অধিকারপত্র সম্পাদকীয়
একটি গ্রন্থের বক্তব্যের সহিত দ্বিমত থাকিতে পারে। উহার বক্তব্য, ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা কিংবা লেখকের রাজনৈতিক ভূমিকা লইয়া কঠোর সমালোচনাও হইতে পারে। মুক্তবুদ্ধির সমাজে সেই সমালোচনার অবকাশ থাকিতে হইবে। একই সঙ্গে গ্রন্থটির প্রকাশ, বিক্রয়, পাঠ ও গবেষণার সুযোগও সুরক্ষিত থাকিতে হইবে। বাংলাবাজারে বাঙালির স্বাধীনতায় অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রয়ে বাধা, ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে তালা এবং দুই কর্মীকে হয়রানির অভিযোগ এই মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করিয়াছে।
অধিকারপত্রের অবস্থান সুস্পষ্ট: আমরা একাডেমিক জ্ঞানচর্চা, ইতিহাসের অনুসন্ধান এবং স্বাধীন পাঠের উপর কোনো আঘাত চাই না। এই অবস্থান সকল লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের সহিত জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতার মানদণ্ড পরিবর্তিত হইতে পারে না।
প্রকাশিত সংবাদ ও ইউপিএলের বিবৃতি অনুযায়ী, বিক্রয়কেন্দ্রে আগত ব্যক্তিরা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে ‘নিষিদ্ধ’ বলিয়া দাবি করিয়া উহার বিক্রয়ে আপত্তি জানান। প্রতিষ্ঠানটি তাঁহাদিগকে জানায়, গ্রন্থটি নিষিদ্ধ নহে। তাহার পরও শাটার নামাইয়া দেওয়া এবং দুই কর্মীকে হয়রানি করিয়া পুলিশ ফাঁড়িতে লইয়া যাইবার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। বাধাদানকারীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। তবে তাঁহাদের ঘোষিত দাবির সমর্থনে কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার তথ্য আলোচিত সংবাদসমূহে পাওয়া যায় নাই।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ঘোষণার দ্বারা একটি গ্রন্থের প্রকাশ্য প্রাপ্যতা নির্ধারিত হইতে পারে না। কোনো প্রকাশনা লইয়া অভিযোগ থাকিলে তাহার নিষ্পত্তির জন্য প্রমাণ, জবাব প্রদানের সুযোগ এবং যথাযথ প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ভয় দেখাইয়া দোকান বন্ধ করা সেই প্রক্রিয়াকেই অগ্রাহ্য করে। ইহাতে সমাজে এমন ধারণা জন্মিবার আশঙ্কা থাকে যে, সংগঠিত চাপ প্রয়োগ করিতে পারিলেই অন্যের পাঠের পছন্দ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
জ্ঞানকে রুদ্ধ করিলে মুক্তির পথও রুদ্ধ হয়
জ্ঞানের প্রবাহ অবাধ রাখিবার মধ্য দিয়াই একটি সমাজ তাহার মুক্তির পথ উন্মুক্ত রাখে। ইতিহাসের বক্তব্যের জবাব আসুক দলিল, গবেষণা ও সমালোচনায়; জ্ঞানের দ্বার বন্ধ করিয়া মানুষের মুক্তির পথ রুদ্ধ করা চলিবে না।
যে গ্রন্থ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র গুরুত্ব অনুধাবন করিবার জন্য লেখকের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি গ্রন্থটির বিষয়বস্তু ও প্রকৃতিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। ২০১২ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ The Unfinished Memoirs করিয়াছেন অধ্যাপক ফকরুল আলম। তাঁহার প্রকাশনা-তালিকায় একই বৎসরে ঢাকা হইতে ইউপিএল, নয়াদিল্লি হইতে পেঙ্গুইন বুকস এবং করাচি হইতে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মাধ্যমে ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশের তথ্য রহিয়াছে। ইহার ফলে বাংলা ভাষার বাহিরের পাঠক ও গবেষকদের নিকটও গ্রন্থটি পৌঁছাইবার পথ উন্মুক্ত হইয়াছে।
ইউপিএলের গ্রন্থপরিচিতি অনুযায়ী, কারাবাসকালে রচিত এই স্মৃতিকথায় শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা, পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, ভাষা আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামের বিবরণ রহিয়াছে। ঘটনাপ্রবাহ ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ ইহা মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নহে; বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমি অনুধাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে অংশগ্রহণকারী একজন ব্যক্তির আত্মজীবনী গবেষককে তাঁহার অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, সম্পর্ক ও আত্মব্যাখ্যার নিকট লইয়া যায়। ভাষার প্রশ্ন কীভাবে রাজনৈতিক চেতনায় পরিণত হয়, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা একজন নেতাকে কীভাবে গড়িয়া তোলে এবং ব্যক্তিজীবনের সহিত বৃহত্তর ইতিহাসের সম্পর্ক কোথায়—এই সকল অনুসন্ধানে এমন গ্রন্থ মূল্যবান।
একই সঙ্গে আত্মজীবনীকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে পাঠ করিতে হয়। স্মৃতির সীমাবদ্ধতা, ঘটনার নির্বাচিত উপস্থাপন এবং লেখকের নিজস্ব অবস্থান বিবেচনায় রাখিয়া অন্যান্য উৎসের সহিত বক্তব্য মিলাইয়া দেখা গবেষকের দায়িত্ব। কোনো গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করিবার অর্থ উহার প্রতিটি বক্তব্যকে প্রশ্নাতীত ঘোষণা করা নহে। বরং গ্রন্থটি সহজলভ্য থাকিলেই উহার বক্তব্য যাচাই, সমালোচনা ও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ বিস্তৃত হয়। আধুনিক জ্ঞানচর্চার পরিসরেও এই নীতি স্বীকৃত যে, ইতিহাসের উৎসকে প্রশ্ন করা যায়; সেই প্রশ্ন করিবার জন্যই উৎসটি পাঠকের নাগালে থাকা প্রয়োজন।
বিক্রয়কর্মীর নিরাপত্তাও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন
এই ঘটনায় দুই বিক্রয়কর্মীর অবস্থান বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। তাঁহারা কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করিতেছিলেন। কোনো গ্রন্থের লেখক বা প্রকাশকের সহিত রাজনৈতিক বিরোধ থাকিলেও তাহার দায় কর্মীদের উপর চাপাইবার সুযোগ নাই। তাঁহাদিগকে ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা বলপূর্বক কর্মস্থল হইতে লইয়া যাইবার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে গ্রন্থটি আর বিক্রয় করা হইবে না—এমন শর্তে কর্মীদের মুক্তি দেওয়ার কথা সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরাতে উল্লেখ করা হইয়াছে। একই প্রতিবেদনে পুলিশের অপর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করিবার শর্তে এমন শর্ত আরোপ যথাযথ নহে বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। এই বিবরণ পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন আরও বৃদ্ধি করিয়াছে।
নাগরিকের নিরাপত্তা কোনো অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার উপর নির্ভর করিতে পারে না। বিরোধ নিষ্পত্তির নামে হুমকিদাতার দাবি কার্যকর হইলে ভবিষ্যতে একই পদ্ধতি প্রয়োগের উৎসাহ সৃষ্টি হইতে পারে। প্রকাশক, গ্রন্থবিক্রেতা ও কর্মীরা তখন নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সম্ভাব্য আক্রমণের কথা ভাবিতে বাধ্য হইবেন। এই ভয় হইতেই আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধের জন্ম হয়; প্রকাশিত হইবার পূর্বেই বহু রচনার পথ রুদ্ধ হইয়া যাইতে পারে।
প্রতিবাদের মধ্যে যে নীতিগত ঐক্য
ঘটনাটি লইয়া ভিন্ন অবস্থানের মানুষের প্রতিবাদের তাৎপর্য এখানেই। গ্রন্থটির সকল বক্তব্য কিংবা লেখকের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে অভিন্ন মূল্যায়ন ছাড়াও প্রকাশনার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব।
আদর্শ প্রকাশনীর অবস্থান তাহার একটি উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়া জানাইয়াছে, ২০২৩ সালে তাহাদের সংকটকালে ইউপিএল প্রকাশনার পেশাগত স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াইয়াছিল। এবার একই নীতির ভিত্তিতে তাহারা ইউপিএলের পাশে দাঁড়াইয়াছে। আদর্শ আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছে, চাপ প্রয়োগ করিয়া একটি গ্রন্থের বিক্রয় বন্ধ করা সম্ভব হইলে আগামী দিনে অন্য মতাদর্শের গ্রন্থও আক্রান্ত হইতে পারে।
শহিদুল আলম, সারা হোসেন, হামিদা হোসেন, খুশী কবিরসহ নাগরিকদের যৌথ প্রতিবাদ এবং ব্লাস্টের তদন্তের দাবিও এই বৃহত্তর উদ্বেগের প্রকাশ। বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমাজের বিবৃতিও একই উদ্বেগের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। তাঁহাদের বক্তব্যসমূহে কয়েকটি অভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাইয়াছে: কর্মীদের নিরাপত্তা, প্রকাশনা ও পাঠের অধিকার এবং দায়ীদের জবাবদিহি।
এই নীতিগত সংহতি বজায় রাখা জরুরি। আজ যে গ্রন্থের বক্তব্য আমাদের পছন্দ নহে, তাহার পাঠের স্বাধীনতা রক্ষার মধ্য দিয়াই আগামীকাল আমাদের পছন্দের গ্রন্থটির স্বাধীনতাও সুরক্ষিত হয়। অধিকারের প্রয়োগে বাছবিচার পরিণামে সকলের অধিকারকেই দুর্বল করে।
দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা
ঘটনাটি বিবিসি বাংলা, ডয়চে ভেলেসহ বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হইয়াছে। দ্য হকে প্রকাশিত আইএএনএসের প্রতিবেদনে বিষয়টি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লইয়া উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হইয়াছে। ফলে বাংলাবাজারের একটি বিক্রয়কেন্দ্রের ঘটনা দেশের বাহিরেও বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চার পরিবেশ সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ সৃষ্টি করিয়াছে।
দেশের ভাবমূর্তির কতখানি ক্ষতি হইয়াছে, তাহা পরিমাপ করিবার তথ্য আমাদের নিকট নাই। কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি, গবেষণা-সহযোগিতা বা কূটনৈতিক সম্পর্কে সরাসরি প্রভাব পড়িয়াছে বলিবারও ভিত্তি নাই। তবে এমন ঘটনা সাংস্কৃতিক সহনশীলতা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করিতে পারে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে প্রতিবাদ হইয়াছে, তাহাও বাইরের পর্যবেক্ষকের নিকট গুরুত্বপূর্ণ। উহা প্রকাশনার স্বাধীনতা রক্ষায় সমাজের সক্রিয়তার পরিচয় দেয়। এখন কর্তৃপক্ষের বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ সেই আস্থা আরও সুদৃঢ় করিতে পারে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, পুলিশের ভূমিকার ব্যাখ্যা, কর্মীদের নিরাপত্তা এবং দায় প্রতিষ্ঠিত হইলে ব্যবস্থা গ্রহণ—এই সকল পদক্ষেপই প্রয়োজন।
প্রকাশক ও পাঠককে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখিয়া দেওয়া চলিবে না। গ্রন্থটির আইনগত অবস্থান সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করিতে হইবে এবং বিক্রয়কেন্দ্রে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করিতে হইবে। কোনো গ্রন্থ লইয়া আপত্তি থাকিলে তাহার আলোচনা হইবে প্রকাশ্যে, যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে। কেননা একটি আত্মবিশ্বাসী সমাজ ইতিহাসের জটিলতা লইয়া আলোচনা করিতে পারে। সেখানে শ্রদ্ধা থাকে, সমালোচনাও থাকে; গবেষণার ফল প্রচলিত ধারণাকে পরিবর্তিত করিবার সুযোগ পায়। সেই সমাজ গড়িয়া তুলিতে গ্রন্থ, দলিল, আর্কাইভ ও গবেষণার পরিসর উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন।
অধিকারপত্র মনে করে, জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা রক্ষা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। আমরা চাই, গ্রন্থের বক্তব্যের জবাব আসুক গবেষণায়, দলিলে, সমালোচনায় এবং নূতন গ্রন্থে। পাঠকের জন্য বইয়ের দোকানের দ্বার উন্মুক্ত থাকুক। জ্ঞানের কোনো উৎস যেন ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগের নিকট জিম্মি হইয়া না পড়ে।
রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে
এখানে স্মরণ রাখিতে হইবে, ঘটনাটি ঘটিয়াছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড—ইউপিএল নামক একটি আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কেন্দ্রে। বাংলাদেশের তুলনামূলকভাবে সীমিত একাডেমিক প্রকাশনার পরিসরে এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচ্য। দেশি ও বিদেশি বহু বিশিষ্ট পণ্ডিত ও গবেষকের গ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়া প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চাকে আন্তর্জাতিক পাঠকসমাজের নিকট পৌঁছাইতে ভূমিকা রাখিয়াছে। উহার প্রকাশিত গ্রন্থ বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারেও স্থান পাইয়াছে; গবেষণা, উচ্চশিক্ষা ও বাংলাদেশবিষয়ক অধ্যয়নের সহিত এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক তাই তাৎপর্যপূর্ণ।
ইউপিএলের ন্যায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠান যদি গ্রন্থ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বাধা এবং কর্মীদের নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হয়, তবে দেশের মুক্ত জ্ঞানপ্রবাহে নূতন উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হইবার আশঙ্কা উপেক্ষা করা যায় না। এমন ঘটনার প্রভাব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকিবে—এই নিশ্চয়তা দেওয়াও সম্ভব নহে। অন্য প্রকাশক, লেখক, গবেষক ও গ্রন্থবিক্রেতার মনে প্রশ্ন জাগিতে পারে, কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অপছন্দের বিষয় প্রকাশ বা বিক্রয় করিলে তাঁহারাও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হইবেন কি না। এই আশঙ্কা প্রকাশনার সিদ্ধান্তে আত্মনিয়ন্ত্রণ আরোপ করিতে পারে এবং বিতর্কিত অথচ গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহের প্রকাশ ও প্রচার সংকুচিত করিতে পারে।
সুতরাং রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, পুলিশের ভূমিকার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপত্তা এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার নিশ্চয়তা প্রদান জরুরি। দায় প্রতিষ্ঠিত হইলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। ইউপিএলের আন্তর্জাতিক পরিচিতি ঘটনাটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে; তবে একই সুরক্ষা প্রত্যেক প্রকাশক, গ্রন্থবিক্রেতা ও পাঠকের প্রাপ্য।
রাষ্ট্রকে তাহার কার্যক্রমের মধ্য দিয়াই নিশ্চিত করিতে হইবে যে, ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগের দ্বারা দেশের জ্ঞানচর্চার পরিসর নিয়ন্ত্রণ করা যাইবে না।
সমাপনী: ভিন্নমতের স্বাধীনতা রক্ষাতেই জ্ঞান ও মুক্তির পথ
একাডেমিক জ্ঞানচর্চার একটি মৌলিক নীতি হইল, নিজের চিন্তা ও বিশ্বদৃষ্টিকে প্রশ্নের সম্মুখীন করিবার জন্য ভিন্নমতের উপস্থিতি অপরিহার্য। যে পরিসরে বিরুদ্ধ যুক্তি উত্থাপন, প্রচলিত ধারণা যাচাই এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করিবার স্বাধীনতা থাকে না, সেখানে জ্ঞানের অগ্রগতি ব্যাহত হয়; চিন্তা ক্রমে বদ্ধ ধারণা, অন্ধ আনুগত্য ও কুসংস্কারের আবর্তে আবদ্ধ হইয়া পড়ে। যুক্তি ও সংলাপের পরিসর সংকুচিত হইলে ভয়ভীতি, অসহিষ্ণুতা এবং গায়ের জোর প্রাধান্য বিস্তারের সুযোগ পায়। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা সম্পর্কে রোজা লুক্সেমবুর্গের বহুল পরিচিত বক্তব্যের মর্মার্থও এই—স্বাধীনতা সর্বদাই ভিন্নমত পোষণকারীর স্বাধীনতা। এই নীতির আলোকে কোনো গ্রন্থের বক্তব্যের সহিত দ্বিমত পোষণ করিয়াও উহার প্রকাশ, বিক্রয় ও পাঠের অধিকার রক্ষা করা প্রয়োজন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে কেন্দ্র করিয়া বাংলাবাজারে বাধাদান ও কর্মীদের হয়রানির অভিযোগ তাই একটি গ্রন্থ কিংবা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি অতিক্রম করিয়া আমাদের জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রশ্নকেই সম্মুখে আনিয়াছে।
সমঅধিকার ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা সমাজের বৈষম্য ও অসংগতি দূর করিবার সংগ্রামকে পথ দেখায়। তবে অধিকারের প্রকৃত পরীক্ষা ঘটে তখনই, যখন উহা আমাদের সহিত দ্বিমত পোষণকারী মানুষের ক্ষেত্রেও সমভাবে স্বীকৃত ও সুরক্ষিত হয়। যে সমাজ ভিন্নমতকে ভয় পায়, সেই সমাজ নিজের চিন্তার বিকাশের পথও সংকুচিত করে; আর যে সমাজ প্রশ্ন করিবার অধিকার রক্ষা করে, সেই সমাজ জ্ঞান, ন্যায় ও মুক্তির সম্ভাবনাকে প্রসারিত করে।এই বিশ্বাস স্মরণ করিয়াই সম্পাদকীয়টির ইতি টানিতে চাই—মানুষের অন্তরে স্বাধীনতার যে আকাঙ্ক্ষা নিহিত রহিয়াছে, রাইফেলের মুখে তাহাকে চিরতরে স্তব্ধ করা যায় না। গ্রন্থের দ্বার রুদ্ধ করিয়া, পাঠককে ভয় দেখাইয়া কিংবা ভিন্নমতকে দমন করিয়া মানুষের জানিবার ও মুক্ত হইবার আকাঙ্ক্ষাকেও নির্বাপিত করা যাইবে না। লুক্সেমবার্গের ভাষায়,
“that humanity has an inherent yearning for freedom one which cannot be put down with rifles.”
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু | উপদেষ্টা, অধিকারপত্র | odhikarpatranews@gmail.com
#অধিকারপত্র #সম্পাদকীয় #অসমাপ্তআত্মজীবনী #ইউপিএল #প্রকাশনারস্বাধীনতা #পাঠেরঅধিকার #জ্ঞানচর্চারস্বাধীনতা #মুক্তবুদ্ধি #মতপ্রকাশেরস্বাধীনতা #রাষ্ট্রেরজবাবদিহি
