নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
ইউরোপজুড়ে জেঁকে বসেছে তীব্র ও রেকর্ডভাঙা দাবদাহ (হিটওয়েভ)। ফ্রান্সে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বুধবার দেশের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চলে সর্বোচ্চ বা 'রেড অ্যালার্ট' জারি করা হয়েছে। ফরাসি আবহাওয়া দপ্তর 'মেতেও ফ্রান্স' জানিয়েছে, নতুন করে আরও ৪টি অঞ্চল যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে মোট ৫৮টি অঞ্চলে রেড অ্যালার্ট এবং ৩১টি অঞ্চলে মাঝারি বা 'অরেঞ্জ অ্যালার্ট' জারি রয়েছে।
তীব্র এই গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে প্রাণহানি। ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে দাবদাহ-সংক্রান্ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় (প্রধানত পানিতে ডুবে) অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ফনটেইন-লা পোর্ত এলাকায় সপরিবারে সিন নদীতে গোসল করতে গিয়ে সাঁতার না জানা ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু দেশবাসীকে নাড়া দিয়েছে।
রেকর্ড তাপমাত্রা ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়
গত মঙ্গলবার ফ্রান্সের ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত জুন মাস রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে সারা দেশের গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লঁদ (Landes) এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বুধবারেও গরমের তীব্রতা কমেনি; ভোর ৫টাতেই লা রোশেল (La Rochelle) শহরের তাপমাত্রা ছিল ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা দিনের শেষভাগে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত গরমের কারণে দেশটির বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ফিনিস্তির (Finistère) এলাকায় একটি ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে প্রায় ৬৮,০০০ বাড়িঘর বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। ফরাসি শ্রমমন্ত্রী জঁ-পিয়ের ফারান্দু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রেডিওতে বলেন, "আমরা আসলে বুঝতে পারছি যে আমরা এখন একটি চরম ভাবাপন্ন গরমের দেশে পরিণত হয়েছি।"
ঝুঁকিতে ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বনাঞ্চল
তীব্র উত্তাপের কারণে প্যারিসের বিশ্বখ্যাত লা লিউভর (Louvre) মিউজিয়াম তাদের বন্ধের সময় এগিয়ে এনেছে। বুধ থেকে শনিবার পর্যন্ত সাধারণ সময় সন্ধ্যা ৬টার পরিবর্তে বিকেল ৪টাতেই মিউজিয়াম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ঐতিহাসিক ভবনটি জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্র প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত নয়। দর্শনার্থীদের ভিড় ও দিনের শেষের অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ভেতরের পরিবেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
এদিকে মেইন-এন্ড-লোয়ার অঞ্চলের সেন্ট-ম্যাকায়ার-দু-বাইসের বনাঞ্চলে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড (দাবানল) নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৫০ জনেরও বেশি দমকল কর্মীকে সারারাত কাজ করতে হয়েছে।
অন্যান্য দেশে ছড়াচ্ছে উত্তাপ
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালি ও স্পেনেও চরম গরম পড়েছে। ইতালির রোমসহ ১৬টি প্রাদেশিক রাজধানী এখন রেড অ্যালার্টের আওতায় রয়েছে। স্পেনের বাস্ক কাউন্টিতে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালেও বুধবার থেকে সেখানে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে শুরু করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই দাবদাহ এখন উত্তর ও পূর্ব ইউরোপের দিকে অগ্রসর হচ্ছে:
নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম: নেদারল্যান্ডসের আবহাওয়া সংস্থা (KNMI) দক্ষিণ ও মধ্য অঞ্চলে বিপজ্জনক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে 'কোড অরেঞ্জ' জারি করেছে। সেখানে শুক্রবার তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। বেলজিয়ামের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা গ্রুপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় চার বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো 'জাতীয় ওজোন এবং তাপ পরিকল্পনা' সচল করেছে।
জার্মানি ও পূর্ব ইউরোপ: আগামী সপ্তাহান্তে জার্মানিতে পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করতে পারে। এছাড়া পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরিতেও আগামী কয়েকদিনের জন্য তীব্র তাপমাত্রার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জার্মানিতেও পানিতে ডুবে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
ইউরোপীয় জলবায়ু সংস্থা 'কোপার্নিকাস'-এর মতে, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ইউরোপ মহাদেশ দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবেই ঘন ঘন দাবদাহ, তীব্র দাবানল এবং পানির সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
তবে আবহাওয়াবিদরা আশা করছেন, আগামী শুক্রবার থেকে ফ্রান্সসহ পশ্চিমাঞ্চলের তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে। তবে এই স্বস্তি আসার সাথে সাথে তীব্র বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি এবং আকস্মিক বন্যার (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) ঝুঁকি রয়েছে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: