—অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │ ইরান পর্ব–০২
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে বদলে গেল? সাংস্কৃতিক বিপ্লব, পাঠ্যক্রমের ইসলামীকরণ, নারীশিক্ষার বিস্তার, বিজ্ঞানচর্চা, মাননিশ্চয়তা ও তরুণ প্রজন্মের প্রশ্ন নিয়ে অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের ইরান পর্ব–০২।
সম্পাদকীয় নোট │পর্ব ০২
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান বুঝেছিল, রাষ্ট্র বদলাতে হলে কেবল ক্ষমতার আসন দখল করলেই হয় না; দখল করতে হয় পাঠশালা, পাঠ্যবই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্পনাকেও। তাই শিক্ষা হয়ে উঠেছিল নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রকল্প। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, পাঠ্যক্রম পুনর্লিখন, শিক্ষকদের আদর্শিক পুনর্বিন্যাস, নারীশিক্ষার বিস্তার, বিজ্ঞানচর্চার অগ্রগতি এবং তরুণ প্রজন্মের অস্থির প্রশ্ন—সব মিলিয়ে বিপ্লবোত্তর ইরানের শিক্ষাব্যবস্থা আজও বিশ্ব ইতিহাসের এক জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়।
এই লেখাটির শক্তি হলো—এটি ইরানের ১৯৭৯-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র, আদর্শ, ধর্ম, জ্ঞান ও আধুনিকতার সংঘাতে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ সামাজিক পরীক্ষাগার হিসেবে দেখেছে। “সাংস্কৃতিক বিপ্লব”, পাঠ্যক্রমের ইসলামীকরণ, নারীশিক্ষার বিস্তার, বিজ্ঞানচর্চা, মাননিশ্চয়তা, জ্ঞানসৃষ্টি এবং তরুণ প্রজন্মের প্রশ্ন—এসব বিষয় ফিচারটির কাঠামোকে সমৃদ্ধ করেছে।
Keywords:
ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থা, ১৯৭৯ ইসলামি বিপ্লব, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ইরান, ইরানের পাঠ্যক্রম, শিক্ষা ও আদর্শ, ইরান নারীশিক্ষা, ইরান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বিপ্লবোত্তর ইরান, শিক্ষা সংস্কার, বাংলাদেশ ইরান শিক্ষা তুলনা, অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক।
প্রারম্ভিক কথন: আলবোরজের ছায়ায় এক নতুন শ্রেণিকক্ষ
তেহরানের উত্তর দিগন্তে তুষারশুভ্র আলবোরজ পর্বতমালা নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারির উত্তাল দিনে যখন ইরানের রাজপথে স্লোগানের ঢেউ উঠছিল, তখন সেই পর্বতের পাদদেশে এক পুরোনো সাম্রাজ্যের পতন এবং এক নতুন রাষ্ট্রদর্শনের জন্ম হচ্ছিল। রাজতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাস পেছনে ফেলে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে সূচিত হলো ইসলামি বিপ্লব। কিন্তু এই বিপ্লব শুধু প্রাসাদ, মসনদ বা সংবিধানের ভাষা বদলায়নি; বদলে দিয়েছে শ্রেণিকক্ষের ভাষা, পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস, শিক্ষকের ভূমিকা এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ কল্পনার পদ্ধতি।
নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সামনে তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—কীভাবে তৈরি হবে বিপ্লব-উত্তর “নতুন মানুষ”? এমন এক নাগরিক, যে হবে পাশ্চাত্য প্রভাবমুক্ত, ইসলামি মূল্যবোধে বলীয়ান, রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত, অথচ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষাও জানবে। এই জটিল লক্ষ্য পূরণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হলো শিক্ষাব্যবস্থাকে।
শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর আমলে যে শিক্ষা-প্রকল্প পশ্চিমা আধুনিকায়নের পথে এগোচ্ছিল, বিপ্লব-পরবর্তী শাসকগোষ্ঠী সেটিকে দেখল “ঘারবজাদেগি”—অর্থাৎ পশ্চিমাসক্তির বিষাক্ত ফল হিসেবে। তাই বিপ্লবের পর ইরানে শিক্ষার ইতিহাস শুরু হলো এক ধরনের আদর্শিক পুনর্লিখন দিয়ে। রাষ্ট্র যেন বলল—শ্রেণিকক্ষ আর নিরপেক্ষ জায়গা নয়; এটি হবে বিপ্লবের নৈতিক মানচিত্র।
বিপ্লবের পাঠশালায় ইরান: আদর্শ, জ্ঞান ও নতুন প্রজন্মের অস্থিরতা
তেহরানের আকাশে তখনও বিপ্লবের ধোঁয়া। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি—রাজপথে লক্ষ মানুষের স্লোগান, পতনোন্মুখ রাজতন্ত্র, নির্বাসন থেকে ফিরে আসা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, আর আড়াই হাজার বছরের সাম্রাজ্যিক ঐতিহ্য ভেঙে এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম। ইতিহাসের বইয়ে একে বলা হয় ইসলামি বিপ্লব। কিন্তু ইরানের ভেতরে এই বিপ্লব কেবল ক্ষমতার পালাবদল ছিল না; ছিল একটি জাতির আত্মা, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে নির্মাণের মহাপরিকল্পনা।
এই নির্মাণের সবচেয়ে গভীর ক্ষেত্র ছিল শিক্ষা। কারণ রাষ্ট্র বদলাতে হলে শুধু সংবিধান বদলালেই হয় না; বদলাতে হয় শ্রেণিকক্ষের ভাষা, পাঠ্যবইয়ের নায়ক, শিক্ষকের উচ্চারণ, শিশুর কল্পনা এবং তরুণের ভবিষ্যৎ-স্বপ্ন। বিপ্লবোত্তর ইরান খুব দ্রুত বুঝেছিল—রাজপথ জয় করা এক জিনিস, কিন্তু পাঠশালা জয় করা আরেক গভীরতর কাজ। রাষ্ট্র যদি নতুন মানুষ তৈরি করতে চায়, তবে তাকে স্কুলে ফিরতেই হবে।
শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর আমলে ইরানের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল পশ্চিমমুখী আধুনিকায়নের একটি বড় বাহন। ফরাসি ও মার্কিন ধাঁচের প্রশাসনিক কাঠামো, ধর্মনিরপেক্ষ পাঠ্যক্রম, নগর-অভিজাত শিক্ষার বিস্তার—এসব মিলিয়ে শিক্ষা ছিল রাষ্ট্রীয় আধুনিকতার প্রদর্শনী। কিন্তু বিপ্লবীরা এটিকে দেখলেন ভিন্ন চোখে। তাঁদের ভাষায় এটি ছিল ‘ঘারবজাদেগি’—পশ্চিম-আক্রান্ত এক মানসিকতা, যা ইরানি সমাজকে নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ফলে বিপ্লবের পর শিক্ষা হয়ে উঠল শুদ্ধিকরণের ক্ষেত্র, প্রতিরোধের ক্ষেত্র, এবং নতুন রাষ্ট্রদর্শনের পরীক্ষাগার।
সাংস্কৃতিক বিপ্লব: যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে গেল
বিপ্লবের পরপরই নতুন শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পারল, রাজপথে বিজয় অর্জন করলেই বিপ্লব পূর্ণতা পায় না। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, পাঠ্যসূচি এবং ছাত্ররাজনীতি যদি পুরোনো মতাদর্শের ছায়ায় থাকে, তাহলে নতুন রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। এই উপলব্ধি থেকেই ১৯৮০ সালে শুরু হয় ইরানের বহুল আলোচিত “সাংস্কৃতিক বিপ্লব”।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। উচ্চশিক্ষা যেন হঠাৎ থেমে দাঁড়াল এক আদর্শিক সীমান্তে। তিন বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান স্থগিত থাকল; গঠিত হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লব পরিষদ। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—কোন শিক্ষক পড়াবেন, কোন বই পড়ানো হবে, কোন জ্ঞান গ্রহণযোগ্য, কোন চিন্তা বিপ্লববিরোধী—এসব নতুন করে নির্ধারণ করা।
এই সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে এক গভীর ভূমিকম্প। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় তিন বছর বন্ধ রাখা হয়। উচ্চশিক্ষার চলমান ধারা হঠাৎ থেমে যায়। পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন, শিক্ষক পুনর্বিন্যাস, শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান যাচাই এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার এক ব্যাপক কর্মসূচি শুরু হয়।
হাজার হাজার শিক্ষক ও অধ্যাপককে পদচ্যুত করা হয়। যাঁরা বামপন্থী, উদারপন্থী, শাহপন্থী অথবা ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত বলে বিবেচিত ছিলেন, তাঁদের অনেকের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ছিল কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ। শ্রেণিকক্ষকে “শুদ্ধ” করার নামে ইরান শুরু করল এক গভীর আদর্শিক সার্জারি।
এই মানচিত্রে পশ্চিম ছিল এক সতর্ক সংকেত। পশ্চিমা সংস্কৃতি, সিনেমা, সংগীত, ভোগবাদী জীবনযাপন—এসবকে পাঠ্যবইয়ে প্রায়শই নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে দেখানো হলো। বিপ্লব-পরবর্তী শিক্ষার একটি বড় কাজ হয়ে দাঁড়াল শিক্ষার্থীদের বোঝানো যে, আধুনিকতা গ্রহণ করা যাবে, কিন্তু পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্য নয়। বিজ্ঞান শেখা যাবে, কিন্তু আত্মপরিচয় হারিয়ে নয়।
তবে এই ঘটনাকে একমাত্রিকভাবে বিচার করলে ভুল হবে। একদিকে এটি একাডেমিক স্বাধীনতার ওপর কঠোর আঘাত, অন্যদিকে বিপ্লবী রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এটি ছিল নতুন সামাজিক শৃঙ্খলা নির্মাণের অপরিহার্য পদক্ষেপ। এখানেই ইরানের শিক্ষার গল্প শুরু থেকেই দ্বিধাবিভক্ত—রাষ্ট্রের চোখে সংস্কার, সমালোচকের চোখে নিয়ন্ত্রণ।
পাঠ্যক্রমের ইসলামীকরণ: ইতিহাসের নতুন ভাষা
ইরানের বিপ্লবোত্তর শিক্ষা-রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পাঠ্যক্রম। বিপ্লবী নেতৃত্ব বিশ্বাস করত, শিশুর মন কাদা মাটির মতো; সেখানে যে মূল্যবোধ বপন করা হবে, ভবিষ্যতের নাগরিক তেমনই গড়ে উঠবে। তাই স্কুলের পাঠ্যবই হয়ে উঠল আদর্শ নির্মাণের প্রধান ক্ষেত্র।
ইতিহাস বইয়ে বড় পরিবর্তন এল। শাহ আমলের পাঠ্যবইয়ে যেখানে প্রাক-ইসলামি পারস্যের সাম্রাজ্যিক গৌরব, সাইরাস বা দারিয়ুসের ঐতিহাসিক মর্যাদা এবং রাজতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বিশেষ গুরুত্ব পেত, বিপ্লবের পর সেই বয়ান সরে যেতে থাকে। তার জায়গায় প্রবেশ করে ইসলামের ইতিহাস, কারবালার আত্মত্যাগ, শিয়া রাজনৈতিক চেতনা, মুসলিম উম্মাহর সংগ্রাম এবং ইসলামি বিপ্লবের বীরত্বগাথা।
আধুনিক ইরানের ইতিহাসে শাহকে তুলে ধরা হলো বিদেশি শক্তির নির্ভরশীল শাসক হিসেবে; আর খোমেনিকে দেখানো হলো জাতির মুক্তিদাতা হিসেবে। ইতিহাস আর শুধু অতীতের বিবরণ থাকল না; এটি হয়ে উঠল রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার পাঠ।
ধর্মীয় শিক্ষা পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রে স্থান পেল। কোরআন, ইসলামী নৈতিকতা, ধর্মীয় অনুশাসন এবং বিপ্লবী আত্মত্যাগের ধারণা পাঠ্যবইয়ে ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠল। শুধু ধর্মীয় বিষয়েই নয়, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞানপাঠেও নৈতিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার ছাপ দেখা গেল। শিক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল “তরবিয়ত”—অর্থাৎ এমন মানসিক ও নৈতিক গঠন, যা শিক্ষার্থীকে কেবল জ্ঞানী নয়, বরং অনুগত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ধর্মনিষ্ঠ নাগরিক হিসেবে নির্মাণ করবে।
আসলে বিপ্লবের পর পরেই পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের কাজ শুরু হলো আরও গভীরভাবে। ইতিহাসের বইয়ে প্রাক-ইসলামি পারস্যের সাম্রাজ্যিক গৌরব কম গুরুত্ব পেল; সামনে এলো ইসলামের ইতিহাস, কারবালার ত্যাগ, শহীদত্ব, মুসলিম উম্মাহর সংগ্রাম এবং বিপ্লবী নেতৃত্বের বয়ান। শাহকে দেখানো হলো বিদেশি শক্তির অনুগত শাসক হিসেবে; খোমেনিকে উপস্থাপন করা হলো জাতির নৈতিক মুক্তির প্রতীক হিসেবে।
শিক্ষা আর কেবল তথ্যের বাহন রইল না। এটি হয়ে উঠল ‘তরবিয়ত’—অর্থাৎ আত্মিক ও নৈতিক গঠন। ধর্মতত্ত্বের পাঠ বাধ্যতামূলক হলো। কিন্তু পরিবর্তন সেখানেই থামেনি। ফারসি সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান, ভূগোল, এমনকি বিজ্ঞানের পাঠ্যেও ধর্মীয় উদ্ধৃতি, নৈতিক ব্যাখ্যা এবং বিপ্লবী ভাষা প্রবেশ করল। রাষ্ট্র যেন বলতে চাইছিল—জ্ঞান আলাদা কোনো নিরপেক্ষ দ্বীপ নয়; জ্ঞানকে রাষ্ট্রের নৈতিক মানচিত্রের ভেতরেই থাকতে হবে।
পশ্চিমিকরণের বিরুদ্ধে পাঠশালা
ইরানের বিপ্লবোত্তর শিক্ষাব্যবস্থা নিজেকে নির্মাণ করেছে এক বিরোধিতার ভিতের ওপর। সেই বিরোধিতার নাম ছিল “পশ্চিমিকরণ”। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, সংগীত, পোশাক, জীবনধারা এবং ভোগবাদী মানসিকতাকে নতুন পাঠ্যক্রমে নৈতিক বিপদের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা হলো। “ঘারবজাদেগি” বা Westoxification ধারণাটি শিক্ষাদর্শের কেন্দ্রে প্রবেশ করল।
শিক্ষার্থীদের শেখানো হলো, আত্মপরিচয় হারানো জাতির সবচেয়ে বড় বিপদ। ইরানকে তাই শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবেও স্বাধীন হতে হবে। এই ধারণা পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় ইরানের আত্মনির্ভরতার ভাষাকে শক্তি দেয়। নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ইরান বারবার বলেছে—জ্ঞান আমদানি করা যায়, কিন্তু জাতির আত্মা আমদানি করা যায় না।
এই অবস্থান উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: শিক্ষা কি কেবল বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণের নাম, নাকি নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে নিজস্ব জ্ঞান-স্থাপত্য নির্মাণেরও নাম?
