odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Sunday, 12th July 2026, ১২th July ২০২৬
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম, জনমিতিক সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের অনিবার্যতা

মানুষ বেশি নয়, দক্ষতা কম: জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তরে শিক্ষাব্যবস্থার জরুরি সংস্কার

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১১ July ২০২৬ ১৮:১০

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১১ July ২০২৬ ১৮:১০

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকবিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে ভাবনা

আজ ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য—তরুণদের আশা ও আকাঙ্ক্ষাকে আজ এবং ভবিষ্যতের জন্য বাস্তবে রূপ দেওয়া। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা সাত কোটির কিছু বেশি থেকে বেড়ে প্রায় সতেরো কোটিতে পৌঁছেছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠী খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও নগরব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করলেও এটিই আবার দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। কারণ বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখন কর্মক্ষম বয়সে এবং প্রায় চার কোটি ৭৫ লাখ মানুষ তরুণ। কিন্তু মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতার ঘাটতি, উচ্চ শিক্ষিত বেকারত্ব, নারী ও প্রান্তিক তরুণদের শ্রমবাজার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং অদক্ষ শ্রমিকনির্ভর অভিবাসন এই সম্ভাবনাকে ক্রমে ঝুঁকিতে ফেলছে। নিবন্ধটি বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ঐতিহাসিক প্রবণতা, জনমিতিক লভ্যাংশের সীমিত সময়, শিক্ষা ও শ্রমবাজারের অসংগতি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং দক্ষ জনসম্পদ গড়ার বাস্তব কৌশল বিশ্লেষণ করেছে। জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, উন্নয়নের সোপানে পরিণত করতে প্রাক্‌শৈশব থেকে উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বৈদেশিক শ্রমবাজার—সব ক্ষেত্রেই জরুরি সমন্বিত সংস্কারের প্রস্তাব এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

একটি দেশের জনসংখ্যা অনেকটা নদীর পানির মতো। বাঁধ, সেচব্যবস্থা ও প্রবাহের সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে সেই পানি জমিতে ফসল ফলায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং জনপদকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু পরিকল্পনাহীনভাবে একই পানি উপচে পড়লে তা বন্যা হয়ে ঘরবাড়ি, ফসল ও জীবিকা ভাসিয়ে নেয়। বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যাও ঠিক এমন এক প্রবল স্রোত—যাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, ন্যায়সংগত সুযোগ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পরিচালিত করা গেলে এটি হতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ; আর অবহেলিত থাকলে বেকারত্ব, বৈষম্য, হতাশা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সামাজিক অস্থিরতার উৎস।

আজ ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তৎকালীন গভর্নিং কাউন্সিল জনসংখ্যা-সংক্রান্ত প্রশ্নে বৈশ্বিক মনোযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দিনটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়; ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই প্রায় ৯০টি দেশে প্রথমবার দিবসটি উদযাপিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য—“তরুণদের আশা ও আকাঙ্ক্ষাকে আজ এবং ভবিষ্যতের জন্য বাস্তবায়ন”—বাংলাদেশের জন্য নিছক একটি আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যতের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।

সাত কোটি থেকে সতেরো কোটি: স্বাধীনতার পর জনসংখ্যার দীর্ঘ যাত্রা

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের প্রথম জনশুমারিতে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ১৫ লাখ। ১৯৮১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮ কোটি ৭১ লাখ, ১৯৯১ সালে ১০ কোটি ৬৩ লাখ, ২০০১ সালে ১২ কোটি ৪৪ লাখ এবং ২০১১ সালে ১৪ কোটি ৪০ লাখের বেশি। ২০২২ সালের জনশুমারিতে সরাসরি গণনাকৃত জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি ৫২ লাখ; পরবর্তী সমন্বিত হিসাবে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ৯৮ লাখ নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ স্বাধীনতার পাঁচ দশকে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

এই বৃদ্ধিকে কেবল জন্মহার দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। স্বাধীনতার পর স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার, শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, টিকাদান, নিরাপদ পানি, খাদ্য উৎপাদন এবং গড় আয়ু বৃদ্ধিও জনসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। একই সময়ে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ফলে মোট প্রজনন হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অতএব বাংলাদেশের জনসংখ্যার গল্প একদিকে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের সাফল্য, অন্যদিকে সেই সাফল্যকে যথাযথ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারার অস্বস্তিকর ইতিহাস।

বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্বও বৈশ্বিকভাবে অত্যন্ত বেশি। সীমিত ভূমিতে বিপুল মানুষের বসবাসের ফলে কৃষিজমি সংকুচিত হচ্ছে, আবাসন ব্যয় বাড়ছে, নগরগুলো ধারণক্ষমতার সীমা অতিক্রম করছে এবং জলাধার, বন ও নদী ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে। অথচ সমস্যাটি জনসংখ্যার সংখ্যা দিয়ে যতটা নির্ধারিত, তার চেয়েও বেশি নির্ধারিত হচ্ছে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার মান দিয়ে।

জনসংখ্যা কখন সমস্যা, কখন সম্পদ

কোনো মানুষ জন্মের মুহূর্তে অর্থনীতির জন্য বোঝা বা সম্পদ—কোনোটিই নয়। পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সমাজ এবং রাষ্ট্র তাকে ধীরে ধীরে সক্ষম বা অক্ষম করে তোলে। সুস্থ, শিক্ষিত, দক্ষ ও কর্মরত একজন মানুষ উৎপাদন করেন, কর দেন, পরিবারকে সহায়তা করেন এবং সমাজে জ্ঞান ও উদ্ভাবন যোগ করেন। বিপরীতে, অপুষ্টি, মানহীন শিক্ষা, বেকারত্ব ও বৈষম্যের শিকার একজন নাগরিক নিজের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেন না; রাষ্ট্রকেও তার অনাবিষ্কৃত সামর্থ্যের বড় মূল্য দিতে হয়।

বাংলাদেশে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সবচেয়ে দৃশ্যমান হয় প্রতিদিনের জীবনযাত্রায়। ঢাকার একটি বাসে আসনের তুলনায় যাত্রী বেশি, সরকারি হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগী বেশি, চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে পদের তুলনায় আবেদনকারী হাজার গুণ, আর শহরতলির বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার তুলনায় শিক্ষার্থী অনেক বেশি। একটি পরিবারে উপার্জনকারী একজন, নির্ভরশীল সদস্য চারজন হলে যেমন সংসার দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও কর্মক্ষম মানুষের বড় অংশ যদি উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত না থাকে, তবে জনসংখ্যা সুবিধার পরিবর্তে চাপ সৃষ্টি করে।

খাদ্য, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের চাহিদা জনসংখ্যার সঙ্গে বাড়ে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজস্ব আহরণ, স্থানীয় সরকার এবং সেবার মান একই গতিতে না বাড়লে উন্নয়নের সুফল পাতলা হয়ে যায়। জাতীয় আয় বাড়লেও মাথাপিছু সেবার মান কাঙ্ক্ষিত হারে উন্নত হয় না। এই বাস্তবতায় “জনসংখ্যা সমস্যা” আসলে মানুষের সংখ্যা নয়; বরং বিপুল মানুষকে মর্যাদাপূর্ণভাবে বিকশিত ও কাজে লাগাতে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার নাম।

বাংলাদেশের সামনে জনমিতিক সুযোগের সংকীর্ণ জানালা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো এর জনসংখ্যার বড় অংশ এখন কর্মক্ষম বয়সে। ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ—সংখ্যায় প্রায় চার কোটি ৭৫ লাখ। এর অর্থ, দেশের প্রায় প্রতি চারজনের একজনেরও বেশি জীবনের এমন পর্যায়ে রয়েছেন, যখন শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ফল দিতে পারে।

অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় জনমিতিক লভ্যাংশ। যখন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত শিশু ও প্রবীণ নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি হয়, তখন সঞ্চয়, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু এই লভ্যাংশ ডাকঘর থেকে পাঠানো কোনো নিশ্চিত উপহার নয়; এটি শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনা। কর্মক্ষম মানুষকে কাজ দিতে না পারলে একই জনমিতিক গঠন বেকারত্ব, হতাশা, অনিরাপদ অভিবাসন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।

এই সুযোগের সময়সীমাও অনন্ত নয়। প্রজনন হার কমায় ভবিষ্যতে শিশু জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমবে, কিন্তু বর্তমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী একসময় বার্ধক্যে পৌঁছাবে। তখন পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার চাপ বাড়বে। আজকের তরুণদের উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে আগামী দিনের বাংলাদেশকে একই সঙ্গে বেকার তরুণ এবং অসচ্ছল প্রবীণ—দুটি সংকটের ব্যয় বহন করতে হবে। জনমিতিক জানালাটি তাই এমন একটি দরজা, যা এখন খোলা আছে; কিন্তু আমরা সিদ্ধান্তহীনতায় দাঁড়িয়ে থাকলে সেটি নীরবে বন্ধ হয়ে যাবে।

তরুণদের আশা কোথায় আটকে যাচ্ছে

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বহুমাত্রিক। তারা শুধু একটি সরকারি চাকরি চায় না; তারা অর্থবহ কাজ, ন্যায্য আয়, নিরাপদ জীবন, সৃজনশীল স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ চায়। কিন্তু পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের যে পথে চালিত করে, শ্রমবাজার প্রায়ই সে পথে দাঁড়িয়ে থাকে না। ফলাফল হলো সনদ আছে, দক্ষতা নেই; চাকরির ইচ্ছা আছে, উপযুক্ত সুযোগ নেই; শিক্ষা আছে, কিন্তু জীবনের সঙ্গে তার যোগসূত্র দুর্বল।

আইএলওর সাম্প্রতিক তথ্যে বাংলাদেশে যুব বেকারত্ব প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ বলে অনুমান করা হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রায় ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণ—কোনোটিতেই যুক্ত নেই। তরুণ নারীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। অর্থাৎ লাখ লাখ তরুণী কেবল চাকরির বাইরে নন; দক্ষতা অর্জনের প্রাতিষ্ঠানিক পথ থেকেও বিচ্ছিন্ন।

বেকারত্বের সরকারি হার প্রায়ই সমস্যার পূর্ণ গভীরতা দেখায় না। অনেক তরুণ সপ্তাহে অল্প কয়েক ঘণ্টার অনিয়মিত কাজ করেন, বিনা মজুরিতে পারিবারিক কাজে যুক্ত থাকেন অথবা যোগ্যতার তুলনায় অনেক নিচের কাজে নিয়োজিত হন। পরিসংখ্যানে তাঁরা কর্মরত হলেও বাস্তবে তাঁদের সামর্থ্যের বড় অংশ অব্যবহৃত থাকে। শহরের শিক্ষিত তরুণের দীর্ঘ চাকরিপ্রস্তুতি, গ্রামের নারীর অদৃশ্য শ্রম এবং উপকূলের জলবায়ু বাস্তুচ্যুত যুবকের অনিশ্চিত দিনমজুরি—সবই একই কাঠামোগত সমস্যার ভিন্ন মুখ।

শিক্ষাব্যবস্থা: সনদের কারখানা, নাকি মানুষের সক্ষমতার কর্মশালা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এটি শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা পাসের জন্য যতটা প্রস্তুত করে, জীবন ও কাজের জন্য ততটা প্রস্তুত করে না। প্রশ্ন মুখস্থ করে নম্বর অর্জন, নির্দেশনা অনুসরণ, নির্দিষ্ট উত্তর পুনরুৎপাদন এবং সনদ সংগ্রহ—এই চার দেয়ালের মধ্যে শিক্ষার উদ্দেশ্য আটকে গেছে। অথচ আধুনিক অর্থনীতি চায় সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, দলগত কাজ, প্রযুক্তি ব্যবহার, নৈতিক সিদ্ধান্ত, ভাষাজ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা।

প্রাথমিক পর্যায়ে মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানের দুর্বলতা পরবর্তী সব শিক্ষার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে। কোনো শিশু যদি বুঝে পড়তে, যুক্তি সাজাতে বা দৈনন্দিন গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে না শেখে, তবে মাধ্যমিকে বিজ্ঞান, কারিগরি শিক্ষা কিংবা ডিজিটাল দক্ষতায় তার অগ্রগতি সীমিত হবে। শিক্ষাব্যবস্থা তখন এমন একটি বহুতল ভবনের মতো দাঁড়ায়, যার নিচতলার ভিত্তি অসম্পূর্ণ, অথচ ওপরের দিকে একের পর এক তলা যোগ করা হচ্ছে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেও দীর্ঘদিন সাধারণ শিক্ষার তুলনায় নিচু মর্যাদার পথ হিসেবে দেখা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতি পুরোনো, প্রশিক্ষক স্বল্প, শিল্পকারখানার সঙ্গে যোগাযোগ দুর্বল এবং পাঠ্যক্রম বাজারের চাহিদা থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে প্রশিক্ষণের সনদ থাকলেও নিয়োগদাতাকে আবার নতুন করে কর্মী প্রশিক্ষণ দিতে হয়। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন বহু বিষয়ে আসন বাড়ানো হয়েছে, যেসব বিষয়ের সঙ্গে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার, গবেষণা কিংবা জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সরাসরি সংযোগ স্পষ্ট নয়।

শিক্ষা খাতে কম বিনিয়োগের বড় মূল্য

কোনো দেশ তার তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা আন্তরিক, তা বক্তৃতার চেয়ে বাজেটে ভালো বোঝা যায়। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই মোট দেশজ উৎপাদনের দুই শতাংশের নিচে ঘোরাফেরা করছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত শিক্ষা বাজেট ছিল মোট বাজেটের প্রায় ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত আকাঙ্ক্ষিত মানের তুলনায় এটি অত্যন্ত কম।

তবে অর্থ বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হবে—এ ধারণাও সরলীকৃত। ব্যয়ের গুণগত মান, বৈষম্য হ্রাস এবং ফলাফল পরিমাপ সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ভবন নির্মিত হলেও সেখানে দক্ষ শিক্ষক না থাকলে, কম্পিউটার দেওয়া হলেও বিদ্যুৎ ও প্রশিক্ষণ না থাকলে, বৃত্তি চালু হলেও দরিদ্র শিক্ষার্থী শনাক্তকরণে ভুল হলে বাজেটের বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে না।

শিক্ষায় বিনিয়োগের ঘাটতি পরিবারকে ব্যক্তিগত ব্যয় বাড়াতে বাধ্য করে। কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, পরিবহন, ডিভাইস, বই ও পরীক্ষার ফি বহন করতে না পেরে দরিদ্র পরিবারের সন্তান পিছিয়ে পড়ে। এতে মেধার বদলে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য শিক্ষাজীবনের গন্তব্য নির্ধারণ করতে শুরু করে। জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তরের নীতি তখন শুরুতেই ব্যর্থ হয়, কারণ সম্ভাবনাময় শিশুর একটি বড় অংশ জন্মস্থান, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা অথবা পরিবারের আয়ের কারণে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকে।

প্রাক্-শৈশব থেকে উচ্চশিক্ষা: কোথায় কী পরিবর্তন জরুরি

মানবসম্পদ উন্নয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় মাতৃগর্ভ, পুষ্টি, নিরাপদ জন্ম, স্নেহপূর্ণ পরিচর্যা এবং প্রাক্‌শৈশব বিকাশের মধ্য দিয়ে। অপুষ্ট বা বিকাশগতভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুর জন্য পরবর্তী শ্রেণিতে একই পাঠ্যবই দিলেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই মাতৃস্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রাক্‌প্রাথমিক শিক্ষা এবং অভিভাবক সহায়তাকে শিক্ষানীতির কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে।

প্রাথমিক স্তরে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বুঝে পড়া, লেখা, সংখ্যাজ্ঞান, কৌতূহল, সামাজিক-মানসিক দক্ষতা এবং আনন্দময় শিক্ষা। মাধ্যমিকে সাধারণ শিক্ষার ভেতরেই জীবনদক্ষতা, আর্থিক সাক্ষরতা, পরিবেশ ও জলবায়ু শিক্ষা, কোডিংয়ের মৌলিক ধারণা, নাগরিক শিক্ষা এবং হাতে-কলমে কাজের সুযোগ যুক্ত করতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী বানানো উদ্দেশ্য নয়; বরং প্রত্যেককে প্রযুক্তিসচেতন, যুক্তিবাদী ও অভিযোজনক্ষম নাগরিক করা জরুরি।

উচ্চমাধ্যমিকের পর শিক্ষার্থীদের সামনে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পথ থাকতে হবে। দুই বা তিন বছরের প্রয়োগমুখী ডিপ্লোমা, শিক্ষানবিশি, স্বাস্থ্যসেবা সহকারী প্রশিক্ষণ, কৃষি প্রযুক্তি, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, পর্যটন, জাহাজ নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রবীণ পরিচর্যা ও ডিজিটাল সেবা—এসব খাতে দক্ষতার সিঁড়ি তৈরি করা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আসন বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণা, শিক্ষকতার মান, শিল্পসংযোগ ও স্নাতকের কর্মফল পরিমাপ করতে হবে। কোন বিভাগ থেকে কতজন শিক্ষার্থী বেরিয়ে কোথায় কাজ করছেন—এই তথ্য প্রকাশ না করলে উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনা অন্ধকারে তীর ছোড়ার মতোই থেকে যাবে।

বিদ্যালয় থেকে কর্মক্ষেত্র: ভাঙা সেতুটি নতুন করে নির্মাণ

বাংলাদেশে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাঝখানে একটি অদৃশ্য খাদ রয়েছে। শিক্ষার্থী এক পারে সনদ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, নিয়োগদাতা অন্য পারে দক্ষ কর্মী খোঁজেন; মাঝখানে কার্যকর সেতু নেই। এই ব্যবধান কমাতে জাতীয় দক্ষতার পূর্বাভাসব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কোন জেলা, শিল্প, দেশ ও পেশায় আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে কী ধরনের কর্মীর চাহিদা তৈরি হবে, সেই তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে শুধু পরামর্শ সভায় আমন্ত্রণ জানালেই হবে না; পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, প্রশিক্ষক উন্নয়ন, যন্ত্রপাতি নির্বাচন, শিক্ষানবিশ নিয়োগ এবং মূল্যায়নে তাদের দায়িত্বশীল অংশীদার করতে হবে। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার দ্বৈত কারিগরি শিক্ষা মডেলে শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে কাজ শিখে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় হুবহু সেই ব্যবস্থা নকল করা সম্ভব নয়, তবে তৈরি পোশাক, চামড়া, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, নির্মাণ, জাহাজ নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষানবিশ কাঠামো তৈরি করা যায়।

প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে কার্যকর কর্মজীবন নির্দেশনা থাকা দরকার। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী পরিবার, বন্ধু অথবা সামাজিক মর্যাদার ধারণা অনুসরণ করে বিষয় নির্বাচন করে; নিজের সামর্থ্য ও বাজারের বাস্তবতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য পরামর্শ পায় না। ফলস্বরূপ একই ধরনের কয়েকটি পেশায় অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয়, অথচ গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ও সেবামুখী পেশা দক্ষ জনবলশূন্য থাকে।

শিক্ষা সনদকে স্থির গন্তব্য না বানিয়ে আজীবন শেখার পাসপোর্টে রূপ দিতে হবে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের যুগে একজন কর্মীর একবারের প্রশিক্ষণ পুরো কর্মজীবনের জন্য যথেষ্ট নয়। ছোট মেয়াদের পুনর্দক্ষতা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিকে স্বীকৃত জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।

নারী, প্রতিবন্ধী প্রান্তিক তরুণদের বাদ দিয়ে জনসম্পদ গড়া অসম্ভব

বাংলাদেশের জনমিতিক সম্ভাবনার প্রায় অর্ধেক নারী। অথচ শিক্ষা অর্জনে অগ্রগতি সত্ত্বেও শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। নিরাপদ যাতায়াতের অভাব, যৌন হয়রানি, অনুপযুক্ত কর্মপরিবেশ, শিশুযত্নের সংকট, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক মানসিকতা বহু তরুণীকে শিক্ষা শেষে ঘরে ফিরিয়ে দেয়। একজন শিক্ষিত নারীকে কর্মক্ষেত্র থেকে বাইরে রাখা মানে শুধু একটি চাকরি হারানো নয়; একটি পরিবারের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্ভাব্য বহুগুণ প্রভাব হারানো।

প্রতিবন্ধী তরুণদের ক্ষেত্রেও একই বৈপরীত্য দৃশ্যমান। বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকার পেলেও পাঠ্যবস্তু, পরীক্ষা, ভবন, পরিবহন ও প্রযুক্তি প্রবেশগম্য না হওয়ায় অনেকেই মাঝপথে ঝরে পড়ে। দক্ষতা প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং কর্মসংস্থান সেবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী নকশা করা নয়। জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তরের নীতি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র উভয় জায়গায় সর্বজনীন নকশা, সহায়ক প্রযুক্তি এবং যুক্তিসংগত সুবিধা নিশ্চিত হবে।

চর, হাওর, পাহাড়, উপকূল ও শহুরে বস্তির তরুণদের জন্য একই ধরনের কর্মসূচি কার্যকর হবে না। উপকূলের তরুণের প্রয়োজন জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, মৎস্য ও বিকল্প জীবিকা; পাহাড়ি অঞ্চলে ভাষা ও সংস্কৃতিসংবেদনশীল শিক্ষা; নগর বস্তিতে নমনীয় সময়সূচি ও কাজের সঙ্গে শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ। সমতা মানে সবাইকে একই জুতা দেওয়া নয়; প্রত্যেকের পায়ের মাপ অনুযায়ী জুতা নিশ্চিত করা।

বিদেশে মানুষ নয়, দক্ষতা পেশাগত মর্যাদা রপ্তানি

প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এই রেকর্ড আয় প্রমাণ করে, দেশের জনশক্তি অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু সংখ্যার আড়ালে দক্ষতার দুর্বল কাঠামো রয়ে গেছে। ২০২৪ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৫৪ শতাংশ ছিলেন অদক্ষ; পেশাজীবী ছিলেন পাঁচ শতাংশেরও কম। অদক্ষ কর্মী সাধারণত কম মজুরি পান, বেশি শারীরিক ঝুঁকি নেন এবং নিয়োগদাতা বা দালালের ওপর বেশি নির্ভরশীল থাকেন।

বাংলাদেশকে তাই “শ্রমিক পাঠানো” থেকে “আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যয়িত পেশাজীবী তৈরি” করার কৌশলে যেতে হবে। গন্তব্য দেশের ভাষা, কর্মসংস্কৃতি, শ্রম আইন, ডিজিটাল দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট পেশাগত মান প্রশিক্ষণের বাধ্যতামূলক অংশ হওয়া উচিত। জাপানের পরিচর্যা খাত, জার্মানির কারিগরি পেশা, ইউরোপের নির্মাণ ও স্বাস্থ্যসেবা, উপসাগরীয় অঞ্চলের উন্নত প্রযুক্তি-রক্ষণাবেক্ষণ এবং পূর্ব এশিয়ার জাহাজ ও উৎপাদন খাতে দেশভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

প্রশিক্ষণের সনদ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত না হলে দেশে অর্জিত দক্ষতার মূল্য বিদেশে কমে যায়। তাই বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিদেশি পেশাগত সংস্থা ও নিয়োগদাতার যৌথ মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়তে হবে। পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমানো, দালালনির্ভরতা ভাঙা, কর্মচুক্তির ডিজিটাল যাচাই এবং প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি। বিদেশগামী কর্মীকে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর যন্ত্র হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও দেশের পেশাগত দূত হিসেবে দেখতে হবে।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা: শিক্ষা বদলালে জনসংখ্যার অর্থও বদলায়

দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধোত্তর দারিদ্র্য ও দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সময় সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, পরে মাধ্যমিক ও প্রযুক্তি শিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ করে। শিল্পনীতির সঙ্গে শিক্ষানীতি যুক্ত হওয়ায় কৃষিনির্ভর কর্মীরা ধীরে ধীরে দক্ষ উৎপাদন ও প্রযুক্তিখাতে প্রবেশ করেন। সিঙ্গাপুর সীমিত ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ঘাটতিকে অজুহাত না বানিয়ে মানুষকেই প্রধান সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করেছে; শিক্ষকতার মান, দ্বিভাষিক শিক্ষা, প্রযুক্তি ও শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

ভিয়েতনাম সাধারণ শিক্ষায় শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে একই সঙ্গে উৎপাদন, ইলেকট্রনিকস ও রপ্তানিমুখী শিল্পে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়িয়েছে। আয়ারল্যান্ড উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ও বিদেশি বিনিয়োগের সমন্বয়ে তরুণ জনগোষ্ঠীকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে যুক্ত করেছে। ফিলিপাইন নার্সিং, পরিচর্যা, সামুদ্রিক পেশা এবং ইংরেজি ভাষায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বৈশ্বিক শ্রমবাজারে অবস্থান তৈরি করেছে।

তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নকলের বই নয়; শেখার আয়না। বাংলাদেশের শিল্পকাঠামো, সামাজিক বৈষম্য, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সফল দেশগুলো শিক্ষা, শিল্প, শ্রম, অভিবাসন ও প্রযুক্তি নীতিকে আলাদা দ্বীপ হিসেবে পরিচালনা করেনি। কোন খাতে অর্থনীতি এগোবে, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে। বাংলাদেশে একই সমন্বয় ছাড়া বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্প কেবল সনদের স্তূপ বাড়াবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবুজ অর্থনীতির যুগে নতুন প্রস্তুতি

আগামী শ্রমবাজার বর্তমানের সরল সম্প্রসারণ হবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, রোবট, অনলাইন সেবা ও তথ্যনির্ভর উৎপাদন বহু নিয়মিত কাজ বদলে দেবে। একই সঙ্গে নতুন কাজ সৃষ্টি হবে তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, সফটওয়্যার, রোবট রক্ষণাবেক্ষণ, সৃজনশীল শিল্প এবং স্থানীয় ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তিতে। তাই কম্পিউটার চালানো শেখানোকে ডিজিটাল দক্ষতার শেষ কথা ভাবলে চলবে না; তথ্য যাচাই, অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত বোঝা, অনলাইন নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার এবং প্রযুক্তির সাহায্যে সমস্যা সমাধান শেখাতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনও বাংলাদেশের কাজের জগৎ বদলে দিচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, জ্বালানি-সাশ্রয়ী ভবন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে। উপকূলের কৃষক পরিবারকে শুধু প্রচলিত কৃষিশিক্ষা দিলে চলবে না; লবণাক্ততা সহনশীল ফসল, জলজ চাষ, আবহাওয়া তথ্য এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের শিক্ষা দিতে হবে।

প্রযুক্তি কোনো জাদুর কাঠি নয়। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ডিভাইস, দক্ষ শিক্ষক ও মাতৃভাষায় মানসম্মত উপকরণ ছাড়া ডিজিটাল শিক্ষা নতুন বৈষম্য তৈরি করতে পারে। ধনী পরিবারের শিশু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সৃজনশীল সহকারী হিসেবে ব্যবহার করবে, আর দরিদ্র শিশুর হাতে হয়তো সংযোগবিহীন পুরোনো ফোনও থাকবে না। প্রযুক্তিনীতিকে তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়ের কাঠামোর ভেতরেই রাখতে হবে।

এখনই প্রয়োজন একটি জাতীয় মানবসম্পদ রূপান্তর চুক্তি

জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তরের দায়িত্ব শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নয়। শিক্ষা, শ্রম, যুব, শিল্প, প্রবাসীকল্যাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, মহিলা ও শিশুবিষয়ক, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্থায়ী সমন্বয় প্রয়োজন।

  • প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে জেলা ও খাতভিত্তিক একটি জাতীয় মানবসম্পদ মানচিত্র—কোথায় কত তরুণ, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী, কোন দক্ষতার ঘাটতি আছে এবং স্থানীয় ও বৈদেশিক বাজারে কী চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
  • দ্বিতীয়ত, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ ধাপে ধাপে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে এবং অর্থের ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। শুধু কত বিদ্যালয় নির্মিত হয়েছে নয়, কত শিশু বুঝে পড়তে পারছে, কত তরুণ প্রশিক্ষণের ছয় মাসের মধ্যে কাজ পেয়েছে এবং নারী ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কতটা বেড়েছে—এসব সূচক জনসমক্ষে আনতে হবে।
  • তৃতীয়ত, শিক্ষককে সংস্কারের কেন্দ্রস্থলে রাখতে হবে। পাঠ্যক্রম যত আধুনিকই হোক, শিক্ষক যদি প্রশিক্ষণ, সময়, উপকরণ ও পেশাগত মর্যাদা না পান, তবে শ্রেণিকক্ষে পরিবর্তন ঘটবে না। শিক্ষক নিয়োগে মান, ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন, মেন্টরিং এবং প্রযুক্তি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • চতুর্থত, প্রতিটি তরুণের জন্য শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে উত্তরণের সেবা দরকার—কর্মজীবন পরামর্শ, শিক্ষানবিশি, চাকরি মেলার বদলে স্থায়ী নিয়োগসংযোগ, ক্ষুদ্র উদ্যোগের পরামর্শ এবং সহজ অর্থায়ন। প্রশিক্ষণ দিয়ে ছবি তুলে প্রকল্প শেষ করার সংস্কৃতি বন্ধ করে কর্মফল অনুসরণ করতে হবে।
  • সবশেষে, জাতীয় মানবসম্পদ নীতিকে রাজনৈতিক মেয়াদের ঊর্ধ্বে নিতে হবে। জনমিতিক লভ্যাংশ পাঁচ বছরের নির্বাচনী প্রকল্প নয়; এটি কয়েক দশকের ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার।

শেষ কথা: তরুণের স্বপ্নই বাংলাদেশের জনসংখ্যা নীতির আসল সূচক

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আমাদের কেবল কত মানুষ জন্ম নিচ্ছে বা দেশে মোট কত মানুষ আছে—সেই হিসাব করতে বলে না। এটি জিজ্ঞাসা করে, প্রতিটি মানুষ কি মর্যাদাপূর্ণ জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজ ও নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছে? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে জনসংখ্যা আশীর্বাদ হবে, না বোঝা।

আজকের একটি শিশু ২০৪০ সালে দেশের কর্মশক্তির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হবে। এখন তার বিদ্যালয়ে যদি শিক্ষক না থাকে, পুষ্টির অভাবে তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করেও সে যদি বুঝে পড়তে না শেখে—তবে ২০৪০ সালের অর্থনীতির দুর্বলতা আজই তৈরি হচ্ছে। একইভাবে আজ একজন তরুণীকে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণ ও শিশুযত্ন সহায়তা দেওয়া হলে তার আয় শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; পরবর্তী প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগে পরিণত হবে।

বাংলাদেশে মানুষ বেশি—এই বাক্যটি তাই অর্ধসত্য। পূর্ণ সত্য হলো, আমাদের অপ্রশিক্ষিত মানুষ বেশি, অব্যবহৃত মেধা বেশি, অসম সুযোগ বেশি এবং শিক্ষা ও কাজের মধ্যে দূরত্ব বেশি। মানুষকে কমানো নয়, মানুষের সম্ভাবনার অপচয় কমানোই এখন প্রধান কাজ।

তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন মানে তাদের জন্য কেবল অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ দেওয়া নয়; এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়া, যা প্রশ্ন করতে শেখায়, কাজ করতে শেখায়, ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শেখায় এবং নিজের মেধাকে দেশে কিংবা বিশ্বে মর্যাদার সঙ্গে প্রয়োগের সুযোগ দেয়।

জনমিতিক জানালাটি এখনও খোলা। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি এই জানালা দিয়ে ভবিষ্যতের আলো প্রবেশ করতে দেবে, নাকি সনদ, বেকারত্ব ও সিদ্ধান্তহীনতার পর্দা টেনে সম্ভাবনাটিকে অন্ধকারেই হারিয়ে ফেলবে?

লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#বিশ্বজনসংখ্যাদিবস #জনসংখ্যাথেকেজনসম্পদ #শিক্ষাসংস্কার #তরুণদেরভবিষ্যৎ #দক্ষবাংলাদেশ #WorldPopulationDay #EducationReform #DemographicDividend #YouthEmpowerment #SkilledBangladesh



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: