odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 10th September 2026, ১০th September ২০২৬
বাংলাদেশে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবে মৃত্যু ৯৯৯। টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, ক্যাচ-আপ কর্মসূচি ও হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি বিশেষজ্ঞদের।

হাম প্রাদুর্ভাবে ৯৯৯ মৃত্যু, টিকাদান ঘাটতিতে ভয়াবহ পরিস্থিতি

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৯ September ২০২৬ ২৩:৫৫

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৯ September ২০২৬ ২৩:৫৫

সংগৃহীত

অধিকার পত্র ডেস্ক:
একসময় হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকা সরবরাহে ঘাটতি এবং কর্মসূচির দুর্বলতার কারণে বর্তমানে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে দেশ। গত মার্চে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯-এ পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তালিকাতেও বাংলাদেশের এই প্রাদুর্ভাবকে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শনাক্ত ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬১ জন শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।

একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৫৯ জন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৫০ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

মৃতদের মধ্যে ৮৯৯ জনের মৃত্যু হামের উপসর্গ নিয়ে হয়েছে এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০০ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে সম্মিলিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯-এ দাঁড়িয়েছে।

টিকাদানে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু হাম টিকার সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর ফলে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি বড় ঘাটতি বা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই এই বয়সী শিশু ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও নিয়মিত হাম টিকার আওতায় আসার আগেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদানের এই ঘাটতি সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।

আগের সাফল্য বড় চ্যালেঞ্জে

গত এক দশকে হাম প্রতিরোধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটলেও অধিকাংশ সময়ে হাম টিকার আওতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার ওপরে ছিল।

তবে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় আগের অর্জন এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

জরুরি টিকাদান কর্মসূচি

সংকট মোকাবিলায় সরকার গত এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আগে টিকা না পাওয়া শিশুদের জন্য ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

হাম-ডেঙ্গুতে চাপে হাসপাতাল

হাম প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। কোথাও কোথাও নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগী কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় মেঝেতে রেখেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

শিশুদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় স্যালাইনসহ বিভিন্ন সামগ্রীর ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। এতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি রোগীদের স্বজনদেরও বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

দ্রুত টিকাদান ঘাটতি পূরণের আহ্বান

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, নিয়মিত কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা জরুরি।

একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। তা না হলে হাম প্রাদুর্ভাবের প্রভাব আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও দুই ডোজ হাম টিকা এ রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে। তাই শিশুদের সময়মতো টিকাদানের আওতায় আনা এবং কোনো ডোজ বাদ পড়লে স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ অনুযায়ী তা পূরণ করা জরুরি।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: