সম্পাদকীয় | অধিকারপত্র ডটকম
একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, তখন সে কোনো পরিচয় নিয়ে জন্মায় না—সে শুধু একজন শিশু। তারও হাসার অধিকার আছে, খেলার অধিকার আছে, স্কুলে যাওয়ার অধিকার আছে, স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব শিশুর শৈশবের পথ সমান নয়।
কেউ জন্ম থেকেই শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে বেড়ে ওঠে। কেউ অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, শ্রবণ বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা কিংবা অন্য কোনো বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন নিয়ে বড় হয়। আবার কোনো শিশু পরিবার হারিয়ে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কিংবা চরম দারিদ্র্যের কারণে রাস্তায় বা অনিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠে।
সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন আমরা এসব শিশুকে অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখার বদলে করুণার পাত্র হিসেবে দেখি।
শিশুর প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার অধিকার ভিন্ন নয়।
প্রতিবন্ধিতা কোনো শিশুর অধিকার কমিয়ে দেয় না
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষার জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ রয়েছে। এই আইনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রবেশগম্যতা ও অন্যান্য অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা রয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে প্রতিবন্ধী শিশুর মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ একটি শিশু হুইলচেয়ারে বসে বলে তার স্কুলে যাওয়ার অধিকার কমে যায় না।
একটি শিশু শুনতে পায় না বলে তার কথা বলার অধিকার কমে যায় না।
একটি শিশু চোখে দেখতে পায় না বলে তার বই পড়ার অধিকার শেষ হয়ে যায় না।
একটি শিশু অটিজমে আক্রান্ত বলে তার খেলাধুলা, বন্ধুত্ব কিংবা সামাজিক জীবনের অধিকার হারায় না।
বরং তার প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়াই রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
সমান সুযোগ আর একই সুযোগ এক নয়
শিশু অধিকার নিয়ে আমাদের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি।
সব শিশুকে একই জিনিস দিলেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিশুকে অন্য শিশুর মতো শুধু স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই তার শিক্ষা অধিকার নিশ্চিত হয় না। স্কুলে ওঠার জন্য যদি র্যাম্প না থাকে, শ্রেণিকক্ষ প্রবেশযোগ্য না হয়, টয়লেট ব্যবহার করা না যায়—তাহলে ভর্তি থাকলেও সে বাস্তবে সমান সুযোগ পাচ্ছে না।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুকে শুধু বই দিলেই হবে না; প্রয়োজন ব্রেইল বা উপযুক্ত সহায়ক প্রযুক্তি।
শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুকে শুধু শ্রেণিকক্ষে বসালেই হবে না; প্রয়োজন যোগাযোগের উপযোগী ব্যবস্থা।
অটিজম বা অন্যান্য বিকাশগত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে বিশেষায়িত শিক্ষা, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, থেরাপি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহায়তা।
তাই আমাদের নীতি হওয়া উচিত—
সমান অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী অসম সহায়তা দিতে হবে।
এটাই প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে ‘বোঝা’ ভাবা যাবে না
আমাদের সমাজে এখনো অনেক পরিবারে প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম নিলে সেটিকে পরিবারের দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখা হয়। কেউ সন্তানকে লুকিয়ে রাখেন, কেউ সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতে সংকোচ বোধ করেন, কেউ আবার চিকিৎসার আশায় বছরের পর বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করেন—কিন্তু শিশুটির শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ ও আত্মনির্ভরতার বিষয়টি পিছনে পড়ে যায়।
এই মানসিকতা বদলাতে হবে।
একটি শিশুর জীবনের লক্ষ্য শুধু তাকে “স্বাভাবিক” করে তোলা নয়।
লক্ষ্য হওয়া উচিত—তার সক্ষমতা অনুযায়ী তাকে সবচেয়ে স্বাধীন, আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ দেওয়া।
প্রতিবন্ধিতা তার পুরো পরিচয় নয়।
সে একজন শিক্ষার্থী, একজন বন্ধু, একজন সন্তান, একজন নাগরিক—এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় একজন মানুষ।
শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন প্রয়োজন
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও প্রতিবন্ধী শিশুদের সবচেয়ে বড় লড়াইগুলোর একটি শিক্ষা।
অনেক ক্ষেত্রে স্কুলে ভর্তি করাই চ্যালেঞ্জ। কোথাও অবকাঠামো নেই, কোথাও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই, কোথাও সহায়ক উপকরণ নেই। আবার কোথাও শিশুটিকে অন্য শিশুদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পুরোপুরি তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
অথচ অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার অর্থ হলো—শিশুকে ব্যবস্থার সঙ্গে জোর করে মানিয়ে নেওয়া নয়; শিক্ষাব্যবস্থাকেই শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী উপযোগী করা।
প্রতিটি বিদ্যালয়ে ধীরে ধীরে হলেও প্রবেশগম্য অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, সহায়ক শিক্ষা উপকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শুধু বিশেষ বিদ্যালয় তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সাধারণ বিদ্যালয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে, যাতে প্রতিবন্ধী ও অপ্রতিবন্ধী শিশুরা একসঙ্গে বেড়ে ওঠে।
কারণ ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুরা একে অন্যের বৈচিত্র্যকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখে, ভবিষ্যতের সমাজও হবে বেশি সহনশীল।
স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসা নয়
প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর স্বাস্থ্যসেবা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল হতে পারে।
চিকিৎসকের পাশাপাশি প্রয়োজন হতে পারে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, মনোসামাজিক সহায়তা, সহায়ক যন্ত্রপাতি এবং নিয়মিত ফলোআপ।
গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিবারগুলোর জন্য এই সেবা আরও কঠিন।
ফলে রাজধানী বা বড় শহরে সেবা আছে—এমন তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।
প্রশ্ন হওয়া উচিত—
দুর্গম এলাকার একজন দরিদ্র বাবা-মা তার প্রতিবন্ধী সন্তানকে প্রয়োজনীয় সেবা কোথায় পাবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর স্বাস্থ্যব্যবস্থার কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে।
আরেকটি কঠিন বাস্তবতা—সেলটারলেস শিশু
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মতোই আরেকটি অদৃশ্য বাস্তবতা হলো আশ্রয়হীন বা সেলটারলেস শিশু।
যে শিশুর স্থায়ী নিরাপদ বাসস্থান নেই, যে ফুটপাত, স্টেশন, লঞ্চঘাট, বাজার বা অন্য কোনো অনিরাপদ স্থানে রাত কাটায়—তার কাছে “শিশু অধিকার” অনেক সময় কাগজের একটি শব্দ মাত্র।
তার জন্য স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে প্রয়োজন নিরাপদ থাকার জায়গা।
কারণ যে শিশু রাতে কোথায় ঘুমাবে তা জানে না, তার কাছে পরদিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া প্রায় অসম্ভব।
আশ্রয়হীন শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রম, মাদক, পাচার, যৌন শোষণ, শারীরিক নির্যাতন ও অপরাধী চক্রের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই আশ্রয়হীন শিশুকে শুধু রাস্তা থেকে সরিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া যথেষ্ট নয়।
তার প্রয়োজন—
নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, মানসিক সহায়তা, পরিচয়পত্র/জন্মনিবন্ধন, পারিবারিক পুনর্মিলনের চেষ্টা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন।
‘সেলটার’ মানেই অধিকার নিশ্চিত নয়
কোনো শিশুকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখলেই তার অধিকার নিশ্চিত হয়ে যায় না।
আশ্রয়কেন্দ্র হতে হবে নিরাপদ, শিশুবান্ধব এবং জবাবদিহিমূলক।
সেখানে শিশুর সঙ্গে কী আচরণ করা হচ্ছে, পর্যাপ্ত খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা আছে কি না, শিক্ষা পাচ্ছে কি না, নির্যাতনের অভিযোগ করার নিরাপদ ব্যবস্থা আছে কি না—এসবও দেখতে হবে।
একটি শিশু পরিবার হারিয়েছে বলে তার দ্বিতীয়বার পরিবার হারানোর মতো অভিজ্ঞতা হওয়া উচিত নয়।
যেখানে সম্ভব, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশে পুনর্বাসনের চেষ্টা করতে হবে।
আশ্রয়হীন শিশুরও পরিচয়ের অধিকার আছে
জন্মনিবন্ধন শুধু একটি কাগজ নয়। এটি একটি শিশুর রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের দরজা।
পরিচয় না থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য সরকারি সেবায় প্রবেশ কঠিন হয়ে যায়।
তাই আশ্রয়হীন, পথশিশু বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুর জন্মনিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় পরিচয় নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা দরকার।
রাষ্ট্রের কোনো শিশুকে “ঠিকানা নেই” বলে অধিকারহীন করা উচিত নয়।
মানসিক স্বাস্থ্য—এই শিশুদের সবচেয়ে অবহেলিত অধিকার
প্রতিবন্ধী শিশু এবং আশ্রয়হীন শিশু—দুই ক্ষেত্রেই মানসিক চাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন প্রতিবন্ধী শিশু বারবার যদি শুনতে থাকে—
“তুমি পারবে না।”
“তুমি অন্যদের মতো নও।”
“তোমার জন্য সবাইকে কষ্ট করতে হয়।”
তাহলে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে যেতে পারে।
আবার আশ্রয়হীন একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই ক্ষুধা, ভয়, রাস্তায় ঘুমানো, নির্যাতন কিংবা প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে, তার মানসিক বিকাশেও গভীর প্রভাব পড়তে পারে।
তাই এই শিশুদের জন্য শুধু খাবার ও আশ্রয় নয়—নিরাপদ সম্পর্ক, কাউন্সেলিং, খেলাধুলা, সৃজনশীলতা এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রাপ্তবয়স্কের উপস্থিতি প্রয়োজন।
প্রযুক্তি হতে পারে সমাধানের একটি অংশ
প্রযুক্তি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
স্ক্রিন রিডার, অডিও বই, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ, যোগাযোগের সহায়ক প্রযুক্তি এবং অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী অনেক শিশুর শেখার সুযোগ বাড়াতে পারে।
কিন্তু ডিজিটাল বৈষম্য যেন নতুন বৈষম্য তৈরি না করে।
শহরের একটি পরিবারের সন্তান প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছে, আর গ্রামের দরিদ্র প্রতিবন্ধী শিশু যদি তা না পারে—তাহলে প্রযুক্তি তার জন্য সমাধান নয়, বরং আরেকটি ব্যবধান।
পরিবারকে একা লড়তে দেওয়া যাবে না
একটি প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের যত্ন নিতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক ও মানসিকভাবে চাপে পড়ে।
অনেক সময় মা-বাবার একজনকে চাকরি ছাড়তে হয়। চিকিৎসা ও থেরাপির ব্যয় পরিবারকে সংকটে ফেলে।
রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় পর্যায়ের সহায়ক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা তাই শুধু শিশুর জন্য নয়—পুরো পরিবারের জন্য প্রয়োজন।
একইভাবে আশ্রয়হীন শিশুর ক্ষেত্রেও শুধু শিশুকে উদ্ধার করে পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করলে সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান হবে না।
সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো সবচেয়ে জরুরি
আইন পরিবর্তন করা যায়।
স্কুলে র্যাম্প বানানো যায়।
আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা যায়।
ভাতা দেওয়া যায়।
কিন্তু সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করা কঠিন।
আমাদের ভাষাও বদলাতে হবে।
“অক্ষম” বলার বদলে তার প্রয়োজন ও সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
“বোঝা” বলার বদলে তাকে সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে।
“ওরা আলাদা”—এই দূরত্বের বদলে বলতে হবে—
“ওদের প্রয়োজন কিছুটা আলাদা, কিন্তু অধিকার আমাদের সবার সমান।”
রাষ্ট্রের করণীয় কী?
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, প্রতিবন্ধী ও আশ্রয়হীন শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কয়েকটি বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
প্রথমত, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে প্রবেশগম্য করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সহায়ক শিক্ষা উপকরণ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় থেরাপি ও পুনর্বাসন সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে।
চতুর্থত, আশ্রয়হীন শিশুদের জন্য নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক আশ্রয়ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
পঞ্চমত, এসব শিশুর জন্মনিবন্ধন ও পরিচয় নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
ষষ্ঠত, শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।
সপ্তমত, শিশু নির্যাতন, যৌন শোষণ ও পাচারের ঝুঁকি থেকে প্রতিবন্ধী ও আশ্রয়হীন শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
অষ্টমত, সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিশুর পরিবারকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে যতটা সম্ভব মুক্ত করতে হবে।
আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল: শিশুকে ‘সহায়তার বস্তু’ ভাবা
একজন প্রতিবন্ধী শিশুকে হুইলচেয়ার দেওয়া ভালো কাজ।
একজন আশ্রয়হীন শিশুকে খাবার দেওয়া ভালো কাজ।
একজন দরিদ্র শিশুকে পোশাক দেওয়া ভালো কাজ।
কিন্তু অধিকার নিশ্চিত করা তার চেয়েও বড় কাজ।
কারণ দান সাময়িক।
অধিকার স্থায়ী।
আমরা যদি একটি শিশুকে একদিন খাবার দিই, সে একদিনের জন্য বাঁচবে।
কিন্তু তাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পরিচয়, দক্ষতা ও মর্যাদা দেওয়ার ব্যবস্থা করলে সে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করার সুযোগ পাবে।
শেষ কথা
একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষের জীবনযাত্রায় নয়; বরং সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকা মানুষের প্রতি তার আচরণে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং আশ্রয়হীন শিশুরা সমাজের বোঝা নয়।
তারা আমাদের সমাজেরই অংশ।
তাদের জন্য আলাদা দয়া নয়—সমান মর্যাদা ও কার্যকর অধিকার প্রয়োজন।
আমাদের মনে রাখতে হবে—
হুইলচেয়ার শিশুটিকে স্কুলে যাওয়ার রাস্তা করে দেওয়া দয়া নয়—এটি তার অধিকার।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুকে উপযোগী বই দেওয়া দয়া নয়—এটি তার শিক্ষার অধিকার।
আশ্রয়হীন শিশুকে নিরাপদ ঘুমের জায়গা দেওয়া দয়া নয়—এটি তার নিরাপত্তার অধিকার।
একজন শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা দয়া নয়—এটি তার মর্যাদার স্বীকৃতি।
আর তাই শিশু অধিকার নিয়ে আমাদের আগামী দিনের স্লোগান হওয়া উচিত শুধু—
“সব শিশুর সমান অধিকার।”
বরং আরও স্পষ্ট করে বলতে হবে—
“যার প্রয়োজন বেশি, তার পাশে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বও বেশি।”
যেদিন একটি প্রতিবন্ধী শিশু স্কুলের দরজায় গিয়ে ভাববে না—“আমি কি এখানে ঢুকতে পারব?”
যেদিন একটি আশ্রয়হীন শিশু রাতে ঘুমানোর আগে ভাববে না—“আজ আমাকে কোথায় থাকতে হবে?”
যেদিন কোনো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু নিজের সক্ষমতা নিয়ে লজ্জা না পেয়ে গর্ব করতে পারবে—
সেদিনই আমরা বলতে পারব, বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে শিশু অধিকারকে কাগজ থেকে জীবনে নিয়ে এসেছে।
মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পলাশ
—সম্পাদক ও প্রকাশ
অধিকারপত্র ডটকম