নারীশিক্ষা: নিয়ন্ত্রণের ভেতর বিস্তারের প্যারাডক্স
ইরানের বিপ্লবের পর লিঙ্গভিত্তিক শিক্ষানীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। পশ্চিমের অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেছিলেন, ইসলামি শাসনে নারীশিক্ষা হয়তো স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল।
প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ছেলে ও মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলাদা করা হয়। নারী শিক্ষকদের মেয়েদের স্কুলে এবং পুরুষ শিক্ষকদের ছেলেদের স্কুলে পাঠদানের নীতি জোরদার হয়। পোশাকবিধি, হিজাব এবং লিঙ্গভূমিকা পাঠ্যবইয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে। পরিবার, মাতৃত্ব, নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় নারীর ভূমিকা বিশেষভাবে মহিমান্বিত করা হয়।
কিন্তু এই পৃথকীকরণ অপ্রত্যাশিতভাবে নারীশিক্ষার বিস্তারে ভূমিকা রাখে। রক্ষণশীল পরিবারগুলো, যারা শাহ আমলের মিশ্র ও পশ্চিমাঘেঁষা শিক্ষাব্যবস্থায় মেয়েদের পাঠাতে দ্বিধা করত, তারা বিপ্লব-পরবর্তী ইসলামি পরিবেশে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বস্তি বোধ করে। ফলে গ্রামীণ ও রক্ষণশীল সমাজে নারীশিক্ষার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।
এই জায়গাতেই ইরানের শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স দেখা যায়। যে ব্যবস্থা নারীকে নির্দিষ্ট সামাজিক ভূমিকায় দেখতে চেয়েছিল, সেই ব্যবস্থাই শিক্ষিত, সচেতন ও উচ্চশিক্ষিত নারীসমাজ তৈরি করল। পরবর্তী সময়ে এই নারীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে, গবেষণায়, পেশাজীবনে এবং অধিকার-আন্দোলনে শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করে। রাষ্ট্র যে নারীকে শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, শিক্ষা তাকে প্রশ্ন করার ভাষাও দিয়েছে।
শিক্ষক: জ্ঞানদাতা, না বিপ্লবের প্রহরী?
বিপ্লবোত্তর ইরানে শিক্ষকের ভূমিকা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়। শিক্ষক আর শুধু পাঠদানকারী নন; তিনি রাষ্ট্রীয় আদর্শের বাহক, নৈতিকতার রক্ষক এবং বিপ্লবী চেতনার প্রেরক। ক্লাসরুম হয়ে ওঠে এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে জ্ঞান ও আনুগত্য পাশাপাশি শেখানো হয়।
শিক্ষকদের জন্য ধর্মীয় প্রশিক্ষণ, আদর্শিক কর্মশালা এবং রাষ্ট্রীয় দিকনির্দেশনার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থার একটি সংকটও ছিল। অনেক শিক্ষক নিজেদের পেশাগত স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কায় আত্ম-সেন্সরশিপে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রগুলোতে প্রশ্ন, বিতর্ক ও বিকল্প মতের জায়গা সংকুচিত হয়।
একজন শিক্ষক যখন জানেন, তাঁর ক্লাসরুমের কথা রাষ্ট্রীয় নজরদারির আওতায় যেতে পারে, তখন শিক্ষার প্রাণ—স্বাধীন চিন্তা—আঘাতপ্রাপ্ত হয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন তখন অনেক সময় আদর্শিক আনুগত্যের চাপে পিছিয়ে পড়ে। এই অভিজ্ঞতা শুধু ইরানের নয়; যে কোনো আদর্শ-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা।
সাক্ষরতা আন্দোলন: মসজিদের বারান্দা থেকে গ্রামের উঠোনে
ইরানের বিপ্লবোত্তর শিক্ষানীতির একটি উজ্জ্বল দিক হলো সাক্ষরতা আন্দোলন। বিপ্লবী নেতৃত্ব বুঝেছিল, নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে আদর্শিক রাষ্ট্রগঠন সম্ভব নয়। মানুষ যদি পড়তে না পারে, তবে ধর্মীয় বার্তা, বিপ্লবী চেতনা, নাগরিক দায়িত্ব কিংবা আধুনিক জ্ঞান—কিছুই কার্যকরভাবে পৌঁছাবে না।
এই উপলব্ধি থেকে গ্রামাঞ্চলে সাক্ষরতা কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। মসজিদের বারান্দা, স্থানীয় কমিউনিটি স্পেস, গ্রামের স্কুলঘর এবং কখনো খোলা আকাশের নিচে বয়স্ক ও নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা চালু হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এখানেও একটি দ্বৈততা আছে। সাক্ষরতা আন্দোলন ছিল আদর্শিক রাষ্ট্রের প্রকল্প; কিন্তু তার সামাজিক ফলাফল ছিল বাস্তব ও ইতিবাচক। মানুষ পড়তে শিখল, নারী ঘর থেকে বের হলো, গ্রামীণ সমাজে শিক্ষার মর্যাদা বাড়ল। অর্থাৎ রাষ্ট্র যে আদর্শ ছড়াতে চেয়েছিল, সেই পথেই জ্ঞানের সামাজিক বিস্তার ঘটল।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: ধর্মীয় রাষ্ট্রে আধুনিক জ্ঞানের উত্থান
ইরানের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে বিজ্ঞান কীভাবে বিকশিত হলো? অনেকের ধারণা ছিল, ইসলামীকরণ হয়তো বিজ্ঞানচর্চাকে দুর্বল করবে। কিন্তু ইরানের বাস্তবতা ভিন্ন ছবি দেখায়।
ইরান ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে মৌলিক বিরোধ স্থাপন করেনি। বরং পারমাণবিক বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, ন্যানোটেকনোলজি, স্টেম সেল গবেষণা এবং মহাকাশ প্রযুক্তিকে রাষ্ট্রীয় গৌরবের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। বিজ্ঞানকে বলা হয়েছে আল্লাহর সৃষ্টিজগত বোঝার পথ, আর প্রযুক্তিকে দেখা হয়েছে জাতীয় আত্মনির্ভরতার হাতিয়ার হিসেবে।
তবে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানে পরিস্থিতি ছিল বেশি জটিল। সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান কিংবা দর্শনের ক্ষেত্রে পশ্চিমা তত্ত্বকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। কোথাও কোথাও সেগুলোকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্ব্যাখ্যার চেষ্টা হয়েছে, আবার কোথাও সীমিত করা হয়েছে। ফলে ইরানের জ্ঞানচর্চা এক অসম মানচিত্র তৈরি করেছে—প্রযুক্তি ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে শক্তিশালী অগ্রগতি, কিন্তু মুক্ত মানবিক বিতর্কে সীমাবদ্ধতার অভিযোগ।
মাননিশ্চয়তা ও পরীক্ষানির্ভরতার দ্বন্দ্ব
ইরানের শিক্ষাব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফলে একটি অভিন্ন মানদণ্ড গড়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রতিযোগিতা, শিক্ষক নিয়োগ ও মূল্যায়ন কাঠামো শিক্ষাব্যবস্থাকে সংগঠিত করেছে। এর ফলে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার বিস্তার ও মান নিয়ন্ত্রণে একটি কাঠামোগত সুবিধা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এই শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও আছে। অতিরিক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, মুখস্থনির্ভরতা, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের তীব্র চাপ এবং আদর্শিক অনুগত্যের প্রত্যাশা শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। মাননিশ্চয়তা তখন হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের আরেক নাম, যদি তা মুক্ত অনুসন্ধানকে জায়গা না দেয়।
শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়; শিক্ষা হলো প্রশ্ন করার সামর্থ্য, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সমাজকে নতুনভাবে দেখার ক্ষমতা। ইরানের অভিজ্ঞতা দেখায়, কেন্দ্রীয় মানদণ্ড প্রয়োজনীয় হলেও সেটি যদি উদ্ভাবন, বহুমত ও একাডেমিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে, তবে শিক্ষার প্রাণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জ্ঞানসৃষ্টি ও আত্মনির্ভরতার প্রকল্প
বিপ্লবোত্তর ইরান শিক্ষা ও গবেষণাকে জাতীয় আত্মনির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত অবরোধ এবং বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা দেশটিকে বাধ্য করেছে নিজস্ব গবেষণা অবকাঠামো গড়তে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র এবং রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাননীতির মাধ্যমে ইরান দেশীয় জ্ঞান উৎপাদনের পথে এগিয়েছে।
প্রকৌশল, চিকিৎসা, ন্যানোটেকনোলজি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও জ্বালানি গবেষণায় ইরানের অগ্রগতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। সীমাবদ্ধতা কখনো কখনো উদ্ভাবনের প্ররোচনা হতে পারে—যদি রাষ্ট্র জ্ঞানকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে।
তবে জ্ঞানসৃষ্টি শুধু ল্যাবরেটরি, অর্থায়ন বা প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি স্বাধীন চিন্তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণার নৈতিকতা এবং মেধা ধরে রাখার পরিবেশের সঙ্গেও জড়িত। ইরানের সেরা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে পাড়ি জমায়। এই মেধাপাচার দেখায়, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়; সৃজনশীল মানুষের জন্য মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশও প্রয়োজন।
ডিজিটাল যুগে আদর্শের দেয়ালে ফাটল
চার দশক আগে যে শিক্ষাব্যবস্থা পাঠ্যবই, শিক্ষক ও রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার মাধ্যমে প্রজন্ম গড়তে চেয়েছিল, আজ সেটি দাঁড়িয়ে আছে ডিজিটাল যুগের এক নতুন বাস্তবতার সামনে। আজকের ইরানি তরুণ শুধু সরকারি পাঠ্যবই পড়ে না; সে স্মার্টফোনে বিশ্ব দেখে, সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক করে, ইউটিউবে বক্তৃতা শোনে, ভিপিএন দিয়ে নিষিদ্ধ জগতেও প্রবেশ করে।
শ্রেণিকক্ষে যে আদর্শিক নাগরিক তৈরির চেষ্টা চলে, ডিজিটাল জগৎ তার সামনে অন্য জীবন, অন্য স্বাধীনতা, অন্য প্রশ্ন খুলে দেয়। ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের দ্বৈততা জন্ম নেয়। একদিকে রাষ্ট্রীয় পাঠ্যক্রমের নৈতিক ভাষা, অন্যদিকে বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক তুলনার চাপ।
সাম্প্রতিক ইরানে তরুণদের আন্দোলন, বিশেষ করে নারী অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে যে প্রতিবাদ দেখা গেছে, তা শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কহীন নয়। যে শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে পড়তে শিখিয়েছে, ইতিহাস শিখিয়েছে, বিজ্ঞান শিখিয়েছে—সেই শিক্ষাই তাকে প্রশ্ন করতেও শিখিয়েছে। আদর্শের পাঠশালা কখনো কখনো প্রশ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: তুলনার আয়নায় একটি সতর্ক পাঠ
ইরান ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এক নয়। ইরান বিপ্লবের পর শিক্ষাকে সরাসরি আদর্শিক রাষ্ট্রগঠনের হাতিয়ার করেছে; বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর শিক্ষাকে দেখেছে জাতীয় চেতনা, ভাষা, গণতন্ত্র, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে। বাংলাদেশের শিক্ষা-ইতিহাসে ধর্মীয় শিক্ষা আছে, মাদ্রাসা শিক্ষা আছে, নৈতিকতার ভাষা আছে; কিন্তু ইরানের মতো পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ধর্মাদর্শভিত্তিক শিক্ষাকাঠামো নেই।
তবে তুলনাটি জরুরি। ইরান দেখিয়েছে, রাষ্ট্র যদি শিক্ষাকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেয়, তবে সাক্ষরতা, নারীশিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব। আবার ইরান এটিও দেখিয়েছে, অতিরিক্ত আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ মুক্তচিন্তা ও তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতার বড় শিক্ষা হলো—শিক্ষা সংস্কার কেবল পাঠ্যবই বদলানো নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, অর্থায়ন, শিক্ষক মর্যাদা, গবেষণা সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, মূল্যবোধ এবং নাগরিক স্বাধীনতার সম্মিলিত প্রকল্প। শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষা, সনদ ও চাকরির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে জাতি জ্ঞানী নয়, সনদধারী হবে। আবার শিক্ষা যদি কেবল আদর্শিক অনুগত্য চায়, তবে তা প্রশ্নহীন প্রজন্ম তৈরি করবে—সৃজনশীল প্রজন্ম নয়।
মূল্যায়ন: সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও অসমাপ্ত প্রশ্ন
বিপ্লবোত্তর ইরানের শিক্ষানীতি কোনো একরৈখিক সাফল্য বা ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি অর্জন ও সীমাবদ্ধতার এক জটিল মিশ্রণ।
ইরান সাক্ষরতা বিস্তারে সফল হয়েছে। নারীশিক্ষার প্রসার ঘটেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতার একটি শক্তিশালী মনোভাব তৈরি হয়েছে। জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় সংহতির ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ার যে প্রচেষ্টা ইরান দেখিয়েছে, তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
কিন্তু এর বিপরীতে রয়েছে একাডেমিক স্বাধীনতার সংকোচন, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, তরুণ প্রজন্মের বিচ্ছিন্নতা এবং মেধাপাচারের বাস্তবতা। রাষ্ট্র যে আদর্শিক মানুষ তৈরি করতে চেয়েছিল, বাস্তব সমাজ সেই মানুষের ভেতরেই প্রশ্ন, দ্বন্দ্ব ও নতুন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছে।
এই কারণেই ইরানের শিক্ষাব্যবস্থা একটি বিশাল সামাজিক পরীক্ষা। তারা দেখাতে চেয়েছিল—ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয় আত্মনির্ভরতা এবং আধুনিক বিজ্ঞান একসঙ্গে চলতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে তারা সফল; কিছু ক্ষেত্রে আদর্শ ও বাস্তবতার সংঘাত তাদের কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
জ্ঞান, আত্মনির্ভরতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সন্ধানে এক রাষ্ট্রের পথচলা
ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে শিক্ষা একেকটি জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন সভ্যতার ধারক ইরান—যার সাংস্কৃতিক শিকড় প্রসারিত হয়েছে হাজার বছরের জ্ঞানচর্চায়—আজও সেই ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সাথে মিলিয়ে নতুন এক শিক্ষাদর্শ নির্মাণে ব্যস্ত। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন—সবকিছুর ভেতর দিয়েও দেশটি শিক্ষা খাতকে তার উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছে। এই পথচলা কেবল একটি রাষ্ট্রের নয়, বরং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের এক গভীর আকাঙ্ক্ষার গল্প।
ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—জ্ঞানকে কেবল তথ্য বা পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা জাতীয় আত্মনির্ভরতার শক্তিতে রূপান্তর করা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশটির অগ্রগতি, বিশেষ করে প্রকৌশল, চিকিৎসা ও পারমাণবিক গবেষণায়, শিক্ষার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কৌশলের এক নিবিড় সম্পর্কেরই প্রতিফলন। ইরান শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে এমন এক কাঠামো নির্মাণ করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
তবে এই যাত্রা নিখুঁত নয়। গ্রাম ও শহরের মধ্যে শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য, শিক্ষাক্রমে অতিরিক্ত তাত্ত্বিক নির্ভরতা, এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা—এসব চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান। বিশেষত বৈশ্বিক জ্ঞান-বিনিময়ের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক এক্সপোজারকে সংকুচিত করেছে। তবুও, এই সীমাবদ্ধতার ভেতরেই ইরান একটি আত্মনির্ভর গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনুকরণীয়।
ইরানের শিক্ষা দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে “স্বনির্ভরতা” ও “সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা”—যেখানে পাশ্চাত্য জ্ঞানের সাথে নিজস্ব মূল্যবোধের এক সংমিশ্রণ দেখা যায়। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাকে কেবল কর্মসংস্থানের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি একটি আদর্শ নাগরিক তৈরির প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় চেতনা জাগ্রত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য কিছু কৌশলগত পথ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাকে আরও আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভার্চুয়াল সহযোগিতা, যৌথ গবেষণা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাক্রমে সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল জ্ঞান গ্রহণকারী নয়, বরং জ্ঞান সৃষ্টিকারী হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা—বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স এবং ডিজিটাল লার্নিং—এই ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো ইরানকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখতে পারে। চতুর্থত, নারী শিক্ষার বিস্তারে ইতোমধ্যে অর্জিত সাফল্যকে আরও শক্তিশালী করে কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সবশেষে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা—যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও সমান সুযোগ পায়—এই লক্ষ্য অর্জনই হবে টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। কারণ শিক্ষা তখনই সফল, যখন তা কেবল কিছু মানুষের নয়, বরং পুরো সমাজের উন্নয়ন নিশ্চিত করে।
ইরানের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—প্রতিবন্ধকতা যতই থাকুক, একটি রাষ্ট্র যদি শিক্ষা খাতকে তার উন্নয়নের কেন্দ্রস্থলে রাখে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে এক শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম। এই গল্প তাই কেবল ইরানের নয়; এটি প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক প্রেরণার আলোকবর্তিকা।
ইরানি শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামি বিপ্লবের প্রভাব মূল্যায়ন: সরকারি হস্তক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল
শিক্ষা ব্যবস্থায় আদর্শিক হস্তক্ষেপের মূল্যায়ন
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থাকে শুধু আধুনিকীকরণ নয়, বরং ‘বিশুদ্ধিকরণ’ করাই ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য। ইসলামি সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্র নয়, বরং বিপ্লবের আদর্শ প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ (Cultural Revolution)-এর মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের মনে ইসলামি মূল্যবোধ গেঁথে দিতে পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় আখ্যান ও রাজনৈতিক সচেতনতার মিশ্রণ ঘটানো হয়। সরকারের এই সরাসরি হস্তক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি নতুন ‘ইসলামি প্রজন্ম’ তৈরি করা, যারা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হবে।
হস্তক্ষেপের ইতিবাচক ও নেতিবাচক ফলাফল
এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলাফল ছিল দ্বিমুখী। ইতিবাচক দিক থেকে, গ্রামীণ ও রক্ষণশীল পরিবারগুলো তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে শুরু করে, কারণ সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কঠোর ইসলামি পরিবেশ ও লিঙ্গভিত্তিক পৃথকীকরণ নিশ্চিত করেছিল। এর ফলে নারী শিক্ষার হার অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পায়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার ব্যাপক বিনিয়োগ করে, যার ফলে সাক্ষরতার হারে ইরান বিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ইরানকে স্টেম (STEM) গবেষণায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী দেশে রূপান্তরিত করেছে।
তবে এই কঠোর নিয়ন্ত্রণের কিছু নেতিবাচক দিকও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শিক্ষার ওপর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শের মাত্রাতিরিক্ত চাপ অনেক ক্ষেত্রে মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। উচ্চশিক্ষার স্তরে প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং ক্যারিয়ারের সীমিত সুযোগের কারণে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। এর ফলশ্রুতিতে ইরান গত কয়েক দশকে মারাত্মক ‘মেধাপাচার’ বা ব্রেইন ড্রেইন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। ফলে, বিপ্লবোত্তর শিক্ষানীতি একদিকে যেমন একটি বিশাল শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে, অন্যদিকে তাদের আদর্শিক ও পেশাদারী চাহিদা পূরণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইরানের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক সংস্কার: ১৯৭৯ পরবর্তী বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া
পাঠ্যপুস্তকের আমূল রূপান্তর ও ‘শোধন’ প্রক্রিয়া
বইয়ের পাতা থেকে রাজতন্ত্র মুছে দিয়ে বিপ্লবোত্তর ইরানে কীভাবে বদলে ফেলা হলো প্রায় ৩,০০০ পাঠ্যবই—সেই ইতিহাস আজও শিক্ষা, আদর্শ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুতে। বিপ্লবী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইগুলোতে আমূল পরিবর্তন আনে। ১৯৮০ সালে গঠিত ‘সেন্টার ফর টেক্সটবুকস’ (Center for Textbooks), যার অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন ধর্মতাত্ত্বিক বা আলেম, ১৯৮৩ সালের মধ্যে প্রায় ৩,০০০ নতুন কলেজ-লেভেল পাঠ্যবই রচনা করে। এই প্রক্রিয়ায় পাহলভী আমলের ‘শাহ’ কেন্দ্রিক ইতিহাস, পশ্চিমা সংস্কৃতির গুণগান এবং সেকুলার জীবনধারা সংক্রান্ত যাবতীয় অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়। এর পরিবর্তে স্থান পায় শিয়া ইসলামি দর্শন, বিপ্লবের চেতনা এবং পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা ‘ওয়েস্টক্সিকেশন’ (Westoxification)-এর বিরুদ্ধে সচেতনতা।
পাঠ্যক্রমে আদর্শিক ও বৈজ্ঞানিক সমন্বয়
বিপ্লবোত্তর পাঠ্যক্রমে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদগুলোতে সবচেয়ে বড় আঘাত হানা হয়। সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং আইন শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে ইসলামি শরিয়াহ এবং বৈপ্লবিক ইতিহাসের আলোকে ঢেলে সাজানো হয়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকার ধর্মতত্ত্বের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির (STEM) ওপর পাঠ্যক্রমে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে এমন একটি দক্ষ জনশক্তি তৈরির চেষ্টা করা হয় যারা একদিকে ধর্মীয়ভাবে অনুগত এবং অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তিতে পারদর্শী। এছাড়াও, প্রাক-বিপ্লব আমলের রাজকীয় জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ‘উম্মাহ’ বা বৈশ্বিক মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ধারণা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জাতীয় পাঠ্যক্রম ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ
বর্তমানে ইরানের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম একটি ‘জাতীয় কাউন্সিল’ দ্বারা নির্ধারিত হয়। এর ফলে দেশটির উত্তর থেকে দক্ষিণ—সর্বত্র অভিন্ন পাঠ্যসূচি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। পাঠ্যপুস্তকে লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে পরিবার কাঠামো এবং ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি অনুগত থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়। যদিও ২০১২ সালের শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনায় মুখস্থবিদ্যার বদলে গবেষণা এবং সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তবুও পাঠ্যপুস্তকের মূল ভিত্তি এখনও ইসলামি আদর্শ ও রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক দর্শনের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।
শ্রেণিকক্ষেও কি রাজনীতি? ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় কীভাবে মিশে আছে ‘সুপ্রিম লিডার’-এর দর্শন?
সর্বোচ্চ নেতার দর্শন ও ‘বিলায়াত-ই ফকিহ’র অন্তর্ভুক্তি
ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader)-এর আদর্শিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। দেশটির সংবিধানে বর্ণিত ‘বিলায়াত-ই ফকিহ’ বা ‘ফকিহ-র অভিভাবকত্ব’ তত্ত্বটি পাঠ্যক্রমের প্রতিটি স্তরে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পড়ানো হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় যে, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব অবিচ্ছেদ্য। সর্বোচ্চ নেতার বিভিন্ন ভাষণ, তার রাজনৈতিক দর্শন এবং পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানকে পাঠ্যপুস্তকে আদর্শিক উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনে শাসকগোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোর প্রতি অটল বিশ্বাস তৈরির চেষ্টা করা হয়।
শিক্ষক নিয়োগ ও ‘পাসদারান’ আদর্শের প্রভাব
আদর্শিক প্রচার শুধু পাঠ্যপুস্তকেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শাসক দল ও আদর্শের প্রতি আনুগত্যকে অন্যতম প্রধান যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়। ইরানে শিক্ষক হতে হলে একজন প্রার্থীকে কঠোর ‘গোযিনেশ’ (Selection) বা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যেখানে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের পরীক্ষা নেওয়া হয়। শাসক দলের অনুসারী এবং বিপ্লবী চেতনার শিক্ষকরাই মূলত শ্রেণিকক্ষে প্রাধান্য পান। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘বাসিজ’ (বিপ্লবী ছাত্র সংগঠন)-এর সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করে যে, ক্যাম্পাসের পরিবেশ যেন কোনোভাবেই সরকারের বা সর্বোচ্চ নেতার নীতিমালার বাইরে না যায়।
সাংস্কৃতিক প্রতিরক্ষা ও ‘সফট ওয়ার’ মোকাবিলা
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির পর বর্তমান নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘সফট ওয়ার’ (Soft War) বা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। শাসকগোষ্ঠীর এই নীতি অনুযায়ী, শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো ‘ইসলামি জীবনধারা’ (Islamic Lifestyle) প্রচার করা এবং পশ্চিমা জীবনবোধের অসারতা প্রমাণ করা। ফলে, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান বইগুলোতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিজয়গাথা এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের কাহিনী বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়। সরকারের এই আদর্শিক হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো এমন এক অনুগত প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখেও বর্তমান শাসন কাঠামোর রক্ষক হিসেবে কাজ করবে।
ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনামূলক মূল্যায়ন: ১৯৭৯ বিপ্লব-পূর্ব ও পরবর্তী প্রেক্ষাপট
বিপ্লব-পূর্ব শিক্ষা ব্যবস্থা: আধুনিকায়ন বনাম পশ্চিমা আধিপত্য (১৯২৫-১৯৭৯)
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর শাসনামলে ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল মূলত পশ্চিমা ধাঁচের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আধুনিকায়নের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা। ১৯৩৬ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে ‘হোয়াইট রেভোলিউশন’ (White Revolution)-এর মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি এলিট বা উচ্চবিত্ত শ্রেণির উপযোগী করে সাজানো হয়েছিল। তখন ফরাসি ও মার্কিন শিক্ষা পদ্ধতিকে মডেল হিসেবে নেওয়া হয়, যেখানে রাজতন্ত্রের গুণগান এবং প্রাক-ইসলামি পারস্যের গৌরবকে বড় করে দেখানো হতো। যদিও সে সময় শহরগুলোতে আধুনিক স্কুল ও কলেজ গড়ে উঠেছিল, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষা নিয়ে এক ধরণের অনীহা ও দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
বিপ্লব-উত্তর শিক্ষা ব্যবস্থা: গণমুখী শিক্ষা ও আদর্শিক রূপান্তর (১৯৭৯-বর্তমান)
বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় দুটি বড় পরিবর্তন আসে: এক, শিক্ষার ‘ইসলামীকরণ’ এবং দুই, শিক্ষার ‘গণতন্ত্রীকরণ’। ইসলামি সরকার শিক্ষাকে কেবল এলিট শ্রেণির গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় স্কুল নির্মাণ এবং মেয়েদের শিক্ষার জন্য নিরাপদ ধর্মীয় পরিবেশ নিশ্চিত করার ফলে নারী শিক্ষার হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। শাহ আমলের ‘পাশ্চাত্যকরণ’ নীতিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে সেখানে স্থান দেওয়া হয় শিয়া ইসলামি মূল্যবোধ। তবে পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞানের প্রসারে সরকার আগের চেয়েও বেশি বিনিয়োগ শুরু করে। এর ফলে ইরান বর্তমানে মহাকাশ গবেষণা, ন্যানোটেকনোলজি এবং নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের মতো জটিল বিষয়ে ঈর্ষণীয় উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে।
তুলনামূলক পর্যালোচনা: ফলাফল কী দাঁড়িয়েছে?
পাহলভী আমলের সাথে বর্তমান ব্যবস্থার মূল পার্থক্য হলো ‘উদ্দেশ্য’ এবং ‘ব্যাপ্তি’। শাহ আমল চেয়েছে ইরানকে একটি পশ্চিমা সাংস্কৃতিক উপগ্রহে পরিণত করতে, যেখানে শিক্ষা ছিল কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির উন্নয়নের হাতিয়ার। অন্যদিকে, বিপ্লব-উত্তর সরকার শিক্ষাকে একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শিক যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। শাহ আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল উদার কিন্তু বৈষম্যমূলক, আর বর্তমান ব্যবস্থাটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও গণমুখী হলেও কঠোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে মুক্তচিন্তার প্রসারে কিছুটা সীমাবদ্ধ। তবে সামগ্রিক বিচারে, ১৯৭৯-এর পর ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে আমূল অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সাক্ষরতার অগ্রগতি হয়েছে, তা দেশটির আধুনিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত।
সাফল্য নাকি সীমাবদ্ধতা? ১৯৭৯ পরবর্তী ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার লাভ-ক্ষতির খতিয়ান!
সাফল্যের খতিয়ান: ইতিবাচক অভিজ্ঞতা
বিপ্লব পরবর্তী ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো শিক্ষার ‘গণতন্ত্রীকরণ’। ১৯৭৯ সালের আগে শিক্ষা ছিল মূলত শহুরে এলিট শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার, কিন্তু বিপ্লবের পর ‘লিটারেসি মুভমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (LMO)-এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া হয়। এর ফলে ১৯৭৬ সালে যেখানে সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৪৮%, বর্তমানে তা ৯৫% ছাড়িয়েছে। আরেকটি বিশাল ইতিবাচক দিক হলো নারী শিক্ষার বিপ্লব। ইসলামি অনুশাসন ও লিঙ্গভিত্তিক পৃথকীকরণ নিশ্চিত করায় রক্ষণশীল পরিবারগুলো তাদের মেয়েদের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বর্তমানে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি নারী। এছাড়া, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যেমন—ন্যানোটেকনোলজি, স্টেম সেল এবং এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ইরান এখন বৈশ্বিক মানে পৌঁছেছে, যা তাদের স্বনির্ভর শিক্ষানীতির অন্যতম বড় সাফল্য।
সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ: নেতিবাচক অভিজ্ঞতা
ইতিবাচক অর্জনের পাশাপাশি ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু গভীর নেতিবাচক প্রভাবও পরিলক্ষিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘আদর্শিক সেন্সরশিপ’। পাঠ্যক্রমকে অতিরিক্ত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করার ফলে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদগুলোতে মুক্তচিন্তা ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে ধর্মীয় অনুশাসনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া, সরকারি কড়াকড়ি এবং শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্যের বাধ্যবাধকতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন বারবার বিঘ্নিত হয়েছে।
মেধাপাচার ও কর্মসংস্থান সংকট
বিপ্লবোত্তর ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় বৈপরীত্য হলো—দেশটি উচ্চশিক্ষিত বিশাল এক জনসংখ্যা তৈরি করতে পারলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও গবেষণার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার ইরানি মেধাবী শিক্ষার্থী ইউরোপ ও আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছে, যা বিশ্বের অন্যতম উচ্চমাত্রার ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধাপাচার হিসেবে পরিচিত। একদিকে রাষ্ট্রের অর্থায়নে উন্নত শিক্ষা প্রদান, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই মেধা দেশের কাজে না লাগাতে পারা এই শিক্ষা ব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক অভিজ্ঞতা। ফলে, সংখ্যাগত দিক দিয়ে ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক এগিয়ে থাকলেও গুণগত ও সৃজনশীল স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এটি এখনও বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
বিপ্লব পরবর্তী ইরানের শিক্ষার মূল্যায়ন: ইতিবাচক ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতা
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব–পরবর্তী সময়ে ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে রূপান্তর ঘটে, তা একইসঙ্গে সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার এক জটিল সমাহার। ইতিবাচক দিক থেকে দেখলে, রাষ্ট্র শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ বাড়ায়, গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যালয় সম্প্রসারণ করে এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি দৃশ্যমান—বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের সমান বা বেশি হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিও এই সময়ের একটি বড় অর্জন।
অন্যদিকে, নেতিবাচক অভিজ্ঞতার তালিকাও কম নয়। শিক্ষার ওপর আদর্শগত নিয়ন্ত্রণের কারণে পাঠ্যক্রমে বৈচিত্র্য ও স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে মানবিক শাখায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হওয়ায় গবেষণার গভীরতা ও বহুমাত্রিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক একাডেমিক সংযোগের সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে। ফলে উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের এই দ্বৈত বাস্তবতা ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক ধরনের টানাপোড়েনের মধ্যে রেখেছে।
আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন ও নতুন ইস্যুর উত্থান
বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ইরানের শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা এক মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। পূর্বে যেখানে আধুনিকীকরণ ও পাশ্চাত্যধর্মী জ্ঞানচর্চা প্রাধান্য পেত, সেখানে নতুন করে গুরুত্ব পায় ইসলামী মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং জাতীয় স্বনির্ভরতা। শিক্ষার লক্ষ্য হয়ে ওঠে কেবল দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি নয়, বরং আদর্শিকভাবে প্রতিশ্রুতিশীল নাগরিক গড়ে তোলা।
তবে সময়ের সাথে সাথে নতুন কিছু প্রশ্নও সামনে আসে। বৈশ্বিকায়নের যুগে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ফলে একটি দ্বৈত আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে—একদিকে ধর্মীয় ও জাতীয় পরিচয় ধরে রাখা, অন্যদিকে বৈশ্বিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। এর পাশাপাশি “ব্রেইন ড্রেইন”, শিক্ষিত বেকারত্ব, এবং দক্ষতা–চাহিদার অসামঞ্জস্য নতুন ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
উত্তম দৃষ্টান্ত ও বিতর্কিত অনুশীলন
ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু দৃষ্টান্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসিত হয়েছে। যেমন—গ্রামীণ শিক্ষা বিস্তার, নারী শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, এবং বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষায় বিনিয়োগ। রাষ্ট্রীয়ভাবে গবেষণা ও উদ্ভাবনে উৎসাহ প্রদান করে দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তবে একইসঙ্গে কিছু বিতর্কিত অনুশীলনও রয়েছে। পাঠ্যক্রমে আদর্শগত প্রভাব, শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনা, এবং শিক্ষাঙ্গনে মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ শিক্ষার স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং সৃজনশীল চিন্তার পরিসর সংকুচিত করে।
দর্শন, নীতি ও কর্তৃত্বে প্যারাডাইম শিফট
বিপ্লবের পর ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি সুস্পষ্ট প্যারাডাইম শিফট ঘটে। পূর্বে যেখানে শিক্ষা নীতি তুলনামূলকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিকতাবাদী ছিল, সেখানে নতুন কাঠামোতে ইসলামী দর্শন কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য পুনঃসংজ্ঞায়িত হয়—জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নৈতিকতা, আদর্শ এবং রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের বিকাশকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নীতিগতভাবে, শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায় এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা শক্তিশালী হয়। ইরান শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো শিক্ষার দিকনির্দেশনা নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এর ফলে একটি ঐক্যবদ্ধ নীতিমালা গড়ে ওঠে, তবে একইসঙ্গে বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে আসে।
পুল ও পুশ ফ্যাক্টর: পরিবর্তনের গতিশীলতা
ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার বিবর্তনে বিভিন্ন পুল (আকর্ষণ) ও পুশ (প্রেরণ/চাপ) ফ্যাক্টর কাজ করেছে। পুল ফ্যাক্টরের মধ্যে রয়েছে—রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, বিনামূল্যে বা স্বল্পব্যয়ে শিক্ষা, গবেষণায় বিনিয়োগ, এবং জাতীয় উন্নয়নে অংশগ্রহণের সুযোগ। এই উপাদানগুলো শিক্ষার্থীদের দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
অন্যদিকে, পুশ ফ্যাক্টরের মধ্যে রয়েছে—আন্তর্জাতিক সুযোগের সীমাবদ্ধতা, মতপ্রকাশের নিয়ন্ত্রণ, এবং কিছু ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সীমিত সম্ভাবনা। এসব কারণ অনেক শিক্ষার্থীকে বিদেশমুখী হতে উৎসাহিত করেছে, যা “ব্রেইন ড্রেইন” সমস্যাকে তীব্র করেছে। এই দ্বৈত প্রবণতা ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—কীভাবে দেশীয় আকর্ষণ বাড়িয়ে এবং সীমাবদ্ধতা কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।
এই সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়, ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থা এক চলমান রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—যেখানে আদর্শ, বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক চাহিদার মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টাই ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ নির্ধারণ করবে।
মূল্যবোধের পরিবর্তন: কী, কীভাবে এবং কেন—ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক আদর্শগত রূপান্তর
কী পরিবর্তন ঘটেছে (What: Value System Transformation)
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব–পরবর্তী সময়ে ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন ছিল মূল্যবোধের কেন্দ্রবিন্দুতে এক মৌলিক স্থানান্তর। পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় যেখানে আধুনিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং পাশ্চাত্যধর্মী জ্ঞানচর্চা প্রাধান্য পেত, সেখানে বিপ্লব-পরবর্তী যুগে ইসলামী নৈতিকতা, শিয়া মতাদর্শ, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় আনুগত্য শিক্ষার মূল মূল্যবোধে পরিণত হয়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয় “আদর্শ ইসলামী নাগরিক” তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক চেতনা শিক্ষার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়।
ফলে জ্ঞানের সংজ্ঞাও পরিবর্তিত হয়—জ্ঞান আর কেবল বৈজ্ঞানিক বা কারিগরি দক্ষতা নয়; বরং তা নৈতিক, ধর্মীয় এবং আদর্শগত চেতনার সঙ্গে একীভূত একটি সামগ্রিক ধারণায় রূপ নেয়।
কীভাবে এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হয়েছে
এই মূল্যবোধগত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হয়েছে একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে। প্রথমত, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়—যেখানে ইসলামী ইতিহাস, ধর্মীয় শিক্ষা এবং আদর্শগত বিষয়গুলোকে কেন্দ্রীয় স্থানে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পাঠ্যসূচির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধর্মীয় শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করা হয় এবং পশ্চিমা তত্ত্ব বা ধারণাকে পুনর্বিন্যাস বা বাদ দেওয়া হয়।)
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে আদর্শগত সামঞ্জস্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে শিক্ষকেরা রাষ্ট্রের মূল্যবোধের বাহক হিসেবে কাজ করতে পারেন। তৃতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আচরণগত ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ—যেমন লিঙ্গভিত্তিক পৃথকীকরণ, ধর্মীয় অনুশাসন—প্রবর্তন করা হয়।
চতুর্থত, কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী কাঠামোর মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যাতে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লক্ষ্যসমূহ সরাসরি শিক্ষার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়া দেখায় যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি “আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস” হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে জ্ঞানচর্চা ও মূল্যবোধ একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।
কেন এই পরিবর্তন আনা হয়েছে
এই মূল্যবোধগত পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণ। প্রথমত, বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র একটি নতুন আদর্শিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল—যা পশ্চিমা প্রভাব থেকে মুক্ত এবং ইসলামী দর্শনে ভিত্তিক। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা হয় সেই আদর্শ বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম হিসেবে।
দ্বিতীয়ত, শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য একটি অনুগত ও আদর্শগতভাবে সমর্থক নাগরিক গোষ্ঠী তৈরি করা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে সামাজিকীকরণ (socialization) করা হয়, যাতে তারা রাষ্ট্রের মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি অনুগত থাকে।
তৃতীয়ত, সাংস্কৃতিক আত্মরক্ষা—অর্থাৎ “পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন” থেকে নিজস্ব পরিচয় রক্ষা—এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি প্রতিরোধমূলক সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
চতুর্থত, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও এই পরিবর্তনের অংশ ছিল—বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষা বিস্তার, নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং নারী শিক্ষার প্রসারে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ
এই মূল্যবোধগত রূপান্তর ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক স্বতন্ত্র চরিত্র দিয়েছে—যেখানে জ্ঞান, আদর্শ এবং রাষ্ট্রনীতি একত্রে কাজ করে। তবে এর ফলে একটি দ্বৈত বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে: একদিকে নৈতিকতা ও জাতীয় পরিচয়ের দৃঢ়তা, অন্যদিকে মুক্তচিন্তা ও বৈশ্বিক জ্ঞান প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যের চ্যালেঞ্জ।
অতএব, “কি, কীভাবে এবং কেন”—এই তিনটি প্রশ্নের আলোকে দেখা যায়, ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যবোধের পরিবর্তন ছিল পরিকল্পিত, রাষ্ট্রনির্দেশিত এবং আদর্শভিত্তিক; যার প্রভাব আজও দেশটির শিক্ষা, সমাজ ও রাজনীতির প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হচ্ছে।
পর্যবেক্ষণ ও প্রতিফলন
ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থাকে তাই একরৈখিক ভাষায় বিচার করা কঠিন। এটি কি সফল? আংশিকভাবে, হ্যাঁ। সাক্ষরতা বৃদ্ধি, নারী শিক্ষার বিস্তার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতার চেষ্টা, জাতীয় পরিচয়ের দৃঢ় নির্মাণ—এসব অর্জন উপেক্ষা করা যায় না। আবার এটি কি সীমাবদ্ধ? নিঃসন্দেহে। মুক্তচিন্তার পরিসর সংকোচন, মানবিক বিদ্যায় আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ, মেধাপাচার, তরুণদের হতাশা, কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার দুর্বল সংযোগ—এসবও বাস্তব।
আসলে বিপ্লবোত্তর ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল এক বিশাল সামাজিক পরীক্ষা। একটি রাষ্ট্র দেখতে চেয়েছিল—আধুনিক বিজ্ঞান, ধর্মীয় নৈতিকতা, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং জাতীয় আত্মনির্ভরতা কি একই শ্রেণিকক্ষে বসানো যায়? কিছু ক্ষেত্রে তারা পেরেছে। কিছু ক্ষেত্রে সেই শ্রেণিকক্ষের দেয়ালে ফাটল ধরেছে।
আজ তেহরানের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দাঁড়ালে হয়তো একসঙ্গে দেখা যাবে দুই ইরানকে। একদিকে দেয়ালে বিপ্লবী নেতার ছবি, অন্যদিকে তরুণ শিক্ষার্থীর হাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণার নোট। একদিকে পাঠ্যবইয়ে শহীদের কাহিনি, অন্যদিকে ক্যাফের টেবিলে স্বাধীনতা, পেশা, দেশত্যাগ, প্রেম, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তর্ক। এই বৈপরীত্যই আধুনিক ইরানের আসল চেহারা।
শিক্ষা শেষ পর্যন্ত শুধু রাষ্ট্রের প্রকল্প নয়; শিক্ষার্থীও তাকে নিজের মতো করে পড়ে, বদলায়, প্রশ্ন করে। ইরান পাঠ্যবই দিয়ে একটি নতুন মানুষ গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো—মানুষ কখনো শুধু পাঠ্যবইয়ের তৈরি নয়। পরিবার, রাস্তা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, স্মৃতি, স্বপ্ন—সব মিলে তার চেতনা তৈরি হয়।
১৯৭৯ সালের বিপ্লব ইরানের শ্রেণিকক্ষে যে আগুন জ্বালিয়েছিল, তা এখনও নিভে যায়নি। তবে সেই আগুনের রং বদলেছে। একসময় তা ছিল আদর্শের আগুন; আজ তা প্রশ্নের আগুন। সেই প্রশ্নই হয়তো আগামী দিনের ইরানের শিক্ষানীতিকে নতুন পথে ঠেলে দেবে।
শেষ পর্যন্ত ইরানের শিক্ষাগাথা আমাদেরও ভাবায়। শিক্ষা কি কেবল রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত নাগরিক তৈরি করবে? নাকি রাষ্ট্রকেও প্রশ্ন করতে শেখাবে? পাঠ্যবই কি কেবল অতীতের বয়ান বহন করবে? নাকি ভবিষ্যতের দরজা খুলবে? বিপ্লবের ক্লাসরুমে বসে ইরান এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে চার দশক ধরে। উত্তর এখনও অসম্পূর্ণ—কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পাঠশালাগুলো এমনই হয়।
উপসংহার: পাঠ্যবইয়ের বাইরে যে ভবিষ্যৎ
১৯৭৯ সালের সেই উত্তাল বিপ্লবী দিন থেকে আজকের ডিজিটাল ইরান—মাঝখানে চার দশকের বেশি সময়। এই সময়ের মধ্যে ইরানের শিক্ষাব্যবস্থা এক বিরল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। এটি কেবল ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্র কীভাবে নাগরিকের মন গড়তে চায়, ইতিহাস কীভাবে পুনর্লিখিত হয়, নারীশিক্ষা কীভাবে নিয়ন্ত্রণের ভেতর থেকেও শক্তি পায়, বিজ্ঞান কীভাবে জাতীয় প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ওঠে এবং তরুণ প্রজন্ম কীভাবে পাঠ্যবইয়ের বাইরে নতুন পৃথিবী আবিষ্কার করে—তার গল্প।
শিক্ষা কখনো সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের হাতে বন্দি থাকে না। কারণ শিক্ষা মানুষকে পড়তে শেখায়; আর পড়তে শেখা মানুষ একসময় প্রশ্ন করতেও শেখে। ইরান সেই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বিপ্লবের পাঠশালা একদিন যে নাগরিককে আনুগত্য শেখাতে চেয়েছিল, সেই নাগরিক আজ স্বাধীনতা, মর্যাদা, জ্ঞান ও ভবিষ্যতের নতুন সংজ্ঞা লিখতে চাইছে।
বিপ্লব-উত্তর ইরানের শিক্ষা তাই বিশ্বকে একটি কঠিন কিন্তু জরুরি পাঠ দেয়: শিক্ষা দিয়ে রাষ্ট্র গড়া যায়, কিন্তু শিক্ষা দিয়ে মানুষের কল্পনাকে চিরদিন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ডে রাষ্ট্র যা লিখে, ইতিহাস তা সবসময় অক্ষরে অক্ষরে মানে না। কখনো কখনো শিক্ষার্থীর চোখেই লেখা থাকে আগামী বিপ্লবের প্রথম বাক্য।
বিদ্র: উপরের নিবন্ধটি এই ফিচারটি সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব। তৃতীয় পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন—যেখানে আমরা তুলে ধরব - ইরানের অসম্ভব’কে সম্ভব করার গল্প→ নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জন করল ইরান তা আলোচিত হবে আগহামী পর্বে।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#ইরান_শিক্ষাব্যবস্থা #ইসলামি_বিপ্লব_১৯৭৯ #বিপ্লবের_পাঠশালা #শিক্ষা_সংস্কার #পাঠ্যক্রমের_ইসলামীকরণ #সাংস্কৃতিক_বিপ্লব #নারীশিক্ষা_ইরান #বিজ্ঞান_ও_প্রযুক্তি #জ্ঞানসৃষ্টি #মাননিশ্চয়তা #শিক্ষা_ও_আদর্শ #বাংলাদেশ_ইরান_তুলনা #অধিকারপত্র #শিক্ষার_নদী #EducationReform #IranEducation #CurriculumReform #KnowledgeSociety #Odhikarpatra
অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থা ৯৭৯ ইসলামি বিপ্লব বাংলাদেশ ইরান শিক্ষা তুলনা

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: