odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 18th June 2026, ১৮th June ২০২৬
দুর্নীতি, জনবল সংকট, দখলদারি আর উন্নয়ন প্রকল্পের ভুয়া প্রচ্ছন্নতায় বাঁচতে বসে মরছে সুন্দরবন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম—একটি অধিকারভিত্তিক অনুসন্ধান

রক্ষক-ভক্ষকের অমীমাংসিত বিপর্যয়: বাংলাদেশের বনের কান্না, যেন এক জাতির আত্মহত্যার ডায়েরি

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৮ June ২০২৬ ০৩:৪১

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৮ June ২০২৬ ০৩:৪১

অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় কলামদেশ চিন্তা

বাংলাদেশের বন বিভাগের দায়িত্ব হলো সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বন রক্ষা করা, কিন্তু অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও জনবল সংকট সেই রক্ষককেই ভক্ষকে পরিণত করেছে। বৈশ্বিক বন উজাড়ের হার ১.১ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ২.৬ শতাংশ—এই ফিচার নিবন্ধটি রক্ষক-ভক্ষকের অমীমাংসিত এই বিপর্যয়ের গভীরে নিয়ে যাবে পাঠককে। বাংলাদেশের বনভূমি আজ বহুমাত্রিক দুর্নীতির নীরব মহাযজ্ঞের সাক্ষী। রাষ্ট্রের সবুজ প্রহরী বলে পরিচিত বন বিভাগের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভক্ষকের বিষবৃক্ষ। এই ফিচার প্রতিবেদনটি গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণে খুলে ধরেছে বন সংরক্ষণের নামে কিভাবে সংঘটিত হচ্ছে পদ্ধতিগত দুর্নীতি, কিভাবে অপর্যাপ্ত জনবলের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে একজন রেঞ্জারের কাঁধে সাড়ে চার হাজার হেক্টর বন, কিভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের ছদ্মবেশে বিনাশ করা হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, আর কিভাবে ক্ষমতার কুহকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রজাতির পর প্রজাতি। একইসঙ্গে উঠে এসেছে বনরক্ষীদের আত্মত্যাগের বিরল নজির—যারা বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাই প্রাণ দিয়েছেন। অধিকারপত্রের এই ফিচারটি শুধু অভিযোগ উত্থাপন করে না, বরং তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, অস্বস্তিকর প্রশ্ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়বদ্ধতার পাঠ।

ভূমিকা: এক বনপ্রহরীর শেষ নিঃশ্বাস

উখিয়ার কুয়াশাভেজা এক ভোরে ডাম্প ট্রাকের চাকার নিচে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় সবুজের এক বীরপ্রতীক। সাজ্জাদুজ্জামান—নামটি সম্ভবত ইতিহাসের পাতায় খুব বেশি দিন থাকবে না। কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি বাঁধা দিয়েছিলেন পাহাড় কাটার অবৈধ বাহনকে, সেদিন তিনি হয়তো ভাবেননি, রাষ্ট্রের বন রক্ষার যে আইন ও দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছিল, তার পুরস্কার হবে মৃত্যু। উখিয়া রেঞ্জের এই বনকর্মী মাত্র কয়েক মুহূর্তেই প্রমাণ করে দিলেন, রক্ষক শব্দটি তখনই অর্থবহ হয় যখন কেউ প্রাণ পণ করে বনকে বাঁচাতে চায়। কিন্তু এক প্রশ্ন থেকেই যায়—বন বিভাগের ভেতরে যে হাজারো সাজ্জাদুজ্জামান রয়েছেন, তাঁদের অস্ত্র কী? তাঁদের সংখ্যা কী? তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর নীতি, আইন আর স্বচ্ছতা কোথায়?

গত এক দশকের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের বনভূমি কমেছে প্রায় এক লাখ এক হাজার হেক্টর। নিশ্চিহ্ন হয়েছে ৬৪ প্রজাতির গাছ। বন্য প্রাণী হারিয়েছে ৩১টি প্রজাতি। আর এই ধ্বংসের মূল প্রতিপাদ্য যেন এক অদৃশ্য বিষবাষ্প—বন বিভাগের ভেতরে নানা স্তরে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অদক্ষতা আর ক্ষমতার লালসা। একই সঙ্গে, বনকে বাঁচাতে গিয়ে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের গল্পও লেখা হয়নি আনুষ্ঠানিক কোনো ইতিহাসে। আজকের এই ফিচার প্রতিবেদনটি সেই দ্বান্দ্বিকতার এক গভীর ডুব দেবে। প্রশ্নটা শুধু ‘কে রক্ষক আর কে ভক্ষক’ তা চিহ্নিত করা নয়—প্রশ্নটা হলো, কেন একজন রক্ষক আজ ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, আর কেন বাংলাদেশের বনের ভবিষ্যৎ এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে হাঁটছে?

বনের ফুসফুসআজ শ্বাসরুদ্ধ

সুন্দরবন। নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লবণাক্ত জলরাশি, ঘন ম্যানগ্রোভের সবুজ চাদর আর রাজকীয় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের এই বন শুধু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রাচীর নয়; এটি বঙ্গবাসীর আবহমানকালের অস্তিত্বের প্রতীক। কিন্তু সেই প্রতীক আজ বিপন্ন। আর এই বিপন্নতার খাতায় প্রথম সারির অপরাধীরা এমন নয় যাদের আমরা কল্পনা করি। চোরাশিকারি, দখলদার বা বন উজাড়কারী বাইরের শক্তি নয়। অভিযোগের তীর বরং ফিরে আসে সেই প্রতিষ্ঠানের দিকেই যার হাতে ন্যাড়া ও দায়িত্ব—বাংলাদেশ বন বিভাগ। ‘রক্ষকই যখন ভক্ষক’, তখন বন বাঁচবে কী করে? কণ্ঠে প্রশ্নটা যেন এক জাতির আত্মহত্যার ডায়েরি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: যখন আইন ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশের হাতিয়ার থেকে স্বাধীনতার বনদস্যুতে

বাংলাদেশের বন ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি স্থাপিত হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। The Forest Act, 1927 এবং ১৮৯৪ সালের বননীতি মূলত রাজস্ব আহরণকেন্দ্রিক ছিল। স্বাধীনতার পর ‘জাতীয়করণের’ মহান আদর্শে বন সম্পদ রাষ্ট্রের দখলে চলে আসে, কিন্তু এর সুফল মেলে নি। বরং স্থানীয় অধিবাসী ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রচলিত অধিকার ও ঐতিহ্যগত বন রক্ষার ভূমিকাকে উপেক্ষা করে একটি কেন্দ্রীয় আমলাতান্ত্রিক কাঠামো দাঁড় করানো হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৯০০ সালের ‘মৌজা ফরেস্ট’ বিধি দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকে। এভাবেই বন সংরক্ষণের চাবিকাঠি স্থানীয় জনগণের হাত থেকে সরে গিয়ে জন্ম নেয় কাগুজে আইনের এক জটলা, যার ‘রক্ষক’ কর্মকর্তাদের অধিকাংশের জ্ঞানহীনতা এবং দুর্নীতি ধীরে ধীরে বন ধ্বংসের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

১৯২৭ সালের বন আইন আজও বাংলাদেশের বন ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এই আইনের লক্ষ্য ছিল বন থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণ, কাঠ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক দ্রব্য সংগ্রহ এবং বিদ্রোহ দমনের কৌশল হিসেবে বনাঞ্চল বন্ধ করে দেওয়া। এতে বাস্তুতন্ত্র রক্ষার ধারণা ছিল প্রায় অনুপস্থিত। উপমহাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭০ ও ১৯৯০ সালে আইনে কিছু সংশোধন আনা হলেও সেটি ছিল খণ্ডিত ও অকার্যকর।

১৯৯২ সালের ‘বন (সংরক্ষণ) আইন’ ও ২০১২ সালের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন’ বলতে গেলে তৎকালীন সময়ের তুলনায় উন্নত, কিন্তু বাস্তবায়নে ঘাটতি প্রকট। বন অধিদপ্তরের ক্ষমতা ও দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সংরক্ষিত বন রক্ষা, জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থাপনা, বন্যপ্রাণী রক্ষা, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। কিন্তু পুরনো আইনের কাঠামোয় নতুন দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ায় প্রশাসনিক পক্ষাঘাত দেখা দিয়েছে। সংস্কারের জন্য প্রস্তাবিত ‘বন সংরক্ষণ বিল ২০২৩’ এখনও সংসদে আটকে।

আর এই আইনি শূন্যতায় ফুলেফেঁপে উঠেছে এক অবৈধ ব্যবসার জাল। কে জানে, যে আইন একসময় বনরক্ষীদের হাতে লাঠি ও ক্ষমতা দিয়েছিল, আজ সেই আইনই পাহাড় কাটা, কাঠ পাচার ও ভূমি দখলের পথ করে দিচ্ছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের অনেকে আজ আইনকে ব্যবহার করেন নিজের পকেট ভরাতে—পদায়নে অর্থ লেনদেন, বদলিতে ঘুষ, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, নিলামে অনিয়ম। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আমাদের শেখায়, একটি আইন যদি তার যুগের চাহিদার চেয়ে পিছিয়ে থাকে, তবে সেটি শুধু অকার্যকরই নয়, বরং দুর্নীতির উর্বর ভূমি হয়ে ওঠে।

বর্তমান বাস্তবতা মূল সমস্যা: পরিসংখ্যানের ভয়াবহ কণ্ঠস্বর

বর্তমান বাস্তবতা আজ ভয়াবহ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) সূত্র মতে, বিশ্বব্যাপী বন উজাড়ের হার যেখানে ১.১ শতাংশ, বাংলাদেশে তা ২.৬ শতাংশ। গত দুই দশকে বাংলাদেশ প্রায় ২৪৬ কিলোহেক্টর বন হারিয়েছে, যা ১৩৩ মিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণের সমান। কিন্তু বনের প্রকৃত পরিমাণ ১০ শতাংশের নিচে বলে ধারণা করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশের পাহাড়ি বনের ৯০ শতাংশ এবং মোট জীববৈচিত্র্যের ৮০ শতাংশের বাসস্থান আজ হুমকির মুখে। বাস্তবতা হলো, বন বিভাগের জনবল সংকট প্রকট। ২০২০ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশ করে যে ‘বন প্রহরী’ থেকে ‘বন কর্মকর্তা’—পদে পদে দুর্নীতির জন্য নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। এর পটভূমিতে জনবল ও বাজেটের অভাব, প্রশিক্ষণের স্বল্পতা এবং সর্বোপরি জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব প্রকট।

‘রক্ষকের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা যেখানে বন বিভাগকেই বৃহত্তম বনশত্রুতে পরিণত করেছে—এটি কোনও হঠাৎ বিপর্যয় নয়, বরং সুদীর্ঘ কাঠামোগত ব্যর্থতার ফসল।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একাধিক গবেষণায় বন বিভাগের দুর্নীতির স্থায়ী চিত্র ফুটে উঠেছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতিতে তিন কোটি টাকারও বেশি অবৈধ লেনদেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ বণ্টনে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত আত্মসাৎ হচ্ছে।

বাংলাদেশের মোট আবাদি ভূখণ্ডের মাত্র ১৫.৫৮ শতাংশ বনভূমি, যার বড় অংশ উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ ও পার্বীয় অঞ্চলে। অথচ প্রতি বছর কমছে গড়ে দশ হাজার হেক্টর বন। এক প্রশ্ন অবধারিতভাবে সামনে দাঁড়ায়—এই বন ধ্বংসের মূলে কারা আছে? দখলদারির তালিকায় বিস্মিত হতে হয়: সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র্যাব, বিজিবি—এই পাঁচটি সংস্থা একাই বরাদ্দ নিয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার একর বনভূমি। বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন পেয়েছে ৪৩ হাজার একর। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের দখল রয়েছে আরও কয়েক হাজার একর।

এবার আসি জনবলের প্রশ্নে। বন বিভাগের অনুমোদিত জনবল ১০ হাজার ৪৯২। কিন্তু বাস্তবে কর্মরত আছেন মাত্র ৬,৮২০ জন—অর্থাৎ শূন্য পদ প্রায় ৩৫ শতাংশ। একজন রেঞ্জারের দায়িত্বে গড়ে ৪,৬৬৪ হেক্টর বন। ফরেস্ট গার্ডের কাঁধে চাপা পড়ে প্রায় ৭৬৭ হেক্টর করে। আন্তর্জাতিক সুপারিশ অনুযায়ী এই সংখ্যার অর্ধেকের কম হলে তবু বন রক্ষা সম্ভব। আর তাই মাত্র ৪০৩ জন রেঞ্জার সারা দেশের ১৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর বন পাহারা দিচ্ছেন—এটি যেন এক হাতির পিঠে তিনশো বানর চাপানোর গল্প।

নীতিগত প্রশাসনিক ব্যর্থতা: কেন বাঁধা দিতে পারে না বন বিভাগ?

প্রশাসনিক ব্যর্থতার শুরুটি নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকেই। ২০২২ সালের দুদকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বন বিভাগের নিয়োগ ও বদলিতে স্বজনপ্রীতি ও ঘুষলেনদেন এতটাই সুসংহত যে মেধাবীরা বহিষ্কৃত হয় আর অযোগ্য ও অনৈতিক ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে। একবার ক্ষমতায় এলে তারা বনকে রক্ষা না করে নিজেদের পকেট ভরানো ও ক্ষমতা ধরে রাখাকেই প্রধান কাজ বানায়।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান অর্গানোগ্রামটি ১৯৯৮ সালের—তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের ২১ বছর আগে তৈরি। ২০২০ সালে বন অধিদপ্তর ১৭ হাজার ৩৫০ পদের একটি প্রস্তাবনা জমা দিলেও তা এখনও অনুমোদিত হয়নি। প্রতিবেদনের পাতায় পাতায় স্বীকার করা হয়েছে, “জনবল সংকটের কারণে বন ব্যবস্থাপনায় গতি আনা সম্ভব নয়।”

তৃতীয়ত, আইনের দুর্বলতা। ১৯২৭ সালের আইনে বন দখল, কাঠ পাচার বা চোরাশিকারের সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র দুই বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। অপরাধীরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। ফলে বন ডাকাতির সাজা যেন এক রুটিনমাফিক ছুটি। অথচ ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইনে কিছু বিশেষ সংরক্ষিত এলাকায় কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও, সেটি বাস্তবায়নে বন বিভাগের নিজস্ব আইনজীবী ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল নেই।

ক্ষমতা, রাজনীতি স্বার্থগোষ্ঠীর ভূমিকা: বনের মৃত্যুপর্বের অদৃশ্য হাত

বাংলাদেশের বন উজাড়ের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকেই সংরক্ষিত বনভূমি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ হস্তান্তর করা হয়েছে। শুধু গত পাঁচ বছরে সড়ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, বস্তি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—মিলিয়ে কমপক্ষে ৪০টি প্রকল্পের জন্য বনভূমি ছাড় দেওয়া হয়েছে। এদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ছিল অসম্পূর্ণ বা ভুয়া।

স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা ‘বনভূমি বন্দোবস্ত’ ও ‘অনাদায়ী খাসজমি’র সুযোগ নিয়ে দলবেঁধে বন জমি দখল করেছেন। এই ঘটনা এতটাই সাধারণ যে বন বিভাগের মাঠকর্মীরা ‘বড় শিকার’ ধরা থেকে বিরত থাকেন, বরং ধরেন ছোট পাচারকারী ও প্রান্তীয় জেলেদের। বাস্তবতা হলো, বনের সবচেয়ে বড় শত্রুরা বসে থাকেন মন্ত্রণালয়ের কক্ষে ও জেলা প্রশাসকের চেম্বারে, জঙ্গলের ভেতরে না।

উদাহরণ: সিলেটের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশেই গড়ে ওঠা একটি চা বাগান প্রকল্প বনের শত শত একর গ্রাস করে নিয়েছে। কাগজে-কলমে এটি ‘সরকারি উদ্যোগ’, কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী কোম্পানি, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বন বিভাগের সাহস জোটেনি। এই ক্ষমতার অসমীকরণ বনসংরক্ষণের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

অর্থনৈতিক উন্নয়নগত প্রভাব: স্বল্পমেয়াদি লাভ বনাম দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়

বাংলাদেশের জিডিপিতে বনখাতের প্রত্যক্ষ অবদান মাত্র ১.৫ শতাংশ। এই সংখ্যাটি দেখে অনেকে বন উজাড়কে ‘অর্থনৈতিক প্রয়োজনে’ স্বাভকৃত করে থাকেন। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতির হিসাব বোঝে না। বাস্তুতন্ত্রগত পরিষেবার (Ecosystem Services) হিসাবে বনের অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম। গবেষণা বলছে, সুন্দরবন প্রতি বছর প্রায় ৬০০ কোটি টাকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সরবরাহ করে—যার ৮০ শতাংশই অদৃশ্য। বন ধ্বংস হলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে কয়েক গুণ, যা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বননির্ভর প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের জীবিকা সরাসরি বনের সঙ্গে জড়িত। বনের দখল ও উজাড় তাদের বেকার করে দিচ্ছে, বাধ্য করছে শহরের ক্যানভাসে ঠাঁই নিতে। এতে পরিবেশের পাশাপাশি অর্থনীতির ভিত্তিও দুর্বল হয়।

এছাড়া, কার্বন ক্রেডিটের আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। বন ধ্বংসের কারণে REDD+ প্রকল্প থেকে লাভের আশা ক্ষীণ। অথচ প্রতিবেশী নেপাল ও ভুটান তাদের বন সুরক্ষার বিনিময়ে কোটি কোটি ডলার পাচ্ছে। বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলছে সেই সম্ভাবনা।

যা বলা হচ্ছে না: রক্ষকেরাই যখন ভক্ষক হয়অস্বস্তিকর সত্য

প্রধান পত্রিকার পাতায় বনবিনাশের সংবাদ ছাপা হলে তাতে সাধারণত দেখা যায় বন বিভাগের এক শক্ত হাতের ভূমিকা—অভিযান, জরিমানা, মামলা। কিন্তু এই সংবাদ কখনও বলে না, সেই বন বিভাগের উচ্চপদস্থ কতজন কর্মকর্তা নিজেরাই স্থানীয় চোরাকারবারিদের সঙ্গে হাত মেলান। বলা হয় না, বনাঞ্চলের দখল উচ্ছেদের অভিযানে গিয়ে কেন সবসময় ধরা পড়েন একেবারে নিচু পর্যায়ের দখলদাররা, আর উচ্চ পর্যায়েরা আগেই টের পেয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকেন।

সর্বশেষ ২০২৪ সালে দুদকের এক গোপন প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য আসে: বন অধিদপ্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ঘুষ নিতেন কাঠ পাচার বন্ধ নামে আর কাঠ পাচার বাড়িয়ে দিয়ে। এই গল্পের কোনো নাম নেই গণমাধ্যমের শিরোনামে।

আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য হলো, অনেক বনকর্মী যখন বনের ভেতর অসহায়, তখন তারা নিজের নিরাপত্তার বিনিময়ে ‘সমঝোতা’ করে নেয়। বনের এক বিট কর্মকর্তা আমাকে নাম না প্রকাশের শর্তে বলেছিলেন, “আমি যদি চোরাই কাঠের গাড়ি আটকাই, তো ওরা আমাকে বেধড়ক মারবে। আমার কোনো বন্দুক নেই, ব্যাকআপ নেই। বরং আমি ওদের সঙ্গে ‘রাজি’ করে নিই—ওরা কিছু টাকা দেয়, আমি চোখ বন্ধ করে থাকি। আমার সংসার চলে।”

এর মোকাবিলা? কারও কাছে নেই। তাই প্রকৃত রক্ষকেরা হারিয়ে যাচ্ছেন ভক্ষকের যন্ত্রণাদায়ক জালে।

কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন নীতিনির্ধারক সমাজের জন্য

এখন প্রশ্নটা শুধু বন বিভাগকে নিয়ে নয়—প্রশ্নটা আমাদের সবাইকে নিয়ে।

  • . আইন প্রণেতাদের প্রশ্ন: ১৯২৭ সালের আইনে দেশ চলে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ বাড়ে। আইন প্রণেতারা কতবার বন আইনের আধুনিকীকরণের বিল হাতে নিয়েছেন? কতবার তারা দলীয় স্বার্থে সেই বিল আটকে দিয়েছেন? বন সংরক্ষণ বিল ২০২৩ কেন এখনও সংসদীয় কমিটিতে পড়ে আছে?
  • . প্রশাসনের প্রশ্ন: ১৭ হাজার পদের অর্গানোগ্রাম অনুমোদনে দেরি হচ্ছে কেন? একজন রেঞ্জার যখন চার হাজারের বেশি হেক্টর সামলাতে গিয়ে ব্যর্থ, তখন সেই ব্যর্থতার দায় কে নেবে?
  • . ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন: সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী কেন সংরক্ষিত বন দখল করে রেখেছে? এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেন এত ভয়?
  • . গণমাধ্যমের প্রশ্ন: সংবাদ শিরোনামে বনবিনাশের নাম এসে থামে। তারপর সেটির গভীরে অনুসন্ধান কতবার হয়? বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির তদন্তে কতজন সাংবাদিক নিজেদের ঝুঁকিতে ফেলে রিপোর্ট করেছেন?
  • . সাধারণ মানুষের প্রশ্ন: আমরা কি শুধু অসহায় দর্শক? বনের ক্ষয় দেখে আমরা আর্তনাদ করি, কিন্তু বন বাঁচাতে নিজের আঙিনার গাছ কাটা বন্ধ করি না। বন বিভাগের দুর্নীতির অভিযোগ তুলি, কিন্তু নিজের গ্রামের পুকুর পাড়ের গাছটি যখন দখলকারী কাটে, তখন চুপ থাকি।

মূল সমস্যার গভীর বিশ্লেষণ: পচনের ফাঁকফোকর

একটি বন কখনো একদিনে মরে না। একটি নদী যেমন ধীরে ধীরে পলি জমে, প্রবাহ হারিয়ে, একসময় মৃত নদীতে পরিণত হয়; তেমনি একটি বনও প্রথমে হারায় তার সততা, তারপর হারায় তার রক্ষকদের নৈতিকতা, এরপর হারায় তার বৃক্ষ, প্রাণ, নদী এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্ব। তাই বাংলাদেশের বন ধ্বংসের ইতিহাস কেবল করাতের শব্দ বা চোরাশিকারির গুলির ইতিহাস নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক পচনের ইতিহাস, যেখানে আইনের দুর্বলতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং দুর্নীতির জটিল জাল একে অপরকে আড়াল করে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে তুলেছে।

পরিসংখ্যানের ভাষা কখনো কখনো নীরব হলেও তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে গভীর আর্তনাদ। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের বনভূমির ওপর চাপ ক্রমাগত বেড়েছে এবং বন উজাড়ের প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু এর চেয়েও ভয়ংকর হলো তথ্যের অস্বচ্ছতা। বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি প্রতিবেদন এবং স্বাধীন গবেষণার মধ্যে বন উজাড়ের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। এই পরিসংখ্যানগত অস্পষ্টতা কেবল গবেষণার সমস্যা নয়; এটি জবাবদিহিতারও সংকট। যখন প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণই নির্ভুলভাবে জানা যায় না, তখন দায় নির্ধারণও অস্পষ্ট থেকে যায়।

গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে বাংলাদেশের বন ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক "ডিজাইন ফ্ল" বা কাঠামোগত ত্রুটি বিদ্যমান। যে প্রতিষ্ঠান অবৈধ বন উজাড়, বন্যপ্রাণী পাচার এবং ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিরক্ষা হওয়ার কথা, সেই ব্যবস্থার ভেতরেই যদি দুর্নীতির জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি হয়, তাহলে বন ধ্বংস কেবল অপরাধীদের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে এমন অভিযোগ এসেছে যে কিছু অসাধু কর্মকর্তা অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ী, বনভূমি দখলকারী কিংবা চোরাকারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বনরক্ষার পরিবর্তে তাদের নিরাপদ চলাচলের সুযোগ করে দিয়েছেন। অভিযোগের সত্যতা বিচার আদালতের বিষয়; তবে এসব পুনরাবৃত্ত অভিযোগ প্রশাসনিক আস্থার সংকটকে গভীর করেছে।

এই পচনের শিকড় অনুসন্ধান করলে অন্তত তিনটি কাঠামোগত কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, আইন সংস্কারের উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নের সক্ষমতা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। নতুন আইন বা অধ্যাদেশ জারি করাই যথেষ্ট নয়; তার কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে আইনের শক্তি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বনভূমি রূপান্তরের প্রবণতা বন সংরক্ষণের মূল দর্শনের সঙ্গেই সংঘর্ষ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সরকারি নথি ও প্রতিবেদনে বনভূমি দখল, অবকাঠামো নির্মাণ এবং ভূমি রূপান্তরের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দেখায়—কখনো কখনো উন্নয়নের ভাষাই বন উজাড়ের বৈধতার মুখোশে পরিণত হয়েছে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনিক প্রভাবের সংস্কৃতি বহু ক্ষেত্রে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগকে দুর্বল করেছে। ফলে অপরাধের বিচার না হয়ে অনেক সময় দায় এড়ানোর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এই ব্যর্থতার প্রভাব কেবল গাছ কাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সুন্দরবনের নদীগুলোতে লবণাক্ততার বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের দ্রুত অবক্ষয়, প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের ক্ষমতা হ্রাস এবং ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধী সবুজ বেষ্টনীর দুর্বল হয়ে পড়া আজ একই সূত্রে গাঁথা। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং ভূমি রূপান্তরের ফলে বহু স্থানীয় উদ্ভিদ, ঔষধি গাছ এবং বিরল বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। একটি বন হারানো মানে কেবল কয়েক হাজার গাছের মৃত্যু নয়; তার সঙ্গে বিলীন হয় অগণিত অণুজীব, পাখি, কীটপতঙ্গ, নদী, ঝরনা এবং মানুষের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক।

সংবাদপত্রের শিরোনামগুলো যেন এই পচনের ছেঁড়া দলিল হয়ে আমাদের সামনে ফিরে আসে। ২০২৬ সালের মে মাসে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে স্মার্ট পেট্রোল টিমের অভিযানে এক জেলের মৃত্যুর ঘটনা জনমনে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ, বন স্টেশনে হামলা এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বন রক্ষার নামে পরিচালিত যে কোনো অভিযানে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং জবাবদিহিতা সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে শেরপুরের শ্রীবরদীতে সরকারি গাছ বিক্রির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে এক রেঞ্জ কর্মকর্তার সাময়িক বরখাস্তের ঘটনা দেখিয়ে দেয়, বনসম্পদের ওপর দুর্নীতির প্রভাব কেবল পরিবেশগত নয়, আর্থিকও। আবার গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, পার্বত্য অঞ্চলের বহু কমিউনিটি-নিয়ন্ত্রিত বন তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে, যেখানে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম বনকে কেবল সম্পদ নয়, নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করে এসেছে। এই অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেয় যে স্থানীয় জনগণকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে দেখার মধ্যেই টেকসই বন ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ নিহিত।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণও একই দিকে ইঙ্গিত করে। দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা, পরিবেশনীতি বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক পরিবেশবিদ্যার বিভিন্ন গবেষণায় বারবার বলা হয়েছে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে বন সংরক্ষণের কোনো দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য সম্ভব নয়। অন্যদিকে বন বিভাগের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট, পর্যাপ্ত যানবাহনের অভাব, আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল পাহারার বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই যুক্তিগুলোর বাস্তব ভিত্তি অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জনবল সংকট যদি বাস্তব হয়, তবে সেই সংকট কি দুর্নীতির বৈধতা হতে পারে? সীমিত সম্পদের মধ্যেও সুশাসন নিশ্চিত করা কি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব নয়?

এই সংকটের সামাজিক অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন বননির্ভর মানুষ। সুন্দরবনের জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বন হারালে কেবল তাদের আয়ের উৎস হারায় না; হারিয়ে যায় তাদের ইতিহাস, ভাষা, লোকজ জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়। বন যখন সঙ্কুচিত হয়, তখন মানুষের জীবিকাও সঙ্কুচিত হয়। আর যখন বনরক্ষক ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়, তখন সংঘাত আরও তীব্র হয়। একই সঙ্গে পরিবেশগত ক্ষতির পরিণতি জাতীয় পর্যায়েও ভয়াবহ। বৃক্ষচ্ছায়া কমে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ব্যাহত হয়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে, উপকূলে লবণাক্ততা গভীর হয় এবং ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দৃশ্যপট। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক ঝুঁকিতে বাংলাদেশ এমনিতেই অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। যদি বন ধ্বংস, দুর্নীতি এবং দুর্বল শাসনের এই চক্র অব্যাহত থাকে, তবে একসময় বন কেবল মানচিত্রের সবুজ রঙে সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে নয়। তখন বন রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং বননির্ভর জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও ভেঙে পড়বে; স্থানীয় মানুষ আইন থেকে দূরে সরে যাবে; এবং "রক্ষক-ভক্ষক" মডেল একটি আত্মবিনাশী চক্রে পরিণত হবে। অথচ এই পথের বিকল্পও রয়েছে। অংশগ্রহণমূলক বন ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্বাধীন নিরীক্ষা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নীতিনির্ধারণে অংশীদার করার মাধ্যমে এখনও বাংলাদেশের বনকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ রয়েছে। প্রশ্ন কেবল একটি—রাষ্ট্র কি সেই কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় পথ বেছে নেওয়ার রাজনৈতিক ও নৈতিক সাহস দেখাবে?

আন্তর্জাতিক আয়নায় বাংলাদেশ: কী করতে পারে অন্য দেশ, কেন আমরা পারি না?

ভারতের ‘জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট’ (JFM) মডেল ১৯৯০ থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ লাখ হেক্টরের বেশি বনকে সুরক্ষিত করেছে। স্থানীয় জনগণ বন রক্ষা পেলে পুরস্কার পায়, বন ধ্বংস করলে শাস্তি—এই দ্বৈত কাঠামো দুর্নীতি অনেকটা কমিয়েছে। নেপালের কমিউনিটি ফরেস্ট্রি আইন পুরো এশিয়ায় প্রশংসিত; যেখানে বনের মালিকানা স্থানীয় ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর হাতে, সরকার কেবল নীতি নির্ধারণ করে।

কোস্টারিকা বন উজাড়ের হার ১৯৭০-এর দশকে ছিল ৪০ শতাংশ, আজ তা কমে ২ শতাংশের নিচে। তারা ‘পেমেন্ট ফর ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস’ (PES) পদ্ধতি চালু করে, যেখানে বন রক্ষাকারী সম্প্রদায় ও ব্যক্তিদের সরাসরি আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হয়। গ্যাবনে ১১ শতাংশ বনভূমি সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষিত, যেখানে সরকার বন বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বার্ষিক নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে।

বাংলাদেশ কি এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে? নিশ্চয় পারে। কিন্তু তার জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংস্কারের সাহস এবং সবচেয়ে বড় কথা—বনকে রাজস্বের উৎস হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। আমরা এখনো বন বিভাগকে শুধু ‘বিভাগ’ হিসেবেই দেখি, ‘বন রাষ্ট্র’ হিসেবে নয়।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়

আমরা যারা আজ বাতাসে নিঃশ্বাস নিই, তারা কি কখনও ভেবেছি, ২০৫০ সালের একটি শিশু যদি জিজ্ঞেস করে, “দাদু, তোমাদের সময়ে কি সত্যিই বাঘ ছিল? পাখির কলরবে ভোর হতো?”—আমরা কী জবাব দেব? যদি বলি, “হ্যাঁ, ছিল, কিন্তু আমরা বাঁচাতে পারিনি”, তাহলে সেই শিশুর চোখে কী পড়বে? অবিশ্বাস? ঘৃণা? ক্ষোভ?

গবেষণা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান বনাঞ্চলের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও মানবসৃষ্ট ধ্বংসের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের সিংহভাগ ম্যানগ্রোভ নিমজ্জিত হবে। বিলুপ্ত হবে বাঘ, হাতি, মায়াবী চিতা, নানান পাখি। সংকুচিত হবে উপকূলীয় জীবিকা।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায় একটাই—এই ধ্বংসের গতিকে থামানো। তাদের জন্য অন্তত এক টুকরো সবুজ রেখে যাওয়া। আইন আধুনিকীকরণ, জনবল বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমন, সম্প্রদায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা—এগুলো আর বিলাসিতা নয়, বাধ্যবাধকতা।

কিন্তু একাই কি বন বিভাগের দুর্নীতি থামবে? না। দরকার গণআন্দোলন। দরকার সচেতন নাগরিকের কণ্ঠস্বর। যখন বন কাটতে গেলে স্থানীয় গ্রামের মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে, তখন বন বিভাগের ঘুম ভাঙবে।

সম্ভাব্য সমাধানের পথ

উপরে বর্ণিত সব সমস্যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়, কিন্তু সম্ভব কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ:

  • প্রথমত, ১৯২৭ সালের বন আইনের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৫’ প্রণয়ন করতে হবে, যাতে জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি, দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা এবং বন বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। ‘হুইলব্লোয়ার’ সুরক্ষা আইন বন বিভাগের দুর্নীতি উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
  • দ্বিতীয়ত, ১৭ হাজার ৩৫০ পদের অর্গানোগ্রাম এখনই অনুমোদন এবং নতুন নিয়োগ দিতে হবে। বিশেষ করে রেঞ্জার ও ফরেস্ট গার্ডের সংখ্যা অন্তত তিনগুণ বাড়াতে হবে। ড্রোন ও জিপিএস টহল বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • তৃতীয়ত, ভূমি অধিদপ্তর ও বন বিভাগের তথ্য একীভূত করতে হবে এবং ‘বাংলাদেশ বন তথ্য ব্যবস্থা’ (BFIS) চালু করতে হবে, যাতে বনের সীমানা নির্ধারণ, দখলদার শনাক্তকরণ ও উচ্ছেদ কার্যক্রম সহজ হয়।
  • চতুর্থত, কমিউনিটি ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট আইনগত স্বীকৃতি পেতে হবে। স্থানীয় বননির্ভর মানুষদের ‘ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ গঠন করে ক্ষমতা ও পুরস্কার নিশ্চিত করতে হবে। নেপালের মডেলে বছরে দুবার নির্বাচন ও জবাবদিহিতার কাঠামো চালু করা যেতে পারে।
  • পঞ্চমত, কার্বন ক্রেডিট ও ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস পেমেন্টের স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ‘ফরেস্ট ল এনফোর্সমেন্ট, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ট্রেড’ (FLEGT) সার্টিফিকেশন বাংলাদেশি কাঠ আমদানি-রপ্তানিতে স্বচ্ছতা আনতে পারে।
  • ষষ্ঠত, বন বিভাগের প্রতি বছর স্বাধীন জবাবদিহিতা নিরীক্ষা চালু করতে হবে। একটি ‘জাতীয় বন কমিশন’ গঠন করে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান করে দেওয়া যেতে পারে, যিনি সরাসরি সংসদে প্রতিবেদন দেবেন।

করণীয় নীতি-সংস্কার: বন বাঁচানোর শেষ সুযোগ

একটি বনকে রক্ষা করা মানে কেবল গাছ পাহারা দেওয়া নয়; একটি জাতির ভবিষ্যৎ, অর্থনীতি, জলবায়ু, সংস্কৃতি এবং সভ্যতাকে একসঙ্গে রক্ষা করা। তাই বাংলাদেশের বন সংকটের সমাধানও কেবল নতুন অভিযান, নতুন আইন কিংবা কয়েকটি প্রশাসনিক নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত রাষ্ট্রদর্শন, যেখানে সুশাসন, বিজ্ঞান, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, শিক্ষা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা একই সুতোয় গাঁথা থাকবে। বন ধ্বংসের শিকড় যেমন বহুস্তরীয়, তেমনি এর সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক।

সবচেয়ে আগে প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা। বন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি বনজ সম্পদ লুণ্ঠন, চোরাচালান, ঘুষ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শাস্তির ভয় নয়, জবাবদিহিতার সংস্কৃতিই হতে হবে প্রশাসনের ভিত্তি। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গবেষণা ও নীতিপত্রে যে সুপারিশ এসেছে—বন ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন নজরদারি, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং সম্পদের ডিজিটাল ট্র্যাকিং—এগুলো আর কাগজে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগিতা হারানো আইনসমূহ পুনর্বিবেচনা করে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বন ব্যবস্থাপনাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত জাতীয় বন আইন প্রণয়নের সময় এসেছে।

বন সংরক্ষণকে শুধুমাত্র বন বিভাগের একক দায়িত্ব হিসেবে দেখার ধারণাও পরিবর্তন করতে হবে। জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমি প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বিত শাসনব্যবস্থা গড়ে না তুললে অবৈধ দখল, বন উজাড় কিংবা বন্যপ্রাণী পাচার কখনোই টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বন ব্যবস্থাপনায় ঘোষিত 'জিরো টলারেন্স' নীতি কেবল স্লোগান নয়, বাস্তব প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে রূপ নিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থাও তখনই সফল হবে, যখন সেটি জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করার পরিবর্তে আস্থা, সহযোগিতা এবং অংশীদারিত্বের সেতুবন্ধন গড়ে তুলবে। বনরক্ষক এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠী যদি পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তবে কোনো প্রযুক্তিই বনকে রক্ষা করতে পারবে না।

একই সঙ্গে বন প্রহরী ও বন কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি। বর্তমান সময়ে বন রক্ষা কেবল লাঠি বা আগ্নেয়াস্ত্রের দায়িত্ব নয়; এটি ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, জিআইএস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি এবং তথ্য বিশ্লেষণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পাশাপাশি মানবাধিকার, সংঘাত ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ, মনস্তাত্ত্বিক সংবেদনশীলতা এবং কমিউনিটি সম্পৃক্ততার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। একজন আধুনিক বনরক্ষী কেবল পাহারাদার নন; তিনি পরিবেশের দূত, সমাজের আস্থাভাজন এবং রাষ্ট্রের পরিবেশগত নিরাপত্তার প্রথম সারির প্রতিনিধি।

তবে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে শক্তিশালী বিনিয়োগ হবে শিক্ষায়। একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই বনকে কেবল কাঠের উৎস হিসেবে নয়, বরং জীবনের উৎস হিসেবে চিনতে শেখে, তাহলে ভবিষ্যতের নাগরিক বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে নিজেই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তাই বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে বৃক্ষরোপণের আনুষ্ঠানিক পাঠের পাশাপাশি বন, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুসংস্থান এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারকে আরও গভীরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাঠ্যবইয়ে সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় বন এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের বাস্তব কাহিনি স্থান পেলে শিশুরা প্রকৃতিকে অনুভব করতে শিখবে। পাশাপাশি স্কুলভিত্তিক 'গুচ্ছবন রক্ষা কর্মসূচি', শিক্ষার্থী বন ক্লাব, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় বন সংরক্ষণ প্রতিযোগিতার মতো উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ-নাগরিকত্বের চর্চা গড়ে তুলতে পারে।

বিশ্বের বহু দেশে প্রমাণিত হয়েছে যে স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে বন সংরক্ষণ টেকসই হয় না। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় অঞ্চল কিংবা বনসংলগ্ন এলাকাগুলোর বাস্তবতাও একই শিক্ষা দেয়। স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বননির্ভর পরিবার, মৌয়াল, বাওয়ালি ও জেলেদের অভিজ্ঞতা এবং ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যৌথ বন ব্যবস্থাপনা, লাভের ন্যায্য অংশীদারিত্ব, সামাজিক বনায়ন এবং কমিউনিটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করলে বন কেবল রাষ্ট্রের সম্পদ নয়, জনগণেরও দায়িত্বে পরিণত হবে। তখন বন রক্ষার প্রশ্নে আইন ও জনগণ মুখোমুখি নয়, একই পাশে দাঁড়াবে।

বাঁচতে হলে বন বাঁচাও

বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প কেবল মহাসড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে লেখা যাবে না। যে দেশ তার বন হারায়, সে দেশ শেষ পর্যন্ত তার বৃষ্টি হারায়, মাটি হারায়, নদী হারায়, কৃষি হারায়, খাদ্যনিরাপত্তা হারায় এবং ধীরে ধীরে নিজের ভবিষ্যৎও হারায়। কারণ বন কেবল অক্সিজেনের ভাণ্ডার নয়; এটি জলবায়ুর রক্ষাকবচ, অর্থনীতির নীরব চালিকাশক্তি, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল এবং জাতীয় নিরাপত্তারও একটি অদৃশ্য স্তম্ভ।

আজকের বাস্তবতা আমাদের এক অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করায়—যাদের হাতে বন রক্ষার দায়িত্ব, তাদের অনেকেই নিষ্ঠা, সক্ষমতা ও সাহস নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন; আবার কিছু অসাধু ব্যক্তি অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা দায়িত্বহীনতার মাধ্যমে সেই আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রক্ষক ও ভক্ষকের সীমারেখা জনমনে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং একটি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করে তোলার জরুরি আহ্বান।

সুন্দরবনের নিস্তব্ধ অরণ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ঝরনা কিংবা শালবনের পাখির ডাক আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগপত্র লেখে না। তারা আদালতে যায় না, সংবাদ সম্মেলনও করে না। কিন্তু প্রতিটি কাটা গাছ, প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া প্রাণী, প্রতিটি শুকিয়ে যাওয়া ঝরনা এবং প্রতিটি দখল হওয়া বনভূমি নীরবে আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে। প্রকৃতির সেই নীরব কান্না আসলে একটি জাতির আত্মসমালোচনার আহ্বান।

এখনও সময় আছে। যদি রাষ্ট্র, প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষক, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ একসঙ্গে এগিয়ে আসে, তবে বাংলাদেশের বন আবারও পুনর্জীবনের পথ খুঁজে পেতে পারে। কিন্তু যদি আমরা আজও উদাসীন থাকি, তবে ভবিষ্যতের ইতিহাস হয়তো নির্মম ভাষায় লিখবে"আমরা বনকে আগুনে পুড়িয়ে দিইনি শুধু; আমরা আমাদেরই আগামী প্রজন্মের শ্বাস, ছায়া, নদী এবং ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে ছাই করে দিয়েছিলাম।"

শেষ কথা: সেই শক্তিশালী বার্তা যা ভাইরাল হওয়ার মতো

বন কেবল গাছের সমষ্টি নয়—বন একটি জাতির ফুসফুস, তার আবহমান সংস্কৃতির আয়না, তার অর্থনীতির অদৃশ্য মেরুদণ্ড। বাংলাদেশের বন আজ এক বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে। এই বিপদের নাম শুধু চোরাকাটারি বা দখলদারি নয়—এই বিপদের প্রধান নাম পদ্ধতিগত দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারী অবহেলা। রক্ষক যখন ভক্ষক হয়, তখন সেই বনের গাছ যেমন মরে, তেমনি মরে সাধারণ মানুষের আস্থা, মরে আইনের শাসন, মরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার।

সুন্দরবনের একটি বৃদ্ধ জেলে আমাকে বলেছিলেন, “বনের ভেতর মানুষ ঢুকলে বন কাঁদে। বনের কান্না কেউ শোনে না, যতক্ষণ না সেই বন নিজেই চলে না যায়।” আজ আমরা সেই বিন্দুতে পৌঁছেছি কি? হয়তো এখনো দেরি হয়নি। এখনো যদি আইন পরিমার্জিত হয়, জনবল বাড়ে, দুর্নীতি দমন হয়, স্বচ্ছতা আসে, স্থানীয় সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব দেওয়া হয়—তাহলে আগামী এক দশকে বনের মৃত্যুকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

শেষ কথাটি একাই বলব, সাজ্জাদুজ্জামানের মতো প্রতিটি বনকর্মীর অলিখিত স্মৃতির উদ্দেশ্যে:

“তোমরা প্রাণ দিয়েছ বনের জন্য, কিন্তু পুরো দেশ জানে না। আজ আমরা জানি। আর জানার পর দায়িত্ব নেওয়ার পালা। রক্ষক ও ভক্ষকের এই দ্বৈত বিপর্যয়ের দিন শেষ করতে হবে এখনই। কারণ একটি জাতি তার বন হারালে নিজেই বিলীন হয় — নীরবে, অথচ অপরিবর্তনীয়ভাবে।”

— অরণ্য রক্ষাই শেষ রক্ষা, অন্যথায় ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#বাংলাদেশের_বন #সুন্দরবন #পার্বত্য_চট্টগ্রাম #বন_সংরক্ষণ #জীববৈচিত্র্য #পরিবেশ #জলবায়ু_পরিবর্তন #দুর্নীতি #সুশাসন #অধিকারপত্র #FeatureArticle #InvestigativeJournalism #ForestGovernance #SaveTheForest #SaveSundarbans #EnvironmentalJustice #Bangladesh

 

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: