'ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিরই' আরেকটি রূপান্তর। এক স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে যদি আমরা আরেক উগ্র মব-তন্ত্রের জন্ম দিই, তবে তাকে মুক্তি বলা যায় না। বাংলার শ্রেণিকক্ষে আজ যে আগুন জ্বলছে, তা আসলে মুক্তচিন্তার চিতাভস্ম।

জন ডিউই: একদম ঠিক। যেখানে আইনি প্রক্রিয়া বা 'Due Process' লঙ্ঘিত হয়, সেখানে গণতন্ত্র বাঁচতে পারে না। ১৯৭৩ সালের 'Dhaka University Ordinance' বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ তো আমি পড়েছি। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে। উপাচার্য বা সিন্ডিকেট মবদের চাপের মুখে এভাবে নতিস্বীকার করতে পারেন না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া প্রশাসনের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু আজ যখন প্রশাসন নিজেই ভিকটিমদের রক্ষা না করে নিপীড়কদের সহযোগী হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা সংকটের মুখে পড়ে। মব জাস্টিস কখনো জাস্টিস বা ন্যায়বিচার হতে পারে না; এটি হলো নৈরাজ্য। এই নৈরাজ্য বন্ধ না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনোদিন বৈশ্বিক স্তরে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে না।

আন্তোনিও গ্রামশি: এখানেই আমাদের বুঝতে হবে যে, এই মব সন্ত্রাস আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি হলো সমাজে সুদীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা 'অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতির' ফসল। যখনই কোনো দেশে বড় political পরিবর্তন ঘটে, তখনই একটি শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়। শিক্ষকেরা আজ এতটাই বিভক্ত যে এক দল শিক্ষক যখন লাঞ্ছিত হন, অন্য দল শিক্ষক তখন নীরব থাকেন বা আনন্দ পান। এই যে শিক্ষকদের নৈতিক স্খলন ও সংহতির অভাব, এটাই মবদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। ড. লিটু, আপনার তৈরি FCTL বা শিক্ষক মূল্যায়ন কৌশল যদি সঠিকভাবে কার্যকর থাকত, তবে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা থাকত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কাছে, কোনো উগ্র মবের কাছে নয়। কিন্তু রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তির কারণে শিক্ষকেরা নিজেরাই নিজেদের মর্যাদা ধূলিসাৎ করেছেন।

পাওলো ফ্রেইরি: এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কিন্তু আমাদেরই খুঁজতে হবে। সংলাপই (Dialogue) হলো মুক্তির একমাত্র পথ। কিন্তু সংলাপ হতে হবে সমতার ভিত্তিতে। আজ যে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের পদত্যাগ করাচ্ছে, তারা আসলে শোষকের মনস্তত্ত্বই ধারণ করছে। "The oppressed, instead of striving for liberation, tend themselves to become oppressors." এই চক্র ভাঙতে হবে। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক স্তরে আরও শক্ত অবস্থান তৈরিতে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। ড. লিটু, আপনি যে মাস্টার প্ল্যান এবং একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান তৈরি করেছিলেন, সেটিকে ডাস্টবিন থেকে তুলে এনে আলোর মুখ দেখাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করতে হবে লেজুরবৃত্তিক রাজনীতি থেকে।

 ৩. কলঙ্কের কালো অধ্যায়: ৫ আগস্ট পরবর্তী শিক্ষক নিগ্রহের করুণ আখ্যান

গোলটেবিল সংলাপের সেই তাত্ত্বিক আলোচনার গভীরতা যখন আমাদের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, তখন অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মোড় হলেও, এর পরবর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনে যে অন্ধকার নেমে এসেছে, তা নজিরবিহীন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন (যেমন বাংলাদেশ টাইমস, সমকাল, মানবকথা ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল) অনুযায়ী, আগস্ট-পরবর্তী মাত্র কয়েক মাসে সারা দেশে ৩ হাজারের বেশি শিক্ষক মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত এই নিগ্রহের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।

যে শিক্ষকের হাত ধরে বাঙালি প্রথম বর্ণমালা চিনেছিল, যাঁর জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত হয়ে তরুণ সমাজ দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে, সেই শিক্ষকদের কান ধরে উঠ-বস করানো, শারীরিক লাঞ্ছনা, এবং জোরপূর্বক সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি কেবল কোনো ব্যক্তির লাঞ্ছনা নয়, এটি সমগ্র শিক্ষকতা পেশার এবং একটি জাতির মেরুদণ্ডের ওপর কুঠারাঘাত। ইউনেস্কোর ২০২৪ সালের গ্লোবাল রিপোর্ট অন টিচার্স (Global Report on Teachers)-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, শিক্ষকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হলে তা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে। বাংলাদেশে আজ ঠিক সেই ট্র্যাজেডিই ঘটছে। সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি শিক্ষক আজ শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারছেন না এক অজানা আতঙ্কে।

 ৪. স্বায়ত্তশাসনের অমর্যাদা ও ভিকটিমাইজেশনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় ঐতিহাসিক 'The Dhaka University Order, 1973' বা ১৯৭৩ সালের অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত এই অর্ডিন্যান্সের মূল ভিত্তিই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, সিন্ডিকেট ও ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বর্তমান প্রশাসন এই ঐতিহাসিক আইনি দলিলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মব জাস্টিসের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত উন্নয়নে, আন্তর্জাতিকীকরণে এবং শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তনে আজীবন অবদান রেখেছেন, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি ভিকটিমাইজেশনের শিকার। অধিকারপত্র স্টুডিওর উপদেষ্টা সম্পাদক ও ঢাবি ফ্যাকাল্টি অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটুর উদাহরণটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শতবর্ষ উদযাপন কমিটির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন, তা আজ ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মেধা ও শ্রমে তৈরি হওয়া 'এফসিটিএল' (FCTL) আজ অবহেলিত। যে মানুষটি ঢাবির ইতিহাসে প্রথম একাডেমিক উন্নয়ন ও স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান উপহার দিলেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক মানের সিআরজি (CRG) গবেষণা সম্পন্ন করে বিশেষ নীতিমালা তৈরি করলেন, তাঁকে উপযুক্ত সম্মান ও স্বীকৃতি না দিয়ে উল্টো প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক নোংরামির মাধ্যমে অপদস্থ করার অপসংস্কৃতি প্রবর্তন করা হয়েছে। ভিন্নমতাবলম্বী হওয়ার কারণে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক চরিত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 ৫. সংকট থেকে উত্তরণ: বৈশ্বিক স্তরে ঢাবির শক্ত অবস্থান তৈরিতে করণীয় ও আগামীর পথচলা

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে যারা পথ চলে, তারাই টিকে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি তার গৌরবময় অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হয় এবং বৈশ্বিক মানচিত্রে একটি শক্ত মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে হয়, তবে এই মুহূর্তে এক আমূল ও বৈপ্লবিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। অধিকারপত্র স্টুডিওর এই ঐতিহাসিক সংলাপ থেকে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে আগামীর পথচলার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ১০ দফা অ্যাকশন প্ল্যান বা ব্লু-প্রিন্ট প্রস্তাব করা হলো:

  • ১. মব জাস্টিসের অবসান ও আইনি প্রক্রিয়ার পুনর্বহাল: বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের মব জাস্টিস, উগ্র উন্মাদনা এবং জোরপূর্বক পদত্যাগের সংস্কৃতিকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। ১৯৭৩ সালের অর্ডিন্যান্সের ধারাগুলোকে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করে সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা কেবল ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে তদন্ত সাপেক্ষে বিচার করা যাবে, রাস্তার মবদের দ্বারা নয়।
  • ২. ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তা ও ভিকটিমাইজেশন বন্ধ করা: বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুক্তমতের চারণভূমি। রাজনৈতিক বা আদর্শিক ভিন্নমতের কারণে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে যেন কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বা শারীরিক হেনস্থার শিকার হতে না হয়, তার পূর্ণ গ্যারান্টি প্রশাসনকে দিতে হবে। অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটুর মতো আন্তর্জাতিক মানের গবেষক ও শিক্ষাবিদদের ওপর অন্যায় অপদস্থতার অবসান ঘটিয়ে তাঁদের অবদানকে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
  • ৩. লেজুরবৃত্তিক রাজনীতির আমূল সংস্কার ও একাডেমিক প্রাধান্য: শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দলীয় লেজুরবৃত্তির রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক পদায়নের ক্ষেত্রে একমাত্র যোগ্যতা হতে হবে একাডেমিক এক্সিলেন্স, গবেষণা ও মেধা—কোনো রাজনৈতিক দলের চাটুকারিতা নয়। উপাচার্য থেকে শুরু করে ডিন ও হলের প্রাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক রেকর্ড বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • ৪. গবেষণা বাজেট বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিকীকরণ: সিনেটের বাজেট অধিবেশনে গবেষণা বাজেট ০% থেকে বাড়িয়ে ন্যূনতম ১৫%-এ উন্নীত করতে হবে। শতবর্ষে প্রবর্তিত 'Centennial Research Grant' (CRG)-কে একটি স্থায়ী সংবিধিবদ্ধ তহবিলে রূপান্তর করতে হবে। থাইল্যান্ডের কাসেটসার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলোর (MoU) প্রকৃত বাস্তবায়ন ঘটিয়ে নিয়মিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও উচ্চমানের জার্নাল প্রকাশনা নিশ্চিত করতে হবে।
  • ৫. এফসিটিএল (FCTL) ও শিক্ষক মূল্যায়ন কৌশলের বাধ্যতামূলক বাস্তবায়ন: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু কর্তৃক প্রবর্তিত 'Foundation Certificate in University Teaching Learning' (FCTL) প্রশিক্ষণকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নবাগত শিক্ষকের জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে, শিক্ষার্থীদের দ্বারা 'শিক্ষক মূল্যায়ন কৌশল' (Teacher Evaluation Strategy) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চালু করতে হবে, যাতে শিক্ষাদানের গুণগত মান আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত হয় এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
  • ৬. ডিজিটাল রূপান্তর ও এস্পায়ারেশনাল একাডেমিক প্ল্যান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও পরীক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করতে হবে। প্রতিটি প্রকাশনা ও গবেষণাপত্রের জন্য ডিওআই (DOI) নম্বর যুক্ত করা এবং অনলাইন ভিজিবিলিটি বা উপস্থিতি নিশ্চিত করার যে উদ্যোগ ড. লিটু নিয়েছিলেন, তা দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। ২০২৭ সালের কিউএস র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষ ৫০০-এর মধ্যে স্থান করে নেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'এস্পায়ারেশনাল একাডেমিক রোডম্যাপ' প্রণয়ন করতে হবে।
  • ৭. অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও প্রতিবন্ধী নীতিমালার বাস্তবায়ন: ড. লিটুর নেতৃত্বে সম্পন্ন হওয়া সিআরজি গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আন্তর্জাতিক মানের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ অ্যাক্সেসিবিলিটি (র‌্যাম্প, ব্রেইল লাইব্রেরি, বিশেষ সফটওয়্যার) এবং তাদের অধিকার রক্ষায় বিশেষ নীতিমালার খসড়াটি অনতিবিলম্বে সিন্ডিকেটে পাস করে বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • ৮. অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মাস্টার প্ল্যানের সঠিক অনুসরণ: বিগত ৯৩ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন প্রায় ৫৬.৫৬% হ্রাস পেয়ে ৬০০ একর থেকে ২৬০.৬১৪ একরে এসে ঠেকেছে, অথচ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজারের ওপরে। এই তীব্র স্থান সংকটের সমাধানে ড. লিটুর সময়ে প্রণীত 'ঢাবি মাস্টার প্ল্যান' এবং 'একাডেমিক উন্নয়ন ও স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান' কঠোরভাবে অনুসরণ করে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে হবে।
  • ৯. কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভূমিকম্প ও মব সন্ত্রাসের কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে গভীর ট্রমা ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দূরীকরণে প্রতিটি হলে এবং অনুষদে পেশাদার 'মান

শেষ দৃশ্য

ভোর হয়ে গেছে। টিএসসির চত্বরে শিক্ষার্থীরা হাঁটছে। কার্জন হলের দেয়ালে সূর্যের প্রথম আলো। অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর্য নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। চার দার্শনিক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁদের অবয়ব আলোয় মিলিয়ে যেতে লাগল।

শেষবারের মতো রোজা লুক্সেমবার্গ ফিরে তাকালেন। হাসলেন। বললেন— 

"বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করবে আইন নয়।
রক্ষা করবে সেই মানুষগুলো, যারা সত্যকে ক্ষমতার চেয়ে বেশি ভালোবাসে।"

ডিউই বললেন—"শিক্ষা শেষ হয় না সমাবর্তনে।সেখান থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু।"

গ্রামশি বললেন—"প্রত্যেক প্রজন্মের কাজ—নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে স্বাধীন করা।"

ফ্রেইরি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন—

"যেখানে সংলাপ আছে, সেখানে আশা আছে।
যেখানে আশা আছে, সেখানেই শিক্ষা জীবিত।"

সমাপ্ত প্রতিফলন: ১০৫ বছরের বিশ্ববিদ্যালয়, ১০৫ বছরের দায়িত্ব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাস কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এটি একটি জাতির বৌদ্ধিক বিবর্তনের ইতিহাস। ১৯২১ সালের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের অর্ডিন্যান্সে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের দর্শন, শতবর্ষে গবেষণাকেন্দ্রিক রূপান্তরের প্রচেষ্টা এবং সাম্প্রতিক সময়ের নানা চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় এখনও একটি চলমান প্রকল্প।

এই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত একটিই—একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার ভবন, বাজেট বা র‌্যাংকিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার প্রতিষ্ঠান, তার গবেষণা, তার নৈতিক সাহস, তার মুক্ত বিতর্কের সংস্কৃতি এবং প্রতিটি মানুষের মর্যাদা রক্ষার সক্ষমতায় নিহিত। যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই মূল্যবোধগুলোকে আগামী প্রজন্মের হাতে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে দিতে পারে, তবে ১০৫ বছরের উত্তরাধিকার কেবল ইতিহাসের গর্ব হয়ে থাকবে না; তা ভবিষ্যতেরও ভিত্তি হয়ে উঠবে।

–লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#ঢাকা_বিশ্ববিদ্যালয়_১০৫ #শিক্ষক_নিগ্রহ_বিরোধী #মব_সন্ত্রাস_না #শিক্ষার_আলো_জ্বালাও #গণতান্ত্রিক_শিক্ষাঙ্গন #শিক্ষক_সুরক্ষা_চাই #বিশ্ববিদ্যালয়ের_আত্মা_বাঁচাও #অধিকারপত্র_আলোচনা #১০৫_বছর_ঢাবি

পরিশিষ্ট (কলাম/স্বাক্ষর)

  • প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন: অধিকারপত্রের সম্মানিত উপদেষ্টা সম্পাদক মহোদয়ের নেতৃত্বে অধিকারপত্র স্টুডিওর গবেষণা ও সম্পাদনা দল
  • সঞ্চালনা: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
  • কল্পনায়: রোজা লুক্সেমবার্গ, জন ডিউই, আন্তোনিও গ্রামশি, পাওলো ফ্রেইরি
  • অধিকারপত্র স্টুডিও: স্বীকৃতিহীনতার বিরুদ্ধে স্বীকৃতির আসর, সত্যের সন্ধানে নিরলস।

Hashtags

  • #DhakaUniversityAt105 বছর পূর্তিতে আমাদের অঙ্গীকার হোক মুক্তবুদ্ধির চর্চা পুনরুজ্জীবিত করা।
  • #EducationReformBangladesh এর মাধ্যমে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে হবে।
  • #StopMobTerrorOnTeachers শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় মব জাস্টিস অবিলম্বে বন্ধ করা হোক।
  • #AcademicAutonomy1973 এর মূল চেতনা রক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে আনা সময়ের দাবি।
  • #JusticeForDrMahbubLitu সুনিপুণ শিক্ষাবিদদের প্রাতিষ্ঠানিক অবদমন ও অপদস্থ করার অপসংস্কৃতির অবসান চাই।
  • #FCTLForQualityEducation শিক্ষকদের আধুনিক ও মানবিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষাদানের গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।
  • #RightsPaperSpecialCoverStory অধিকারপত্র স্টুডিওর এই বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক কভার স্টোরিটি শিক্ষাঙ্গনের চোখ খুলে দেবে।
  • #InclusiveEducationDU প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সমান অধিকার ও অ্যাক্সেসিবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে।
  • #RestoringPrachyerOxford প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাবির গৌরবময় অতীত ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে।
  • #SaveBanglarSrenikokkho মব-সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তির হাত থেকে বাংলার শ্রেণিকক্ষগুলোকে রক্ষা করুন।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: