odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৪ ভাদ্র ১৪৩২
একটি তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ

ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি : বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এক নীরব দুর্যোগ

odhikarpatra | প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৫ ২০:৪৬

odhikarpatra
প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৫ ২০:৪৬

- উপসম্পাদকীয়

 সংকটের স্বরূপ

উচ্চশিক্ষা একটি জাতির জ্ঞানভিত্তিক অগ্রযাত্রার মূল স্তম্ভ। পিএইচডি—যাহা গবেষণানির্ভর জ্ঞানসৃষ্টির সর্বোচ্চ একাডেমিক স্বীকৃতি—বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে একাংশের নিকট “উপাধি-নির্ভর মর্যাদা” প্রাপ্তির শর্টকাটে পরিণত হইয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও নিয়োগব্যবস্থার দুর্বলতা, বিদেশি ডিপ্লোমা মিল-এর দৌরাত্ম্য এবং যাচাই–সম্মতি কাঠামোর ফাঁকফোকর মিলিয়া ইহা এখন এক প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতার সঙ্কটে উত্তীর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রকাশ্যে সতর্ক করিয়াছে—দেশে অবৈধ/অস্বীকৃত প্রতিষ্ঠান ও ভুয়া পিএইচডি লেনদেনের চক্র কার্যকর আছে এবং কঠোর ব্যবস্থা প্রত্যাশিত।

কার্যনির্যাস

বাংলাদেশে পিএইচডি ডিগ্রি—যাহা হওয়া উচিত গবেষণার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি—আজ কিছু ক্ষেত্রে পরিণত হইয়াছে “অর্থ–উপাধি” ক্রয়ের মাধ্যম। ৪,০০০+ ভুয়া পিএইচডি (AWU সূত্রে) বিতরণের ঘটনা, অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম এবং যাচাই–সম্মতি কাঠামোর দুর্বলতা একাডেমিক মানহানিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাইতেছে।

এই প্রবন্ধ ভুয়া পিএইচডি সংকট মোকাবিলায় তথ্যভিত্তিক নীতি–প্রস্তাব প্রদান করে—যাহার লক্ষ্য শিক্ষা–গবেষণায় সততা ফিরিয়ে আনা, নীতি–নির্ধারণে যোগ্যতা নিশ্চিত করা, এবং আন্তর্জাতিক আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

বাংলাদেশের পরিমণ্ডল : সংখ্যা যে কথা বলে

  • ডক্টরেটধারীর মোট সংখ্যা : জনগণনা–২০২২ ভিত্তিতে বাংলাদেশের পিএইচডি/ডক্টরেটধারীর সংখ্যা ৫১,৭০৪—যাহা উচ্চশিক্ষার বিস্তারকে নির্দেশ করে; কিন্তু মানোন্নয়নের প্রশ্ন উন্মুক্তই রহিল। একই সূত্রে ২০১৭–২০২১ সালে ২৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হইতে ৪,৪৩৩ জন ডক্টরেট অর্জন করেন; আর বিশ্ববিদ্যালয়–শিক্ষকগণের মধ্যে পিএইচডিধারী ৫,৬০৬ (২০২১)—যাহা ২০১৭ সালের ৪,৭৬৬ হইতে বৃদ্ধি।
  • পিএইচডি কারখানা/ডিপ্লোমা মিলের স্থানীয় প্রভাব : সংবাদমাধ্যম–তদন্তে প্রকাশ, American World University (AWU) নামে এক “ডিপ্লোমা মিল” গত এক দশকে বাংলাদেশে ৪,০০০-এর অধিক ভুয়া পিএইচডি বিতরণ করিয়াছে—যাহা প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ডের জন্য মারাত্মক হুমকি। daily-sun
  • অবৈধ বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম : America Bangladesh University-এর কার্যক্রম UGC অবৈধ ঘোষণা করিয়া শিক্ষার্থীদের ভর্তি–নিবারণের পরামর্শ দিয়াছে—অর্থ–উপাধি–লেনদেনের পথ রুদ্ধ করিতে ইহা নীতিগত দৃষ্টান্ত।
  • নীতিনির্ধারকের পর্যবেক্ষণ ২০১৬ সালে জাতীয় সংসদে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী স্বীকার করেন—বিদেশ হইতে ভুয়া পিএইচডি সংগ্রহের ঘটনা “অনেকে” করে থাকেন।

ভূয়া পিএইচডি সম্পর্কিত সমস্যার বিবৃতি

  • বাংলাদেশে ডক্টরেটধারীর সংখ্যা : ৫১,৭০৪ (জনগণনা ২০২২)।
  • গত এক দশকে ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে আনুমানিক ৪,০০০+ ভুয়া পিএইচডি বিতরণ।
  • বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাবিহীন ডুয়াল পিএইচডি দাবিদার শিক্ষকগণ।
  • UGC–র রেড–ফ্ল্যাগ তালিকায় ২৫টির অধিক বিশ্ববিদ্যালয়, তথাপি কার্যকর প্রতিরোধ সীমিত।
  • ভুয়া ডিগ্রির কারণে গবেষণার মানহানি, পদোন্নতিতে অসাধু সুবিধা, আন্তর্জাতিক সুনামের ক্ষয়।

Evidence Base (প্রমাণ–উপাত্ত)

  • ডক্টরেট ডিপ্লোমা কারখানা/মিলের বিস্তার : AWU–এর মাধ্যমে হাজারো ভুয়া পিএইচডি বিতরণ।
  • নীতিনির্ধারণে স্বীকৃতি : শিক্ষামন্ত্রী সংসদে স্বীকার করেন, অনেকেই বিদেশ হইতে ভুয়া ডিগ্রি সংগ্রহ করেন।
  • আন্তর্জাতিক নজির : জার্মানির Annette Schavan, হাঙ্গেরির রাষ্ট্রপতি Pal Schmitt পদত্যাগ করেন ভুয়া ডিগ্রির কারণে।
  • আন্তর্জাতিক বাজার : আনুমানিক ১০ লক্ষ ভুয়া ডিগ্রি ধারী, বার্ষিক ব্যবসার আকার USD ৩০০ মিলিয়ন

কেন সংকট গভীর : প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বিশ্লেষণ

  1. যাচাই–সম্মতি (Verification) দুর্বলতা : বিদেশি ডিগ্রি সমতুল্যতা প্রদানে UGC অনলাইন প্রোফাইল, কাগজ–যাচাই, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ইত্যাদি ধাপ নির্দিষ্ট করিলেও—বাস্তবায়নে শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রীয় ডাটাবেস–অগ্রগতি সীমিত।
  2. অবৈধ প্রতিষ্ঠান শনাক্তে সিস্টেমিক ফাঁক : ‘রেড–ফ্ল্যাগ’ তালিকা/কালো–তালিকা থাকিলেও ভর্তিনিষেধ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বাস্তবায়ন অনিয়মিত; ২০১৯ সালে UGC ২৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘রেড’ চিহ্নিত করিয়া সতর্ক করে—কিন্তু ছাত্র–শিক্ষক–নিয়োগক্ষেত্রে প্রতিরোধ যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক হয় নাই।
  3. প্রণোদনার বিকৃতি : পদোন্নতি/বেতন–স্কেলে ডিগ্রি–ভিত্তিক সুবিধা থাকায় ‘উপাধি–অর্থনীতি’ গড়ে ওঠে; ফলে গবেষণার গুণগত মান অপেক্ষা সার্টিফিকেট–সংগ্রহে উৎসাহ বৃদ্ধি পায়—যাহা সংবাদ–তথ্য ও বিশ্লেষণে প্রতিফলিত।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত : তুলনামূলক শিক্ষা–নীতি

ভুয়া ডক্টরেট বৈশ্বিক সমস্যা।

  • জার্মানি: প্রাক্তন শিক্ষা–মন্ত্রী অ্যানেটে শাভান পিএইচডি বাতিল–পরবর্তী পদত্যাগ করেন; দুই বৎসর আগে কার্ল-থিওডর জু গুটেনবার্গ–এর কেলেঙ্কারিও বৈশ্বিক সাড়া তোলে।
  • হাঙ্গেরি: রাষ্ট্রপতি পাল শ্মিট–এর ডক্টরেট প্রত্যাহার; পরবর্তী কালে পদত্যাগ।
  • গ্লোবাল ডিপ্লোমা মিল অর্থনীতি: বিশেষজ্ঞরা ধরিয়া নেন ২,৬০০+ ডিপ্লোমা মিল বিশ্বে সক্রিয়; শুধু যুক্তরাষ্ট্রে ১,০০০+, তন্মধ্যে আনুমানিক ৪০০ সংস্থা ভুয়া পিএইচডি দেয়; ২০১১ সালে বৈশ্বিক ভুয়া ডিগ্রি–বিপণনের আকার USD ৩০ কোটি+ (নিম্ন–আনুমান), অন্তত ১০ লক্ষ গ্রাহক—দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা–শ্রমবাজারে ব্যাপক ক্ষতি।

প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ক্ষতি : প্রমাণ–উপাত্তে

  • শিক্ষার মানহানি : ভুয়া পিএইচডিধারী শিক্ষক/কর্মকর্তা নিয়োগ পেলে ছাত্র–শিক্ষায় গবেষণার ন্যূনতম মান রক্ষিত হয় না—UGC–র পদক্ষেপ ও সংবাদ–তদন্ত ইহার প্রমাণ হাজির করে।
  • আন্তর্জাতিক সুনামের ঝুঁকি : অস্বীকৃত/অবৈধ প্রতিষ্ঠানের উপাধি ব্যবহার দেশের মান–রেটিং, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও স্কলারলি নেটওয়ার্কে বিশ্বাসহানি ঘটায়।
  • নীতিনির্ধারণে অযোগ্যতার প্রবাহ : শিক্ষা–স্বাস্থ্য–প্রযুক্তি–প্রশাসনে জাল উপাধিধারীর উপস্থিতি ভুল নীতি ও নিরাপত্তা–ঝুঁকি ডেকে আনে—মার্কিন কংগ্রেস/GAO–নিরীক্ষার প্রেক্ষাপট সতর্কসংকেত।

নীতি–পথনকশা : উত্তরণের কাঠামো (প্রস্তাব)

১) জাতীয় PhD রেজিস্ট্রি ও ভেরিফিকেশন পোর্টাল

  • ওপেন–অ্যাকসেস মাস্টার রেজিস্ট্রি : দেশে/বিদেশে প্রাপ্ত প্রত্যেক ডক্টরেটের থিসিস–শিরোনাম, তত্ত্বাবধায়ক, বিশ্ববিদ্যালয়, বছর, DOI/URL সংরক্ষণ ও জনসমক্ষে প্রদর্শন।
  • UGC সমতুল্যতা–প্রক্রিয়া–কে (বিদ্যমান অনলাইন প্রোফাইল ও ডকুমেন্ট–যাচাই) থিসিস–রেপোজিটরি–র সাথে ইন্টিগ্রেট করা; এক–ক্লিকে যাচাই–টোকেন।

২) অবৈধ/অস্বীকৃত প্রতিষ্ঠান–তালিকা (Negative List) – বার্ষিক আপডেট

  • রেড–ফ্ল্যাগ বুলেটিন : ভর্তি/নিয়োগ–নিষেধাজ্ঞা সহ সর্বজনীন তালিকা; বিশ্ববিদ্যালয়–মঞ্জুরি–আইন ভঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা।

৩) নিয়োগ–পদোন্নতিতে বাধ্যতামূলক থিসিস–যাচাই

  • প্রাক–নিয়োগ প্রোটোকল : বিদেশি পিএইচডি–ধারীর ক্ষেত্রে UGC সমতুল্যতার সার্টিফিকেট ও থিসিস–প্লেগিয়ারিজম রিপোর্ট (শর্ট–রিভিউ) বাধ্যতামূলক।

৪) ফৌজদারি প্রতিকার

  • ভুয়া উপাধি–ব্যবহার কে জাল দলিল/প্রতারণা–ধারায় দণ্ডনীয় অপরাধ; অসাধু নিয়োগ/পদোন্নতিতে অর্থ–ফেরত, পদ–চ্যুতি, ব্ল্যাকলিস্টিং।—(নীতিগত ভিত্তি : UGC–এর কঠোর ব্যবস্থা দাবি)।

৫) একাডেমিক সততা–শিক্ষা ও গণসচেতনতা

  • বিশ্ববিদ্যালয়–স্তরে রিসার্চ ইন্টেগ্রিটি ট্রেনিং, ন্যূনতম ডেটা ম্যানেজমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড, প্রিপ্রিন্ট/রেপোজিটরি কালচার; গণমাধ্যমে ভুয়া ডিগ্রি–ঝুঁকি–বার্তা।

৬) আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

  • CHEA/WES, আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন–নেটওয়ার্ক–এর তালিকা–ক্রস–রেফারেন্স; সন্দেহভাজন ডিপ্লোমা মিল শনাক্তে তথ্য–শেয়ারিং চুক্তি। CHEAWENR

সূচকভিত্তিক পর্যবেক্ষণ–ফ্রেম (প্রয়োগযোগ্য)

  • Input : (i) UGC সমতুল্যতা–আবেদন সংখ্যা/বছর (ii) রেড–ফ্ল্যাগড প্রতিষ্ঠান সংখ্যা/বছর।
  • Process : (ii) থিসিস–রিভিউ/প্লেগিয়ারিজম–অডিট সম্পন্নের হার (ii) যাচাই–টোকেন জেনারেশন–সময়।
  • Output : (iii) বাতিল/স্থগিত করা নিয়োগ/পদোন্নতি সংখ্যা (ii) ফৌজদারি মামলার সংখ্যা।
  • Outcome : (iv) ৫ বছরে অবৈধ প্রতিষ্ঠানের ভর্তি–প্রবাহ শূন্যে আনা (ii) আন্তর্জাতিক যৌথ–প্রকাশনায় বাংলাদেশের সাইটেশন–ইন্ডেক্স/রেটিং বৃদ্ধি।

উপসংহার : মর্যাদা–রক্ষার অবধারিত লড়াই

বাংলাদেশে পিএইচডির সংখ্যা–বৃদ্ধি যতটা আশাব্যঞ্জক, মান–ঝুঁকি ততটাই উদ্বেগজনক। অবৈধ প্রতিষ্ঠান–রোধ, কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রি, বাধ্যতামূলক যাচাই ও ফৌজদারি প্রতিকারের সমন্বিত কাঠামো গড়িয়া তুলিতে না পারিলে—উচ্চশিক্ষা, নীতিনির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা—সমস্তই বিপন্ন হইবে। প্রশ্নটি তাই নৈতিক–রাষ্ট্রনৈতিক উভয়ই—

যখন ডক্টরেট ‘উপাধি–বাজার’-এর পণ্যে অবনমিত হয়, তখন ‘ডক্টর’ শব্দটির গৌরব আমরা কিরূপে রক্ষা করিব?”

— লেখক: ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান (লিটু), অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকা্রপত্র, odhikarpatranews@gmail.com



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: