odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Wednesday, 7th October 2026, ৭th October ২০২৬
অভিনেত্রী মিথিলার নতুন অধ্যায় কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে, CUNY-তে শিক্ষকতা; দুই দশকের ব্র্যাক-অভিজ্ঞতা ও শিশু বিকাশের গবেষণা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন যাত্রা

রাফিয়াত রশিদ মিথিলা: অভিনয় থেকে কলাম্বিয়ায় গবেষণা, বহুমাত্রিক এক পথচলা

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৪ October ২০২৬ ২০:৫৫

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৪ October ২০২৬ ২০:৫৫

অধিকারপত্র ডটকম / বিনোদন ডেক্স:

নিজস্ব প্রতিবেদক অধিকারপত্র :

বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের পরিচিত মুখ রাফিয়াত রশিদ মিথিলা। অভিনয়, গান ও মডেলিং দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জনের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। শিশুদের প্রাথমিক বিকাশ, শিক্ষা ও পরিবারকেন্দ্রিক উন্নয়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।

এবার মিথিলার পেশাগত জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন এক আন্তর্জাতিক অধ্যায়। Columbia University-এর Irving Institute for Clinical and Translational Research-এ Associate Research Scientist হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে City University of New York (CUNY)-এ Adjunct Assistant Professor হিসেবে শিক্ষকতাও শুরু করেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্টে মিথিলা নিজেই নতুন এই কর্মযাত্রার খবর জানিয়েছেন।

কলাম্বিয়ায় নতুন দায়িত্ব

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মিথিলার নতুন দায়িত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিউইয়র্কভিত্তিক ‘Early Childhood and Family Hub’ উদ্যোগের নকশা ও মূল্যায়নে নেতৃত্ব দেওয়া।

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য জন্ম থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু ও তাদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সম্পদ, সেবা এবং সহায়ক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করা। একই সঙ্গে প্রাথমিক শৈশব বিকাশ, পরিবারকে সম্পৃক্ত করা এবং কমিউনিটি হেলথ—এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মিথিলার দীর্ঘদিনের উন্নয়নকর্মের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর নতুন দায়িত্বের বিষয়বস্তুরও সরাসরি যোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গবেষণার সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের সমন্বয় ঘটাতে চান তিনি।

অর্থাৎ, বিনোদন অঙ্গনের পরিচিত মিথিলার পেশাগত পরিচয় এখন আরও বিস্তৃত হয়ে গবেষক ও শিক্ষাবিদ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

শিক্ষকতাতেও নতুন অধ্যায়

গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন মিথিলা। CUNY-তে Adjunct Assistant Professor হিসেবে তিনি Nonprofit Management পড়াচ্ছেন।

এই কোর্সের মাধ্যমে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত করার লক্ষ্য রয়েছে তাঁর। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা এখানে তাঁর শিক্ষকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

দুই দশকের ব্র্যাক-অভিজ্ঞতা

কলাম্বিয়ায় যোগ দেওয়ার আগে প্রায় দুই দশক ব্র্যাকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মিথিলা। এর মধ্যে ১৫ বছর তিনি ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের হয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতে কাজ করেছেন বলে নিজেই জানিয়েছেন।

শিশুদের প্রাথমিক বিকাশ ও শিক্ষা নিয়ে তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ গড়ে উঠেছে এই সময়েই। ব্র্যাকের বিভিন্ন প্রকাশনা ও নথিতেও Early Childhood Development-এর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততার উল্লেখ রয়েছে।

মিথিলার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর পেশাগত যাত্রা গড়ে তুলতে ব্র্যাকের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কর্মপর্বে প্রবেশের সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন।

অভিনয় দিয়ে যে পরিচিতির শুরু

মিথিলার জনপ্রিয় পরিচয়ের শুরু বিনোদন অঙ্গনে। ২০০২ সাল থেকে তাঁর পেশাগত পথচলা শুরু বলে জীবনীমূলক তথ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। অভিনয়ের পাশাপাশি গান ও মডেলিংয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে টেলিভিশন নাটক, চলচ্চিত্র ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক কাজে নিয়মিত হন।

বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। ফলে তাঁর অভিনয়জীবনের পরিসর দেশের সীমানা পেরিয়ে দুই বাংলার দর্শকের কাছেও বিস্তৃত হয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে মিথিলার পেশাগত পরিচয় কেবল অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। উন্নয়নকর্ম, শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে বিনোদন অঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখের চেয়ে আলাদা একটি অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে।

শিক্ষাজীবনেও ধারাবাহিক সাফল্য

মিথিলার পেশাগত বহুমুখিতার পেছনে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাজীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তিনি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে Early Childhood Development বিষয়ে আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং কৃতিত্বের জন্য চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল লাভ করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে B.Ed. ডিগ্রিও অর্জন করেন তিনি।

২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের University of Minnesota-এর College of Education and Human Development-এ ‘Contemporary Approaches to Curriculum: Instruction and Assessment’ বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন।

এরপর তাঁর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন আসে ২০২৫ সালে। সুইজারল্যান্ডের Université de Genève থেকে Early Childhood Education বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বাংলাদেশের প্রারম্ভিক শৈশব শিক্ষা—অভিভাবক, শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে।

শিশু বিকাশ নিয়ে শুধু কাজ নয়, গবেষণাও

মিথিলার ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—শিশু বিকাশের বিষয়টি তাঁর কাছে শুধু পেশাগত কাজের অংশ নয়, একাডেমিক গবেষণারও বিষয়।

২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে তিনি বাংলাদেশের Early Childhood Education-এর সুযোগ, মান ও প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন। ওই গবেষণায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়লেও শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, উপকরণ এবং বয়সভিত্তিক তথ্যের ঘাটতির মতো বিষয় উঠে আসে।

এ কারণে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে Early Childhood and Family Hub নিয়ে তাঁর বর্তমান দায়িত্বকে তাঁর আগের পেশাগত ও একাডেমিক অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা যায়।

অভিনয়, গান ও শিল্পচর্চা

অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীতের সঙ্গেও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে মিথিলার। নৃত্য ও সংগীতের বিভিন্ন শাখায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার তথ্যও তাঁর জীবনীতে রয়েছে।

কথক, মণিপুরি ও ভরতনাট্যম নৃত্যের পাশাপাশি নজরুলগীতিতেও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। চারুকলার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল; তেলচিত্র প্রদর্শনীতেও অংশ নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ছোটবেলায় পিপলস থিয়েটারের শিশু শিল্পী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

অর্থাৎ, মিথিলার শিল্পীসত্তার বিকাশ অভিনয় দিয়ে শুরু হলেও তা গান, নৃত্য, চিত্রকলা ও লেখালেখির বিভিন্ন ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত।

ব্যক্তিজীবনও আলোচনায়

মিথিলার ব্যক্তিজীবনও বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে দীর্ঘদিন আলোচিত। ২০০৬ সালে সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা তাহসান রহমান খানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের একটি সন্তান রয়েছে। ২০১৭ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

পরবর্তীতে ২০১৯ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা সৃজিত মুখার্জিকে বিয়ে করেন মিথিলা। পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনের এই অধ্যায়গুলোও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের আলোচনায় এসেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর পেশাগত পরিচয়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অভিনয়জগতের বাইরে গবেষণা ও একাডেমিক কাজের বিস্তারে।

মিথিলার নতুন পরিচয়: গবেষক ও শিক্ষাবিদ

একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করা মিথিলার বর্তমান অবস্থানকে শুধু বিনোদন অঙ্গনের সাফল্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।

তিনি এখন একই সঙ্গে একজন অভিনয়শিল্পী, উন্নয়ন পেশাজীবী, গবেষক এবং শিক্ষক। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার দায়িত্ব এবং CUNY-তে শিক্ষকতা তাঁর পেশাগত পরিচয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বিশেষ করে Early Childhood Development নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ, একাডেমিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতের অভিজ্ঞতা নতুন দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে তাঁর নতুন কর্মপর্বকে আকস্মিক কোনো পরিবর্তনের চেয়ে দীর্ঘদিনের কাজ ও শিক্ষার ধারাবাহিক ফল হিসেবেই দেখা যায়।

ব্র্যাক থেকে কলাম্বিয়া—এক দীর্ঘ যাত্রার নতুন বাঁক

প্রায় দুই দশক ব্র্যাকের সঙ্গে কাজ করার পর মিথিলার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান তাঁর ক্যারিয়ারে একটি উল্লেখযোগ্য বাঁক। ব্র্যাক তাঁকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়েছে; বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার পরিবেশ সেই অভিজ্ঞতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ দিচ্ছে।

নিজের নতুন যাত্রা সম্পর্কে মিথিলা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতার মাধ্যমে নতুনভাবে অবদান রাখতে চান। নতুন এই অধ্যায়ের জন্য তিনি সবার দোয়া ও শুভকামনাও চেয়েছেন।

পরিশেষে 

রাফিয়াত রশিদ মিথিলার পথচলা বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের প্রচলিত তারকা-পরিচয়ের বাইরে গিয়ে একটি ভিন্ন গল্প তৈরি করেছে।

অভিনয় ও গান দিয়ে দর্শকের কাছে পরিচিতি পাওয়ার পর তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শিশুদের প্রাথমিক বিকাশ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতে কাজ করেছেন। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা চালিয়ে গিয়ে পিএইচডি অর্জন করেছেন। আর এখন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক এবং CUNY-তে শিক্ষক হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন।

তাই মিথিলার পরিচয় এখন শুধু ‘অভিনেত্রী’ নয়। শিল্পীসত্তা, উন্নয়নকর্ম, গবেষণা ও শিক্ষকতা—এই চারটি ভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তাঁর পেশাগত জীবন হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন দায়িত্ব সেই দীর্ঘ পথচলারই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।