odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 9th March 2026, ৯th March ২০২৬
পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত ইতিহাসের একচোখা বয়ানের আড়ালে বিস্মৃত ফারাও হাতশেপসুত থেকে ফাতিমা আল-ফিহরি, হাইপেশিয়া থেকে খনা—মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় নারীর বিস্মৃত অবদান ও মাতৃত্বের প্রেরণার আলো নিয়ে বিশেষ ফিচার।

ইতিহাস কি সত্যিই একচোখা? মাতৃত্বের আলোয় দেখা নারীর বিস্মৃত অবদান

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৮ March ২০২৬ ২০:২৮

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৮ March ২০২৬ ২০:২৮

—বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার | বিশ্ব নারী দিবস

হাতশেপসুত, ফাতিমা আল-ফিহরি, হাইপেশিয়া, খনা ও চন্দ্রাবতীর মতো ইতিহাসের বিস্মৃত নারীদের অবদান এবং মানবসভ্যতায় মাতৃত্বের অনুপ্রেরণার শক্তি নিয়ে বিশ্লেষণ। এই ফিচারে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দুটি বিশেষ গান: নারীর আলো: অনুপ্রেরণার গীতি এবং The Radiance of Women: A Song of Inspiration.

প্রতিবছর ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব নারী দিবস। নারীর অধিকার, মর্যাদা ও অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানবসভ্যতার ইতিহাস কেবল পুরুষের কীর্তিগাঁথা নয়। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রেই নারীর অবদানকে আড়াল করে রেখেছে। ফলে রাষ্ট্র, জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রায়ই ইতিহাসের প্রান্তে ঠাঁই পেয়েছে। অথচ এই নারীরা না থাকলে মানবসভ্যতার অনেক পথই হয়তো অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকত।

মানবসভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা প্রায়ই রাজা, সম্রাট, দার্শনিক বা বিজ্ঞানীদের নাম দেখতে পাই। কিন্তু ইতিহাসের এই প্রধান ধারাটি অনেক সময়ই একচোখা—কারণ এটি দীর্ঘকাল ধরে পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে রচিত হয়েছে। ফলে জ্ঞান, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশে নারীদের অসামান্য অবদান বহু ক্ষেত্রেই আড়ালে থেকে গেছে। অথচ মানবসভ্যতার আলোকযাত্রা বুঝতে গেলে এই বিস্মৃত অধ্যায়গুলোকে নতুন করে পাঠ করা জরুরি।

মানবসভ্যতার একেবারে আদিম পর্যায়ের সমাজব্যবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিকার ও আহরণনির্ভর সেই প্রাথমিক সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে তুলনামূলক সাম্য বিদ্যমান ছিল। অনেক নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে আদিম সাম্যবাদী সমাজে খাদ্য সংগ্রহ, বীজ সংরক্ষণ এবং উদ্ভিদ পরিচর্যার ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকাই ছিল প্রধান। খাদ্যশস্যের বীজ পর্যবেক্ষণ, সংরক্ষণ এবং তা পুনরায় রোপণের অভিজ্ঞতা থেকেই ধীরে ধীরে কৃষির সূচনা ঘটে—যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়। অর্থাৎ শিকারনির্ভর যাযাবর জীবন থেকে স্থায়ী বসতি, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং পরবর্তী সভ্যতার ভিত্তি গঠনের এই প্রক্রিয়ায় নারীর জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও শ্রম ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন মিশরের ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের উজ্জ্বল উদাহরণ রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে মারনেইথ ছিলেন মিশরের প্রথম পরিচিত নারী শাসকদের একজন। পরে হাতশেপসুত প্রাচীন মিশরের অন্যতম শক্তিশালী ফারাও হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর শাসনামলে প্রশাসনিক স্থিতি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং স্থাপত্যের অসাধারণ উন্নয়ন ঘটে। এই নারী শাসক প্রমাণ করেছিলেন—ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা লিঙ্গের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়।

জ্ঞানচর্চার ইতিহাসেও নারীর অবদান বিস্ময়কর। মরক্কোর ফেজ শহরে অবস্থিত আল-কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন একজন মুসলিম নারী—ফাতিমা আল-ফিহরি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই জ্ঞানকেন্দ্র পরবর্তীকালে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, আইন ও ভাষা শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

ইসলামের ইতিহাসে হযরত খাদিজা (রা.) এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী, দূরদর্শী উদ্যোক্তা এবং মানবিক অর্থনীতির প্রতীক। সততা, ন্যায়নীতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে তিনি যে ব্যবসায়িক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আজও আধুনিক অর্থনৈতিক নৈতিকতার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রাচীন গ্রিসে কবি সাপ্পো তাঁর লিরিক কবিতার মাধ্যমে সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। আসপাসিয়া এথেন্সের রাজনৈতিক চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্পার্টার রাণী গোর্গো এবং ম্যাসিডনের রাণী অলিম্পিয়াস তাঁদের প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসে অ্যাগনোদিসের নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—তিনি পুরুষের ছদ্মবেশে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করে নারী চিকিৎসার পথ উন্মুক্ত করেছিলেন।

প্রাচীন পারস্যের ইতিহাসেও নারীরা রাজনীতি, সামরিক নেতৃত্ব ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সম্রাজ্ঞী আতসা, নারী সেনানায়ক পান্তিয়া আরতেশবোধ এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ইর্দাবামা তাঁদের দক্ষতা ও প্রভাবের মাধ্যমে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছিলেন। পারসেপোলিসের শিলালিপিতে এমনকি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সমান পারিশ্রমিকের উল্লেখও পাওয়া যায়।

বিজ্ঞানের ইতিহাসেও নারীর অবদান গভীর। আলেকজান্দ্রিয়ার দার্শনিক ও গণিতবিদ হাইপেশিয়া প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নারী বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত। জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর কাজ জ্ঞানের জগতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। আবার মেসোপটেমিয়ার তাপুর্তি-বেলাতেকাল্লিমকে বিশ্বের প্রথম রেকর্ডকৃত রসায়নবিদ হিসেবে ধরা হয়।

বাংলা সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসেও নারীর প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উপস্থিতি রয়েছে। খনা তাঁর কৃষিভিত্তিক ও জ্যোতিষসংক্রান্ত বচনের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানের রূপ দিয়েছেন। ষোড়শ শতকের কবি চন্দ্রাবতী বাংলা সাহিত্যে নারীর কণ্ঠস্বরকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন।

তবে এই সব মহান নারীর অবদান বিশ্লেষণ করতে গেলে আরেকটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সভ্যতার প্রতিটি মহান মানুষের পেছনে প্রায়ই থাকে এক অনুপ্রেরণাময়ী মা। মাতৃত্ব শুধু সন্তান জন্মদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধ, জ্ঞানপ্রেম এবং সাহসিকতার প্রথম পাঠশালা। একজন জ্ঞানী ও মানবিক মা একটি প্রজন্মকে আলোকিত করতে পারেন।

ইতিহাসের পৃষ্ঠায় রাজা, দার্শনিক বা বিজ্ঞানীর নাম লেখা থাকে; কিন্তু তাঁদের শৈশবে যে মায়ের স্নেহ, শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা তাঁদের গড়ে তুলেছিল—তার কথা খুব কমই উল্লেখ করা হয়। অথচ মানবসভ্যতার অনেক মহান অর্জনের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় সেই নীরব মাতৃত্বের মধ্যেই।

বিশ্ব নারী দিবস তাই কেবল নারীর অধিকার উদযাপনের দিন নয়; এটি ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায়গুলো পুনরুদ্ধারের আহ্বানও বটে। কারণ নারীর অবদান এবং মাতৃত্বের অনুপ্রেরণা—এই দুই শক্তির সম্মিলনেই মানবসভ্যতার প্রকৃত আলোকযাত্রা সম্ভব হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে যত মহৎ উদ্যোগ, সৃজনশীল চিন্তা ও অগ্রগতির অধ্যায় রচিত হয়েছে, তার গভীরে কোথাও না কোথাও নারীর অনুপ্রেরণা কাজ করেছে। কখনো তিনি মা হিসেবে সন্তানের চরিত্র ও আদর্শ গড়ে তুলেছেন, কখনো শিক্ষক, সহচর বা সহযোদ্ধা হিসেবে প্রেরণা জুগিয়েছেন। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় হয়তো অনেক সময় সেই নামগুলো স্পষ্টভাবে লেখা থাকে না, কিন্তু মানবসমাজের প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে নারীর নীরব শক্তি ও অনুপ্রেরণার উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না।

—ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র, odhikarpatranews@gmail.com

#বিশ্বনারীদিবস #InternationalWomensDay #নারীরঅবদান #HerStory #WomenInHistory #HiddenHeroines #মাতৃত্বেরপ্রেরণা #WomenEmpowerment #RespectWomen #HumanCivilization



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: