odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 3rd February 2026, ৩rd February ২০২৬
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ ও আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশের রূপরেখা—বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার

কলমের ভার কি মুদ্রার চেয়েও হালকা? আগামীর সমতাভিত্তিক বাংলাদেশের খোঁজে—যেখানে শিক্ষা হবে অধিকার, পণ্য নয়—মেধার মুক্তির প্রশ্নে বাংলাদেশ

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৩ February ২০২৬ ০২:৩৯

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৩ February ২০২৬ ০২:৩৯

বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার

বাংলাদেশে শিক্ষার অস্বাভাবিক ব্যয় এবং বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ। কোচিং বাণিজ্য বন্ধ, শিক্ষা উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চশিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করে কীভাবে একটি ব্যয়সাশ্রয়ী ও বৈষম্যহীন আগামীর বাংলাদেশ গড়া সম্ভব, তা জানতে পড়ুন এই ফিচার নিবন্ধটি। পরিসংখ্যান ও বাস্তবসম্মত সমাধানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে আগামীর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার চার স্তম্ভ।

ভোরবেলা তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে কচি হাতটা যখন খাতা-কলম হাতড়ে বেড়ায়, তখন সেই দৃশ্যটি হওয়ার কথা ছিল একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্ভাবনার উন্মেষ। কিন্তু আজ সেই খাতা-কলমের শব্দ ছাপিয়ে মধ্যবিত্ত বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজ আর ক্যালকুলেটরের খটখট শব্দ বড় হয়ে বাজছে। শিক্ষা—যা হওয়ার কথা ছিল অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার এক পলিমাটি মাখা পথ—তা আজ যেন এক খরস্রোতা নদী, যা পার হতে পকেটের সবটুকু পুঁজি বিসর্জন দিতে হচ্ছে। আমরা আজ দাঁড়িয়ে আছি এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে, যেখানে মেধার চেয়ে মুদ্রার ওজন বেশি অনুভূত হচ্ছে। আগামীর যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, সেখানে কি এই বৈষম্যের পাহাড় বজায় থাকবে? নাকি আমরা গড়ব এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে শিক্ষা হবে বাতাসের মতোই সবার জন্য সহজলভ্য?

স্বপ্ন ও বাস্তবের ব্যবধান: পরিসংখ্যানের রূঢ় আয়না

আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, বরং নাগরিকের নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো এক স্বাভাবিক অধিকার। কিন্তু ইউনেস্কোর 'গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট' আমাদের এক রূঢ় বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৭১% বহন করতে হয় পরিবারকে। প্রতিবেশী ভারত (৫২%) বা পাকিস্তানের (৫৭%) চেয়েও এই বোঝা আমাদের কাঁধে অনেক বেশি ভারি। এই সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস।

একজন অভিভাবকের মাসিক আয়ের একটি বড় অংশ গিলে খাচ্ছে তথাকথিত 'ছায়া শিক্ষা' বা কোচিং বাণিজ্য। ব্যানবেইসের তথ্যমতে, মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৮০% শিক্ষার্থী প্রাইভেট টিউশনির ওপর নির্ভরশীল। শ্রেণিকক্ষ যখন তার আকর্ষণ হারায়, তখনই কোচিং সেন্টারের নিয়ন আলোগুলো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে শ্রেণিকক্ষই হবে জ্ঞানের একমাত্র এবং পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র। যখন একটি শিশু সকালে স্কুলে যায়, তখন তার বাবার মনে এই নিশ্চয়তা থাকা চাই যে, স্কুলের চার দেয়ালের ভেতরেই তার সন্তানের মস্তিষ্কের খোরাক নিশ্চিত হবে। তাকে আর কোনো গলির মোড়ে কোচিংয়ের সিরিয়ালে দাঁড়াতে হবে না।

মুদ্রাস্ফীতির যাঁতাকলে শৈশব: উপকরণের অগ্নিমূল্য

আজকের বাজারে এক দিস্তা কাগজের দাম কিংবা একটি জ্যামিতি বক্সের মূল্য বৃদ্ধিতে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন হয় না ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি অংক খাতার পাতায় নিঃশব্দে ঝরে পড়ে কোনো এক নিম্নবিত্ত বাবার ঘাম। গত দুই বছরে কাগজের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। এর প্রভাবে পাঠ্যবই থেকে শুরু করে সহায়ক বই—সবকিছুর দাম আজ আকাশচুম্বী। শিক্ষা উপকরণের এই অস্বাভাবিক দাম আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

আগামীর বাংলাদেশে আমরা দেখতে চাই এমন এক বাজার ব্যবস্থা, যেখানে সরকার শিক্ষা উপকরণের ওপর বিশেষ ভর্তুকি দেবে। কাগজ-কলমের দাম যেন কোনো মেধাবীর কলম থামিয়ে দিতে না পারে। একটি কলম তৈরি করতে যে খরচ, তার চেয়ে বেশি যদি তার ওপর কর চাপানো হয়, তবে সেই রাষ্ট্র মেধাবীর চেয়ে রাজস্বর দিকেই বেশি মনোযোগী বলে প্রতীয়মান হয়। আমাদের দাবি পরিষ্কার—শিক্ষার প্রতিটি অনুষঙ্গকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে হবে। গ্রাম থেকে শহর, প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে যেন একই মানের কলম আর খাতা পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

উচ্চশিক্ষার দেয়াল ও বৈষম্যের ক্ষত

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজগুলোর গেট দিয়ে ঢুকতে গেলে মনে হয়, এটি যেন কোনো জ্ঞানপীঠ নয়, বরং কর্পোরেট লাউঞ্জ। উচ্চশিক্ষার এই বাণিজ্যিকীকরণ মেধাবী কিন্তু দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে। একজন কৃষক বা রিকশাচালকের সন্তান যখন মেডিকেলে চান্স পায়, তখন খুশির চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় খরচের দুশ্চিন্তা। আমরা চাই উচ্চশিক্ষায় খরচের একটি যুক্তিসঙ্গত সীমা। উচ্চশিক্ষা যেন কেবল ধনীদের বিলাসিতা না হয়ে সাধারণের অধিকার হয়।

একইসাথে, শহর ও গ্রামের শিক্ষার ব্যবধান আমাদের সামাজিক কাঠামোকে দ্বিখণ্ডিত করছে। গ্রামের একটি সাধারণ জরাজীর্ণ স্কুল আর শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মধ্যবর্তী যে কয়েক যোজন দূরত্ব, তা ঘুচিয়ে একটি 'সমতাভিত্তিক শিক্ষা' নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। আগামীর বাংলাদেশে ঢাকার সেন্ট যোসেফ আর কুড়িগ্রামের কোনো চরের স্কুলের সুযোগ-সুবিধা যেন একই সমান্তরালে থাকে। প্রযুক্তি যখন পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনেছে, তখন কেন আমাদের গ্রাম আর শহরের শিক্ষার ব্যবধান কমবে না?

ডিজিটাল ডিভাইড: আগামীর চ্যালেঞ্জ

করোনাকালীন সময় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে 'ডিজিটাল ডিভাইড' বা প্রযুক্তিগত বৈষম্য কতটা গভীর। স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ কেনা এবং উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট ডেটা প্যাক কেনা অনেক পরিবারের জন্যই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইন ক্লাসের সময় শহরের শিশুটি যখন ফাইবার অপটিক ইন্টারনেটে ক্লাস করেছে, গ্রামের শিশুটি তখন নেটওয়ার্কের খোঁজে গাছের ওপর বা উঁচু টিলায় উঠেছে। এই দৃশ্য আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক। সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান শিক্ষায় সমতা আনবে এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূর করবে।

বাজেট বরাদ্দ: যেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ

বাজেট বরাদ্দের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ১১.৮৮%, যা জিডিপি-র মাত্র .৬৯%। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী এটি হওয়া উচিত ছিল জিডিপি-র অন্তত % থেকে %

আমরা এমন একটি দেশ চাই যেখানে রাষ্ট্র তার সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব নেবে পরম মমতায়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের এই বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল। যখন রাষ্ট্র শিক্ষায় খরচ কমায়, তখন সেই ঘাটতি মেটাতে হয় সাধারণ মানুষকে তাদের পকেট থেকে। ফলস্বরূপ, শিক্ষা মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাসে পরিণত হয়। আগামীর বাংলাদেশে আমরা চাই বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হোক শিক্ষকের মানোন্নয়নে এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে।

স্বপ্নের: যেমন শিক্ষা ব্যবস্থা চাই

আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশে শিক্ষা হবে একটি বৈষম্যহীন মৌলিক অধিকার, যেখানে শ্রেণিকক্ষই হবে মানসম্মত পাঠদানের একমাত্র কেন্দ্র এবং শিক্ষকদের উপযুক্ত মর্যাদা ও বেতন নিশ্চিত করার মাধ্যমে কোচিং বাণিজ্যের অবসান ঘটানো হবে। উচ্চশিক্ষাকে বাণিজ্যিক পণ্যের খোলস থেকে বের করে খরচের যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ এবং দরিদ্র মেধাবীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হবে। একইসাথে, কাগজ ও প্রকাশনা শিল্পকে করমুক্ত করে শিক্ষা উপকরণকে সাধারণের নাগালে আনা হবে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের অবকাঠামোগত ও গুণগত ব্যবধান ঘুচিয়ে একটি সমতাভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। বাংলাদেশে আগামীর শিক্ষা স্বপ্নের চারটি স্তম্ভ রয়েছে। যথা:কোচিং ও ছায়া শিক্ষার অবসান; বাণিজ্যিকীকরণ বনাম অধিকার; উপকরণের সহজলভ্যতা; এবং গ্রাম ও শহরের মেলবন্ধন। নিম্নে বিস্তারিত আলোচিনা করা হলো:
 
১. কোচিং ও ছায়া শিক্ষার অবসান: শ্রেণিকক্ষই হোক আলোকবর্তিকা : আমরা এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি যেখানে একটি শিশু সকালে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাবে এই নিশ্চয়তা নিয়ে যে, তার প্রয়োজনীয় সবটুকু জ্ঞান ওই চার দেয়ালের ভেতরেই মিলবে। বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন স্কুল আর কোচিং সেন্টারের এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। এই ব্যবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে পড়েছে নামমাত্র হাজিরা দেওয়ার স্থান, আর আসল পড়াশোনা চলে গলি-ঘুপচির ঘিঞ্জি কোচিং রুমগুলোতে। আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশে শ্রেণিকক্ষই হবে শিক্ষার একমাত্র ও অদ্বিতীয় কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে শিক্ষকরা কেবল পাঠ্যবই পড়াবেন না, বরং শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল জাগিয়ে তুলবেন। এটি নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও বেতন কাঠামো এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে তারা টিউশনির পেছনে না ছুটে নিজের সবটুকু মেধা ও সময় শ্রেণিকক্ষেই উজাড় করে দেন। যখন স্কুলের পাঠদান মানসম্মত হবে, তখন কোনো অভিভাবককে আর বাড়তি অর্থ খরচ করে ছায়া শিক্ষার দ্বারস্থ হতে হবে না, যা মধ্যবিত্তের পকেটে সঞ্চয়ের স্বস্তি ফেরাবে।
 
২. উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ: মেধা হোক একমাত্র মানদণ্ড: উচ্চশিক্ষা কোনো পণ্য নয় যে তা কেবল চড়া দামে বাজারে বিক্রি হবে। কিন্তু বর্তমানে উচ্চশিক্ষার আঙিনাগুলো যেন একেকটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভর্তির যোগ্যতা মেধার চেয়েও বেশি নির্ভর করে পকেটের সচ্ছলতার ওপর। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান বা একজন সাধারণ শ্রমিকের সন্তান দেশের শ্রেষ্ঠতম মেডিকেল কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় খরচের চিন্তায় কুঁকড়ে যাবে না। উচ্চশিক্ষার এই অবাধ বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করতে হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাদার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি কঠোর ও যৌক্তিক ব্যয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, উচ্চশিক্ষা কেবল ধনীদের বিলাসিতা নয়, বরং দেশের প্রতিটি যোগ্য নাগরিকের সমান অধিকার। উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার যখন সাধারণের নাগালে আসবে, তখনই সমাজ থেকে মেধাবীদের ঝরে পড়ার হার শূন্যে নেমে আসবে এবং দেশ পাবে প্রকৃত দক্ষ মানবসম্পদ।
 
৩. শিক্ষা উপকরণের সহজলভ্যতা: সুলভ হোক জ্ঞানের হাতিয়ার: খাতা, কলম, জ্যামিতি বক্স আর বই—এগুলো তো কেবল বস্তু নয়, এগুলো হলো জ্ঞানের একেকটি অস্ত্র। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই অস্ত্রগুলোই আজ দামী হয়ে উঠছে। আগামীর বাংলাদেশে আমরা চাই শিক্ষা উপকরণের বাজার থাকবে সিন্ডিকেটমুক্ত এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত। কাগজ ও প্রকাশনা শিল্পের ওপর থেকে করের বোঝা কমিয়ে বা প্রয়োজনে বিশেষ ভর্তুকি দিয়ে প্রতিটি খাতা ও বইয়ের দাম এমন পর্যায়ে রাখতে হবে যাতে তা একটি শিশুর হাতে শোভা পায়, দোকানের শোকেসে নয়। আমরা এমন এক দিনের অপেক্ষায় আছি যখন প্রতিটি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় কপাল কুঁচকাবেন না, বরং আনন্দের সাথে সন্তানের জন্য নতুন বই-খাতা সংগ্রহ করবেন। শিক্ষা উপকরণ সহজলভ্য হলে শিক্ষার সার্বিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া আরও সহজ হবে।
 
৪. গ্রাম ও শহরের মেলবন্ধন: ঘুচুক সমান্তরাল বৈষম্য: আমাদের বর্তমান সমাজ কাঠামোর সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো গ্রাম ও শহরের শিক্ষার মানের আকাশ-পাতাল ব্যবধান। শহরের একটি নামী স্কুলে যে ডিজিটাল ল্যাব বা সুযোগ-সুবিধা আছে, গ্রামের একটি টিনের চালের স্কুলে তার ছিটেফোঁটাও নেই। এই বৈষম্য দূর করাই হবে আগামীর বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আমরা চাই এমন এক প্রযুক্তি-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে রাজধানীর সেরা শিক্ষকের লেকচারটি দেশের প্রত্যন্ত চরের শিক্ষার্থীটিও শুনতে পাবে। গ্রাম ও শহরের স্কুলের অবকাঠামোগত দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে হবে। ডিজিটাল ডিভাইড বা প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর করতে সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট ও ডিভাইস পৌঁছে দিতে হবে সবখানে। যখন কুড়িগ্রামের কোনো চরের স্কুল আর ঢাকার বড় কোনো স্কুলের শিক্ষার মান একই সমান্তরালে আসবে, তখনই আমরা বলতে পারব—আমরা একটি প্রকৃত বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়তে পেরেছি।

চূড়ান্ত প্রত্যাশা: একটি নতুন সূর্যের অপেক্ষায়

আমরা সেই বাংলাদেশের অপেক্ষায় আছি, যেখানে কোনো বাবাকে তার সন্তানের পরীক্ষার ফি জোগাতে ভিটেমাটি বন্ধক দিতে হবে না। যেখানে অর্থের অভাবে কোনো মেধাবীর বই-খাতা বিক্রি করে শ্রমিকের খাতায় নাম লেখাতে হবে না। শিক্ষা যখন পণ্যের খোলস ছেড়ে অধিকারের আলোয় উদ্ভাসিত হবে, তখনই প্রকৃত 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

একটি জাতির মেরুদণ্ড কেবল কাগজে-কলমে থাকলে চলে না, সেই মেরুদণ্ড হতে হয় টানটান আর সবল। আর সেই সবলতা আসে তখন, যখন রাষ্ট্রের শেষ প্রান্তের মানুষটিও অনুভব করে যে তার সন্তানের ভবিষ্যৎ টাকার অভাবে নষ্ট হবে না। অর্থের পাহাড় নয়, মেধার উজ্জ্বল্যই হোক আমাদের আগামী প্রজন্মের পরিচয়। আগামীর বাংলাদেশে "শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, এটি মৌলিক অধিকার"—এই স্লোগানটি যেন কেবল ব্যানার-ফেস্টুনে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি মানুষের জীবনের ধ্রুবসত্যে পরিণত হয়।

✍️ অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#স্মার্টবাংলাদেশ #শিক্ষাঅধিকার #ব্যয়সাশ্রয়ীশিক্ষা #বৈষম্যহীনবাংলাদেশ #কোচিংমুক্তশিক্ষা #উচ্চশিক্ষা #বাংলাদেশ২০২৬ #শিক্ষাসমতা #বাংলাদেশেরশিক্ষা #EducationForAllBD #AffordableEducation #ReformBangladesh

 

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: