odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Sunday, 9th August 2026, ৯th August ২০২৬
সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.) ও তাঁর খলিফা আবদুল লতিফ শাহ চিশতী (রহ.)-কে ঘিরে মুক্তিযুদ্ধ, মাজার, পারিবারিক স্মৃতি এবং পিতা-পুত্রের আলাপচারিতায় তিন জনপদে তিন প্রজন্মের বিস্মৃত ইতিহাস: হারিয়ে যাওয়া আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের অনুসন্ধান

ফুলতলা থেকে গোলাপনগর হয়ে বাঁকা মাঠপাড়ার বিস্মৃত সুফি-ইতিহাস: এক শহীদ সুফি, এক খলিফা ও পিতা–পুত্রের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৯ August ২০২৬ ০৬:৪৩

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৯ August ২০২৬ ০৬:৪৩

অধিকারপত্র বিশেষ ফিচারবায়োগ্রাফি অব . মাহবুব লিটু

মুন্সীগঞ্জের ফুলতলার নদীতীরবর্তী আস্তানা থেকে কুষ্টিয়ার গোলাপনগরের শহীদ সুফি হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.) এবং চুয়াডাঙ্গার বাঁকা মাঠপাড়ায় তাঁর খলিফা হিসেবে স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত হযরত আবদুল লতিফ শাহ চিশতী (রহ.)—তিন জনপদের বিস্মৃত যোগসূত্র অনুসন্ধান করেছে এই দীর্ঘ জীবনীমূলক ফিচার। ঐতিহাসিক বটগাছ, মাজার, পুরোনো চিঠি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, নদীভাঙনে হারানো কবর এবং পারিবারিক মৌখিক ইতিহাসের পাশাপাশি এতে উঠে এসেছে অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটুর পিতা মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের এতিম শৈশব, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, আইনপেশা ও সমাজসেবার জীবন। একই সঙ্গে পিতা–পুত্রের গভীর বন্ধুত্ব, গোলাপনগরের উরসে তাঁদের যৌথ সফর, পিতার অন্তিম উপদেশ এবং তিন প্রজন্মে প্রবাহিত শিক্ষা, মানবসেবা ও আধ্যাত্মিক মানবতাবাদের উত্তরাধিকার নিবন্ধটিকে একটি পরিবারের সীমা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের স্থানীয় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও মূল্যবোধভিত্তিক সন্তান গঠনের দলিলে পরিণত করেছে।

ভূমিকা: তিন জনপদ, তিন প্রজন্ম এবং স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা ইতিহাস

ইতিহাস সব সময় রাষ্ট্রীয় নথি, সরকারি গেজেট কিংবা গ্রন্থাগারের বইয়ে লেখা থাকে না। কখনো তা বেঁচে থাকে নদীর ধারের একটি পরিত্যক্ত আস্তানায়, শতবর্ষী গাছের শিকড়ে, বিবর্ণ সাইনবোর্ডে, পুরোনো চিঠির হস্তাক্ষরে কিংবা কোনো পিতার নীরব অশ্রুতে। আবার কখনো একটি শিশুর মনে লেগে থাকা ছাতুর স্বাদ, নিজের হাতে দাদাকে কবরে নামানোর বেদনা কিংবা মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে বাবার বলা শেষ কথাই হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে জীবন্ত দলিল।

মুন্সীগঞ্জের ফুলতলা, কুষ্টিয়ার গোলাপনগর এবং চুয়াডাঙ্গার বাঁকা মাঠপাড়া—ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এই তিন জনপদকে একই সূত্রে যুক্ত করেছেন দুই সুফিসাধক, একটি পরিবার এবং তিন প্রজন্মের শিক্ষা ও মানবসেবার উত্তরাধিকার। এই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হিসেবে স্থানীয়ভাবে স্মরণীয় হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.) এবং তাঁর খলিফা হিসেবে পরিচিত হযরত আবদুল লতিফ শাহ চিশতী (রহ.)। তাঁদের আধ্যাত্মিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ফুলতলায় হাজি চান মিয়ার বাড়ির আস্তানা, একটি প্রাচীন গাছ, গোলাপনগরের শাহাদাতের স্মৃতি এবং বাঁকা মাঠপাড়ার নিভৃত দরবার শরিফ।

কিন্তু এই ফিচার শুধু মুর্শিদ, খলিফা ও মাজারের ইতিহাস নয়। এর সমান্তরালে প্রবাহিত হয়েছে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের অসাধারণ জীবনকথা—জন্মের আগেই পিতৃহারা, সাত বছর বয়সে মাতৃহারা, পরে আত্মীয় হাজি চান মিয়ার সন্তানরূপে গৃহীত এক শিশুর শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারী, রাজনৈতিক কর্মী, আইনজীবী ও সমাজসংগঠক হয়ে ওঠার আখ্যান। তাঁর জীবনেই সুফি মানবতাবাদ, ভাসানীর সাম্যের রাজনীতি, শিক্ষকের মর্যাদা, আইনের আশ্রয় এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিকতা এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছিল।

এই উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মে বহন করেছেন তাঁর পুত্র অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান—মাহবুব লিটু। দুই কন্যার পর ‘সাধনার ধন’ হিসেবে জন্ম নেওয়া এই সন্তান ছিলেন পিতার আদরের, আস্থার এবং কথোপকথনের সঙ্গী। প্রতি বছরের উরসে পিতার সঙ্গে গোলাপনগর যাওয়া, মাজারের পাশে তাঁর নীরব কান্না দেখা, পেশা নির্বাচনে স্বাধীনতা পাওয়া এবং শেষ সাক্ষাতে মানুষের জন্য বেঁচে থাকার উপদেশ—এসব অভিজ্ঞতা মাহবুব লিটুর শিক্ষকতা, মানবাধিকারচেতনা ও সামাজিক দায়বোধের ভিত নির্মাণ করেছে। ফলে ব্যক্তিগত জীবনী এখানে বৃহত্তর সামাজিক ইতিহাসের দরজা খুলে দেয়।

তবে এই কাহিনির সব তথ্য একই মাত্রায় প্রমাণিত নয়। দৃশ্যমান মাজার, স্থানপরিচয়, সাইনবোর্ড, আলোকচিত্র, শিক্ষাগত নথি ও সংরক্ষিত চিঠি গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগত সাক্ষ্য; অন্যদিকে খেলাফত, সাধকদের যাত্রা, অলৌকিক ঘটনা এবং পারিবারিক সম্পর্কের কিছু বিবরণ প্রধানত মৌখিক ইতিহাস ও স্থানীয় জনশ্রুতিনির্ভর। এই নিবন্ধ তাই বিশ্বাসকে খাটো না করে এবং জনশ্রুতিকে যাচাইকৃত ইতিহাস হিসেবে ঘোষণা না দিয়ে স্মৃতি, দলিল ও সাক্ষ্যের মধ্যকার সীমানা সচেতনভাবে রক্ষা করেছে। এটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিস্মৃতপ্রায় একটি আঞ্চলিক, পারিবারিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার অনুসন্ধান, যাচাই ও সংরক্ষণের সূচনা।

প্রথম অংশ

বাঁকা মাঠপাড়ার নিভৃত সাধক: হযরত লতিফ শাহ চিশতী (রহ.) তাঁর দরবার শরিফ

গোলাপনগরের শহীদ সুফি হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.)-এর খলিফা হিসেবে স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত লতিফ শাহ চিশতীর সমাধি আজ চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে আধ্যাত্মিক স্মৃতি বিস্মৃত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার বাঁকা ইউনিয়নের আলীপুর—স্থানীয়ভাবে পরিচিত বাঁকা মাঠপাড়া। গ্রামের পথ ধরে এগোলে পুরোনো গাছের ছায়ায় চোখে পড়ে একটি সাধারণ সাইনবোর্ড। ওপরে আরবিতে কালেমা, নিচে কয়েকটি পরিচয়বাহী পঙ্‌ক্তি এবং বড় অক্ষরে লেখা—“দরবার শরিফ”। স্থানটি কোনো জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপনা নয়; কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার সুফি-ঐতিহ্যের একটি প্রায় হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।

এখানেই রয়েছে হযরত লতিফ শাহ চিশতী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)-এর মাজার ও দরবার শরিফ।

সাইনবোর্ডে দৃশ্যমান পরিচিতি এবং স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত স্মৃতি অনুসারে, তিনি ছিলেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার গোলাপনগরের আধ্যাত্মিক সাধক ও একাত্তরের শহীদ হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.)-এর একজন খলিফা। অর্থাৎ তিনি কেবল একজন ভক্ত বা সাধারণ অনুসারী ছিলেন না; মুর্শিদের কাছ থেকে মানুষকে আধ্যাত্মিক পথে পরিচালনার দায়িত্ব ও অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে স্থানীয় সমাজে তাঁর পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বাঁকা মাঠপাড়া: মাজারের সঠিক অবস্থান

হযরত লতিফ শাহ চিশতী (রহ.)-এর মাজারটি মুন্সীগঞ্জের ফুলতলায় নয়; এর সঠিক অবস্থান চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার বাঁকা মাঠপাড়া। সরকারি নথিতে আলীপুর ও বাঁকা মাঠপাড়াকে একই স্থানীয় ঠিকানার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য এবং বাংলাদেশ গেজেটেও “আলীপুর (বাঁকা মাঠপাড়া), জীবননগর, চুয়াডাঙ্গা” ঠিকানাটি পাওয়া যায়। 

গ্রামীণ বাংলার বহু সাধকের মতো তাঁর সমাধিও দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার ইতিহাসচর্চার বাইরে রয়ে গেছে। একটি সাইনবোর্ড, স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, ভক্তদের শ্রদ্ধা এবং তাঁর সমাধিই এখন তাঁর অস্তিত্ব ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের প্রধান দৃশ্যমান সাক্ষ্য।

সোলাইমান শাহ চিশতীর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার

হযরত লতিফ শাহ চিশতীকে বুঝতে হলে তাঁর মুর্শিদ হিসেবে পরিচিত হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.)-এর জীবন ও সাধনার দিকে তাকাতে হয়।

প্রকাশিত স্থানীয় ইতিহাসে বলা হয়েছে, সোলাইমান শাহ চিশতী ষাটের দশকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার গোলাপনগরে এসে পদ্মার তীরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। একটি সাধারণ খড়ের কুঁড়েঘরে ছিল তাঁর আস্তানা। মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, সহজ জীবনযাপন এবং আধ্যাত্মিক সাধনার কারণে তিনি ধীরে ধীরে স্থানীয় মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁর আস্তানায় হামলা চালায়। পাকিস্তানি সেনাদের নির্বিচার গুলিতে তিনি এবং তাঁর সঙ্গে অবস্থানরত কয়েকজন অনুসারী শহীদ হন। সহচরের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে অমিল থাকলেও হত্যাকাণ্ড এবং তাঁর শাহাদাতের বিষয়ে স্থানীয় সূত্রগুলো একমত। তাঁর গোলাপনগরের মাজার আজ মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি ও আধ্যাত্মিক সাধনার মিলিত প্রতীক। লতিফ শাহ চিশতীর দরবারের সাইনবোর্ডে সোলাইমান শাহ চিশতীর নাম থাকা তাই নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি দুই সাধকের মধ্যে আধ্যাত্মিক সম্পর্কের স্থানীয় স্বীকৃতি এবং একটি সম্ভাব্য সুফি-সিলসিলার দৃশ্যমান স্মারক।

খলিফাপরিচয়ের তাৎপর্য

সুফি পরিভাষায় ‘খলিফা’ অর্থ উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি পাওয়া কেউ নন। একজন মুর্শিদ যখন কোনো শিষ্যের আধ্যাত্মিক পরিপক্বতা, নৈতিক চরিত্র ও মানুষকে পথ দেখানোর সক্ষমতা সম্পর্কে আস্থা অর্জন করেন, তখন তাঁকে খেলাফত বা প্রতিনিধিত্বের অনুমতি দিতে পারেন।

এই অনুমোদন কখনো লিখিত খেলাফতনামার মাধ্যমে, কখনো শাজরা বা সিলসিলানামায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে, আবার কখনো মুর্শিদ ও প্রবীণ অনুসারীদের প্রকাশ্য স্বীকৃতির মাধ্যমে দেওয়া হতো। গ্রামীণ বাংলার অনেক দরবারে এই ইতিহাস লিখিত নথির চেয়ে মৌখিক স্মৃতি, ব্যবহৃত নিদর্শন এবং মাজারের পরিচিতিফলকে বেশি সংরক্ষিত রয়েছে।

বাঁকা মাঠপাড়ার সাইনবোর্ডে হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.)-এর নামের সঙ্গে লতিফ শাহ চিশতীর পরিচয় যুক্ত থাকা তাঁর খেলাফতের দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় বস্তুগত সাক্ষ্য। তবে এটিকে পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক প্রমাণে রূপ দিতে হলে পুরোনো খেলাফতনামা, শাজরা, চিঠিপত্র, মাজারের নিবন্ধন এবং প্রবীণ মুরিদদের সাক্ষ্য অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

ফুলতলা থেকে বাঁকা মাঠপাড়া: সম্ভাব্য বিস্তৃত যোগসূত্র

লতিফ শাহ চিশতী সম্পর্কে সংরক্ষিত পারিবারিক বয়ানে মুন্সীগঞ্জের ফুলতলা গ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র পাওয়া যায়। সেই ভাষ্য অনুযায়ী, গোলাপনগরে স্থায়ী হওয়ার আগে সোলাইমান শাহ চিশতী কোনো এক পর্যায়ে ফুলতলায় চান মিয়ার বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। চান মিয়ার ছেলে রফিকুল ইসলাম তাঁর স্নেহ লাভ করেছিলেন। রফিকুল ইসলামের চাচাতো ভাই ছিলেন হযরত আবদুল লতিফ বা লতিফ শাহ চিশতী—যাঁকে পরবর্তী সময়ে সোলাইমান শাহ চিশতী খেলাফত প্রদান করেন বলে পরিবারে স্মৃতি প্রচলিত আছে।

এই পারিবারিক বিবরণ অনুযায়ী তিনটি স্থান একই আধ্যাত্মিক ইতিহাসে যুক্ত হয়—মুন্সীগঞ্জের ফুলতলা, কুষ্টিয়ার গোলাপনগর এবং চুয়াডাঙ্গার বাঁকা মাঠপাড়া।

ফুলতলা হয়েছে মুর্শিদ ও শিষ্যের পরিচয় অথবা সম্পর্ক গড়ে ওঠার ক্ষেত্র; গোলাপনগর ছিল সোলাইমান শাহ চিশতীর শেষ সাধনস্থল ও শাহাদাতের ভূমি; আর বাঁকা মাঠপাড়া হয়ে ওঠে তাঁর খলিফা লতিফ শাহ চিশতীর কর্মক্ষেত্র ও শেষ ঠিকানা।

কেমন ছিলেন লতিফ শাহ চিশতী?

তাঁর ব্যক্তিজীবনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আজও অনুদ্‌ঘাটিত। তাঁর জন্মসাল, পিতা-মাতার নাম, শিক্ষাজীবন, পেশা, বাঁকা মাঠপাড়ায় আগমনের সময় এবং ওফাতের তারিখ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত তথ্য পাওয়া যায় না। অথচ তাঁর নামে দরবার শরিফের অস্তিত্ব প্রমাণ করে, তিনি স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছিলেন।

একজন সুফি খলিফার প্রধান দায়িত্ব সাধারণত ছিল মুর্শিদের শিক্ষা অনুসারে মানুষকে আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর স্মরণ, নৈতিক জীবন, পরোপকার ও মানবপ্রেমের পথে আহ্বান করা। সে বিবেচনায় অনুমান করা যায়, লতিফ শাহ চিশতীর আস্তানাও শুধু ব্যক্তিগত সাধনার স্থান ছিল না; এটি ছিল মানুষের মিলন, দোয়া, পরামর্শ এবং মানসিক আশ্রয়ের কেন্দ্র।

মাজার শুধু সমাধি নয়

বাংলার গ্রামীণ জনপদে মাজার অনেক সময় একটি বিকল্প সামাজিক ইতিহাস সংরক্ষণ করে। রাষ্ট্রীয় নথিতে যাঁদের নাম ওঠেনি, বইয়ে যাঁদের জীবনী লেখা হয়নি, তাঁদের স্মৃতি কখনো একটি গাছ, একটি কবর, একটি শিলালিপি বা পুরোনো সাইনবোর্ডের মধ্যে বেঁচে থাকে।

বাঁকা মাঠপাড়ায় লতিফ শাহ চিশতীর দরবারও তেমন একটি স্মৃতিস্থল। এর মূল্য কেবল ধর্মীয় অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি গ্রামীণ মানুষের বিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক, মুর্শিদ–মুরিদ পরম্পরা এবং এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সুফি সাধকদের বিচরণের ইতিহাস বহন করে।

মাজারটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি স্থানীয় ঐতিহ্যচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। সেখানে একটি তথ্যফলক স্থাপন করে তাঁর পরিচয়, মুর্শিদের নাম, সম্ভাব্য সিলসিলা, ফুলতলা–গোলাপনগর–বাঁকা মাঠপাড়ার যোগসূত্র এবং সংগৃহীত মৌখিক ইতিহাস তুলে ধরা যেতে পারে।

নীরব সমাধির উচ্চারিত আহ্বান

বাঁকা মাঠপাড়ার গাছের ছায়ায় লতিফ শাহ চিশতীর দরবার যেন নীরবে একটি প্রশ্ন করে—আমরা কি আমাদের গ্রামের সাধক, মানবহিতৈষী ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকদের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে পেরেছি?

হযরত লতিফ শাহ চিশতী (রহ.) হয়তো কোনো প্রাসাদ নির্মাণ করেননি, লিখে যাননি বড় কোনো গ্রন্থ। কিন্তু তাঁর নামে টিকে থাকা দরবার এবং তাঁর মুর্শিদ সোলাইমান শাহ চিশতীর সঙ্গে যুক্ত স্মৃতি প্রমাণ করে, তিনি মানুষের অন্তরে একটি স্থান তৈরি করেছিলেন।

গোলাপনগরের শহীদ সাধকের আধ্যাত্মিক আলো তাঁর খলিফার মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গার বাঁকা মাঠপাড়ায় পৌঁছেছিল—স্থানীয় ইতিহাস অন্তত সেই সাক্ষ্যই বহন করছে। এখন প্রয়োজন স্মৃতিকে দলিলে, লোককথাকে সাক্ষ্যে এবং সাইনবোর্ডের কয়েকটি বিবর্ণ বাক্যকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য জীবনীতে রূপ দেওয়া।

দ্বিতীয় অংশ

ফুলতলা থেকে গোলাপনগর, গোলাপনগর থেকে জীবননগর

মুর্শিদ, খলিফা একটি পরিবারের আধ্যাত্মিক স্মৃতি

হযরত আবদুল লতিফ শাহ চিশতী (রহ.)-এর জীবনকথা অনুসন্ধান করতে গেলে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের বাঁকা মাঠপাড়ার পাশাপাশি ফিরে তাকাতে হয় মুন্সীগঞ্জের ফুলতলা গ্রামের দিকে। কারণ পারিবারিকভাবে সংরক্ষিত মৌখিক ইতিহাসে হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.), তাঁর খলিফা আবদুল লতিফ শাহ চিশতী এবং অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিক ও পারিবারিক সম্পর্কের বিবরণ পাওয়া যায়।

এই বয়ান শুধু একজন পীর ও তাঁর শিষ্যের কাহিনি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি নদীতীরবর্তী আস্তানা, পারিবারিক বিরোধের মুহূর্তে দেওয়া জীবনবদলে দেওয়া উপদেশ, মুর্শিদের স্থানান্তর, একাত্তরের শাহাদাত এবং পরবর্তী প্রজন্মের স্মৃতিতে বেঁচে থাকা স্নেহের কয়েকটি অমলিন মুহূর্ত।

ফুলতলার নদীতীরে সোলাইমান শাহ (রহ) চিশতীর আস্তানা

পরিবারের মৌখিক ইতিহাস অনুযায়ী, কুষ্টিয়ার গোলাপনগরে স্থায়ী হওয়ার আগে হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.) মুন্সীগঞ্জের ফুলতলা গ্রামে কিছু সময় অবস্থান করেছিলেন। নদীর তীরে হাজি চান মিয়ার বাড়িসংলগ্ন স্থানে ছিল তাঁর আস্তানা। সেখানে ছিল—এবং এখনো রয়েছে বলে পরিবার দাবি করে—একটি বিশাল পুরোনো গাছ ও আস্তানার স্মৃতিচিহ্ন।

সোলাইমান শাহ চিশতীর ফুলতলা ত্যাগের পরও স্থানটির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার বিলীন হয়নি। পারিবারিক ভাষ্য অনুযায়ী, হাজি চান মিয়ার বংশধরদের কেউ কেউ প্রজন্ম পরম্পরায় ওই আস্তানার দেখাশোনা এবং স্থানীয়ভাবে খলিফা বা খাদেমের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফুলতলার বর্তমান আস্তানা, পুরোনো গাছ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে সংরক্ষিত ছবি ও দলিল তাই এই মৌখিক ইতিহাস যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে, যা নিচের একটি ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে।

রফিকুল ইসলামের জীবনের সংকটে মুর্শিদের পরামর্শ

হাজি চান মিয়ার ছেলে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ছিলেন হযরত সোলাইমান শাহ চিশতীর অত্যন্ত স্নেহভাজন। তিনি পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান—মাহবুব লিটুর—পিতা হন।

মুক্তিযুদ্ধের আগের কোনো এক সময়ে রফিকুল ইসলামের বিয়েকে কেন্দ্র করে পরিবারে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। তিনি যাঁকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন (লিটুর মাতা), তাঁর পরিবারের সঙ্গে চান মিয়ার পরিবারের পুরোনো দ্বন্দ্ব ছিল বলে পারিবারিক বয়ানে জানা যায়। ফলে হাজি চান মিয়া ও তাঁর স্ত্রী এই বিয়েতে সম্মতি দিতে চাননি। কিন্তু রফিকুল ইসলাম নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।

এই সংকটকালে তিনি সোলাইমান শাহ চিশতীর কাছে পরামর্শ চান। পরিবারে সংরক্ষিত স্মৃতি অনুসারে, সাধক তাঁকে তিনটি তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছিলেন—নিজের পছন্দের নারীকে বিয়ে করা, বিয়ের পর পৈতৃক বাড়িতে অবস্থান না করা এবং সরকারি চাকরির আশায় দীর্ঘ সময় নষ্ট না করা।

সোলাইমান শাহ চিশতী তাঁকে সতর্ক করেছিলেন—পারিবারিক বিরোধ এমন পর্যায়ে যেতে পারে যে তাঁর জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে তিনি নাকি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে নিজেরও ফুলতলা ছাড়ার সময় এসে গেছে।

পরিবারের বিবরণ অনুযায়ী, রফিকুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত নিজের পছন্দের জাহানার ইসলামকেই বিয়ে করেন। এর ফলে পিতার সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে এবং তাঁকে পৈতৃক বাড়ি ছাড়তে হয়। পরিবারের একজন প্রভাবশালী আত্মীয় তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করবেন—এমন প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই চাকরি হয়নি। পরিবারের দৃষ্টিতে, সোলাইমান শাহ চিশতীর দেওয়া সতর্কবার্তা পরবর্তী জীবনে একে একে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়।

ডা. হাবিবুর রহমানের পরিবার বিয়ের বিরোধ

অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের মাতামহ ডা. হাবিবুর রহমান সম্পর্কে পারিবারিক ইতিহাসে বলা হয়, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সামরিক চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং রাজকীয় স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। তাঁর পরিবারের সামাজিক অবস্থান এবং হাজি চান মিয়ার পরিবারের সঙ্গে পুরোনো বিরোধ বিয়েটিকে আরও জটিল করে তুলেছিল বলে জানা যায়।

তবে ডা. হাবিবুর রহমানের সামরিক পরিচয়, ইউনিট, দায়িত্বকাল এবং রাজকীয় সম্মানের সুনির্দিষ্ট নাম এখনো দলিলভিত্তিকভাবে যাচাই করা করা হয়েছে এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সার্ভিস রেকর্ড, পদক, সনদ বা পুরোনো আলোকচিত্র যা ড. মাহবুব লিটুর কাছে সংরক্ওষিত, যা এই পারিবারিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি প্রামাণ্যভাবে প্রতিষ্ঠা করে।

কান্নাভেজা বিদায়: ফুলতলা থেকে সাধকের প্রস্থান

পারিবারিক স্মৃতিতে সোলাইমান শাহ চিশতীর ফুলতলা ত্যাগের ঘটনাটি আবেগময়। তিনি যখন জানান যে তাঁর অন্যত্র চলে যাওয়ার সময় হয়েছে, ভক্তরা তাঁকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি।

কেন তিনি ফুলতলা ছেড়েছিলেন—এ প্রশ্নের একক উত্তর পাওয়া যায় না। পারিবারিক বিরোধ, আধ্যাত্মিক নির্দেশনা অথবা নতুন সাধনভূমির আহ্বান—লোকস্মৃতিতে কারণগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে। তবে এই বিদায়ের পরই তাঁর জীবনকথা ধীরে ধীরে পদ্মাতীরের গোলাপনগরের সঙ্গে যুক্ত হয়।

থেমে যাওয়া ট্রেন গোলাপনগরে আগমন: লোকস্মৃতির একটি কাহিনি

হযরত সোলাইমান শাহ চিশতীর গোলাপনগরে আগমন নিয়ে পারিবারিক ও স্থানীয় জনশ্রুতিতে একটি অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, ট্রেনে ভ্রমণের সময় পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে এসে তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর গন্তব্য এসে গেছে। তিনি ট্রেনকে থামতে বললে সেটি অপ্রত্যাশিতভাবে থেমে যায়। রেলকর্মীরা যান্ত্রিক ত্রুটি খুঁজেও কোনো কারণ পাননি বলে গল্পটিতে বলা হয়।

যাত্রীদের কাছ থেকে ঘটনা শুনে রেলকর্মী ও স্থানীয় মানুষ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠেন। সে সময় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও রেলপথকে পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য গোলাপনগর এলাকায় পাথর ফেলার কাজ চলছিল। স্থানীয়রা তাঁকে সেখানে আস্তানা স্থাপনের অনুরোধ করেন। তিনি পদ্মার তীরবর্তী গোলাপনগরকে নতুন সাধনস্থল হিসেবে বেছে নেন বলে লোককথায় বর্ণিত হয়েছে।

ভক্তদের বিশ্বাস, তিনি যে স্থানে অবস্থান করেছিলেন, পদ্মার ভাঙন সেই স্থানকে গ্রাস করতে পারেনি। তবে ট্রেন থেমে যাওয়া বা নদীভাঙনসংক্রান্ত এসব বিবরণকে ঐতিহাসিকভাবে যাচাইকৃত ঘটনা নয়, বরং সাধককে ঘিরে গড়ে ওঠা স্থানীয় লোকস্মৃতি ও ভক্তিবয়ান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় মিথ্যা না বলার অঙ্গীকার

১৯৭১ সালে গোলাপনগরের আস্তানা শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার স্থান ছিল না; স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারাও তাঁর কাছে আসতেন, দোয়া চাইতেন এবং কখনো আশ্রয় নিতেন—এমন বিবরণ পরিবার ও স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে রয়েছে।

পারিবারিক বয়ান অনুযায়ী, পাকিস্তানি বাহিনী গানবোটে করে তাঁর আস্তানায় গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান জানতে চায়। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়—“মুক্তি কাহাঁ হ্যায়?” অর্থাৎ, মুক্তিযোদ্ধারা কোথায়?

প্রচলিত ভাষ্য অনুসারে, তিনি পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় প্রকাশ করেননি এবং মিথ্যা বলে নিজের জীবন রক্ষার পথও বেছে নেননি। তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট—তিনি জুলুমের সামনে মাথা নত করবেন না এবং আশ্রয়প্রার্থী মানুষকে শত্রুর হাতে তুলে দেবেন না।

এর আগে আস্তানায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদে সরে যেতে বলেছিলেন বলেও পরিবারে স্মৃতি প্রচলিত আছে। তিনি নাকি তাঁদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে তাঁকে নিয়ে চিন্তা না করে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বুলেট, গাছ গানবোট: বিশ্বাস ইতিহাসের সীমারেখা

তাঁর শাহাদাতকে ঘিরে আরও কিছু অলৌকিক জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, পাকিস্তানি সেনাদের ব্রাশফায়ারে আস্তানার একটি গাছের পাতা ও কাণ্ড ঝাঁঝরা হয়ে গেলেও প্রথমদিকে তাঁকে গুলি বিদ্ধ করতে পারেনি। পরে তিনি নিজেই শরীরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে গুলি করার কথা বলেন এবং সতর্ক করেন—তাঁকে হত্যা করলে আক্রমণকারীরা নিরাপদে ফিরে যেতে পারবে না।

দলিল পত্রে যায় বিনা ঝড় বা গোরাবর্ষরেনে হার্ডিকঞ্টিজ ব্রিজের কাছাকাছি পদ্মা নদীতে পাকিস্তানি হাপনাদারদের একটি টাগবোট ডুবে বেশ হতাহত হরেয়ছিলো। জনশ্রুতি আছে, মুর্শিদের হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানি বাহিনীর ঐ গানবোট হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে পদ্মায় রহস্যজনকভাবে ডুবে যায় এবং বহু সেনা নিহত হয়। ভক্তরা ঘটনাটিকে সাধকের অভিশাপ বা আধ্যাত্মিক প্রতিফল বলে বিশ্বাস করেন।

মুর্শিদের সঙ্গী আবদুল লতিফ শাহ চিশতী

হযরত আবদুল লতিফ শাহ চিশতী (রহ.) শুধু সোলাইমান শাহের একজন সাধারণ ভক্ত ছিলেন না; পারিবারিক ইতিহাস ও বাঁকা মাঠপাড়ার দরবারের সাইনবোর্ড তাঁকে তাঁর খলিফা হিসেবে পরিচয় দেয়। তিনি মুর্শিদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও স্নেহভাজন ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন বলে পরিবারের দাবি।

রফিকুল ইসলামকেও সোলাইমান শাহ স্নেহ করতেন; তবে তাঁকে সংসার ও সামাজিক জীবনের দিকে মনোনিবেশ করতে বলেছিলেন বলে স্মৃতি রয়েছে। বিপরীতে, আবদুল লতিফের মধ্যে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা ও খেলাফতের দায়িত্ব বহনের উপযোগিতা দেখেছিলেন—পারিবারিক ব্যাখ্যায় দুই ভাইয়ের জীবনের পথ এভাবেই আলাদা হয়ে যায়। রফিকুল ইসলাম সংসার ও পেশাজীবনের দায়িত্ব নেন; লতিফ শাহ এগিয়ে যান মুর্শিদের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার বহন করে।

পরবর্তী সময়ে আবদুল লতিফ শাহ চিশতীর শেষ ঠিকানা হয় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার বাঁকা মাঠপাড়া। সেখানেই তাঁর মাজার ও দরবার শরিফ গড়ে ওঠে। ফলে ফুলতলা, গোলাপনগর ও বাঁকা মাঠপাড়া—তিনটি স্থান একই আধ্যাত্মিক ও পারিবারিক ইতিহাসের তিনটি অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

একটি শিশুস্মৃতি: জেঠার দেওয়া ছাতুর স্বাদ

এই দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে মানবিক অংশটি হয়তো একটি শিশুর স্মৃতি। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান স্মরণ করেন, তিনি যখন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন গোলাপনগরে জেঠা আবদুল লতিফ শাহ চিশতী এবং জেঠির সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা হয়েছিল।

তাঁর ভাষায়—“জেঠা আর জেঠি আমাকে খুব আদর করে ছাতু খেতে দিয়েছিলেন। সেই ছাতুর স্বাদ যেন এখনো আমার মুখে লেগে আছে। জেঠার চেহারা, জেঠির কথা আর তাঁদের আদর আমি আজও ভুলতে পারি না।”

ইতিহাসের বড় ঘটনা অনেক সময় তারিখ, স্থান ও দলিলের মধ্যে বন্দী থাকে। কিন্তু পরিবারের ইতিহাস বেঁচে থাকে স্বাদ, স্পর্শ ও স্নেহের ক্ষুদ্র স্মৃতিতে। একটি শিশুকে খেতে দেওয়া সামান্য ছাতু তাই এখানে কেবল খাবার নয়; এটি দুই প্রজন্ম, দুই সাধক এবং একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের জীবন্ত স্মারক।

বিস্তৃত আধ্যাত্মিক পারিবারিক উত্তরাধিকার

পরিবারের বক্তব্য অনুসারে, এই বংশে আবদুল লতিফ শাহ চিশতী ছাড়াও আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আজিজ মাস্তান চিশতীর নাম উল্লেখ করা হয়। কারও মাজারের জন্য জমি দেওয়া হয়েছে, কেউ স্থানীয়ভাবে আধ্যাত্মিক পথের সেবক হিসেবে পরিচিত হয়েছেন।

এসব তথ্য একত্র করলে বোঝা যায়, ফুলতলার পরিবারটির সঙ্গে সুফি সাধনা ও মাজার-সংস্কৃতির সম্পর্ক কোনো একক ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি কয়েক প্রজন্মের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারে পরিণত হয়েছিল।

স্মৃতি থেকে প্রামাণ্য ইতিহাসের পথে

এই পারিবারিক বয়ান হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী ও হযরত আবদুল লতিফ শাহ চিশতীর জীবনের অজানা অধ্যায় উন্মোচনের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। তবে স্মৃতিগুলো দ্রুত নথিবদ্ধ না করলে সময়ের সঙ্গে অনেক নাম, তারিখ ও স্থানের বিবরণ হারিয়ে যাবে।

ফুলতলার আস্তানা ও পুরোনো গাছের ছবি, জমির দলিল, হাজি চান মিয়ার বংশলতিকা, আবদুল লতিফ শাহের স্বহস্তলিখিত চিঠি, রফিকুল ইসলামের নথি, ডা. হাবিবুর রহমানের সামরিক রেকর্ড, গোলাপনগর দরবারের শাজরা এবং বাঁকা মাঠপাড়ার মাজারের পুরোনো দলিল একত্র করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারের প্রবীণ সদস্য, ফুলতলার স্থানীয় মানুষ, গোলাপনগরের খাদেম এবং আবদুল লতিফ শাহের শিষ্য-পরিবারের সাক্ষাৎকার ধারণ করা জরুরি।

তবেই ফুলতলা থেকে গোলাপনগর এবং গোলাপনগর থেকে জীবননগরে ছড়িয়ে থাকা এই আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার লোককথার সীমা অতিক্রম করে বাংলাদেশের স্থানীয় ইতিহাসের একটি মূল্যবান অধ্যায়ে পরিণত হতে পারে।

তৃতীয় অংশ

ফুলতলা: আধ্যাত্মিকতার পাঠ

যে আস্তানায় পীরের কবর হওয়ার কথা ছিল, সেখানেই শায়িত হলেন হাজি চান মিয়া

ফুলতলার নদীতীরবর্তী আস্তানাকে ঘিরে এই পারিবারিক ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিণতি ঘটে হাজি চান মিয়ার মৃত্যুর পর। পারিবারিক বয়ান অনুযায়ী, হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.) যদি ফুলতলায় থেকে যেতেন, তবে এই আস্তানাতেই হয়তো তাঁর সমাধি হতো। কিন্তু তিনি ফুলতলা ছেড়ে গোলাপনগরে চলে যান এবং ১৯৭১ সালে সেখানেই পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। যে স্থানটি একসময় তাঁর সম্ভাব্য সমাধিক্ষেত্র হিসেবে ভাবা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেখানেই সমাহিত হন তাঁর আশ্রয়দাতা ও ভক্ত হাজি চান মিয়া।

ইতিহাসের এক গভীর পরিহাস যেন এখানে পূর্ণতা পায়—সাধক চলে গেলেন পদ্মাতীরের গোলাপনগরে, কিন্তু তাঁর স্মৃতিধন্য ফুলতলার মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সেই গৃহকর্তা, যাঁর বাড়িতে তিনি একসময় আস্তানা গড়েছিলেন। হাজি চান মিয়ার কবর আজও সেখানে রয়েছে বলে তাঁর পরিবার জানিয়েছে।

শিশুর হাতে দাদার শেষ শয্যা

হাজি চান মিয়া (নিজেও ছিলেন সুফি এবং ফুলতলা গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা) যখন মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর নাতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান—মাহবুব লিটু—তখন চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বয়স অল্প হলেও দাদার দাফনের সেই মুহূর্ত তাঁর স্মৃতিতে আজও বিস্ময়করভাবে জীবন্ত।

দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন পরিবারের আরেক আধ্যাত্মিক সাধক হযরত আজিজ চিশতী—যাঁকে এলাকার মানুষ “আজিজ মাস্তান” নামে চিনতেন। পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ঈশ্বরদীতে তাঁর মাজার গড়ে ওঠে।

কবর প্রস্তুত হওয়ার পর হাজি চান মিয়ার মরদেহ নামানোর আয়োজন চলছিল। সেই মুহূর্তে আজিজ মাস্তান ছোট মাহবুবকে কবরের ভেতরে নামিয়ে দেন। হঠাৎ নিজেকে কবরের মধ্যে আবিষ্কার করে শিশুটি ভয় ও বিস্ময়ে স্থির হয়ে গিয়েছিল। তখন ড, মাহবুবের এক চাচা আজিজ মাস্তান তাঁকে জীবনের গভীরতম একটি দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের স্মৃতিতে তাঁর কথাগুলো ছিল এমন—“ভাইনা, এটা তোমার জীবনের শেষ সুযোগ। এমন সুযোগ আর কোনো দিন পাবে না। নিজের হাতে তোমার দাদাকে ধরে কবরে নামাও।”

কবরের ভেতরে আরও দুজন ব্যক্তি মরদেহ গ্রহণ করার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরাও শিশুটিকে সাহস দিয়ে বলেন—“তুমি দাদাকে ধরো। নিজের হাতে তাঁকে শেষ শয্যায় শুইয়ে দাও—এই সুযোগ আর ফিরে আসবে না।”

এরপর ছোট নাতি অন্যদের সঙ্গে নিজের দাদার মরদেহ ধরে কবরে নামায়। শিশুমনের জন্য মুহূর্তটি ছিল অসহনীয় বেদনার; কিন্তু একই সঙ্গে এটি হয়ে ওঠে দাদা ও নাতির সম্পর্কের শেষ শারীরিক সংযোগ—একটি বিদায়ের দায়িত্ব, যা তাঁর স্মৃতিতে আজও অমোচনীয়।

অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান স্মরণ করেন—“দাদাকে নিজের হাতে কবরে শুইয়ে দিতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমি তখন এত ছোট ছিলাম, তবু সেই মুহূর্তের অনুভূতি আজও স্পষ্ট মনে আছে। এখনো ওই আস্তানায় গেলে আমার মন অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে যায়।”

একটি স্থান, যেখানে শোক শান্তিতে রূপ নেয়

ফুলতলার সেই আস্তানা অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের কাছে তাই শুধু একজন সুফিসাধকের স্মৃতিবাহী স্থান নয়। সেখানে শায়িত তাঁর দাদা; সেখানে তাঁর শৈশবের গভীরতম শোকের স্মৃতি; আবার সেখানেই তিনি অনুভব করেন মানসিক প্রশান্তি।

কোনো স্থানের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু স্থাপত্য, জমি বা ভৌগোলিক অবস্থানের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। স্মৃতি, মৃত্যু, ভালোবাসা এবং প্রজন্মান্তরের উপস্থিতি একটি সাধারণ স্থানকে ব্যক্তিগত তীর্থভূমিতে রূপান্তরিত করতে পারে। ফুলতলার আস্তানা এই পরিবারের জন্য তেমনই একটি স্থান—যেখানে হযরত সোলাইমান শাহ চিশতীর স্মৃতি, হাজি চান মিয়ার সমাধি এবং এক শিশুর হাতে দাদাকে শেষ শয্যায় শুইয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা একই মাটিতে মিশে আছে।

দাদির শুচিতা, সুফি জীবনাচার এবং নাতির জন্য একমাত্র ব্যতিক্রম

হাজি চান মিয়ার স্ত্রী (মাহবুব লিটুর দাদি) মহেনজান বিবি’র জীবনেও ধর্মীয় অনুশাসন, শুচিতা এবং আধ্যাত্মিক অনুরাগের গভীর প্রভাব ছিল। পরিবারের স্মৃতিতে তিনি ছিলেন কঠোর শুচিতাবোধসম্পন্ন একজন নারী। নিজের ব্যবহৃত থালা–বাসন, কাপড়চোপড় কিংবা ব্যক্তিগত সামগ্রী অন্য কাউকে স্পর্শ করতে দিতেন না। এমনকি তাঁর স্বামী হাজি চান মিয়ার ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হতো না বলে পরিবারে স্মৃতি রয়েছে।

এই অভ্যাসকে কেউ শুচিবোধ, কেউ কঠোর ব্যক্তিগত পবিত্রতা-চর্চা, আবার কেউ তাঁর সুফি জীবনাচারের অংশ হিসেবে দেখেছেন। তবে পরিবারের সবার জন্য প্রযোজ্য কঠোর নিয়মটির একটি বিস্ময়কর ব্যতিক্রম ছিল—তাঁর ছোট নাতি মাহবুব।

অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান স্মরণ করেন—“দাদির কোনো জিনিস অন্য কেউ ছুঁতে পারত না—থালা–বাসন থেকে শুরু করে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো সামগ্রীই নয়। কিন্তু আমাকে তিনি অনুমতি দিতেন। ছোটবেলায় তাঁর কাছে গেলে শুধু আমার জন্যই সব নিষেধ শিথিল হয়ে যেত। আমার জন্য তাঁর আলাদা ছাড় ছিল।”

শিশুটি হয়তো তখন এই ব্যতিক্রমের তাৎপর্য বুঝতে পারেনি। কিন্তু বয়স বাড়ার পর স্মৃতির দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়—কঠোর নিয়মের আড়ালে দাদির স্নেহ কত গভীর ছিল। যিনি নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে প্রায় কাউকে প্রবেশ করতে দিতেন না, তিনি নাতির জন্য সেই সীমারেখা তুলে নিয়েছিলেন।

এই অনুমতি ছিল ভালোবাসার এক নীরব ভাষা। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়, কোনো উপদেশ নয়—শুধু নিজের সবচেয়ে ব্যক্তিগত জিনিসগুলো স্পর্শ করার অধিকার দিয়ে তিনি নাতিকে বুঝিয়েছিলেন, পরিবারে তার স্থান কতটা বিশেষ।

শুচিতাবোধকে দায়িত্বশীলভাবে পাঠ করা

দাদির কঠোর শুচিতাবোধকে সরাসরি সুফি সাধনার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। ব্যক্তিগত অভ্যাস, ধর্মীয় পবিত্রতার ধারণা এবং মানসিক শুচিবোধ—তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হলেও এক নয়। তবে তাঁর জীবনাচারে ধর্মীয় সংযম, ব্যক্তিগত নিয়ম এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশের প্রভাব ছিল—পারিবারিক স্মৃতি অন্তত সেই ইঙ্গিত দেয়।

তাঁর এই অনমনীয় নিয়ম এবং নাতির জন্য রাখা একমাত্র ব্যতিক্রম পরিবারের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে একটি কোমল মানবিক মাত্রা যোগ করে। সুফি উত্তরাধিকার এখানে শুধু মাজার, খেলাফত বা অলৌকিক জনশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা প্রকাশ পায় দাদি ও নাতির বিশ্বাস, অনুমতি এবং নিঃশর্ত স্নেহের মধ্যেও।

রক্তের দাদা নন, তবু পিতার চেয়েও আপন: হাজি চান মিয়ার পরিচয়ের আরেক অধ্যায়

তবে এই পারিবারিক ইতিহাসের বিস্ময় এখানেই শেষ নয়। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান যাঁকে শৈশব থেকে ‘দাদা’ হিসেবে জেনেছেন এবং নিজের হাতে যাঁকে কবরে নামিয়েছিলেন, সেই হাজি চান মিয়া প্রকৃতপক্ষে তাঁর পিতা রফিকের জন্মদাতা বাবা ছিলেন না। তিনি ছিলেন রফিকের পালকপিতা—পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রে আত্মীয় এবং একই বংশধারার মানুষ। রক্তের সরাসরি পিতৃত্ব না থাকলেও দায়িত্ব, স্নেহ ও সামাজিক স্বীকৃতিতে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন তাঁর প্রকৃত অভিভাবক।

অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের জন্মদাতা পিতামহ ছিলেন আবদুল গনি মাস্টার—একজন শিক্ষক। রফিকের জন্মের আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ফলে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই রফিক পিতৃহারা হন। জন্মের পর তাঁর মা—অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের জন্মদাতা দাদি—এই পিতৃহীন সন্তানকে অসীম স্নেহে আগলে রেখেছিলেন। একমাত্র ছেলেকে তিনি যেন মাথায় করে রাখতেন; তাঁর সমস্ত মমতা, ভয়, আশা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন ঘিরে ছিল ছোট রফিককে।

কিন্তু সেই মাতৃস্নেহও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। রফিকের বয়স যখন মাত্র সাত বছর, তখন তাঁর মাও মৃত্যুবরণ করেন। জন্মের আগেই বাবাকে হারানো শিশুটি এবার মাকেও হারিয়ে প্রায় সম্পূর্ণ এতিম হয়ে পড়ে।

বড় মজলিশে একজন পিতৃহীন শিশুকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ

হাজি চান মিয়া ছিলেন আবদুল গনি মাস্টারের আত্মীয় এবং একই বংশের মানুষ। তাঁর নিজের দুই কন্যাসন্তান ছিল, কিন্তু কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। একটি ছেলের আকাঙ্ক্ষা তাঁর ও তাঁর পরিবারের মনে দীর্ঘদিন ধরেই ছিল।

রফিকের মা মারা যাওয়ার পর আত্মীয়স্বজনেরা যখন শোকাহত পরিবারটিকে দেখতে আসেন, হাজি চান মিয়াও সেখানে উপস্থিত হন। সাত বছরের মাতৃহীন শিশুটির অসহায় অবস্থা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। পরিবারের প্রবীণ ব্যক্তি ও আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বড় মজলিশে তিনি সবার সামনে ঘোষণা করেন—“আজ থেকে রফিক আমার সন্তান। আমি তাকে নিজের ছেলের মতো গ্রহণ করতে চাই।”

পারিবারিক বয়ান অনুযায়ী, উপস্থিত সবাইকে সাক্ষী রেখে তিনি রফিককে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি আধুনিক আইনি অর্থে আনুষ্ঠানিক দত্তকগ্রহণ ছিল কি না, তার কোনো দলিল এখনো পাওয়া যায়নি; বরং একে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ বলাই অধিক যথাযথ। কিন্তু সম্পর্কটির সত্যতা কোনো কাগজের ওপর নির্ভর করেনি। দায়িত্ব, প্রতিপালন, পরিচয় ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে হাজি চান মিয়া রফিকের জীবনে পিতার শূন্যস্থান পূরণ করেছিলেন।

দুই কন্যার সংসারে এলো আকাঙ্ক্ষিত পুত্র

হাজি চান মিয়ার দুই মেয়ে থাকলেও কোনো ছেলে ছিল না। সাত বছরের অনাথ রফিককে ঘরে তুলে নেওয়া তাই শুধু একটি অসহায় শিশুকে আশ্রয় দেওয়া ছিল না; এটি ছিল দুটি অপূর্ণতার পরস্পরকে পূর্ণ করার ঘটনা। একদিকে পিতা-মাতাহারা এক শিশুর প্রয়োজন ছিল নিরাপদ আশ্রয় ও অভিভাবকত্বের; অন্যদিকে পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষায় থাকা একটি পরিবার খুঁজে পেয়েছিল এমন একজন সন্তানকে, যার সঙ্গে তাদের আগে থেকেই আত্মীয়তা ও রক্তের সম্পর্ক ছিল।

এখানে ‘সৎপিতা’ শব্দটির চেয়েও ‘পালকপিতা’ বা ‘সন্তানরূপে গ্রহণকারী অভিভাবক’ পরিচয়টি বেশি যথার্থ। কারণ হাজি চান মিয়া শুধু রফিকের মাকে বিয়ে করার সূত্রে তাঁর বাবা হননি; বরং একটি পারিবারিক মজলিশে সবার সম্মতিক্রমে পিতৃহীন রফিকের লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

জন্মসূত্রের সম্পর্ক যেখানে মৃত্যুতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, সেখানে মানবিক দায়িত্বের সম্পর্ক নতুন করে একটি পরিবার নির্মাণ করেছিল। সেই পরিবারের ভেতরেই রফিক বড় হন, পরিচয় লাভ করেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজের সন্তানদের কাছে হাজি চান মিয়াকে তাঁদের দাদা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

যে দাদাকে নিজের হাতে কবরে নামিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন বাবার আশ্রয়দাতা

এই পরিচয়টি জানার পর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের শৈশবের সেই কবরের স্মৃতি আরও গভীর অর্থ ধারণ করে। তিনি যাঁকে নিজের দাদা হিসেবে ভালোবেসেছেন, যাঁর মরদেহ ছোট হাতে ধরে শেষ শয্যায় নামিয়েছেন, তিনি তাঁর জন্মদাতা পিতামহ ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি তাঁর সাত বছর বয়সী এতিম বাবাকে নিজের সন্তান বলে গ্রহণ করেছিলেন।

অতএব, কবরের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছোট মাহবুব শুধু একজন দাদাকে সমাহিত করেননি; তিনি শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন সেই মানুষটিকে, যাঁর মানবিক সিদ্ধান্ত তাঁর বাবার শৈশবকে অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা করেছিল এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের পারিবারিক পরিচয় নির্মাণ করেছিল।

আজিজ মাস্তানের সেই কথার তাৎপর্যও তাই নতুনভাবে ধরা দেয়—“এটা তোমার জীবনের শেষ সুযোগ। নিজের হাতে তোমার দাদাকে ধরে নামাও।”

সেদিন শিশুটি হয়তো এই সম্পর্কের ইতিহাস ও গভীরতা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। কিন্তু আজ স্মৃতির দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, হাজি চান মিয়াকে কবরে নামানোর মধ্য দিয়ে সে যেন একটি ঋণস্বীকারের ঐতিহাসিক মুহূর্তে অংশ নিয়েছিল—সেই মানুষটির প্রতি, যিনি একদিন তার পিতৃহীন বাবাকে নিজের ছেলে বলে বুকে তুলে নিয়েছিলেন।

নদী নিয়ে গেছে জন্মদাতা দাদাদাদির কবর

এই ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হলো, অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের জন্মদাতা পিতামহ আবদুল গনি মাস্টার এবং জন্মদাতা পিতামহীর কবর আজ আর দৃশ্যমান নেই। নদীভাঙনে তাঁদের সমাধিস্থল বিলীন হয়ে গেছে। পারিবারিক স্মৃতি অনুসারে, মেঘনা–পদ্মার ভাঙন তাঁদের কবরসহ সেই পুরোনো বসতভিটার বহু চিহ্ন গ্রাস করেছে।

কবর হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু মাটির একটি নির্দিষ্ট স্থান হারিয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় ফুল দেওয়ার জায়গা, দোয়া করার পরিচিত ঠিকানা এবং সন্তান–নাতিদের ফিরে দাঁড়ানোর দৃশ্যমান স্মৃতিচিহ্ন। আবদুল গনি মাস্টার ও তাঁর স্ত্রীর কবর এখন নদীর স্রোতের নিচে অথবা পরিবর্তিত ভূখণ্ডের অচেনা কোনো স্তরে মিশে আছে। তাঁদের কোনো দৃশ্যমান সমাধি না থাকলেও পারিবারিক বয়ান, সন্তানের জীবন এবং পরবর্তী প্রজন্মের স্মৃতিতে তাঁদের অস্তিত্ব রয়ে গেছে।

অন্যদিকে হাজি চান মিয়ার কবর এখনো ফুলতলার আস্তানায় টিকে আছে। ফলে ইতিহাস যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য নির্মাণ করেছে—জন্মদাতা পিতামহ ও পিতামহীর কবর নদী নিয়ে গেছে, অথচ বাবাকে সন্তানরূপে গ্রহণকারী পালকপিতার কবর সেই আধ্যাত্মিক আস্তানায় আজও পরিবারের জন্য দৃশ্যমান স্মৃতি ও শান্তির ঠিকানা হয়ে আছে।

কবর মুছে যায়, সম্পর্কের ইতিহাস মুছে যায় না

নদী মানচিত্র বদলে দিতে পারে, বসতভিটা গ্রাস করতে পারে, এমনকি পূর্বপুরুষের কবরও নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে; কিন্তু মানুষের মুখে বহমান স্মৃতি সহজে মুছে ফেলতে পারে না। আবদুল গনি মাস্টারের অকালমৃত্যু, তাঁর স্ত্রীর একমাত্র সন্তানকে আগলে রাখা, সাত বছর বয়সে রফিকের মাতৃহারা হওয়া, বড় মজলিশে হাজি চান মিয়ার তাঁকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সেই পালকপিতার শেষ বিদায়—সব ঘটনা যেন এখন একটি পূর্ণ বৃত্ত তৈরি করে।

অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান যখন এসব স্মৃতি ফিরে দেখেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। তখন স্পষ্ট হয়, পরিবার শুধু জন্মসূত্রে গড়ে ওঠে না; কখনো দায়িত্ব গ্রহণের একটি ঘোষণা, একটি অনাথ শিশুকে বুকে টেনে নেওয়া এবং আজীবন তার পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েও একটি নতুন বংশগত স্মৃতি নির্মিত হয়।

হাজি চান মিয়া সেই অর্থে শুধু তাঁর বাবার পালক-পিতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি বিপন্ন পারিবারিক ধারাবাহিকতার রক্ষক। আর যে নাতি একদিন তাঁকে নিজের হাতে কবরে শুইয়ে দিয়েছিল, আজ তার স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে সেই মানবিক উত্তরাধিকার আবার ইতিহাসের ভাষা লাভ করছে।

তিনটি স্মৃতির একই ঠিকানা

ফুলতলার আস্তানায় এভাবে তিনটি ইতিহাস একত্র হয়েছে—হযরত সোলাইমান শাহ চিশতীর অবস্থান ও প্রস্থানের স্মৃতি, হাজি চান মিয়ার সমাধি এবং তাঁর নাতির শৈশবের আবেগময় অভিজ্ঞতা।

একদিকে দাদাকে নিজের হাতে কবরে নামানোর বেদনা, অন্যদিকে দাদির কঠোর ব্যক্তিগত নিয়মের মধ্যেও নাতির জন্য অবারিত অনুমতি—এই দুই বিপরীত স্মৃতি অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের শৈশবকে একই সঙ্গে শোক ও স্নেহের আলোয় আবৃত করে রেখেছে।

তাই আজও তিনি যখন সেই আস্তানায় যান, সেখানে শুধু কবর দেখেন না; দেখতে পান দাদার শেষ বিদায়, দাদির নিঃশব্দ ভালোবাসা এবং হযরত সোলাইমান শাহ চিশতীর রেখে যাওয়া আধ্যাত্মিক স্মৃতির ধারাবাহিকতা। সেই মাটি তাঁর কাছে ইতিহাসেরও, পরিবারেরও—আবার একান্ত ব্যক্তিগত শান্তিরও ঠিকানা।

চতুর্থ অংশ

পিতা পুত্র : সম্পর্ক, আধ্যাতিকতা

শিক্ষকতা থেকে আইনাঙ্গনে: মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের শিক্ষা, সংগ্রাম সমাজসেবার জীবন

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের পিতা মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই পিতা-মাতাকে হারালেও প্রতিকূলতার কাছে তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। পালকপিতা হাজি চান মিয়ার আশ্রয় ও পারিবারিক সহযোগিতায় শিক্ষা অব্যাহত রেখে তিনি একাধিক বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী জীবনে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, আইনজীবী, আইন উপদেষ্টা ও সমাজসংস্কারক—প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেন।

বহুমুখী শিক্ষাজীবন

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ১৯৬৪ সালে ইমামপুর পিএম উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পাস করেন। পরে মুন্সীগঞ্জের সরকারি হরগঙ্গা কলেজে বাণিজ্য বিভাগে অধ্যয়ন করে ১৯৬৭ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৭০ সালে তিনি বিকম ডিগ্রি এবং ১৯৭২ সালে শহীদ সুরাওয়ার্দী কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষকতাকে আরও পেশাগত ও বিজ্ঞানভিত্তিক করার লক্ষ্যে তিনি ১৯৭৫ সালে ঢাকার সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। কিন্তু তাঁর শিক্ষা অনুসন্ধান সেখানেই থেমে থাকেনি। শিক্ষকতা করতে গিয়ে শিক্ষকদের অধিকার, পেশাগত মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের নানা প্রশ্ন তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি আইন অধ্যয়নের সিদ্ধান্ত নেন। নারায়ণগঞ্জ ল কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৮২ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ফলে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয় চারটি গুরুত্বপূর্ণ ডিগ্রি—বিএ, বিকম, বিএড ও এলএলবি। বাণিজ্য, সাধারণ শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং আইন—চারটি পৃথক জ্ঞানক্ষেত্রে তাঁর অধ্যয়ন তাঁর বহুমাত্রিক পেশাজীবনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।

সুফিসাধকের ভবিষ্যদ্বাণী এবং শিক্ষকতায় প্রবেশ

পারিবারিক মৌখিক ইতিহাসে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কর্মজীবনকে ঘিরে হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.)-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, ১৯৭০ সালে বিকম পাস করার পর তিনি যখন সরকারি চাকরির প্রত্যাশা করছিলেন, তখন হযরত সোলাইমান শাহ তাঁকে জানিয়েছিলেন—তাঁর সরকারি চাকরি হবে না; তাঁর প্রকৃত কর্মক্ষেত্র হবে শিক্ষকতা।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে সেই কথাই যেন সত্য হয়ে ওঠে। সরকারি চাকরির পরিবর্তে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে সাধারণ সহকারী শিক্ষক হিসেবে নয়—তাঁর কর্মজীবনের সূচনাই ঘটে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে। অল্প বয়সে এমন দায়িত্ব লাভ তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, নেতৃত্বের সামর্থ্য এবং সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতি বহন করে।

বিদ্যালয় থেকে বিদ্যালয়ে নেতৃত্বের বিস্তার

লৌহজং উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে কর্মজীবন শুরু করার পর তিনি পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন ফরিদপুর জেলার নড়িয়া থানার ডগরী–চন্দ্রপুর এলাকার সুরেশ্বর উচ্চবিদ্যালয়ে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে সখীপুর ইসলামিয়া দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে এসব এলাকার বর্তমান জেলা ও উপজেলা পরিচয় পরিবর্তিত হয়ে শরীয়তপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বাবা, তুমি কোথায় | বাবাকে হারানোর আবেগঘন বাংলা গান | Mahbub Litu | Emotional Father Song

পরবর্তী সময়ে তিনি নিজ জেলা মুন্সীগঞ্জে ফিরে এসে রিকাবীবাজার উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। প্রায় ১৭ বছর ধরে উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ে তিনি শুধু পাঠদান বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; শিক্ষক–শিক্ষার্থীর মর্যাদা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা, ন্যায়সংগত ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর কাছে বিদ্যালয় ছিল কেবল পরীক্ষায় পাস করানোর প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ছিল মানুষ গড়া, নৈতিকতা সৃষ্টি এবং সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তী সময়ে তাঁর সন্তানদের জীবন, শিক্ষা ও পেশা নির্বাচনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

শিক্ষকদের মর্যাদার প্রশ্ন থেকেই আইন অধ্যয়ন

দীর্ঘ শিক্ষকতা-জীবনে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম শিক্ষকদের অধিকারহীনতা, প্রশাসনিক বৈষম্য এবং পেশাগত মর্যাদাসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে একধরনের প্রতিবাদী চেতনা তৈরি করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেন, নৈতিক প্রতিবাদের পাশাপাশি আইন জানা না থাকলে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অনেক সময় পূর্ণতা পায় না।

এই উপলব্ধিই তাঁকে কর্মরত অবস্থায় আইন পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। নারায়ণগঞ্জ ল কলেজ থেকে ১৯৮২ সালে এলএলবি সম্পন্ন করার পরও তিনি সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকতা ছেড়ে দেননি। একদিকে দীর্ঘদিনের প্রিয় শিক্ষকতা, অন্যদিকে আইনপেশার মাধ্যমে বৃহত্তর পরিসরে মানুষের অধিকার রক্ষার সম্ভাবনা—এই দুইয়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর সময় লেগেছিল।

অবশেষে প্রায় ১৭ বছরের প্রধান শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৮৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিয়ে আইনাঙ্গনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। মুন্সীগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির আওতায় আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে জেলা আদালতে পেশাগত কার্যক্রম শুরু করেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা আদালতে আইনচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

শিক্ষক থেকে আইনজীবীআদর্শের পরিবর্তন নয়, ক্ষেত্রের পরিবর্তন

পেশা বদলালেও তাঁর জীবনের মৌলিক আদর্শ বদলায়নি। শিক্ষক হিসেবে তিনি মানুষকে জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার পথে গড়ে তুলতে চেয়েছেন; আইনজীবী হিসেবে তিনি মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও আইনি সুরক্ষার পক্ষে কাজ করেছেন। তাই শিক্ষকতা থেকে আইনপেশায় তাঁর যাত্রাকে একটি আদর্শ ত্যাগ করে অন্য পেশা গ্রহণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি ছিল একই সামাজিক দায়িত্ববোধের নতুন কর্মক্ষেত্রে সম্প্রসারণ।

আইনজীবী হিসেবে তিনি অগ্রণী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনি বিষয় পরিচালনার পাশাপাশি সাধারণ বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্যও তিনি কাজ করেছেন। পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক ও সংস্কারমূলক উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।

সমাজসংস্কার সাংগঠনিক নেতৃত্ব

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম মুন্সীগঞ্জে ‘ফেমা’র সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন । এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক কল্যাণ ও সমাজসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কাজের পরিসর ছিল বহুমাত্রিক—শিক্ষার প্রসার, পেশাগত মর্যাদা, আইনি সচেতনতা, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় মানুষের কল্যাণ।

তাঁর নেতৃত্ব ছিল কেবল পদকেন্দ্রিক নয়; মানুষের সমস্যা শোনা, প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে পরিবর্তন আনার মধ্যেই তার প্রকাশ ঘটেছিল। একজন এতিম শিশু হিসেবে জীবনের শুরুতে যে মানুষটি অন্যের আশ্রয় ও ভালোবাসা পেয়েছিলেন, পরিণত বয়সে তিনিই শিক্ষা, আইন ও সমাজসেবার মাধ্যমে বহু মানুষের আশ্রয় ও পরামর্শের ঠিকানায় পরিণত হন।

তিন প্রজন্মে শিক্ষার উত্তরাধিকার

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের জীবন পারিবারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ তৈরি করেছে। তাঁর জন্মদাতা পিতা আবদুল গনি মাস্টার ছিলেন একজন শিক্ষক। নিজেও তিনি শিক্ষকতা দিয়ে পেশাজীবন শুরু করেন এবং দীর্ঘ সময় প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী প্রজন্মে তাঁর পুত্র অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষা গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

এ যেন তিন প্রজন্মে বিস্তৃত এক শিক্ষার উত্তরাধিকার—ব্রিটিশ আমলের শিক্ষক আবদুল গনি মাস্টার, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ পর্বের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিদ্যালয়-অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। সময়, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার স্তর বদলেছে; কিন্তু মানুষ গড়ার অঙ্গীকারটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে।

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের প্রতিবাদী মন, শিক্ষকদের মর্যাদার প্রশ্নে তাঁর সংবেদনশীলতা, আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার এবং সমাজসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের প্রভাব তাঁর সন্তানদের জীবনেও দৃশ্যমান। বিশেষ করে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা নিয়ে কাজের মধ্যে পিতার সেই উত্তরাধিকারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।

তাই মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের জীবনী শুধু একজন প্রধান শিক্ষক কিংবা আইনজীবীর পেশাগত ইতিহাস নয়। এটি পিতৃহীন এক শিশুর ঘুরে দাঁড়ানো, শিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে নির্মাণ, বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব থেকে আদালতের ন্যায়বিচারের মঞ্চে উত্তরণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষা ও সমাজসেবার আদর্শ সঞ্চারিত করার এক অনুপ্রেরণাময় জীবনকথা।

ছাত্ররাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ভাসানী ন্যাপ: রফিকুল ইসলামের রাজনৈতিক চেতনার নির্মাণ

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের জীবন কেবল শিক্ষা, শিক্ষকতা ও আইনপেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি রাজনীতিসচেতন ছিলেন এবং দেশের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল পদ-পদবি বা ব্যক্তিগত ক্ষমতা অর্জনের পথ নয়; এটি ছিল বঞ্চিত মানুষের অধিকার, সামাজিক সাম্য এবং শোষণমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশে তাঁর ছাত্রজীবন অতিবাহিত হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর চাপ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তরুণ রফিকুল ইসলাম তার প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। ছাত্রজীবনের এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাই পরবর্তী সময়ে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনীতির দিকে নিয়ে যায়।

শিক্ষার্থী অবস্থায় নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা

শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে অধ্যয়নের সময় তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বিএড অধ্যয়নকালে তাঁর ছাত্রনেতৃত্ব আরও সুস্পষ্ট রূপ পায়। পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ছাত্র সংসদে নির্বাচিত ‘কলেজ দিবস সম্পাদক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই দায়িত্ব কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে সীমিত ছিল না; শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করা, কলেজের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়া এবং ছাত্রদের দাবি ও মতামত প্রশাসনের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। একজন প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষক হয়েও তিনি ছাত্ররাজনীতি, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষা-অধিকারের প্রশ্নকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছিলেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্জিত এই নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে প্রধান শিক্ষক, সমাজসংগঠক এবং আইনজীবী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনে সহায়ক হয়েছিল।

শিক্ষকতার মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান

১৯৭০ সালে বিকম পাস করার পর মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। কিন্তু তাঁর পেশাজীবন শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের রাজনৈতিক সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির গণরায় অস্বীকার, ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যামূলক অভিযান তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করে।

দেশের মুক্তিসংগ্রাম শুরু হলে তিনি চাকরি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সীমা অতিক্রম করে যুদ্ধে যুক্ত হন। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই নয়; এটি ছিল মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, আত্মমর্যাদা ও শোষণমুক্তির সংগ্রাম।

পারিবারিক মৌখিক ইতিহাস অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি একাধিকবার পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েছিলেন। প্রতিবারই তাঁর জীবন ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ, ভয়ভীতি কিংবা নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল কি না, সে সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ লিখিত বিবরণ এখনো পাওয়া যায়নি; তবে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বারবার আটক হওয়ার স্মৃতি পরিবারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

একই সময়ে ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক বিপর্যয়

মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ সময়েই তাঁর জীবনে আরেকটি বড় আঘাত আসে। তাঁর পরিবারের আধ্যাত্মিক অভিভাবক হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.) ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন বলে পারিবারিক বয়ান ও প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রসহ ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

ফলে রফিকুল ইসলামের কাছে মুক্তিযুদ্ধ শুধু জাতীয় ইতিহাসের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত শোক ও ক্ষতিরও ইতিহাস। একদিকে তিনি নিজে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, অন্যদিকে সেই বাহিনীর হাতেই হারিয়েছেন পরিবারের শ্রদ্ধেয় পীর ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শককে।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে আরও গভীর করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন শুধু রাজনৈতিক কর্মীকেই আঘাত করে না; তা পরিবার, ধর্মীয় আশ্রয়, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানুষের আধ্যাত্মিক জগতকেও ক্ষতবিক্ষত করে।

মওলানা ভাসানীর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক

স্বাধীনতার পর মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি—ভাসানী ন্যাপে যোগ দেন। পারিবারিক স্মৃতি অনুযায়ী, মওলানা ভাসানীর সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল।

মজলুম জননেতা হিসেবে পরিচিত ভাসানীর রাজনীতি কৃষক, শ্রমিক, দরিদ্র ও শোষিত মানুষের অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। সাম্রাজ্যবাদ, বৈষম্য, সামন্তবাদ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তরুণ রফিকুল ইসলামকে আকৃষ্ট করে। সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে ভাসানীর আপসহীনতা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।

রফিকুল ইসলাম নিজেই তাঁর এই রাজনৈতিক আকর্ষণের ব্যাখ্যায় আধ্যাত্মিকতা ও সাম্যবাদী চেতনাকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে দেখতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা মানুষকে নিছক জাগতিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে না; বরং দরিদ্র, নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক দায়িত্ব সৃষ্টি করে।

তাঁর চিন্তার সারবত্তা এভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে—“আধ্যাত্মিকতা আমাকে মানুষের দুঃখ অনুভব করতে শিখিয়েছে, আর সাম্যবাদী চিন্তা সেই দুঃখের সামাজিক কারণ বুঝতে সাহায্য করেছে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই দুই আকর্ষণই আমাকে ভাসানীর রাজনীতির কাছে নিয়ে গিয়েছিল।”

সুফি মানবতাবাদ সাম্যের রাজনীতির মিলন

রফিকুল ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের বিশেষত্ব ছিল সুফি আধ্যাত্মিকতা ও শোষণবিরোধী রাজনীতির মধ্যে একটি মানবিক সংযোগ অনুসন্ধান। শৈশবে হাজি চান মিয়ার আশ্রয়, হযরত সোলাইমান শাহ চিশতীর সান্নিধ্য এবং পরিবারের সুফি পরিবেশ তাঁকে মানুষের প্রতি মমতা, আত্মসংযম ও মানবসেবার শিক্ষা দিয়েছিল। অন্যদিকে ছাত্ররাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ এবং সমাজের বৈষম্যমূলক বাস্তবতা তাঁকে সাম্য ও অধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক চিন্তার দিকে নিয়ে যায়।

তাঁর কাছে সুফিবাদ মানে কেবল ব্যক্তিগত সাধনা কিংবা আচারনির্ভর ধর্মচর্চা ছিল না; বরং মানুষের কল্যাণ, দুর্বলের প্রতি সহমর্মিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান গ্রহণও ছিল আধ্যাত্মিকতার অংশ। একইভাবে সাম্যবাদী আদর্শের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ধর্মবিরোধিতা থেকে নয়, বরং সম্পদের বৈষম্য, শোষণ ও মানুষের অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান থেকে সৃষ্টি হয়েছিল।

এই জায়গাতেই তিনি মওলানা ভাসানীর মধ্যে আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব ও গণমানুষের রাজনীতির এক অনন্য সমন্বয় দেখতে পেয়েছিলেন। ভাসানী ছিলেন একদিকে ধর্মীয় নেতা, অন্যদিকে কৃষক–শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামী কণ্ঠস্বর। রফিকুল ইসলামের নিজের জীবনদর্শনের সঙ্গেও এই যুগল পরিচয়ের গভীর সাদৃশ্য ছিল।

রাজনীতি থেকে শিক্ষা আইনের পথে একই সংগ্রাম

রফিকুল ইসলাম পরবর্তী সময়ে সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও তাঁর শিক্ষকতা, আইনচর্চা ও সমাজসেবার মধ্যে ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক চেতনার ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।

প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষার অধিকার ও শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। আইনজীবী হিসেবে ন্যায়বিচার ও মানুষের আইনি অধিকারের জন্য কাজ করেছেন। সমাজসংগঠক হিসেবে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর কর্মক্ষেত্র বদলেছে, কিন্তু সংগ্রামের মূল লক্ষ্য বদলায়নি—মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা।

এই রাজনৈতিক ও নৈতিক উত্তরাধিকার তাঁর সন্তানদের মধ্যেও প্রবাহিত হয়েছে। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তি, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকেন্দ্রিক চিন্তা ও কর্মে পিতার সেই মানবিক ও প্রতিবাদী জীবনদর্শনের প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায়।

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের জীবন তাই একজন ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারী, শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, আইনজীবী কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পরিচয়ের সমষ্টি নয়। এটি আধ্যাত্মিক মানবতাবোধ থেকে সাম্যের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষকতা এবং শিক্ষা থেকে আইন ও ন্যায়বিচারের দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি অবিচ্ছিন্ন সংগ্রামী জীবনকথা।

আমৃত্যু সাংগঠনিক নেতৃত্ব: মুন্সীগঞ্জ জেলায় নানা সম্পৃক্ততা

শিক্ষকতা, আইনপেশা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন উদ্যোগ ও সামাজিক সংগঠনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মৃত্যুর আগপর্যন্ত মুন্সীগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সহ- সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এটি তাঁর সমাজসেবামূলক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আইনজীবী হিসেবে মানুষের আইনি সমস্যার সমাধান, সাবেক প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার প্রসার এবং সমিতির প্রতিনিধি হিসেবে স্থানীয় উন্নয়ন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয়—এই তিন ক্ষেত্রকে তিনি পরস্পরসম্পর্কিত দায়িত্ব হিসেবে দেখতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সমাজ পরিবর্তনের জন্য শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত, নাগরিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগকেও সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হয়।

জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সাংগঠনিক দায়িত্বে সক্রিয় থাকা তাঁর কর্মনিষ্ঠার পরিচায়ক। অসুস্থতা কিংবা বয়স তাঁকে সামাজিক দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মুন্সীগঞ্জের শিক্ষা, আইন ও নাগরিক সমাজের একটি বহুমুখী অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

পিতার স্বপ্নেই শিক্ষকের পথে অধ্যাপক মাহবুব লিটু

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান—মাহবুব লিটু—নিজের শিক্ষকতাজীবনের পেছনে পিতা মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের অনুপ্রেরণাকেই সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর ভাষায়, শিক্ষকতা তাঁর কাছে আকস্মিকভাবে বেছে নেওয়া কোনো পেশা নয়; এর বীজ রোপণ করেছিলেন তাঁর বাবা—যিনি নিজে দীর্ঘদিন শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর মাহবুব লিটু প্রথমে ব্যাংকের চাকরিতে যোগ দেন। এর আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায়ও তিনি তুলনামূলকভাবে ভালো বেতন পেতেন। সে সময় সরকারি চাকরির বেতনস্কেল বেসরকারি খাতের তুলনায় অনেক কম ছিল। ফলে আর্থিক বিবেচনায় ব্যাংক কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেওয়া সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না।

তাঁর মা চাননি, ছেলে ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে কম বেতনের সরকারি শিক্ষকতায় প্রবেশ করুক। একজন মায়ের দৃষ্টিতে এটি ছিল সন্তানের আর্থিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। কিন্তু মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখেছিলেন। নিজের শিক্ষকতাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন, শিক্ষকতা শুধু মাসিক বেতনের পেশা নয়; এটি মানুষ গড়া এবং জ্ঞান ও মূল্যবোধকে প্রজন্মান্তরে বহন করার দায়িত্ব।

পুত্রকে তিনি বলেছিলেন—“আমি যে টিচার্স ট্রেনিং কলেজে পড়েছি, সেই কলেজেই আমার ছেলে শিক্ষক হবে—এটি আমার জন্য গর্বের। আর ভবিষ্যতে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ আসে, তাহলে তোমাকে শিক্ষকতাতেই থাকতে হবে।”

পিতার এই প্রত্যাশা ও অনুপ্রেরণায় মাহবুব লিটু বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে প্রথমে টিচার্স ট্রেনিং কলেজে (মহিলা) ময়মনসিংহে এবং পরে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করেন। যে প্রতিষ্ঠানে একসময় তাঁর পিতা বিএড অধ্যয়ন করেছিলেন এবং ছাত্রনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানে পুত্রের শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসা পরিবারের শিক্ষাগত ইতিহাসে এক প্রতীকী বৃত্ত সম্পন্ন করে।

পরবর্তী সময়ে যখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পান, তখনও পিতার সেই নির্দেশনা তাঁর সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এভাবেই পিতার স্বপ্ন অনুসরণ করে কলেজশিক্ষক মাহবুব লিটু একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অধ্যাপক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

পিতা, বন্ধু জীবনের প্রধান পরামর্শদাতা

পিতাকে স্মরণ করতে গিয়ে অধ্যাপক মাহবুব লিটু বলেন—“এমন একজন পিতা পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। তিনি শুধু আমার বাবা ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমার বন্ধু এবং জীবনের সবচেয়ে বড় পরামর্শদাতা।”

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের অভিভাবকত্বের বিশেষত্ব ছিল, তিনি সন্তানদের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন না। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একটিমাত্র পথ অনুসরণের নির্দেশ দেওয়ার পরিবর্তে তিনি সম্ভাব্য কয়েকটি পথ সামনে তুলে ধরতেন। প্রতিটি বিকল্পের সুবিধা, অসুবিধা ও ভবিষ্যৎ পরিণতি বুঝিয়ে দিতেন; তারপর সন্তানকে নিজের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিতেন।

অধ্যাপক মাহবুব লিটুর স্মৃতিতে—“বাবা কোনো কিছু চাপিয়ে দিতেন না। তিনি আমাকে কয়েকটি বিকল্প দিতেন, প্রতিটির সম্ভাব্য ফল বুঝিয়ে বলতেন এবং সেখান থেকে নিজের পথটি বেছে নিতে বলতেন। সিদ্ধান্ত আমার হলেও তাঁর পরামর্শ সব সময় আমার সঙ্গে থাকত।”

একজন প্রধান শিক্ষক ও আইনজীবীর অভিজ্ঞতা তাঁর পিতৃত্বের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছিল। শিক্ষক হিসেবে তিনি প্রশ্ন করতে ও শিখতে উৎসাহিত করতেন; আইনজীবীর মতো সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরতেন; আর বন্ধু হিসেবে সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।

তিন বছর পর একটি কাগজ, চার বছর পর আরেকটি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাহবুব লিটুর ভর্তি হওয়ার সময় পিতা-পুত্রের মধ্যকার একটি কথোপকথন তাঁর স্মৃতিতে বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতেই মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তাঁকে বলেছিলেন—“আমি তোমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিচ্ছি। আগামী তিন বছর তোমাকে পড়াশোনা নিয়ে কিছু বলব না। তিন বছর পর তোমার কাছ থেকে একটি কাগজ দেখতে চাইব, আর চার বছর পর দেখতে চাইব আরেকটি কাগজ। ওই দুটি কাগজই প্রমাণ করবে তুমি আমার কথার মর্যাদা রেখেছ কি না।”

প্রথম ‘কাগজ’টি ছিল স্নাতক সম্মান ডিগ্রির ফল বা সনদ; দ্বিতীয়টি ছিল স্নাতকোত্তর ডিগ্রির ফল বা সনদ। পিতার কথায় দৃঢ়তা ছিল, কিন্তু তা ছিল না দমনমূলক। তিনি প্রতিদিন পড়াশোনার হিসাব নেননি, অযথা নজরদারি করেননি কিংবা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। বরং পূর্ণ স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।

‘তুমি আমার ছেলে থাকবে কি না’—এমন আবেগঘন ভাষায় তিনি মূলত সম্পর্ক অস্বীকারের কথা বলেননি; বরং পুত্রকে দায়িত্বশীল, আত্মমর্যাদাবান ও প্রতিশ্রুতিশীল করে তোলার জন্য স্নেহমিশ্রিত দৃঢ়তার আশ্রয় নিয়েছিলেন। এতে ছিল একজন শিক্ষকের প্রত্যাশা, একজন পিতার বিশ্বাস এবং একজন বন্ধুর নীরব চ্যালেঞ্জ।

এই ধরনের উৎসাহ মাহবুব লিটুর মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির বোধ তৈরি করেছিল। পিতা তাঁকে পথ দেখিয়েছেন, কিন্তু সেই পথে নিজের পায়ে হাঁটার স্বাধীনতাও দিয়েছেন।

সংকটে যাঁর কাছে সব কথা বলা যেত

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ছিলেন পুত্রের কাছে নিরাপদ কথোপকথনের আশ্রয়। ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা, শিক্ষা, চাকরি, পেশা কিংবা জীবনের যেকোনো জটিল সিদ্ধান্ত—সবকিছুই তাঁর সঙ্গে নির্দ্বিধায় ভাগ করে নেওয়া যেত। তিনি আগে মন দিয়ে শুনতেন, পরে সম্ভাব্য বিকল্পগুলো বিশ্লেষণ করতেন এবং সর্বশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব পুত্রের হাতেই ছেড়ে দিতেন।

অধ্যাপক মাহবুব লিটু বলেন—“জীবনের যেকোনো সমস্যার কথা বাবার সঙ্গে শেয়ার করতে পারতাম। তিনি আমার কথা শুনতেন, পথগুলো দেখিয়ে দিতেন; কিন্তু কোন পথে যাব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা আমাকে দিতেন।”

এই সম্পর্কটি ছিল প্রচলিত কর্তৃত্বনির্ভর পিতা-পুত্র সম্পর্কের চেয়ে আলাদা। এখানে শাসন ছিল, কিন্তু অপমান ছিল না; প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু জবরদস্তি ছিল না; দিকনির্দেশনা ছিল, কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করা হয়নি। তাঁর অভিভাবকত্বের কেন্দ্রে ছিল সন্তানের সক্ষমতার ওপর আস্থা।

জীবনের ক্লান্তিলগ্নে পিতার অনুপস্থিতি

২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের মৃত্যু অধ্যাপক মাহবুব লিটুর জীবনে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে। সময়ের সঙ্গে পেশাগত অর্জন, সামাজিক দায়িত্ব ও অভিজ্ঞতা বেড়েছে; কিন্তু জীবনের কঠিন সময়ে নির্ভয়ে সব কথা বলার সেই মানুষটির অভাব আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে।

অধ্যাপক মাহবুব লিটু প্রায়ই বলেন—“বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, জীবনের এই ক্লান্ত ও কঠিন সময়ে তাঁর সঙ্গে সব কথা বলা যেত। তাঁর পরামর্শ, সাহস এবং মানসিক আশ্রয় পেলে হয়তো আরও দৃঢ়ভাবে সামনে এগিয়ে যেতে পারতাম।”

এই অনুভূতি শুধু একজন প্রয়াত পিতার জন্য সন্তানের ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি একজন আজীবন পরামর্শদাতাকে হারানোর বেদনাও। জীবনের কোনো সংকটে তিনি হয়তো পুত্রের হয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন না; কিন্তু সম্ভাব্য পথগুলো সামনে মেলে ধরে বলতেন—“ভেবে দেখো, তারপর নিজের পথ নিজেই বেছে নাও।”

Father, Where Are You? | Your Love Has Never Died | Emotional Memorial

আজ পিতা শারীরিকভাবে পাশে নেই, কিন্তু তাঁর শেখানো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, শিক্ষকতার প্রতি শ্রদ্ধা, মানুষের অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং প্রতিকূলতায় মাথা উঁচু রাখার শিক্ষা পুত্রের জীবনে রয়ে গেছে। যে পিতা একদিন নিজের টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ছেলেকে শিক্ষক হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, তাঁর সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত আরও বিস্তৃত হয়েছে—সেই পুত্র একসময় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছেন।

এ অর্থে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের মৃত্যুতে তাঁর প্রভাবের সমাপ্তি ঘটেনি। তাঁর অপূর্ণ উপস্থিতি আজও পুত্রের সিদ্ধান্ত, শিক্ষকতার দর্শন, ন্যায়বোধ এবং জীবনের ক্লান্ত পথে এগিয়ে চলার নীরব শক্তি হয়ে আছে।

রক্তের টান, শেষ অপেক্ষা এবং পিতার অন্তিম উপদেশ

পিতা মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর স্মৃতি বলতে গিয়ে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান—মাহবুব লিটু—একটি গভীর উপলব্ধির কথা বলেন—“রক্তের ভেতরে যে টান, যে আধ্যাত্মিক সংযোগ বহমান থাকে, তাকে জীবন থেকে কোনোভাবেই মুছে ফেলা যায় না। দূরত্ব হয়তো মানুষকে আলাদা রাখে, কিন্তু সেই অদৃশ্য সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয় না।”

২০০৭ সালের ‘ওয়ান-ইলেভেন’-তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অস্থির সময়ে ভারত সরকারের একটি বৃত্তি নিয়ে তিনি কম্পিউটারবিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ নিতে দিল্লি যান। প্রায় দেড় মাসের কোর্স শেষ করে দেশে ফেরার সময় তাঁর মনে পিতা-মাতাকে দেখার প্রবল আকুলতা তৈরি হয়। ঢাকায় অবতরণের পর অন্য কোনো কাজ না করে তিনি সরাসরি মুন্সীগঞ্জের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।

তোমাকে দেখার জন্যই আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন

সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে পৌঁছে কলিং বেল বাজাতেই তাঁর মা দরজা খুলে দেন। ঘরে ঢুকে তিনি প্রথমে শয্যাশায়ী বাবাকে সালাম করেন। দীর্ঘদিন পর ছেলেকে সামনে দেখে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন—“বাবা, তোমাকে একবার দেখার জন্যই হয়তো আল্লাহ আমাকে এত দিন বাঁচিয়ে রেখেছেন। তা না হলে হয়তো মাসখানেক আগেই আমি আল্লাহর কাছে চলে যেতাম।”

মাহবুব লিটু কথাটিকে তখন একজন অসুস্থ ও আবেগপ্রবণ পিতার স্নেহমিশ্রিত অভিব্যক্তি হিসেবেই নিয়েছিলেন। তিনি ভাবেননি, এর মধ্যে আসন্ন বিদায়ের কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকতে পারে। এবং এতা অল্প বয়সেই তার বাবা চলে যেতে পারে। পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে তিনি ঘুমাতে যান। পরদিন খুব ভোরেই কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নেন।

সেই সময় তিনি সরকারি শিক্ষক হিসেবে ময়মনসিংহ মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে কর্মরত ছিলেন। বিদেশের প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে কর্মস্থলে দ্রুত যোগদানের প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা ছিল। দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি পিতাকে অসুস্থ অবস্থায় রেখেও সকালে ময়মনসিংহের পথে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেন।

শেষ সালামেও ছিল বিদায়ের ইঙ্গিত

বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে তিনি আবার বাবার কাছে গিয়ে সালাম করেন। আগের সন্ধ্যার মতোই মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন—“বাবা, তোমার সঙ্গে হয়তো আমার আর দেখা হবে না।”

এবার তিনি শুধু বিদায়ের আশঙ্কাই প্রকাশ করেননি; পুত্রকে দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর জীবনের সর্বশেষ ও সবচেয়ে মূল্যবান উপদেশ—“তুমি কলেজে যাও। জীবনে যা-ই করো, মানুষের জন্য কাজ করো, মানুষের জন্য বেঁচে থাকো। সম্ভব হলে মানুষের উপকার করো। টাকা জীবনের সবকিছু নয়। মানুষের অর্থ ও প্রতিপত্তি থাকতে পারে, কিন্তু কবরে যাওয়ার সময় সঙ্গে কিছুই নেওয়া যায় না—শুধু তার আমল সঙ্গে যায়। তুমি যদি মানুষের জন্য কিছু করতে পারো, সেটিই হবে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। এটাই তোমার কাছে তোমার বাবার শেষ চাওয়া।”

তখনও মাহবুব লিটু বুঝতে পারেননি, এটি কোনো সাধারণ পিতৃ-উপদেশ নয়; এটিই হতে যাচ্ছে তাঁর বাবার কাছ থেকে শোনা শেষ পূর্ণাঙ্গ জীবনবাণী। কেননা তাঁর বাবার বয়স তখন মাদত্র ৫৯। তিনি বাবাকে সালাম করে কর্মস্থলের উদ্দেশে বেরিয়ে যান।

উত্তরা পেরোনোর আগেই সেই ফোন

ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে তিনি ময়মনসিংহগামী সৌখিন পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। টিকিট কেটে বাসে বসার পর গাড়িটি উত্তর দিকে চলতে শুরু করে। বাস যখন উত্তরা এলাকার কাছাকাছি, তখন তাঁর বড় বোন ফোন করেন।

বোন জিজ্ঞেস করেন—“লিটু, তুই কোথায়?”

তিনি বলেন—“আমি বাসে আছি, উত্তরার দিকে এসেছি।”

বড় বোন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলেন—“তুই এখনই বাস থেকে নেমে যা। বাসায় ফিরে আয়।”

মাহবুব লিটু জানতে চান—“কী হয়েছে?”

কিন্তু বোন সরাসরি কিছু না বলে শুধু বলেন—“তুই আগে বাসায় ফিরে আয়। জরুরি দরকার আছে।”

ফোনটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে এক অজানা আশঙ্কা তৈরি হয়। পিতার আগের রাত ও ভোরের কথাগুলো হঠাৎ তাঁর মনে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে—“তোমাকে দেখার জন্যই আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন”; “তোমার সঙ্গে হয়তো আমার আর দেখা হবে না।”

অধ্যাপক . তাসলিমা বেগমের আশ্বাস

উদ্বিগ্ন অবস্থায় তিনি তাঁর শিক্ষক ও তৎকালীন অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. তাসলিমা বেগমকে ফোন করেন। অধ্যাপক তাসলিমা বেগম পরবর্তী সময়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাহবুব লিটু তাঁকে বলেন—“আপা, বাড়ি থেকে এমন একটি ফোন এসেছে যে আমার মন বলছে—হয়তো বাবা আর নেই।”

অধ্যাপক তাসলিমা বেগম তাঁকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন—“মাহবুব, তুমি কোনো দুশ্চিন্তা কোরো না। এখনই বাস থেকে নেমে একটি গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি বাড়ি চলে যাও। আর কোনো বাসে যেও না। বাড়িতে পৌঁছে আমাকে ফোন করবে। আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।”

শিক্ষকের এই নির্দেশনা ও মানসিক আশ্বাস নিয়ে তিনি দ্রুত বাস থেকে নেমে বাড়ির পথে ফিরে যান। কিন্তু বাড়ির কাছে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের পরিবেশই যেন তাঁকে অনিবার্য সত্যটির আভাস দেয়।

ফিরে এসে দেখলেনবাবা শেষযাত্রার অপেক্ষায়

বাড়িতে প্রবেশ করে তিনি দেখেন, তাঁর বাবা আর বেঁচে নেই। মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের নিথর দেহ শায়িত। তাঁকে গোসল করানো হচ্ছে। পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা অপেক্ষা করছেন মাহবুব লিটু কখন ফিরে আসবেন; তিনি পৌঁছানোর পরই জানাজা ও দাফনের পরবর্তী আয়োজন সম্পন্ন হবে।

সেই মুহূর্তে আগের সন্ধ্যার প্রতিটি কথা, ভোরের শেষ সালাম এবং পিতার প্রতিটি উপদেশ তাঁর কাছে নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। তিনি বুঝতে পারেন—পিতা যেন সত্যিই শুধু ছেলেকে শেষবার দেখার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। দিল্লি থেকে তাঁর ফিরে আসা, সন্ধ্যায় পিতার মুখোমুখি হওয়া এবং পরদিন ভোরে শেষ উপদেশ শোনা—সবকিছু যেন একটি অদৃশ্য সময়রেখায় যুক্ত হয়ে ছিল।

অধ্যাপক মাহবুব লিটুর স্মৃতিতে—“বাড়িতে ফিরে দেখলাম, বাবাকে গোসল করানো হচ্ছে। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছিল—আমি ফিরলেই তাঁকে কবরস্থ করা হবে। তখন বুঝলাম, আগের রাতে এবং সকালে বাবা যা বলেছিলেন, তা আবেগের কথা ছিল না; তিনি হয়তো নিজের চলে যাওয়ার সময় অনুভব করতে পেরেছিলেন। অথচ আমি তাঁর কথার গভীরতা তখন বুঝতে পারিনি।”

যে উপদেশ আজও জীবনের নৈতিক দিকনির্দেশনা

পিতার মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও সেই শেষ কথাগুলো তাঁকে আজও আবেগাপ্লুত করে। বিশেষ করে এই উপলব্ধি তাঁকে ব্যথিত করে যে, পিতা যখন বিদায়ের ভাষায় কথা বলছিলেন, তখন তিনি তার প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে পারেননি। তবে সেই না-বোঝার বেদনাই পরবর্তী সময়ে পিতার উপদেশ পালনের গভীর দায়ে রূপ নিয়েছে।

তিনি আজও নিজেকে প্রশ্ন করেন—মানুষের জন্য কতটা কাজ করতে পেরেছেন, কতজনের উপকারে আসতে পেরেছেন এবং পিতার শেষ চাওয়ার কতটুকু মর্যাদা রাখতে পেরেছেন। শিক্ষকতা, গবেষণা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক উদ্যোগে তাঁর সম্পৃক্ততার পেছনে পিতার এই শেষ বাণী এক নীরব চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

অধ্যাপক মাহবুব লিটু বলেন— “বাবার কথা তখন পুরোপুরি বুঝিনি—এটাই আজও আমাকে ব্যথা দেয়। কিন্তু তাঁর শেষ চাওয়া রাখার চেষ্টা আমি করে যাচ্ছি। মানুষের জন্য কাজ করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অর্থের চেয়ে মানবিক অর্জনকে বড় করে দেখা—এই শিক্ষাই তিনি আমাকে দিয়ে গেছেন।”

উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পদ নয়, রেখে গেলেন একটি জীবনদর্শন

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম পুত্রকে শেষ মুহূর্তে সম্পত্তি, পেশাগত সাফল্য কিংবা সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জনের উপদেশ দেননি। তিনি বলেছিলেন মানুষের জন্য বাঁচতে, মানুষের উপকার করতে এবং মনে রাখতে—কবর পর্যন্ত অর্থ বা ক্ষমতা যায় না; যায় মানুষের কর্ম ও আমল।

এই উপদেশ তাঁর সমগ্র জীবনের সারাংশও বহন করে। এতিম শৈশব থেকে উঠে এসে তিনি শিক্ষক হয়েছেন, বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন, আইনজীবী হিসেবে ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করেছেন, সামাজিক সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মৃত্যুর আগপর্যন্ত মানুষের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। নিজের জীবন দিয়ে যে মূল্যবোধ ধারণ করেছিলেন, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে সেটিই তিনি পুত্রের হাতে নৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে তুলে দেন।

পিতা আর শারীরিকভাবে পাশে নেই; কিন্তু তাঁর সেই শেষ বাণী পুত্রের জীবনে আজও জীবন্ত—“মানুষের জন্য কাজ করো, মানুষের জন্য বেঁচে থাকো। টাকা জীবনের সবকিছু নয়; মানুষের জন্য করা কাজই তোমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

দুই কন্যার পরসাধনার ধন’: পিতার পরম আদরের সন্তান মাহবুব লিটু

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের দুই কন্যার জন্মের পর পরিবারে পুত্রসন্তান হিসেবে জন্ম নেন মাহবুব লিটু। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও প্রার্থনার পর তাঁর জন্ম হয়েছিল বলে বাবা তাঁকে বলতেন ‘সাধনার ধন’। ফলে শৈশব থেকেই পিতার স্নেহের একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছিলেন তিনি। যদিও পরেও ্বারও এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তান জন্ম নেয়, তারপরেও লিটুই ছিল পিতার চোখের মনি।

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ছেলেকে অত্যন্ত আদর করতেন এবং সব সময় চোখে চোখে রাখতেন। তবে এই স্নেহ শুধু আবেগ কিংবা প্রশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল সন্তানের শিক্ষা, নৈতিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দায়িত্ববোধ। ছেলের চলাফেরা ও পড়াশোনার খোঁজ রাখলেও তিনি তার ব্যক্তিস্বাধীনতা সংকুচিত করতেন না। বরং বন্ধুর মতো কথা বলতেন, নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতেন।

পিতা-পুত্রের এই ঘনিষ্ঠতা সবচেয়ে গভীরভাবে প্রকাশ পেত কুষ্টিয়ার গোলাপনগরে হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.)-এর মাজারে তাঁদের বার্ষিক সফরের মধ্য দিয়ে।

উরসের সফরে পিতার আবশ্যিক সঙ্গী

প্রতিবছর উরস উপলক্ষে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম গোলাপনগরে যেতেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও কয়েকবার তাঁর সঙ্গে গিয়েছেন; কখনো মাহবুব লিটুর মা, কখনো পরিবারের আরও সদস্য সেই সফরে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু একটি বিষয় ছিল প্রায় অপরিবর্তিত—প্রতিবার তাঁর আবশ্যিক সঙ্গী হতেন ছেলে মাহবুব লিটু।

বয়স অল্প হলেও পিতার সঙ্গে এই সফরগুলো মাহবুবের কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক ছিল। দীর্ঘ যাত্রা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়, মাজারের আধ্যাত্মিক পরিবেশ এবং বাবার সান্নিধ্য—সব মিলিয়ে দিনগুলো তাঁর শৈশব ও কৈশোরের বিশেষ স্মৃতিতে পরিণত হয়।

পিতা কেন প্রতিবার তাঁকেই সঙ্গে নিতেন, সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হয়তো তিনি কখনো দেননি। তবে আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, এটি শুধু আদরের ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার ঘটনা ছিল না। এর মধ্য দিয়ে বাবা নিজের আধ্যাত্মিক স্মৃতি, পারিবারিক ইতিহাস এবং হযরত সোলাইমান শাহের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের উত্তরাধিকার নীরবে পুত্রের কাছে হস্তান্তর করছিলেন।

মাজারের পাশে নীরব মানুষটির চোখে জল

গোলাপনগরে পৌঁছে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের আচরণ বদলে যেত। সাধারণত কথা বলা, উপদেশ দেওয়া ও মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসলেও মাজারের কাছে গিয়ে তিনি নীরব হয়ে পড়তেন। হযরত সোলাইমান শাহের কবরের পাশে চুপচাপ বসে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকতেন। কোনো কোনো সময় তাঁর চোখ বেয়ে নীরবে পানি ঝরত।

ছোট মাহবুব পাশে বসে বাবার সেই অশ্রু দেখতেন। কিন্তু বাবা তখন কী ভাবতেন, কোন স্মৃতিতে ফিরে যেতেন কিংবা তাঁর কান্নার মধ্যে কতখানি শোক, ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক আকুলতা মিশে থাকত—শিশুমনে তার সম্পূর্ণ অর্থ ধরা পড়ত না।

হয়তো তিনি স্মরণ করতেন সেই মানুষটিকে, যিনি তাঁর জীবনের পথ সম্পর্কে বলেছিলেন; যাঁর সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ছিল; এবং যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন বলে পারিবারিক ইতিহাসে বর্ণিত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ার স্মৃতি এবং একই সময়ে প্রিয় আধ্যাত্মিক অভিভাবককে হারানোর শোক—দুটিই হয়তো সেই নীরব অশ্রুর মধ্যে ফিরে আসত।

মাহবুব লিটুর স্মৃতিতে—“বাবা মাজারের পাশে গিয়ে চুপ করে বসে থাকতেন। কবরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, আর তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়ত। তিনি তখন খুব বেশি কথা বলতেন না। আমি শুধু পাশে বসে তাঁকে দেখতাম।”

নীরবতার পাঠ: কথার বাইরে পিতার শিক্ষা

পিতা সাধারণত ছেলের সঙ্গে জীবনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাগ করে নিতেন। শিক্ষা, পেশা, রাজনীতি, মানুষের অধিকার, অর্থ ও নৈতিকতা—কোনো বিষয়েই তিনি ছেলেকে আলোচনার বাইরে রাখতেন না। কিন্তু গোলাপনগরের মাজারে তাঁর শোকের ভাষা ছিল নীরবতা।

এই নীরবতাও ছেলের জন্য একধরনের শিক্ষা হয়ে ওঠে। শিশুটি বুঝতে শেখে—জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো সম্পূর্ণভাবে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না; কিছু ঋণ, কিছু ভালোবাসা এবং কিছু বিচ্ছেদ মানুষকে শুধু নীরবে বহন করতে হয়।

পরবর্তী জীবনে অধ্যাপক মাহবুব লিটুর কাছে গোলাপনগরের সফরগুলো তাই শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উরসে অংশগ্রহণের স্মৃতি হয়ে থাকেনি। এগুলো হয়ে উঠেছে পিতার অন্তর্জগৎকে দেখার বিরল জানালা—যেখানে একজন রাজনৈতিক কর্মী, মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারী, প্রধান শিক্ষক ও আইনজীবীর দৃঢ় ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোমল, কৃতজ্ঞ এবং আধ্যাত্মিক মানুষটিকে দেখা যেত।

পিতার কাছ থেকে পুত্রের কাছে আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার

প্রতিবার মাহবুবকে সঙ্গে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সম্ভবত একটি প্রজন্মগত সেতু নির্মাণ করেছিলেন। এক প্রান্তে ছিলেন হযরত সোলাইমান শাহ চিশতী; মাঝখানে তাঁর শিষ্যসদৃশ অনুরাগী রফিকুল ইসলাম; আর অন্য প্রান্তে ছিল পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিনিধি মাহবুব লিটু।

এই উত্তরাধিকার কোনো আনুষ্ঠানিক খেলাফত, শাজরা কিংবা ধর্মীয় পদ গ্রহণের ইতিহাস নয়। এটি স্মৃতি, শ্রদ্ধা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের উত্তরাধিকার। পিতা ছেলেকে শিখিয়েছিলেন—আধ্যাত্মিকতা শুধু অলৌকিকতার অনুসন্ধান নয়; তা মানুষের প্রতি ভালোবাসা, পূর্বসূরিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানের মধ্যেও প্রকাশ পায়।

শৈশবে বাবার সঙ্গে গোলাপনগরে গিয়ে মাহবুব লিটুও একধরনের মানসিক প্রশান্তি অনুভব করতেন। মাজারের পরিবেশ, পিতার নীরব উপস্থিতি এবং তাঁদের মধ্যকার ঘনিষ্ঠতা তাঁর মনে গভীর ছাপ রেখে যায়। তাই পরবর্তী সময়ে এই পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি শুধু তথ্য বা দলিল খোঁজেন না; ফিরে যান নিজের শৈশবের সেই অনুভূতির কাছেও।

আদর, বন্ধুত্ব পরামর্শের সম্পর্ক

পিতা-পুত্রের সম্পর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পারস্পরিক আস্থা। মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ছেলেকে ভালোবাসতেন, কিন্তু ভালোবাসার নামে তাকে দুর্বল বা নির্ভরশীল করে তোলেননি। তিনি নিজের জীবনসংগ্রাম, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষকতার উপলব্ধি এবং আইনপেশার শিক্ষা ছেলের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন। কোনো ভুলের আশঙ্কা দেখলে সতর্ক করতেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন না।

অধ্যাপক মাহবুব লিটু বলেন—“বাবা আমাকে খুব আদর করতেন এবং সব সময় চোখে চোখে রাখতেন। কিন্তু তিনি শুধু আদরের বাবা ছিলেন না—তিনি আমার সঙ্গে সব কথা ভাগ করতেন, উপদেশ দিতেন এবং নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে শেখাতেন।”

এই সম্পর্কের মধ্যেই তাঁর শিক্ষক হয়ে ওঠার প্রথম পাঠ নিহিত ছিল। একজন ভালো শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীর সম্ভাবনার ওপর আস্থা রাখেন, প্রয়োজনীয় পথ দেখান কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নেন না—মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামও পিতৃত্বে সেই নীতিই অনুসরণ করেছিলেন।

গোলাপনগরের মাজারে বাবার পাশে নীরবে বসে থাকা ছোট ছেলেটি তখন হয়তো জানত না, একদিন সেই স্মৃতির সংরক্ষক তাকেই হতে হবে। আজ পিতাও নেই, হযরত সোলাইমান শাহও ইতিহাসের অংশ; কিন্তু তাঁদের মধ্যকার সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে চলেছেন অধ্যাপক মাহবুব লিটু। পিতার চোখের সেই নীরব জল তাঁর কাছে তাই কেবল শোকের স্মৃতি নয়—এটি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা এবং রক্তের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের এক অমোচনীয় চিহ্ন।

শেষকথা

এই দীর্ঘ অনুসন্ধানের শেষে স্পষ্ট হয়, এটি শুধু দুই সুফিসাধক বা তিনটি মাজার-সংশ্লিষ্ট জনপদের ইতিহাস নয়; এটি আশ্রয় দেওয়ার, সন্তান হিসেবে গ্রহণ করার, মানুষ গড়ার এবং মূল্যবোধ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়ার ইতিহাস। ফুলতলায় হযরত সোলাইমান শাহ চিশতীর আস্তানা, গোলাপনগরে তাঁর শাহাদাত এবং বাঁকা মাঠপাড়ায় হযরত আবদুল লতিফ শাহ চিশতীর নিভৃত সমাধি—তিনটি স্থান একই আখ্যানের তিন অধ্যায়। সেই আখ্যানের মানবিক কেন্দ্রে আছেন হাজি চান মিয়া, তাঁর পালকপুত্র মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং রফিকুল ইসলামের পুত্র অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু।

জন্মের আগেই পিতৃহারা ও সাত বছর বয়সে মাতৃহারা রফিকুল ইসলামকে হাজি চান মিয়ার সন্তানরূপে গ্রহণ দেখায়—পরিবার কেবল জন্মসূত্রে নয়, দায়িত্ব ও ভালোবাসার অঙ্গীকারেও নির্মিত হয়। পরে সেই শিশুই শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারী, আইনজীবী ও সমাজসংগঠক হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজের পুত্রকে তিনি সম্পদ বা প্রতিপত্তির স্বপ্ন নয়, মানুষের জন্য বেঁচে থাকার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাঁর শেষ বাণী—টাকা জীবনের সবকিছু নয়, মানুষের জন্য করা কাজই সবচেয়ে বড় অর্জন—এই সমগ্র জীবনীকথার নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।

অধ্যাপক মাহবুব লিটুর কাছে তাই ফুলতলা, গোলাপনগর কিংবা বাঁকা মাঠপাড়া নিছক ভৌগোলিক নাম নয়। ফুলতলায় আছে নিজের হাতে দাদাকে শেষ শয্যায় শুইয়ে দেওয়ার বেদনা ও দাদির নিঃশব্দ স্নেহ; বাঁকা মাঠপাড়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেঠা আবদুল লতিফ শাহের দেওয়া ছাতুর অমলিন স্বাদ; আর গোলাপনগরে আছে পিতার পাশে বসে মাজারের দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখের জল দেখার স্মৃতি। এই ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলোই বড় ইতিহাসকে রক্তমাংস, স্পর্শ ও মানবিক অর্থ দেয়।

আজ জীবনের কঠিন সময়ে পিতার অনুপস্থিতি মাহবুব লিটুকে ব্যথিত করে; কিন্তু পিতার শেখানো স্বাধীন সিদ্ধান্ত, ন্যায়বোধ, শিক্ষকতার মর্যাদা এবং মানবসেবার আদর্শ তাঁর মধ্যে এখনো সক্রিয়। যে পিতা একদিন নিজের পড়া টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ছেলেকে শিক্ষক হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, তাঁর সেই স্বপ্ন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়ার মধ্য দিয়ে আরও বড় পরিসরে পূর্ণতা পেয়েছে। এ কারণেই এই জীবনী কোনো এক ব্যক্তির সাফল্যের বিবরণ নয়; এটি তিন প্রজন্মে প্রবাহিত শিক্ষা, আধ্যাত্মিক মানবতা ও সামাজিক দায়বোধের উত্তরাধিকার।

সমাপনী মন্তব্য

নীরব সমাধি কথা বলে না, কিন্তু প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি আমাদের স্থানীয় ইতিহাস, আধ্যাত্মিক সাধক, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং পূর্বসূরিদের মানবিক অবদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করছি? শ্রদ্ধার প্রকৃত প্রকাশ শুধু মাজারে ফুল দেওয়া, উরসে অংশ নেওয়া বা স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; তার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে তথ্য যাচাই, দলিল উদ্ধার এবং ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দায়িত্বশীলভাবে পৌঁছে দেওয়ার কাজ।

এটি একটি পারিবারিক–আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য-মানচিত্র এবং মৌখিক ইতিহাসের ডিজিটাল সংগ্রহ গড়ে তোলা একটি কাব্য। তবে এই ফিচার কোনো অলৌকিক ঘটনার চূড়ান্ত সত্য ঘোষণা কিংবা কারও আধ্যাত্মিক মর্যাদা নির্ধারণের প্রয়াস নয়। এটি স্মৃতিকে অবজ্ঞা না করে প্রমাণের পথে নিয়ে যাওয়ার, বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়ে ইতিহাসের পদ্ধতি অনুসরণের এবং ব্যক্তিগত বয়ানকে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে পাঠ করার প্রচেষ্টা। কারণ পরিবারে বলা একটি গল্পের ভেতর কখনো মুক্তিযুদ্ধের অনুলিখিত অধ্যায়, গ্রামীণ সমাজের বিবর্তন এবং বাংলার সুফি মানবতাবাদের মূল্যবান সাক্ষ্য লুকিয়ে থাকে।

শেষ পর্যন্ত এই আখ্যানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা মাজার বা অলৌকিকতায় নয়, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্বে। একজন মানুষ এতিম শিশুকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন; সেই শিশু বড় হয়ে শিক্ষকতা, আইন ও সমাজসেবায় জীবন দিয়েছিলেন; আর মৃত্যুর আগে নিজের সন্তানকে বলে গেছেন—মানুষের জন্য কাজ করো। এই একটি মানবিক ধারাই ফুলতলা থেকে গোলাপনগর, গোলাপনগর থেকে বাঁকা মাঠপাড়া এবং সেখান থেকে পরবর্তী প্রজন্মের জীবনে প্রবাহিত হয়েছে। কবর নদীতে হারিয়ে যেতে পারে, আস্তানা ভেঙে পড়তে পারে, চিঠির কালি ম্লান হতে পারে—কিন্তু দায়িত্বের সঙ্গে সংরক্ষণ করা গেলে মানুষের জন্য বেঁচে থাকার এই উত্তরাধিকার হারাবে না।

--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

#হযরত_আবদুল_লতিফ_শাহ_চিশতী #লতিফ_শাহ_চিশতী #হযরত_সোলাইমান_শাহ_চিশতী #ফুলতলার_ঐতিহাসিক_বটগাছ #ফুলতলা #মুন্সীগঞ্জ #গোলাপনগর #ভেড়ামারা #বাঁকা_মাঠপাড়া #জীবননগর #চুয়াডাঙ্গা #সুফি_ইতিহাস #মুর্শিদ_ও_খলিফা #মাজার_ও_দরবার #মুক্তিযুদ্ধের_স্মৃতি #পারিবারিক_ইতিহাস #মৌখিক_ইতিহাস #আধ্যাত্মিক_উত্তরাধিকার #বাংলার_ঐতিহ্য #অধিকারপত্র_বিশেষ_ফিচার



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: