odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 5th March 2026, ৫th March ২০২৬
রাজনীতি, আইন ও একাডেমিক শাসনের সংঘাতে উপাচার্য নিয়োগের কাঠামোগত সংকট

উপাচার্য নিয়োগে বৈশ্বিক বিতর্ক —বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নাকি রাজনৈতিক প্রভাব?

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৫ March ২০২৬ ০৩:০২

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৫ March ২০২৬ ০৩:০২

অধিকারপত্র এক্সক্লুসিভ (পাঁচ পর্বের বিশ্লেষণধর্মী) ধারাবাহিক (পর্ব০৩)

বিশ্ববিদ্যালয়কে দী রাজনীতি, আইন ও একাডেমিক শাসনের সংঘাতে উপাচার্য নিয়োগের কাঠামোগত সংকটর্ঘদিন ধরে বলা হয় মুক্ত জ্ঞানচর্চার প্রাঙ্গণ। এখানে চিন্তা, গবেষণা ও বিতর্কের স্বাধীনতা থাকার কথা। কিন্তু সেই প্রাঙ্গণের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতা—উপাচার্য বা ভাইস-চ্যান্সেলর (VC)—নিয়োগের প্রশ্ন উঠলেই এই আদর্শ বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা প্রমাণ করে এই পদটি কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়োগ নয়; বরং এটি ক্ষমতা, নীতি, স্বায়ত্তশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের জটিল সমীকরণ।

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে বিতর্ক বাড়ছে। কোথাও আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে আইনি লড়াই, কোথাও ছাত্র আন্দোলন, আবার কোথাও রাজনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে আমেরিকা—পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেতৃত্ব নির্বাচনকে ঘিরে আইনি লড়াই, ছাত্র আন্দোলন, আদালতের রায় এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন ক্রমেই বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নেতৃত্ব কি সত্যিই মেধা ও একাডেমিক যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত নিয়োগের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠছে?

নেতৃত্ব নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

উপাচার্য কেবল একজন প্রশাসনিক প্রধান নন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করেন, গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করেন। তাই এই পদে নিয়োগের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

একজন শক্তিশালী ও দূরদর্শী উপাচার্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে নিতে পারেন। আবার বিতর্কিত নিয়োগের ফলে একই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনিক অস্থিরতা, শিক্ষক বিভাজন এবং গবেষণায় স্থবিরতার মুখে পড়তে পারে। ফলে উপাচার্য নিয়োগের প্রশ্নটি কেবল একটি পদ পূরণের বিষয় নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন।

বিশ্বজুড়ে নিয়োগ বিতর্ক

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উপাচার্য বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসিডেন্ট নিয়োগের কাঠামো এক নয়। কোথাও বোর্ড-নির্ভর ব্যবস্থা, কোথাও সরকার-নির্ধারিত পদ্ধতি, আবার কোথাও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিলের মাধ্যমে এই নির্বাচন সম্পন্ন হয়। তবু পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি বিষয় প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়—নেতৃত্ব নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্কের ধরন অনেকটাই মিল রয়েছে। কখনো রাজনৈতিক প্রভাব, কখনো প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আবার কখনো নৈতিকতার প্রশ্ন এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

পড়ুন অধিকারপত্র এক্সক্লুসিভ (পাঁচ পর্বের বিশ্লেষণধর্মী) ধারাবাহিক (পর্ব–০২)। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল ধরার লড়াই: বিশ্বজুড়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের রীতি, রাজনীতি ও বাস্তবতা

যুক্তরাষ্ট্রে অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেসিডেন্ট বা উপাচার্য নিয়োগের দায়িত্ব থাকে বোর্ড অব রিজেন্টস বা ট্রাস্টি বোর্ডের ওপর। এই ব্যবস্থাকে তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসিত বলে মনে করা হয়, কারণ এখানে সরাসরি সরকারের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয় না। তবে এই মডেলও বিতর্কমুক্ত নয়। উদাহরণ হিসেবে ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেসিডেন্ট নিয়োগের সময় সার্চ প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। একইভাবে নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বোর্ড সদস্যদের রাজনৈতিক বিভাজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছিল। অন্যদিকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের ঘটনাও দেখিয়েছে যে, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে একাডেমিক সততা, গবেষণার নৈতিকতা এবং জনআস্থার প্রশ্ন এখন বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিল বা বোর্ড অব গভর্নরসের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এখানে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তুলনামূলকভাবে কম হলেও অন্য ধরনের প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষ করে উপাচার্যদের উচ্চ বেতন, প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং কর্পোরেট শাসনের মডেল নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব বাথের উপাচার্যের পারিশ্রমিক নিয়ে গণমাধ্যমে যে তীব্র আলোচনা হয়েছিল, তা দেখিয়েছে যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব থাকলে রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াও নেতৃত্ব নির্বাচন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় আসে—সামাজিক রূপান্তর। বর্ণবৈষম্য-পরবর্তী সময়ে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিনিধিত্ব, অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য নিয়োগের সময় একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি এই সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—একাডেমিক মান বজায় রাখা এবং সামাজিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।

আফ্রিকার আরেকটি বড় উদাহরণ নাইজেরিয়া। সেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিল। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রে ফেডারেল সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে অনেক সময় অভিযোগ ওঠে যে রাজনৈতিক আনুগত্য বা আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্ন যোগ্যতার তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগ বাতিল বা স্থগিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর আস্থাহীনতা তৈরি করেছে।

এই অভিজ্ঞতাগুলো একত্রে দেখায় যে উপাচার্য নিয়োগের বিতর্ক কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়; বরং এটি বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি জটিল বাস্তবতা। পদ্ধতি ভিন্ন হলেও মূল প্রশ্ন প্রায় একই—নেতৃত্ব নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণযোগ্য।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে বৈশ্বিক বিতর্কের সাধারণ কারণ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে যে বিতর্কগুলো তৈরি হয় তার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কাঠামোগত কারণ কাজ করে। দেশভেদে প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সমস্যার ধরন অনেক ক্ষেত্রেই মিল রয়েছে।

প্রথমত, সার্চ কমিটির অস্বচ্ছতা একটি বড় কারণ হিসেবে সামনে আসে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নির্বাচনের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করা হলেও সেই কমিটির সদস্য নির্বাচন, মূল্যায়নের পদ্ধতি বা চূড়ান্ত সুপারিশের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করা হয় না। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি কতটা নিরপেক্ষ বা মেধাভিত্তিক ছিল—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বা আদর্শিক প্রভাব নিয়োগ বিতর্ককে আরও জটিল করে তোলে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত হওয়ায় সরকারের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু যখন রাজনৈতিক প্রভাব অতিরিক্ত হয়ে ওঠে, তখন তা একাডেমিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে যে প্রার্থীর একাডেমিক যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তৃতীয়ত, যোগ্যতার মানদণ্ড অস্পষ্ট থাকাও বিতর্কের আরেকটি বড় কারণ। যদি প্রার্থীদের মূল্যায়নের জন্য গবেষণা অবদান, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বা নেতৃত্বের দক্ষতার মতো সূচক স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা না থাকে, তাহলে নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে আস্থার সংকট তৈরি হয়।

চতুর্থত, পরিচয় বা আঞ্চলিক ভারসাম্যের চাপ অনেক দেশের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। সামাজিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্য কখনো কখনো রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক সমীকরণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ফলে একদিকে যোগ্যতার প্রশ্ন, অন্যদিকে প্রতিনিধিত্বের দাবি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে ওঠে।

বিতর্কের প্রভাব

উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের প্রভাব কেবল প্রশাসনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরি হয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন দেখা দেয় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। কখনো কখনো এই বিতর্ক আদালত পর্যন্ত গড়ায়, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তোলে।

এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিদেশি গবেষণা সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক তহবিল এবং শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক সুনাম এবং বৈশ্বিক অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশে উপাচার্য নিয়োগের টানাপোড়েন

উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে যে বিতর্ক প্রায়ই দেখা যায়, তার কেন্দ্রে থাকে একটি মৌলিক প্রশ্ন—নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড কি একাডেমিক উৎকর্ষ, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্য? বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত হলেও তার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত একাডেমিক স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব। কিন্তু বাস্তবে অনেক দেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো, দলীয় প্রভাব এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে।

দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি বা গভর্নর দায়িত্ব পালন করেন। এর ফলে আইনগতভাবে উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এই কাঠামো নীতিগত তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করলেও, রাজনৈতিক প্রভাবের সম্ভাবনাও তৈরি করে। ভারতের কেরালা রাজ্যে উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে গভর্নর ও রাজ্য সরকারের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিল, তা এই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। সেখানে প্রশ্ন উঠেছিল—নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার হাতে থাকবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কতটা বজায় থাকবে। এই বিতর্ক দেখিয়েছে, দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমারেখা স্পষ্ট না হলে সংঘাত প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশেও উপাচার্য নিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয়। অনেক শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারক মনে করেন, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে নিয়োগ হলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশকে দুর্বল করতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সার্চ কমিটি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবু সেই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং কতটা স্বাধীন—সেই প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আস্থার সংকট মাঝেমধ্যে প্রকাশ্যে চলে আসে।

এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—একাডেমিক মানদণ্ড বনাম বাস্তব রাজনীতি। একজন আদর্শ উপাচার্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, শক্তিশালী একাডেমিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হওয়া উচিত। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক সময় এই যোগ্যতাগুলো রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার তুলনায় কম গুরুত্ব পায়। এর ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন জাগে—নিয়োগ কি সত্যিই মেধাভিত্তিক, নাকি রাজনৈতিক সমীকরণের ফল?

আফ্রিকার কিছু দেশেও একই ধরনের বাস্তবতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে নাইজেরিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে ফেডারেল সরকারের অনুমোদন প্রক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিলের স্বাধীনতাকে অনেক সময় সীমিত করে দেয়। ফলে একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

উন্নয়নশীল দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। যদি কোনো উপাচার্যকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ক্যাম্পাসে বিরোধী মতের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়। আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া অনেক সময় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক উপাচার্যকে একদিকে একাডেমিক নেতৃত্ব দিতে হয়, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করতে হয়—যা দায়িত্বটিকে আরও জটিল করে তোলে।

দক্ষিণ এশিয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসনের দ্বন্দ্ব

দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় উপাচার্য নিয়োগ এখন আর কেবল প্রশাসনিক বা একাডেমিক বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (VC) নিয়োগকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আইনি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং যোগ্যতার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই উপাচার্য নির্বাচন এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার রূপ নিচ্ছে, যেখানে একাডেমিক নেতৃত্বের প্রশ্নটি প্রায়ই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

ভারতে উপাচার্য নিয়োগের বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে রাজ্যপাল ও নির্বাচিত রাজ্য সরকারের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। অধিকাংশ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাজ্যপাল দায়িত্ব পালন করেন; ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজ্য সরকারও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে প্রভাব রাখতে চায়। এই দ্বৈত ক্ষমতার কাঠামো প্রায়ই সংঘাতের জন্ম দেয়। পশ্চিমবঙ্গে ২০২৩–২৪ সালে রাজ্যপাল সি. ভি. আনন্দ বোস একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য নিয়োগ দিলে রাজ্য সরকার অভিযোগ তোলে যে এই সিদ্ধান্ত তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। আদালত মন্তব্য করে যে উপাচার্য নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) নির্দেশিকা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।

কেরালাতেও একই ধরনের বিতর্ক দেখা গেছে। এপিজে আব্দুল কালাম টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য নিয়োগ বাতিল করে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানায়, সার্চ কমিটি কেবল একজন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করতে পারে না; ইউজিসি নির্দেশিকা অনুযায়ী তিন থেকে পাঁচজনের একটি প্যানেল থাকা আবশ্যক। এই রায় ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত ‘একক নাম’ পাঠানোর প্রথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করে। আদালতের এই হস্তক্ষেপ স্পষ্ট করে যে বিশ্ববিদ্যালয় আইনের বিধান উপেক্ষা করলে নিয়োগ বাতিলযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে। আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে উপাচার্য নিয়োগ দেন। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ১৯৭৩ সালের আইনে সিনেট তিনজনের একটি প্যানেল প্রস্তাব করে, যেখান থেকে একজনকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন; ফলে অনেক সমালোচকের মতে উপাচার্য নিয়োগে সরকারের প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো যায় না।

এই বাস্তবতার ফলে অনেক সময় নিয়োগ-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা দেখা দেয়। শিক্ষক সংগঠনের বিভাজন, শিক্ষার্থী আন্দোলন এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থার ঘটনা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা গেছে। সমালোচকদের মতে, যোগ্যতার নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুপস্থিত থাকায় অনেক সময় রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে যে তিন সদস্যের প্যানেল প্রথা থাকা সত্ত্বেও সরাসরি অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম বা প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগও সামনে এসেছে, যা অনেকেই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে দেখেন।

পাকিস্তানে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হলেও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এখানেও স্পষ্ট। দেশটির সংবিধানের ১৮তম সংশোধনীর পর উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাদেশিক সরকারের ভূমিকা বেড়েছে। ফলে গভর্নর ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। পাঞ্জাব প্রদেশে ২০২৪ সালে বেশ কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ সম্ভব হয়নি। কারণ, সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে গভর্নর ও মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ ছিল। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের অধীনে পরিচালিত হয়, যা একাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি করে।

সিন্ধু প্রদেশে আবার উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে আঞ্চলিকতা বা ‘ডোমিসাইল’ প্রশ্ন সামনে আসে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে যে নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে অথবা রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রার্থী নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হন বলে সমালোচনা রয়েছে।

নেপালেও দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিক ভাগাভাগির সংস্কৃতি ছিল, যা স্থানীয়ভাবে “ভাগবন্দা” নামে পরিচিত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাব অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো বণ্টন করা হতো। এই প্রথার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক নিয়োগের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক আন্দোলন শুরু করলে সরকার প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে উপাচার্য নিয়োগের ঘোষণা দেয়। যদিও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবু বাছাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে এখনো বিভিন্ন মহলে সংশয় রয়ে গেছে।

পড়ুন (পর্ব–০১): বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের রাজনীতি ও বাস্তবতা —বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় অভিজ্ঞতার আলোকে নেতৃত্ব, স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্ন । অধিকারপত্র এক্সক্লুসিভ সিরিজ

এই উদাহরণগুলো দেখায় যে দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় উপাচার্য নিয়োগ এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। একদিকে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ও নীতিগত দায়িত্ব বহন করে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক চরিত্র হলো স্বাধীন জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করা। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই এখন অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে বিতর্ক

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কয়েকটি অভিন্ন কারণ লক্ষ্য করা যায়। দেশভেদে প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সমস্যার মূল উৎস প্রায় একই ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত। ভারতে এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) নির্দেশিকা এবং বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় আইনের মধ্যে দ্বন্দ্ব। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইউজিসি যে প্রক্রিয়াগত মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে, তা রাজ্য পর্যায়ে পুরোপুরি অনুসরণ করা হয় না। এর ফলে রাজ্যপাল ও নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই টানাপোড়েনকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে, যেখানে উপাচার্য নিয়োগের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আদালতের পর্যায়ে পৌঁছায়।

পাকিস্তানে বিতর্কের প্রধান উৎস সার্চ কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ। প্রাদেশিক সরকার ও গভর্নরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব অনেক সময় উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে। ফলে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য দিয়ে প্রশাসনিক কাজ চালাতে হয়। এই অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং একাডেমিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দেয়।

বাংলাদেশে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্ন। আইনগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট থেকে প্রস্তাবিত প্যানেল থেকে উপাচার্য নিয়োগের বিধান থাকলেও অনেক সময় সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না বলে অভিযোগ ওঠে। সমালোচকদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়োগ বা অস্থায়ী নিয়োগের মাধ্যমে প্যানেল প্রথা কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে। এর ফলে নিয়োগের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আস্থাহীনতা বাড়ে।

নেপালের ক্ষেত্রে সমস্যাটি কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগির ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো বণ্টনের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যা স্থানীয়ভাবে “ভাগবন্দা” নামে পরিচিত। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে তীব্র সমালোচনা দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রথা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা শুরু হলেও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।

এই ধরনের বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও কম গুরুতর নয়। প্রথমত, এতে এক ধরনের একাডেমিক “ইনব্রিডিং” বা অভ্যন্তরীণ বলয় গড়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কিছু উপাচার্য নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা দেখাতে পারেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। নতুন ধারণা ও বৈচিত্র্যময় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশের পরিবর্তে একটি সীমিত গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তার তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। যখন নিয়োগ প্রক্রিয়া অতিরিক্তভাবে রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে একটি স্বাধীন জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র না হয়ে সরকারের একটি প্রশাসনিক বিভাগের মতো আচরণ করতে শুরু করে। এতে মুক্তবুদ্ধি, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং স্বাধীন গবেষণার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তৃতীয়ত, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। যদি উপাচার্যকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ছাত্র সংগঠনগুলোও সেই বিভাজনের ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চেষ্টা করে। এর ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চাপ তৈরি হয় এবং ক্যাম্পাসে অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।

এই বাস্তবতা দেখায় যে উপাচার্য নিয়োগের প্রশ্নটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সংস্কৃতি, গবেষণার মান এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এখন একটি জরুরি চ্যালেঞ্জ।

সমাধানের সম্ভাব্য দিকনির্দেশ

উচ্চশিক্ষা নীতিনির্ধারক ও শিক্ষাবিদদের মতে, উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে চলমান বিতর্ক কমাতে কিছু কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া গড়ে তোলা দরকার, যেখানে স্বচ্ছতা, মেধাভিত্তিক নির্বাচন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা একসঙ্গে নিশ্চিত হয়।

প্রথমত, উপাচার্য নির্বাচনের জন্য একটি স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য সার্চ কমিটি গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কমিটিতে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রতিনিধিরাই নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ, গবেষক বা প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদেরও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা বাড়ে এবং সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত প্রভাবের সম্ভাবনা কমে।

দ্বিতীয়ত, প্রার্থীদের জন্য স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একজন সম্ভাব্য উপাচার্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, একাডেমিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ—এসব বিষয়কে নির্দিষ্ট সূচকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এতে নির্বাচন প্রক্রিয়াটি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে নীতিনির্ভর হয়ে ওঠে।

তৃতীয়ত, চূড়ান্ত প্রার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের সামনে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা ভিশন উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সামনে এই ধরনের উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে প্রার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্বের ধরন এবং বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নের কৌশল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতি অভ্যন্তরীণ আস্থাও বৃদ্ধি পায়।

চতুর্থত, উপাচার্য নিয়োগের পর তাঁর কার্যকারিতা মূল্যায়নের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো থাকা দরকার। নির্দিষ্ট লক্ষ্য, গবেষণা অগ্রগতি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো সূচকের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময় পর পর মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে চুক্তিভিত্তিক পুনর্মূল্যায়নের সুযোগও রাখা যেতে পারে, যাতে নেতৃত্বের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

এই ধরনের কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং মেধাভিত্তিক হয়ে উঠতে পারে—যা একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য।

জমে থাকা প্রশ্ন

দুইটি প্রশ্ন মনের কোনে মেঘের ভেলা তৈদরি করে: ১) সার্চ কমিটি—সমাধান নাকি আনুষ্ঠানিকতা? এবং ২) উপাচার্য য়োগে ম্পূর্ণ রাজনৈতিক মুক্তি কি সম্ভব?

—প্রশ্ন দুটি নিচে আলোচনা করা যেতে পারে। অনেক দেশে উপাচার্য নিয়োগকে মেধাভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য সার্চ কমিটি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। ধারণাটি ছিল এমন—একটি স্বাধীন ও পেশাদার কমিটি সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে, যাতে চূড়ান্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই সার্চ কমিটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

যদি কমিটির সদস্য নির্বাচন থেকেই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব শুরু হয়, তাহলে তাদের সুপারিশ কতটা নিরপেক্ষ হবে—সেই প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সার্চ কমিটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে থেকে যায়, যেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগেই নির্ধারিত থাকে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উপাচার্য নিয়োগ বাতিল হওয়ার ঘটনাগুলো এই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। আদালত একাধিক ক্ষেত্রে মন্তব্য করেছে, যদি সার্চ কমিটি আইনসম্মতভাবে গঠিত না হয় বা প্রার্থীদের তালিকা নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী তৈরি না হয়, তাহলে সেই নিয়োগ বৈধ বলে গণ্য করা যায় না। এই অভিজ্ঞতা দেখায় যে কেবল সার্চ কমিটি গঠনই যথেষ্ট নয়; তার কার্যক্রম কতটা স্বচ্ছ ও নীতিনির্ভর, সেটিই মূল বিষয়।

তবে বাস্তবতা হলো, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত হওয়ায় সরকারের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি কখনোই সম্ভব নয়। রাষ্ট্র উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নীতিগত দিকনির্দেশনা দেবে—এটি স্বাভাবিক এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়ও। কিন্তু সেই নীতিনির্দেশ যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ ও স্বাধীন চিন্তার পরিবেশকে প্রতিস্থাপন না করে, বরং তাকে শক্তিশালী করে—এই ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অতএব, উপাচার্য নিয়োগের প্রশ্নে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে রাষ্ট্রের নীতিগত ভূমিকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন—দুইয়ের মধ্যে একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তবেই বিশ্ববিদ্যালয় তার মৌলিক চরিত্র বজায় রেখে জ্ঞানচর্চার স্বাধীন কেন্দ্র হিসেবে এগিয়ে যেতে পারবে।

চূড়ান্ত প্রতিফলন: প্রক্রিয়াই মূল প্রশ্ন

উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে যে টানাপোড়েন দেখা যায়, তার মূলে রয়েছে দুটি শক্তির দ্বন্দ্ব—একদিকে মেধা, একাডেমিক নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার স্বীকৃতি; অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত হওয়ায় রাজনীতির প্রভাব পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু যখন সেই প্রভাব একাডেমিক মানদণ্ডকে ছাপিয়ে যায়, তখনই বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে।

বাস্তবসম্মত সমাধান তাই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি আদর্শ কাঠামোর কল্পনা নয়। বরং প্রয়োজন এমন একটি স্বচ্ছ, মানদণ্ডভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত প্রভাবের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মই শেষ কথা বলে। স্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড, বিশ্বাসযোগ্য সার্চ প্রক্রিয়া এবং অংশীজনদের আস্থাভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতি এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সমস্যা মূলত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমস্যার উৎস অনেক সময় প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত। রাজনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব না হলেও, স্বচ্ছতা, নীতিনিষ্ঠ মানদণ্ড এবং শক্তিশালী জবাবদিহিতা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিকার অর্থে মুক্ত জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে চায়, তবে নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়াকে হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী। অন্যথায় উপাচার্যের পদটি জ্ঞানচর্চার নেতৃত্বের প্রতীক না হয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতীক হয়ে উঠবে—যা কোনো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই দীর্ঘমেয়াদে শুভ লক্ষণ নয়।

আগামীপর্বে পড়ুন চতুর্থ পর্ব।উপাচার্য নিয়োগের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: পাবলিক বনাম প্রাইভেট মডেল ও গ্লোবাল গভর্ন্যান্স কাঠামো

 ️ অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#অধিকারপত্রএক্সক্লুসিভ, #ভিসি_নিয়োগ, #উপাচার্য_নিয়োগ, #বিশ্ববিদ্যালয়_নেতৃত্ব, #উচ্চশিক্ষা_সংস্কার, #স্বায়ত্তশাসন, #জবাবদিহিতা, #জ্ঞানচর্চার_স্বাধীনতা, #HigherEducationBangladesh, #UniversityGovernance, #AcademicLeadership, #UniversityAutonomy এবং #EducationReformBD



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: