—বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার
বাংলাদেশে শিক্ষার অস্বাভাবিক ব্যয় এবং বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ। কোচিং বাণিজ্য বন্ধ, শিক্ষা উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চশিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করে কীভাবে একটি ব্যয়সাশ্রয়ী ও বৈষম্যহীন আগামীর বাংলাদেশ গড়া সম্ভব, তা জানতে পড়ুন এই ফিচার নিবন্ধটি। পরিসংখ্যান ও বাস্তবসম্মত সমাধানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে আগামীর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার চার স্তম্ভ।
ভোরবেলা তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে কচি হাতটা যখন খাতা-কলম হাতড়ে বেড়ায়, তখন সেই দৃশ্যটি হওয়ার কথা ছিল একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্ভাবনার উন্মেষ। কিন্তু আজ সেই খাতা-কলমের শব্দ ছাপিয়ে মধ্যবিত্ত বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজ আর ক্যালকুলেটরের খটখট শব্দ বড় হয়ে বাজছে। শিক্ষা—যা হওয়ার কথা ছিল অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার এক পলিমাটি মাখা পথ—তা আজ যেন এক খরস্রোতা নদী, যা পার হতে পকেটের সবটুকু পুঁজি বিসর্জন দিতে হচ্ছে। আমরা আজ দাঁড়িয়ে আছি এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে, যেখানে মেধার চেয়ে মুদ্রার ওজন বেশি অনুভূত হচ্ছে। আগামীর যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, সেখানে কি এই বৈষম্যের পাহাড় বজায় থাকবে? নাকি আমরা গড়ব এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে শিক্ষা হবে বাতাসের মতোই সবার জন্য সহজলভ্য?
স্বপ্ন ও বাস্তবের ব্যবধান: পরিসংখ্যানের রূঢ় আয়না
আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, বরং নাগরিকের নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো এক স্বাভাবিক অধিকার। কিন্তু ইউনেস্কোর 'গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট' আমাদের এক রূঢ় বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৭১% বহন করতে হয় পরিবারকে। প্রতিবেশী ভারত (৫২%) বা পাকিস্তানের (৫৭%) চেয়েও এই বোঝা আমাদের কাঁধে অনেক বেশি ভারি। এই সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
একজন অভিভাবকের মাসিক আয়ের একটি বড় অংশ গিলে খাচ্ছে তথাকথিত 'ছায়া শিক্ষা' বা কোচিং বাণিজ্য। ব্যানবেইসের তথ্যমতে, মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৮০% শিক্ষার্থী প্রাইভেট টিউশনির ওপর নির্ভরশীল। শ্রেণিকক্ষ যখন তার আকর্ষণ হারায়, তখনই কোচিং সেন্টারের নিয়ন আলোগুলো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে শ্রেণিকক্ষই হবে জ্ঞানের একমাত্র এবং পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র। যখন একটি শিশু সকালে স্কুলে যায়, তখন তার বাবার মনে এই নিশ্চয়তা থাকা চাই যে, স্কুলের চার দেয়ালের ভেতরেই তার সন্তানের মস্তিষ্কের খোরাক নিশ্চিত হবে। তাকে আর কোনো গলির মোড়ে কোচিংয়ের সিরিয়ালে দাঁড়াতে হবে না।
মুদ্রাস্ফীতির যাঁতাকলে শৈশব: উপকরণের অগ্নিমূল্য
আজকের বাজারে এক দিস্তা কাগজের দাম কিংবা একটি জ্যামিতি বক্সের মূল্য বৃদ্ধিতে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন হয় না ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি অংক খাতার পাতায় নিঃশব্দে ঝরে পড়ে কোনো এক নিম্নবিত্ত বাবার ঘাম। গত দুই বছরে কাগজের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। এর প্রভাবে পাঠ্যবই থেকে শুরু করে সহায়ক বই—সবকিছুর দাম আজ আকাশচুম্বী। শিক্ষা উপকরণের এই অস্বাভাবিক দাম আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
আগামীর বাংলাদেশে আমরা দেখতে চাই এমন এক বাজার ব্যবস্থা, যেখানে সরকার শিক্ষা উপকরণের ওপর বিশেষ ভর্তুকি দেবে। কাগজ-কলমের দাম যেন কোনো মেধাবীর কলম থামিয়ে দিতে না পারে। একটি কলম তৈরি করতে যে খরচ, তার চেয়ে বেশি যদি তার ওপর কর চাপানো হয়, তবে সেই রাষ্ট্র মেধাবীর চেয়ে রাজস্বর দিকেই বেশি মনোযোগী বলে প্রতীয়মান হয়। আমাদের দাবি পরিষ্কার—শিক্ষার প্রতিটি অনুষঙ্গকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে হবে। গ্রাম থেকে শহর, প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে যেন একই মানের কলম আর খাতা পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
উচ্চশিক্ষার দেয়াল ও বৈষম্যের ক্ষত
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজগুলোর গেট দিয়ে ঢুকতে গেলে মনে হয়, এটি যেন কোনো জ্ঞানপীঠ নয়, বরং কর্পোরেট লাউঞ্জ। উচ্চশিক্ষার এই বাণিজ্যিকীকরণ মেধাবী কিন্তু দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে। একজন কৃষক বা রিকশাচালকের সন্তান যখন মেডিকেলে চান্স পায়, তখন খুশির চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় খরচের দুশ্চিন্তা। আমরা চাই উচ্চশিক্ষায় খরচের একটি যুক্তিসঙ্গত সীমা। উচ্চশিক্ষা যেন কেবল ধনীদের বিলাসিতা না হয়ে সাধারণের অধিকার হয়।
একইসাথে, শহর ও গ্রামের শিক্ষার ব্যবধান আমাদের সামাজিক কাঠামোকে দ্বিখণ্ডিত করছে। গ্রামের একটি সাধারণ জরাজীর্ণ স্কুল আর শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মধ্যবর্তী যে কয়েক যোজন দূরত্ব, তা ঘুচিয়ে একটি 'সমতাভিত্তিক শিক্ষা' নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। আগামীর বাংলাদেশে ঢাকার সেন্ট যোসেফ আর কুড়িগ্রামের কোনো চরের স্কুলের সুযোগ-সুবিধা যেন একই সমান্তরালে থাকে। প্রযুক্তি যখন পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনেছে, তখন কেন আমাদের গ্রাম আর শহরের শিক্ষার ব্যবধান কমবে না?
ডিজিটাল ডিভাইড: আগামীর চ্যালেঞ্জ
করোনাকালীন সময় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে 'ডিজিটাল ডিভাইড' বা প্রযুক্তিগত বৈষম্য কতটা গভীর। স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ কেনা এবং উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট ডেটা প্যাক কেনা অনেক পরিবারের জন্যই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইন ক্লাসের সময় শহরের শিশুটি যখন ফাইবার অপটিক ইন্টারনেটে ক্লাস করেছে, গ্রামের শিশুটি তখন নেটওয়ার্কের খোঁজে গাছের ওপর বা উঁচু টিলায় উঠেছে। এই দৃশ্য আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক। সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান শিক্ষায় সমতা আনবে এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূর করবে।
বাজেট বরাদ্দ: যেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ
বাজেট বরাদ্দের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ১১.৮৮%, যা জিডিপি-র মাত্র ১.৬৯%। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী এটি হওয়া উচিত ছিল জিডিপি-র অন্তত ৪% থেকে ৬%।
আমরা এমন একটি দেশ চাই যেখানে রাষ্ট্র তার সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব নেবে পরম মমতায়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের এই বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল। যখন রাষ্ট্র শিক্ষায় খরচ কমায়, তখন সেই ঘাটতি মেটাতে হয় সাধারণ মানুষকে তাদের পকেট থেকে। ফলস্বরূপ, শিক্ষা মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাসে পরিণত হয়। আগামীর বাংলাদেশে আমরা চাই বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হোক শিক্ষকের মানোন্নয়নে এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে।
স্বপ্নের: যেমন শিক্ষা ব্যবস্থা চাই
চূড়ান্ত প্রত্যাশা: একটি নতুন সূর্যের অপেক্ষায়
আমরা সেই বাংলাদেশের অপেক্ষায় আছি, যেখানে কোনো বাবাকে তার সন্তানের পরীক্ষার ফি জোগাতে ভিটেমাটি বন্ধক দিতে হবে না। যেখানে অর্থের অভাবে কোনো মেধাবীর বই-খাতা বিক্রি করে শ্রমিকের খাতায় নাম লেখাতে হবে না। শিক্ষা যখন পণ্যের খোলস ছেড়ে অধিকারের আলোয় উদ্ভাসিত হবে, তখনই প্রকৃত 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
একটি জাতির মেরুদণ্ড কেবল কাগজে-কলমে থাকলে চলে না, সেই মেরুদণ্ড হতে হয় টানটান আর সবল। আর সেই সবলতা আসে তখন, যখন রাষ্ট্রের শেষ প্রান্তের মানুষটিও অনুভব করে যে তার সন্তানের ভবিষ্যৎ টাকার অভাবে নষ্ট হবে না। অর্থের পাহাড় নয়, মেধার উজ্জ্বল্যই হোক আমাদের আগামী প্রজন্মের পরিচয়। আগামীর বাংলাদেশে "শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, এটি মৌলিক অধিকার"—এই স্লোগানটি যেন কেবল ব্যানার-ফেস্টুনে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি মানুষের জীবনের ধ্রুবসত্যে পরিণত হয়।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#স্মার্টবাংলাদেশ #শিক্ষাঅধিকার #ব্যয়সাশ্রয়ীশিক্ষা #বৈষম্যহীনবাংলাদেশ #কোচিংমুক্তশিক্ষা #উচ্চশিক্ষা #বাংলাদেশ২০২৬ #শিক্ষাসমতা #বাংলাদেশেরশিক্ষা #EducationForAllBD #AffordableEducation #ReformBangladesh

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: